শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০

সুহাইব ইবনু সিনান রুমি : সাহাবিদের অগ্রগামী দলের অন্যতম

0

মদিনার পথ ধরে এগিয়ে চলেছেন এক যুবক। চোখে ইস্পাত-কঠিন দৃঢ়তা। দুঃশ্চিন্তার লেশমাত্র নেই চোখেমুখে। কড়া নজরদারি আর পাহারাদারদের চোখে ধুলো দিয়ে তিনি ছুটে চলেছেন অতি সংগোপনে। মক্কা থেকে বেরিয়ে কিছুদূর না যেতেই পেছনে বালুঝড় উড়তে দেখা গেল। এতক্ষণে পাহারাদারদের টনক নড়েছে। তাদের নজরবন্দী লোকটা এই বুঝি হাতছাড়া হয়ে গেল। দিশেহারা হয়ে পড়ল তারা। দ্রুতগতির অশ্বের পিঠে চড়ে তাঁর পিছু ধাওয়া করে। পাহারাদারদের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি এক উঁচু টিলার উপর উঠলেন। তির-ধনুক বের করে হুংকার ছাড়লেন—‘হে কুরাইশ সম্প্রদায়! তোমরা খুব ভালো করেই জানো, আমি তোমাদের মধ্যে সবেচেয়ে দক্ষ তিরন্দাজ ও নিশানবাজ ব্যক্তি। আল্লাহর কসম, আমার কাছে যতগুলো তির আছে, তার প্রত্যেকটি দিয়ে তোমাদের এক-একজনকে খতম না করা পর্যন্ত তোমরা আমার কাছে পৌঁছুতে পারবে না। তারপর আমার তরবারি তো আছেই।’
কুরাইশদের একজন বলল, ‘আল্লাহর কসম! তুমি জীবনও বাঁচাবে এবং ধন-সম্পদ নিয়ে যাবে তা আমরা হতে দেবো না৷ তুমি মক্কায় এসেছিলে শূন্য হাতে। এখানে এসেই এসব ধন-সম্পদের মালিক হয়েছ।’
তিনি বললেন, ‘আমি যদি সকল ধন-সম্পদ তোমাদের হাতে তুলে দিই তোমরা আমার রাস্তা ছেড়ে দেবে?’
তারা বলল, ‘হ্যাঁ।’
যুবক তাঁদের সঙ্গে নিয়ে মক্কায় ফিরে গেলেন। কষ্টার্জিত নিজের সব অর্থ-কড়ি তুলে দিলেন কুরাইশদের হাতে। কুরাইশরা তাঁর পথ ছেড়ে দিলো। তিনি প্রফুল্ল মনে ছুটে চললেন মদিনার পানে। নিজের কষ্টোপার্জিত ধন-সম্পদের মায়া তাঁকে কাবু করতে পারেনি। তিনি ঈমানের জন্য নিজের সবকিছু বিলিয়ে দিলেন। পথে যখনই ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলেন, রাসুলের সাক্ষাতের আনন্দঘন মুহূর্তের কথা স্মরণ করে সব ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে নতুন উদ্যমে যাত্রা শুরু করছেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তখন কুবায় কুলসুম ইবনু হিদামের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। যুবককে আসতে দেখে উৎফুল্ল হয়ে তিনি বলে উঠলেন, ‘আবু ইয়াহইয়া, তোমার ব্যবসা লাভজনক হয়েছে।’ তিনবার কথাটি উচ্চারণ করলেন রাসুল। এই কথার সমর্থনে জিবরাইল আলায়হিস সালাম ওহি নিয়ে উপস্থিত হলেন—‘কিছু মানুষ এমনও আছে, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের জীবনও বিক্রি করে দেয়। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত মেহেরবান।’

