শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০

সাহাবিয়্যাহ আসমা বিনতু আবি বকর : সৌভাগ্য যাঁর পদ চুম্বন করে

0

আসমা। যাঁকে ডাকা হয় ‘যাতুন নিতাকাইন’ নামে। বাবা তাঁর শ্রেষ্ঠ সাহাবি। স্বাধীন পুরুষদের মধ্যে প্রথম ইসলামগ্রহণকারী, রাসুলের হিজরতের সঙ্গী, রাসুলের অন্তরঙ্গ বন্ধু, জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত শ্রেষ্ঠ সাহাবি আবু বকর আস-সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু। বোন আয়েশা রাসুলের প্রিয়তমা স্ত্রী, উম্মুল মুমিনিন। স্বামী যুবাইর ইবনুল আওয়াম নবিজির বিশেষ সাহায্যকারী। তাঁর বাবা, দাদা, চাচা, ভাই, বোন, ছেলে, শ্বাশুড়ি সকেলই রাসুলের সাহচর্যপ্রাপ্ত সাহাবি। দুনিয়াতে এরচেয়ে সৌভাগ্য আর কী হতে পারে!

দুনিয়াতে শুভাগমন ও ইসলামগ্রহণ
হিজরতের সাতাশ বছর আগে তিনি মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম যখন নবুওয়াত লাভ করেন তখন তিনি মাত্র কিশোরী। পারিবারিক সূত্রে ইসলামের সূচনালগ্নেই তিনি ঈমান আনয়নের সৌভাগ্য লাভ করেন। ইমাম নাওবি রহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেন, ‘তাঁর ঈমান আনার আগে মাত্র সতেরজন মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।’ তাঁর আগে নারীদের মধ্যে শুধুমাত্র খাদিজা, উম্মু আয়মান, উম্মুল ফযল ও ফাতিমা বিনতুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

‘যাতুন নিতাকাইন’
খাবার তৈরি করা শেষ। পানিও ভরা হয়েছে মশকে। এখন শুধু থলের মুখদুটো বেঁধে দেবার পালা। কিন্তু বাঁধার জন্য কোনো রশি পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে কাজটাও তাড়াতাড়ি শেষ করতে হবে। কী করা যায়! হ্যাঁচকা টান দিয়ে খুলে ফেললেন কোমরবন্ধনীটা। তারপর দু টুকরো করে বেঁধে দিলেন খাবার ও পানির থলে। যত্ন করে তুলে দিলেন বাবার হাতে। সেটা নিয়ে তিনি বেরিয়ে গেলেন লম্বা সফরে। প্রিয় বন্ধু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সাথে। যাবার আগে রাসুল দুআ করে দিলেন, ‘আল্লাহ তোমাকে এই একটার বদলে জান্নাতের দুইটি কোমরবন্ধনী দান করুন।’ সেদিন থেকে তিনি হলেন ‘যাতুন নিতাকাইন’। দুই ফিতার অধিকারিনী। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি এ খ্যাতিতে প্রসিদ্ধ ছিলেন।
বলছিলাম আসমা বিনতু আবি বকর রাদিয়াল্লাহু আনহার কথা। হিজরতের সময় এভাবেই তিনি সাহায্য করেছিলেন বাবা আবু বকর এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে। শুধু কি তাই! বাবার অনুপস্থিতিতে পরিবারের বিভিন্ন সমস্যাও সামলেছেন অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে।

