শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০

রুকাইয়াহ বিনতু রাসুলিল্লাহ : যুন-নুরাইনের প্রথম নুর

0

‘উসমান ও রুকাইয়াহ কি চলে গিয়েছে?’
আসমা বিনতু আবি বকর রাদিয়াল্লাহু আনহাকে প্রশ্ন করলেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম।
নবুওতের পঞ্চম বছর তখন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ও আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু হেরা গুহায় নির্জনে অবস্থান করতেন। সেই সময় একদিন উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের নিকট হিজরতের অনুমতি চাইলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাঁকে হাবশায় হিজরতের অনুমতি দিলেন। এরপর যেদিন আসমা বিনতু আবি বকর রাদিয়াল্লাহু আনহা তাঁদের জন্য খাবার নিয়ে হেরা গুহায় উপস্থিত হলেন, তখন তাঁকে প্রশ্নটি করেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম।
তিনি বললেন, ‘জি।’
তখন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘লুত আলায়হিস সালাম ও ইবরাহিম আলায়হিস সালামের পরে উসমান প্রথম ব্যক্তি, যে কাফিরদের অত্যাচারের কারণে স্ত্রীসহ হিজরত করেছে।’ [আল ইসাবা—৫৮২; তবাকাত—৮/২৪]
পরবর্তীকালে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু স্ত্রীকে নিয়ে মদিনায় পুনরায় হিজরত করেন। ‘সাহাবাতুল হিজরাতাইন’-এর অন্তর্ভুক্ত এই নারী ছিলেন রাসুল-কন্যা রুকাইয়াহ রাদিয়াল্লাহু আনহা।

রাসুল-কন্যা
রুকাইয়াহ রাদিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের মেজো কন্যা। তাঁর মাতা খাদিজা বিনতু খুওয়াইলিদ রাদিয়াল্লাহু আনহা। তিনি নবুওয়তের সাত বছর পূর্বে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মের সময় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের বয়স ছিল তেত্রিশ বছর। রুকাইয়াহ রাদিয়াল্লাহু আনহা তাঁর বড়বোন যাইনাব রাদিয়াল্লাহু আনহার চেয়ে তিন বছরের ছোট এবং ছোটবোন উম্মু কুলসুম রাদিয়াল্লাহু আনহার চেয়ে এক বছরের বড় ছিলেন।
শৈশবে মাতা খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা ও বাকি বোনদের সাথে রুকাইয়াহ রাদিয়াল্লাহু আনহাও ইসলামগ্রহণ করেন।
তাঁর শৈশব সম্পর্কে বেশি কিছু জানা যায় না।
আবু লাহাবের পুত্র উতবার সাথে বিয়ের সময় থেকে ইতিহাসে বর্ণনা পাওয়া যায়। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম নবুওত লাভের পূর্বে রুকাইয়াহ রাদিয়াল্লাহু আনহা এবং উম্মু কুলসুম রাদিয়াল্লাহু আনহা বিয়ে একই সময়ে আবু লাহাবের দুই পুত্রের সাথে হয়। বিয়ে হলেও দুইবোন রাসুলের ঘরেই ছিলেন। অতঃপর যখন আবু লাহাব আর তার স্ত্রী উম্মু জামিলের ঘৃণ্য আচরণের কারণে সুরা লাহাবে তাদেরকে অভিশাপ দেয়া হয়, তখন তারা দুই পুত্রকে ডেকে তাদের স্ত্রীদেরকে তালাক দেয়ার নির্দেশ দেয়। আবু লাহাব বলে, ‘তোমরা যদি তাঁর (মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের) মেয়েদেরকে তালাক না দাও তবে তোমাদের সাথে আমার মেলামেশা হারাম!’ [তবাকাত-৮/৩৭]
হতভাগ্য উতবা আর উতাইবা পিতামাতার নির্দেশমতো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের কন্যাদের তালাক দেয়।