কে এই আবু ইয়াহইয়া?
তিনি সুহাইব ইবনু সিনান রুমি রাদিয়াল্লাহু আনহু। বসরার প্রাচীন শহর উবুল্লার রাজপরিবারে যাঁর জন্ম। তাঁর পিতা সিনান ইবনু মালিক উবুল্লার শাসক ছিলেন। রাজপুত্র হলেও তাঁর শুরুর জীবনের গল্পটা খুবই করুণ। হৃদয়বিদারক।
তিনি তখনও সাহাবি হননি। ছোট্ট সুহাইব। কিছু লোক-লষ্করসহ মায়ের সাথে বেড়াতে বেরিয়েছে ইরাকের সানিয়্যা নামক এলাকায়। এক রাতে রোমক বাহিনী অতর্কিত আক্রমণ করে বসে। ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ ও লুণ্ঠন চালায়। বন্দী করে নারী ও শিশুদের। ছোট্ট সুহাইবও সেই বন্দীদের দলে। শুরু হয় তাঁর জীবনের বেদনাদায়ক অধ্যায়। রোমের দাসবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয় তাঁকে। দাসত্বের করুণ জীবন বরণ করে রোমের ভূমিতেই যৌবনে পদার্পণ করেন। রোমবাসীর জীবনাচার ও নোংরা সংস্কৃতি অবলোকন করেন নিজ চোখে। সেখানকার ভাষা ও সুরও আয়ত্ব করে ফেলেন। তবে তাঁর হৃদয়-মন জুড়ে ছিল শুধু আরব। সদা-সর্বদা। মরু আরবে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তাঁকে তাড়িয়ে ফিরতে সবসময়। তাঁর আকাঙ্ক্ষা প্রবলতর হয়ে ওঠে এক খ্রিষ্টান কাহেনের এই ভবিষ্যদ্বাণী শুনে—‘সে সময় সমাগত যখন জাজিরাতুল আরবের মক্কায় একজন নবি আবির্ভূত হবেন। তিনি ঈসা ইবনু মারইয়ামের রিসালাতের সত্যায়ন করবেন এবং মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে আসবেন।’ এই ভবিষ্যদ্বাণী তাঁকে আরবভূমিতে ফিরে যেতে ব্যাকুল করে তোলে। তিনি সুযোগের প্রতীক্ষায় থাকলেন।
সুযোগও এসে গেল। দাসত্বের জীবন বরণ করে তিনি প্রেরিত হলেন মক্কায়৷ এবার মনিব মক্কার বিশিষ্ট কুরাইশ নেতা আবদুল্লাহ ইবনু জুদআন। মনিব তাঁর ধীশক্তি, প্রখর মেধা ও চরিত্রে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে আজাদ করে দেন। যুক্ত করেন নিজের ব্যবসায়। সমঅংশীদারত্বে৷ শুরু হলো সুহাইবের স্বাধীন জীবন। ব্যবসায় দারুণ সফলও হন। দাস সুহাইব হয়ে গেলেন মক্কার স্বনামধন্য ব্যবসায়ী সুহাইব।

ইসলামের ছায়ায়
সফর থেকে ফিরে এসেছেন সুহাইব। শুনতে পেলেন মুহাম্মাদ ইবনু আবদিল্লাহ নবুওয়াত লাভ করেছেন। তিনি মানুষকে এক-আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার দাওয়াত দিচ্ছেন। আদল ও ইনসাফের সবক শেখাচ্ছেন। যাবতীয় অশ্লীল ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিচ্ছেন। মনে পড়ে গেলে তাঁর সেই কাহেনের কথা। যার ভবিষ্যদ্বাণী তাঁকে বেকারার করে তুলেছিল। তিনি নবির সাথে দেখা করতে অস্থির হয়ে উঠলেন। ছুটে চললেন আল-আরকাম ইবনু আবিল আরকামের বাড়ির দিকে। অতি সন্তর্পণে।
দারুল আরকামের দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন আম্মার ইবনু ইয়াসির। ভেতরে অবস্থান করছেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম। আম্মার কে দেখে সুহাইব ইতস্তত বোধ করলেন। এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আম্মার, তুমি এখানে?’ আম্মার পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘তুমিই বলো, তুমি কেন এসেছ?’ সুহাইব জবাব দিলেন, ‘আমি এই লোকটির কিছু কথা শুনতে চাই।’ আম্মার বললেন, ‘আমার উদ্দেশ্যও তাই। তখন সুহাইব বললেন, ‘তাহলে আমরা আল্লাহর নামে নিয়ে ঢুকে পড়ি, চলো।’
দুইজনে একসাথে হাজির হলেন রাসুলের দরবারে। মনোযোগ দিয়ে তাঁর কথাগুলো শুনলেন। মুগ্ধ-অভিভূত হয়ে একত্রে কালেমা পাঠ করলেন দুইজন। ব্যবসায়ী সুহাইব হয়ে গেলেন সুহাইব রাদিয়াল্লাহু আনহু। হেদায়েতের আলোকোজ্জ্বল পথের পথিক। উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের একজন।