বুদ্ধিতে তাঁর জুড়ি মেলে না
রাতের অন্ধকারে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু হিজরত করেছেন রাসুলের সাথে। দিনের আলো ফুটতে না ফুটতেই চারদিকে এ খবর চাউর হয়ে গেছে। পরদিন দাদা আবু কুহাফা এলেন আবু বকরের ঘরে। এসেই হম্বি তম্বি। ‘আবু বকর কোথায়? সে কি তোমাদের জন্য কিছু রেখে গেছে? না সব সঙ্গে করে নিয়ে গেছে? সে কীভাবে তার পরিবারকে নিঃস্ব করে গেল? একবারও ভাবল না তারা কীভাবে দিন পার করবে!’ আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহা এগিয়ে এলেন। মিষ্টি হেসে বললেন, ‘আরে দাদু! তুমি মিছেমিছি রাগ করছ। এই দেখো, বাবা আমাদের জন্য কত সম্পদ রেখে গেছেন!’ একথা বলে অন্ধ আবু কুহাফাকে নিয়ে গেলেন সম্পদ রাখার স্থানে। আসমা কিছু পাথর কাপড়ে ঢেকে রেখে দিয়েছিলেন সেখানে। আবু কুহাফা তার ওপর হাত বুলিয়েই শান্ত হলেন। এই ভেবে চলে গেলেন যে, অনেক সম্পদ রেখে গেছে তার ছেলে। এদিকে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু যাওয়ার সময় তাঁর সব টাকা সঙ্গে নিয়ে বেরিয়েছিলেন। বলা যায় না পথে রাসুলের কখন কীসের দরকার পড়ে। কিন্তু আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহা এই কৌশলটি করলেন বাবার সম্মান বাঁচাতে। নইলে দাদা আরও রেগে যেতেন। হয়তো নিজেই সাহায্য করতে এগিয়ে আসতেন। কিন্তু আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহা চান না তার থেকে কোনো সাহায্য নিতে। কারণ তিনি যে তখনও জাহেলিয়াতের অন্ধকারে।

আবু জেহেলের অত্যাচার
সকাল সকাল আবু জেহেল এসে উপস্থিত। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর খোঁজ জানতে চায়। বাজখাঁই গলায় জিজ্ঞেস করল—‘আবু বকর কোথায়?’ এবারও এগিয়ে এলেন আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহা। সাহসিকতার সাথে জবাব দিলেন, ‘তিনি কোথায় আছেন আমরা তা জানি না।’ একথা শুনে আবু জেহেল প্রচণ্ড রেগে গেল। নির্দয়ের মতো কষে একটা থাপ্পড় মারল তাঁর গালে। এতো জোরে আঘাত করল যে তাঁর কানের দুল খুলে ছিটকে পড়ে গেল দূরে। তারপরও তিনি অনড়। কিছুতেই বলেননি আবু বকর এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম কোথায় গেছেন। অভিশপ্ত আবু জেহেলও ফিরে গেল রাগে গজগজ করতে করতে।

রাতের আঁধারে রাসুলের সাহায্যে
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম এবং বাবা আবু বকর আশ্রয় নিয়েছেন সাওর পর্বতের গুহায়। তাঁদেরকে খাবার পৌঁছে দিতে হবে। শত্রুরা গিজগিজ করছে চারদিকে। কোনোভাবে যদি রাসুলের অবস্থান জানতে পারে তাহলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। আসমা রাদিয়াল্লাহু চুপিচুপি বেরিয়ে পড়লেন ভাই আবদুল্লাহর সাথে। রাতের অন্ধকারে খাবার নিয়ে পৌঁছুলেন সাওর পর্বতে। আবার সকাল হবার আগেই ফিরে আসেন নিজের ঘরে।