উসমান-গৃহে
ইসলামের শুরুর দিকেই উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু ইসলাম গ্রহণ করেন। এর কিছুদিন পরেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাঁর আদরের কন্যা রুকাইয়াহ রাদিয়াল্লাহু আনহাকে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর নিকট বিয়ে দেন। তাঁদের দুইজনের দাম্পত্য জীবন ছিল ভালোবাসায় ভরপুর। লোকেরা তাঁদের উদাহরণ দিয়ে বলত—‘রুকাইয়াহ ও উসমানের চেয়ে উত্তম দম্পতি আর দেখিনি।’ কিন্তু মক্কায় তাঁদের সংসারজীবন নিশ্চিন্ত সুখের হলো না। কাফের-মুশরিকদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে তাঁরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের নিকট হিজরতের অনুমতি চাইলেন।
অনুমতি মিললে রুকাইয়াহ রাদিয়াল্লাহু আনহা ও উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু-সহ আরও পাঁচজন নারী এবং এগারোজন পুরুষ হাবশার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। [ফাতহুল বারি—৭/১৪৩]
হাবশায় কয়েক মাস অবস্থান করার পর সংবাদ আসে মক্কার সকলে ইসলাম গ্রহণ করেছে। সংবাদ শুনে হিজরতকারী দলটি দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে মক্কার নিকটে পৌঁছান এবং জানতে পারেন সংবাদটি কেবলই গুজব ছিল। পুনরায় তাঁরা হাবশার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। সেখানে পৌঁছে নিরাপদে বসবাস করতে শুরু করেন।
দ্বিতীয়বার হাবশায় অবস্থানকালে রুকাইয়াহ রাদিয়াল্লাহু আনহার কোল আলো করে জন্ম নেন পুত্র আবদুল্লাহ। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর ঔরসে রুকাইয়াহ রাদিয়াল্লাহু আনহার আর কোনো সন্তান জন্মগ্রহণ করেনি।
পুত্র আবদুল্লাহর বয়স যখন ছয় বছর, তখন হঠাৎ একদিন একটি মোরগ তাঁর চেহারায় ঠোকর দেয়। এতে চেহারা ফুলে যায়। এ দুর্ঘটনায় হিজরি চতুর্থ সনে তিনি মৃত্যুবরণ করে। [সিয়ারু আলা আন নুবালা—২/২৫১]

জীবন-সায়াহ্ন
হাবশায় কিছুকাল কাটানোর পর যখন সকলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে মদিনায় হিজরতের সংবাদ পেলেন, তখন উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু স্ত্রী-পুত্রকে নিয়ে মদিনায় হিজরত করেন। মদিনায় হিজরতের পর দ্বিতীয় হিজরিতে রুকাইয়াহ রাদিয়াল্লাহু আনহা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। বসন্ত রোগে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন তিনি। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তখন মদিনার মুসলমানদের নিয়ে বদরযুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুকে অসুস্থ স্ত্রীর পাশে থাকার নির্দেশ দিয়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বদরপ্রাঙ্গণের দিকে যাত্রা করেন। বদরযুদ্ধে বিজয়লাভের দিন রুকাইয়াহ রাদিয়াল্লাহু আনহা একুশ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।
উসামা ইবনু যায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘আমরা যখন রাসুল-কন্যা রুকাইয়াহ রাদিয়াল্লাহু আনহার কবরের মাটি সমান করছিলাম তখন আমার পিতা যায়েদ ইবনু হারেসা বদরযুদ্ধের বিজয়-সংবাদ নিয়ে মদিনায় পৌঁছান। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আমাকে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে মদিনায় রেখে গিয়েছিলেন।’ [ইবনু হিশাম—১/৬৪২,৬৪৩; আনসাবুল আশরাফ—১/২৯৪,৪৭৫]

রাসুলের দ্বিতীয় কন্যা রুকাইয়াহ রাদিয়াল্লাহু আনহাকে জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হয়।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

error: Content is protected !!