বিভীষিকাময় দিনগুলো
মক্কার সেই সময়টা ছিল মুসলমানদের জন্য ঘোর অমানিশাকাল। কেউ মুসলমান হলেই তাঁর উপর নির্যাতনের স্টীম-রোলার চালানো হতো। যেই নির্যাতন পৃথিবীবাসী এর আগে কখনো দেখেনি। জুলুম-অত্যাচারের ভয়ে মুসলমানরা নিজেদের ঈমানের কথা গোপন রাখতেন। তবে মক্কায় সুহাইব রাদিয়াল্লাহু আনহু পারলেন না। মক্কায় তাঁর কোনো আত্মীয়-স্বজন না থাকলেও তিনি ঘোষণা করে দিলেন নিজের ঈমানের কথা। একত্ববাদে বিশ্বাসী হওয়ার কথা৷ ফলে কাফেরদের নিষ্ঠুর অত্যাচারের শিকারে পরিণত হন। বিলাল, আম্মার আর সুমাইয়া রদিয়াল্লাহু আনহার মতো শুরু হয় তাঁর জীবনের বিভীষিকাময় অধ্যায়। তবে তিনি দমে যাননি।
ধৈর্যের সাথে সকল অত্যাচার সহ্য করেন৷ কেননা তিনি জানেন, জান্নাতের পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়, কণ্টকাকীর্ণ। এ পথের বাঁকে বাঁকে রয়েছে হাজারও বাধা৷ যা পেরোলেই চির শান্তির স্থান জান্নাত।

রাসূলের সান্নিধ্যে
মুসলমানদের দুর্দিন শেষ হতে চলল। রাসূলের নির্দেশ পেয়ে একে একে সবাই হিজরত করলেন মদিনায়। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় নবিকেও হিজরতের হুকুম দিলেন। সুহাইব রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের হিজরতের বিষয়ে অবগত হলেন, তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল তিনিই হবেন ‘সালেসু সালাসাহ’— তিন জনের একজন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম, আবু বকর ও সুহাইব। তবে তাঁর ইচ্ছেটা পূর্ণ হলো না। কুরাইশদের নজরদারি আর কড়া পাহারা ছিল তাঁর উপর। যেন সুহাইব তাঁর অর্জিত সম্পদ নিয়ে কিছুতেই মক্কা ছেড়ে যেতে না পারে, যে অর্থ-কড়ি তিনি মক্কায় এসেই কামিয়েছেন। সুহাইবও হাল ছাড়লেন না। সুযোগের প্রতীক্ষায় থাকলেন। অবশেষে সে সুযোগ এসেও গেল। নিজের সমস্ত ধন-সম্পদ ঈমানের জন্য বিসর্জন দিলেন। ইতিহাসে স্থাপন করলেন অপূর্ব দৃষ্টান্ত। যা আগে কেউ প্রত্যক্ষ করেনি।
মদিনায় সাদ ইবনু খুসাইমার ঘরে অতিথি হলেন সুহাইব। হারিস ইবনুস সাম্মা আল-আনসারির সাথে আল্লাহর রাসুল তাঁর ভ্রাতৃসম্পর্ক গড়ে করে দিলেন। যেই সম্পর্ক ছিল অসীম ত্যাগের।
সুহাইব রাদিয়াল্লাহু আনহু জীবনের বড় একটা অংশ রাসুলের সান্নিধ্যে কাটানোর সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন। বদর, উহুদ, খন্দকসহ সকল যুদ্ধেই লড়েছেন বীরত্বের সাথে। দাসবেশে মক্কায় আসার সুবাদে ওহি নাজিলের পূর্বেই খুব কাছ থেকে নবিজিকে দেখার সুযোগ লাভ করেন। ফলে সকল সৎ গুণের সমাবেশ ঘটেছিল তাঁর মধ্যে। সচ্চরিত্রতা ও বুদ্ধিমত্তা তাঁর চরিত্রকে আরও সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছিল। জীবনের পড়ন্তবেলায় রাসুলের সাথে কাটানো সময়গুলোর সুখস্মৃতিচারণ করে তিনি বলতেন, ‘রাসুলের প্রতিটি দৃশ্য, প্রতিটি ভূমিকায় আমি উপস্থিত থেকেছি। তিনি যখনই কোনো বায়আত গ্রহণ করেছেন, আমি উপস্থিত থেকেছি।তাঁর ছোট ছোট অভিযানগুলোতে অংশগ্রহণ করেছি। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত যত যুদ্ধ তিনি করেছেন তাঁর প্রত্যেকটিতে আমি তাঁর ডানে অথবা বামে অবস্থান করে যুদ্ধ করেছি। মুসলমানরা যতবার এবং যেখানেই পেছনের অথবা সামনের শত্রুর ভয়ে ভীত হয়েছে, আমি সবসময় তাঁদের সাথে থেকেছি। রাসুলকে কখনোই আমরা নিজের ও শত্রুর মাঝখানে হতে দিইনি। আর এভাবে রাসুল তাঁর প্রভুর সান্নিধ্যে গমন করেন।’