সৌভাগ্যের চাঁদ-আঁচল-তলে
দীর্ঘ মরুপথ পাড়ি দিয়ে কাফেলা পৌঁছুল কুবা পল্লিতে। আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহা পেটে বাচ্চা নিয়েই নেমে পড়েছিলেন দীর্ঘ কষ্টকর সফরে। শারীরিক অসুস্থতা বা মরুপথের হাজারও প্রতিবন্ধকতা—কোনোকিছুই তাঁকে পারেনি হিজরতের পথে বাধা দিতে। তবে গন্তব্যে পৌঁছে বিশ্রামের সময়টুকুও তাঁর মেলেনি। এর আগেই শুরু হলো প্রসব-বেদনা। অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করে জন্ম দিলেন একটি পুত্র সন্তানের। মদিনার মুসলমানেরা খুশিতে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে তোলেন। তাঁরা বলতে লাগলেন—‘এ শিশু আমাদের জন্য সৌভাগ্য নিয়ে এসেছে। সে কাফেরদের দেয়া অপবাদকে মিথ্যা প্রমাণিত করেছে। তারা তো বলত, মদিনার ইহুদিদের জাদুতে মুসলিম নারীরা বন্ধা হয়ে গেছে। আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহা কলিজার টুকরো ছেলেকে তুলে দিলেন রাসুলের কোলে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম সামান্য খেজুর চিবিয়ে নিজের হাতে বাচ্চার মুখে দিলেন। তারপর অনেক দুআ করলেন এবং বাচ্চার নাম রাখলেন আবদুল্লাহ। আবদুল্লাহ ইবনু যুবাইর ইবনিল আওয়াম। যাঁর প্রথম খাবার ছিল রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের পবিত্র লালা-মিশ্রিত বরকতময় খাবার। এবং এই শিশু-সন্তানই পরবর্তী সময়ের ইতিহাসের বড় একটি অংশ দখল করেছেন ইসলামের জন্য তাঁর ত্যাগ এবং সত্যের ওপর অবিচলতার মাধ্যমে।

দানশীলতায় প্রবাদতুল্য
আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন খুবই দানশীল নারী। হাতে যা আসত তাই বিলিয়ে দিতেন। আজকেরটা কালকের জন্য জমা করতেন না কখনও। এভাবে দান করতে করতে এ ব্যাপারে তিনি নিজেই একটি দৃষ্টান্ত হয়ে গিয়েছিলেন।
আবদুল্লাহ ইবনু যুবাইর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘আমি আমার মা আসমা এবং খালা আয়েশার মতো দানশীলা নারী কখনও দেখিনি। তবে তাঁদের দান করার ধরন ছিল ভিন্ন ভিন্ন। খালা আয়েশা বিভিন্ন সম্পদ জমা করতেন। তারপর হঠাৎ একদিন সব একসাথে দান করে দিতেন। আর মা আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহা হাতে যা পেতেন তাই দান করতেন। আগামীকাল পর্যন্তও কোনো জিনিস জমা করতেন না।’
আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহা তাঁর ছেলে-মেয়েদের এই বলে ওসিয়ত করতেন যে, ‘তোমাদের ধন-সম্পদ দেয়া হয় দান করার জন্য। তোমরা যদি তা অন্যের জন্য ব্যয় করতে কৃপণতা করো তাহলে আল্লাহও তোমাদের বঞ্চিত করবেন। তোমরা যা দান করবে তাই প্রকৃতপক্ষে তোমাদের সঞ্চয় হিসেবে থাকবে।’
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার ইন্তেকালে পরে একখণ্ড জমি তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেন। জমিটা বিক্রি করে পুরো টাকা দান করে দেন। যখনই তিনি অসুস্থ হতেন তাঁর মালিকানায় থাকা সমস্ত দাস আজাদ করে দিতেন। দানশীলতার এই গুণটা আমৃত্যু তাঁর রক্তে মিশে ছিল।

