শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০

সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনু সুহাইল

0

বদর-প্রান্তরে চলছে হক-বাতিলের তুমুল লড়াই। তিনশো তেরোজন প্রায় নিরস্ত্র মুসলিম সৈন্য যুদ্ধ করছেন সশস্ত্র হাজার মুশরিকের বিরুদ্ধে। বলাবাহুল্য, এই গোটাকয়েক দুর্বল মুসলিমকে তাদের পরাজিত করা বাম হাতের খেলা মাত্র। এমন সময় মুশরিক-দলের এক যুবক আল্লাহু আকবার বলে শিরকের পোশাক ছিঁড়ে ফেললেন। দৌড়ে গিয়ে দাঁড়ালেন মুসলমানদের সারিতে।
যুবকের নাম আবদুল্লাহ। পিতার নাম সুহাইল। সুহাইল আরবের এক প্রসিদ্ধ ব্যক্তি। অসাধারণ বাগ্মীও তিনি। তাঁকে ‘কুরাইশের খতিব’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল। তাঁর বক্তব্যের এত শক্তি ছিল যে, বড় বড় সমাবেশে মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দিত। এ ছাড়া তাঁর বিচক্ষণতা, বুদ্ধিমত্তা কুরাইশদের কাছে অজানা ছিল না। তবুও এই বিচক্ষণ লোকটি তখন পর্যন্ত ঈমান আনেননি। আশ্রয় নেননি ইসলামের ছায়াতলে। বারবার হোঁচট খাচ্ছিলেন শিরকের অন্ধগলিতে।
আবদুল্লাহ ইবনু সুহাইল ছিলেন আমের ইবনু লুব্বি গোত্রের সন্তান। পিতা-মাতা উভয়ের বংশধারা উপরের দিকে গিয়ে নবিজির বংশের সাথে মিলেছে। বংশপরম্পরা—আবদুল্লাহ ইবনু সুহাইল ইবনি আমর ইবনি আবদে শামস ইবনি আবদে ওয়াদ ইবনি নাজার ইবনি মালিক ইবনি হাসাল ইবনি আমের ইবনি লুব্বি। মাতার দিক দিয়ে বংশধারা—আবদুল্লাহ ইবনু ফাখনাহ বিনতি আমের ইবনি নওফেল ইবনি আবদে মানাফ ইবনি কুসাই।
ইসলামের প্রথম যুগেই আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু ঈমান আনেন। এতে তার পিতার মাথায় রাগ চড়ে বসে। তিনি তাঁকে মারধর করতে শুরু করেন। এমনকি ঘরে বন্দী করেও রাখেন। কিন্তু কোনো কাজ হলো না। তিনি হক থেকে বিন্দুমাত্র টলেননি। শেষপর্যন্ত সুহাইল অভিভাবকত্ব পরিত্যাগ করেন। যার ফলে মক্কার মুশরিকরাও আবদুল্লাহর ওপর নির্যাতন করা শুরু করে। এদিকে নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম সাহাবিদের নির্যাতিত হতে দেখে হাবশায় হিজরতের নির্দেশ দিলেন। ফলে আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু মক্কা ছেড়ে হাবশায় হিজরত করেন। কিছুদিন পর কোনো এক কারণে তিনি আবার মক্কায় আসেন। পিতা সুহাইল তখন তাঁর উপর আরও ভয়ানক মাত্রায় নির্যাতন চালাতে শুরু করেন। নির্যাতনের কোনো সুযোগই হাত ছাড়া করলেন না সুহাইল। তাঁকে ঘরের এক কোণে হাত পা-বেঁধে রাখলেন। পরিষ্কার করে বলে দিলেন—মুহাম্মদের ধর্ম ছেড়ে দাও নতুবা তোমাকে ক্ষুৎ-পিপাসা নিয়ে মরতে হবে।’ বাধ্য হয়ে ওই দিন প্রকাশ্যত পিতার নির্দেশ মেনে নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু অন্তরের দিক থেকে রয়ে গিয়েছিলেন পাক্কা ঈমানদার। অবশেষে বদরের প্রান্তরে তাঁর গোপন ঈমানের জৌলুশ হাজার কাফেরের সামনে পুনরায় প্রকাশ করে দিলেন। ছেলের দল-বদলানো দেখে সুহাইলের চোখ রাগে অগ্নিশর্মা। কোনোকিছু করতে না পেরে দাঁতে দাঁত কাটতে লাগলেন।