যেমন ছিলেন তিনি
রাসুলের সান্নিধ্যে থেকে তিনি পরিণত হয়েছিলেন মহামানবে। দয়া-দানশীলতা ও আতিথেয়তায় ছিলেন অতুলনীয়। তাঁকে দারুণ অমিতব্যায়ী মনে করা হতো। কেননা গরীব-দুঃখীর প্রতি তিনি ছিলেন উদারহস্ত। মানবের প্রশংসনীয় গুণাবলিতে ছিলেন সুসজ্জিত। তাই সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে তিনি সুউচ্চ মর্যাদায় আসীন ছিলেন। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর ব্যাপারে উচ্চাঙ্গের সুধারণা পোষণ করতেন। ভালোবাসতেনও খুব। মৃত্যুর পূর্বে ওসিয়ত করে যান, সুহাইব যেন তাঁর জানাজার ইমাম হন। যতক্ষণ না শূরার সদস্যবৃন্দ নতুন খলিফার নাম ঘোষণা করবেন খেলাফতের দায়িত্ব পালন করবেন সুহাইব। কত ভরসা ছিল, বিশ্বাস ছিল সুহাইব রাদিয়াল্লাহু আনহু’র উপর। কতটা ভালোবাসার মানুষ ছিলেন তিনি! আর কেনই-বা হবেন না? দ্বীনের জন্য তিনি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তার কি কোনো তুলনা হয়?
উমরের ওসিয়তগুলো সুহাইব পূর্ণ করেছিলেন। উমরের মৃত্যুর তিন দিন পর পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে খেলাফতের দায়িত্ব পালন করেন।

অনন্তকালের মহাযাত্রায়
সুহাইব ইবনু সিনান রাদিয়াল্লাহু আনহু’র জীবনটা রাজপুত্রের মতো শুরু হলেও মাঝে তাঁকে অনেক চড়াই-উতরাই পেরোতে হয়েছে। দাসত্বের শৃঙ্খলে কেটেছে জীবনের বড় একটা সময়৷ তবে ভাগ্য তাঁর সহায় ছিল৷ পরিণত বয়সে তিনি পেয়েছিলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানবের দেখা। হয়েছিলেন তাঁর প্রতি উৎসর্গিত-প্রাণ। দ্বীনের জন্য নিবেদিত-প্রাণ এই সাহাবি হিজরি ৩৮ সনে ৭২ বছর বয়সে মদিনায় ইন্তেকাল করেন।

মদিনার জান্নাতুল বাকিতে তাঁকে দাফন করা হয়।

তথ্যসূত্র
১. তাবাকাতে ইবনে সাআদ ৩/২২৬
২.সিফাতুস সফওয়া ১/১৬৯
৩. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৩/৩১৮-৩১৯
৪. উসদুল গাবাহ ৩/৩০
৫. আল-ইসাবা ২/১৯৫
৬. সুয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবা সূচি দ্রষ্টব্য
৭.হায়াতুস সাহাবা ৪র্থ খণ্ডের সূচি দ্রষ্টব্য

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

error: Content is protected !!