দুঃখ-সুখের জোয়ার-ভাটায়
মক্কার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আবু বকরের মেয়ে আসমা। যাঁর জন্ম হয়েছে সোনার চামচ মুখে নিয়ে, শৈশব-কৈশোরের প্রায় পুরোটা সময় কেটেছে বিপুল ঐশ্বর্য্যে। একসময় ধনীর দুলালীর স্বপ্নকুমার বাস্তবে এসে ধরা দেয়। রাসুলের ফুফাতো ভাই যুবাইর ইবনুল আওয়ামের সাথে তাঁর বিয়ে হয়। তিনি ছিলেন ভীষণ দরিদ্র। তবে সম্পদের ঐশ্বর্য না থাকলেও তাঁর স্বভাব-চরিত্র ও বীরত্ব ছিল গর্ব করার মতো।
স্বামীর ঘরে এসে আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহার অন্যরকম এক জীবন শুরু হয়। অভাবে-অনটনে দিন কাটতে থাকে। কিন্তু তাতে একটুও অসন্তুষ্টি নেই তাঁর। বরং সংসারের সব কাজ নিজ হাতেই করেন। স্বামীর খেদমতেও কোনো ত্রুটি হতে দেন না। এমনকি উট-ঘোড়ার রাখালির কাজও তিনিই করতেন। অভাবের সংসারে খুব হিসেব করে চলতেন তিনি। সব জিনিস মেপে মেপে ব্যবহার করতেন। তাঁর এ অবস্থা দেখে একদিন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বলেন, ‘আসমা, তুমি মেপে মেপে খরচ করবা না। যদি এরকম করো তাহলে আল্লাহও তোমাকে মেপে মেপেই দেবেন।’ তারপর থেকে তিনি আর কখনও এমনটা করেননি।
একসময় যুবাইর রাদিয়াল্লাহু আনহুর অবস্থার পরিবর্তন হয়। বিপুল সম্পদের অধিকারী হন তিনি। কিন্তু তারপরও আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহা কখনও বিলাসী জীবন যাপন করেননি। বরং শুকনো রুটি আর মোটা কাপড়ে জীবন পার করেছেন। অল্পেতুষ্টি ছিল তাঁর স্বভাবজাত গুণ। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি এভাবেই চলেছেন।

গুণবতী
আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন একজন গুণবতী নারী। অসংখ্য গুণের সমাবেশ ঘটেছিল তাঁর স্বত্তাজুড়ে। আদব, আখলাক, বিনয়, নম্রতা, লজ্জা, বুদ্ধিমত্তা, দানশীলতা ছিল তাঁর স্বভাবজাত বিষয়। এ ছাড়াও তাঁর খোদাভীতি ছিল অতুলনীয়। তিনি যখন কুরআন তেলাওয়াত করতেন তখন এক আয়াত বারবার পড়তেন এবং পড়তে পড়তে কেঁদে ফেলতেন।

স্বপ্নের ব্যাখা ও কাব্যপ্রতিভা
সে সময়ে আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন নানাবিধ জ্ঞানের উৎসস্থল। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ স্বপ্নের ব্যাখাকারিণী। তাবেয়িদের মধ্যে সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব রহমাতুল্লাহি আলায়হি ছিলেন অন্যতম স্বপ্ন-ব্যাখাকার। এ জ্ঞান তিনি লাভ করেছিলেন আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহার থেকে। আর আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহা তা পেয়েছিলেন তাঁর পিতা আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর থেকে। একজন বাগ্মী নারী হিসেবেও তাঁর পরিচিতি ছিল। কাব্যপ্রতিভা ছিল তাঁর বিশেষ একটি গুণ। স্বামী যুবাইর এবং পুত্র আবদুল্লাহর ইন্তেকালের পর তিনি মর্সিয়া রচনা করেন। যা বিভিন্ন গ্রন্থে উল্লেখিত আছে।