যুদ্ধ তুমুলভাবে শুরু হলো। একপর্যায়ে আল্লাহর সাহায্যে মুসলমানরা বিজয়ী হলেন। আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুও নিজেকে বদরি সাহাবিদের অন্তর্ভুক্ত করার সৌভাগ্য লাভ করলেন। এরপর তিনি উহুদ, খন্দক, হুদায়বিয়া, মক্কাবিজয়সহ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের যুগের বড় বড় যুদ্ধেও তাঁর সহগামী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন। বাইয়াতে রিদওয়ানেও তিনি শরিক ছিলেন। এবং হুদায়বিয়ার সন্ধিপত্রে সাক্ষী হিসেবে নিজের নাম লিখিয়েছিলেন।
৮ম হিজরি। মুসলমানরা কোনো রক্তপাত ছাড়াই মক্কা বিজয় করেছে। কাফেররা নিজেদের জান বাঁচাতে পাগলের মতো ছুটছে। সুহাইলও ঘরের দরজা বন্ধ করে এক কোণে বসে আছেন। তাঁর মনে বারবার নিজের প্রাণবায়ু উড়ে যাওয়ার আশংকা হচ্ছে। ফলে আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলে পাঠালেন—‘আমাকে মুহাম্মাদের হাত থেকে রক্ষা করো।’ পিতার অসহায়ত্ব দেখে আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু নবিজির কাছে গেলেন।
‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমার পিতাকে নিরাপত্তা দিন।’ নবিজির কাছে পিতার জন্য আবদুল্লাহর আরজি।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম হলেন রাহমাতুল্লিল আলামিন। যাঁকে সৃষ্টি করা না হলে এই পৃথিবীও সৃষ্টি করা হতো না। তিনি কি আর নিরাপত্তা না দিয়ে পারেন!
‘তাকে নিরাপত্তা দেয়া হলো। নির্ভয়ে ঘোরাফেরা করতে পারবেন তিনি।’ বললেন রাসুল।
সেই সাথে সাহাবিদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আল্লাহর কসম! সুহাইল একজন বিজ্ঞ লোক। এ ধরনের প্রজ্ঞাসম্পন্ন মানুষ ইসলাম থেকে দূরে থাকতে পারেন না। তোমরা তাঁর সাথে উত্তম আচরণ কোরো।’
অতঃপর মক্কাবিজয়ের কয়েকদিনের মাথায় আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুর পিতা সুহাইল ইসলামের সুশীতল ছায়াকে নিজের পরবর্তী জীবনের জন্য বেছে নেন। মুসলমান হওয়ার পর তাঁর বাকি জীবন অতীত-সংশোধনেই কেটেছিল।
প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পর বাতিল শক্তি বেড়ে গিয়েছিল। মুসায়লামাতুল কাজ্জাব নিজেকে নবি দাবি করছিল। তাকে নির্মুল করতে খলিফা আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু একটি বাহিনী পাঠান। নেতৃত্বে ছিলেন খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ। আবদুল্লাহ ইবনু সুহাইল রাদিয়াল্লাহু আনহুও এই বাহিনীতে ছিলেন। ইয়ামামাহ নামক স্থানে উভয় দলের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বীরত্বের সাথে লড়াই করেন। একপর্যায়ে তাঁকে তির বা তরবারি দ্বারা আঘাত করলে তিনি আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই শাহাদতের অমীয় সুধা পান করে আখেরাতের সফর শুরু করেন। শাহাদাতকালে তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৩৮ বছর।

তথ্যসূত্র : সারাওয়ারে কায়েনাত ক্যা পাঁচাস সাহাবা; তালিব আল-হাশেমি

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

রাজনগর, মৌলভীবাজারের ছেলে। আলেম পরিবারের সন্তান। কওমি মাদরাসায় অধ্যয়নরত। পড়াশোনার ফাঁকে টুকটাক লেখালেখির মশক করেন।

error: Content is protected !!