হাদিস বর্ণনা
আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহা হাদিস বর্ণনায় অনেক সাহাবির চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। তিনি আটান্নটি হাদিস বর্ণনা করেন। তাঁর থেকে যাঁরা হাদিস বর্ণনা করেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—তাঁর পুত্র আবদুল্লাহ এবং উরওয়া। নাতি আবদুল্লাহ ইবনু উরওয়া, আজাদকৃত দাস আবদুল্লাহ ইবনু কায়সান, ফাতেমা বিনতু কুলসুমসহ আরও অনেকে।
আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহার জীবনের সব ঘটনা ইতিহাস সংরক্ষণ করতে না পারলেও তাঁর শেষ জীবনের একটি ঘটনা আজও বিশ্ববাসীর কাছে শুকতারার মতো জ্বলজ্বল করছে। তা হলো, ছেলে আবদুল্লাহ ইবনু যুবাইর রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে তাঁর শেষ দেখা ও শেষ কথা।
আবদুল্লাহ ইবনু যুবাইর রাদিয়াল্লাহু আনহু তখন রাজনৈতিক কারণে কাবার হেরেম শরিফে অবরুদ্ধ। জালেম হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফ তাঁকে ঘেরাও করে রেখেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই শেষ প্রতিরোধটুকুও ভেঙে পড়বে। এ সময়ে আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর মা আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহার সাথে দেখা করতে গেলেন। আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহা তখন একেবারে দুর্বল বৃদ্ধা। তাঁর দৃষ্টিশক্তিও চলে গেছে। আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে সালাম দিলেন। তিনি সালামের উত্তর দিয়ে বললেন, ‘শত্রুরা যখন হারাম শরিফ ঘেরাও করে ফেলেছে, তাদের নিক্ষেপ করা পাথর তোমার সঙ্গীদের গায়ে লাগছে তখন তুমি এখানে কী করছ?’
আবদুল্লাহ রদিয়ায়ল্লাহু আনহু বললেন, ‘মা, আমি আপনার সাথে পরামর্শ করতে এসেছি।’
‘কী পরামর্শ?’
‘মা, আমার সঙ্গীরা প্রায় সবাই ভয়ে অথবা লোভে পড়ে আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। তারপরও যে কজন লোক আমার সাথে আছে তাদের নিয়ে সামান্য কিছু সময়ের বেশি টেকা যাবে না। এদিকে শত্রুরা বলছে আমি যদি মালিক ইবনু মারওয়ানকে খলিফা হিসেবে মেনে নিই তাহলে ওরা পার্থিব জীবনের সমস্ত সুযোগ-সুবিধা আমাকে দেবে। এখন আমি কী করব?’
ছেলের এই কথার জবাবে আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহা যা বললেন তার সারমর্ম হলো—যদি তুমি সত্যের ওপরে থাক তাহলে এভাবেই মৃত্যুবরণ করো। আর যদি দুনিয়ার সুখের আশা করো তাহলে তুমি একজন নিকৃষ্ট ব্যক্তি। নিজের স্বার্থের জন্য তোমার সাথিদের ধ্বংস করেছ। এখন তুমি কেমন সেটা তুমিই ভালো জানো। এভাবে অপমান নিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে যদি তুমি হকের পথে নিহত হও তাহলেই আমি বেশি খুশি হব।
আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু একথা শুনে বললেন, ‘আমি হকের ওপর আছি এবং এভাবেই মৃত্যুবরণ করব। মা, আপনি আমার জন্য দুআ করে দিন।’
আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহা শেষবারের মতো তাঁর ছেলের মাথার গন্ধ শুকলেন এবং তাঁকে আদর করলেন। তারপর বললেন, ‘বাবা, তোমার এই বর্ম খুলে ফেলো। যারা শাহাদাতের আশা রাখে এটা তাদের পোশাক নয়। তারচেয়ে বরং তুমি পাজামা পরে নাও। এতে মৃত্যুর পরে তোমার সতর খুলে যাবে না। আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু মায়ের আদেশ পালন করলেন এবং যুদ্ধ করতে করতে শহিদ হয়ে গেলেন।

ইন্তেকাল
আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহা হিজরি ৭৩ সনে মক্কায় ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল একশো বছর। অথচ তাঁর একটা দাঁতও পড়েনি বা তাঁর জ্ঞান-বুদ্ধিও কমে যায়নি। মুহাজির পুরুষ ও নারী সাহাবিদের মধ্যে তিনি সবার শেষে ইন্তেকাল করেন।
মৃত্যুর পূর্বে তিনি ওসিয়ত করেন যে, আমার মৃত্যুর পরে সুগন্ধি কাঠ জ্বালিয়ে আমার পরিধানের কাপড় তাতে সেঁক দেবে। আমার শরীরে খুশবু লাগাবে তবে কাফনের কাপড়ে খুশবু লাগাবে না। আগুন নিয়ে আমার লাশের অনুসরণ করবে না এবং রাতের বেলা আমাকে দাফন করবে না।
তাঁকে মক্কায় তাঁর ছেলে আবদুল্লাহ ইবনু যুবাইর রাদিয়াল্লাহু আনহুর পাশেই দাফন করা হয়।

রচনাটি সুয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবিয়াত ও আসহাবে রাসুলের জীবনকথা অবলম্বনে লিখিত

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

error: Content is protected !!