শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০

যুবাইর ইবনুল আওয়াম : রাসুলের সার্বক্ষণিক সহচর

0

মহানবি বসে আছেন তাঁর সহচরদের নিয়ে। আলোর মজলিসে। এমন সময় একজন তরুণ উন্মুক্ত তরবারি আর অস্থির চেহারা ও ক্ষিপ্রতা নিয়ে সেখানে হাজির হলেন। সবাই অপ্রস্তুত হয়ে উঠলেও মহানবি তাঁর স্বভাবমতো শান্ত, সুস্থির—জিজ্ঞাসা করলেন, ‘যুবাইর, কী হয়েছে?’
তরুণ জবাব দিলেন, ‘শুনেছি আপনাকে নিহত বা বন্দী করা হয়েছে।’
মহানবি তাঁর অস্থিরতার কারণ বুঝতে পারলেন। খুশিতে তাঁর মন ভরে উঠল। তিনি যুবাইরের জন্যে দুআ করলেন। এটিই ইসলামের জন্যে তরবারি খোলার প্রথম ঘটনা।
এই তরুণ সাহাবিই আমাদের আজকের আলোচ্য ব্যক্তি যুবাইর ইবনুল আওয়াম রাদিয়াল্লাহু আনহু। রাসুলের অন্যতম নিকটভাজন ও গুরুত্বপূর্ণ একজন সাহাবি ছিলেন তিনি।

জন্ম, বেড়ে ওঠা ও ইসলামপূর্ব জীবন
তাঁর আব্বার নাম আওয়াম, আম্মা সাফিয়াহ বিনতু আবদিল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহা।
হিজরতের আটাশ বছর আগে তিনি মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন।
বাল্যকালে তুচ্ছ কারণেও তাঁর আম্মা তাঁকে প্রহার করতেন। কঠিনতম প্যারেন্টিংয়ের ভেতর দিয়ে বেড়ে উঠেছিলেন তিনি। এ নিয়ে তাঁর আম্মাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলতেন—‘যারা বলে আমি তাকে দেখতে পারি না তারা মিথ্যে বলে। আমি এজন্যে তাকে প্রহার করি যাতে সে বুদ্ধিমান হয় এবং পরবর্তী জীবনে শত্রুসৈন্য পরাজিত করে গনিমতের মাল লাভে সক্ষম হয়।’
এর ফল তিনি পেয়েছিলেন। পনেরো বছর বয়সে তিনি ইসলাম গ্রহন করেন। ইসলামের প্রথম দিকে যাঁরা ইসলামগ্রহণে অগ্রগামী হয়েছিলেন এমন অন্যতম সাহসী সাতজনের মধ্যে তিনি ছিলেন একজন। ইসলামগ্রহণের কারণে তাঁর চাচা তাঁকে উত্তপ্ত পাথরের উপর শুইয়ে প্রহার করত যেন তিনি ইসলাম পরিত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর আম্মা তাঁকে গড়ে তুলেছিলেন পাথরের মতো করে। তাঁর ভেতরে ঐশ্বরিক আলো প্রতিভাত, সূর্যের আলোয় উত্তপ্ত পাথর তাঁকে কী সাজা দেবে?
আম্মার শাসন ও পরিকল্পিত প্রতিপালন তাঁকে করে তুলেছিল বুদ্ধিমান ও অকুতোভয়—যেন আম্মাকে ভয় করবার পর পৃথিবীর সমস্ত ভয়ই তুচ্ছ—যেন আম্মাকে ভয়ই জ্বালিয়ে দেয় সমস্ত ভয়—আত্মায় জ্বলে ওঠে সাহসের আলো। সেই আলোই যুবাইর ইবনুল আওয়ামকে ইসলামি সমর-ইতিহাসের অন্যতম বীর করে তুলেছিল। সমরে তাঁকে অপ্রতিরোধ্য হবার শক্তি দিয়েছিল। সেই আলো তাঁকে উপহার দিয়েছিল ‘হাওয়ারিয়্যু রাসুলিল্লাহ’র মর্যাদা। সেই আলো তাঁর জন্যে লিখেছে ইসলামের প্রথম উন্মুক্ত তরবারির দাস্তান।
কৈশোর থেকেই তিনি মুষ্ঠিযুদ্ধে সাহসী ও শক্তিশালী হয়ে উঠতে থাকেন। একবার মক্কার শক্তিমান এক যুবকের সাথে লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়লেন। মারের চোটে যুবকটির হাত মচকে গেলে লোকেরা তাঁকে ধরে তাঁর আম্মার কাছে নিয়ে এসে অভিযোগ করল। আম্মা সাফিয়া অভিযোগের প্রতি ভ্রুক্ষেপটি না করে লোকেদের পাল্টা প্রশ্ন করলেন—‘তোমরা যুবাইরকে কেমন দেখলে? সাহসী না ভীরু?’
যুবাইর ইবনুল আওয়ামের ইসলামপূর্ব জীবন নিয়ে তেমন কিছু জানা যায় না। মূলত ইসলামগ্রহণের মধ্য দিয়েই তিনি ইতিহাসে উঠে আসেন।
আম্মার দিক থেকে তিনি মহানবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের বংশধর ছিলেন। মহানবিকে ঘিরেই তাঁর আত্মীয়তার জাল। আম্মা সাফিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন রাসুলের ফুফু, তিনি ফুফাতো ভাই। আবার, আবু বকর আস-সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহুর মেয়ে আসমাকে বিয়ে করায় হয়েছিলেন মহানবির ভায়রাও।

ইসলামগ্রহণ ও পরবর্তী জীবন
মাত্র পনেরো— মতান্তরে ষোলো—বছর বয়সে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণ করার পর মক্কার অন্যান্য আরও অনেক মুসলিমের মতো তিনিও মুশরিকদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হন। আগেই বলেছি, তাঁর চাচা তাঁকে উত্তপ্ত পাথরের উপর শুইয়ে মারধর করত। এত কম বয়স হওয়া সত্ত্বেও সেইসব নিপীড়নের পরও ইসলামের ব্যাপারে তিনি কঠিন অবিচল ছিলেন। তিনি তাঁর চাচাকে বলতেন—‘যতই যা কিছু করেন না কেন, আমি আবার মুশরিক হতে পারি না।’
এরকম আজাব সহ্য করে করেই একসময় তিনি জন্মভূমি ছেড়ে অন্য সাহাবিদের সাথে হাবশায় হিজরত করেন। সেখানে কিছুকাল কাটানোর পর মহানবি মদিনায় হিজরত করলে তিনি মদিনায় ফিরে আসেন। সিরাতের গ্রন্থগুলোতে বলা হয়েছে যে তখন তাঁর বয়স ছিল আটাশ বছর।
যুবাইর ইবনুল আওয়াম রাদিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে যা কিছু জানা যায় সেসবের বেশিরভাগই তাঁর যোদ্ধা চরিত্রের ইতিহাস। তিনি ছিলেন একজন মহাবীর। ইসলামের জন্যে বিভিন্ন যুদ্ধে তিনি যে সাহসী অবদান ও বীরত্ব দেখিয়েছেন, তাঁর জীবনচরিতের অধিকাংশই দখল করে আছে সেসব কথা। ইসলামের শুরু থেকে তাঁর জীবদ্দশায় সংঘটিত হওয়া প্রতিটা গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধেই তিনি অংশগ্রহণ করেছেন।

বদরের যুদ্ধে
ইসলামের প্রথম এই যুদ্ধে তিনি ভীষণ বীরত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় দেন। একটি ঘটনা এমন যে, একজন মুশরিক সৈন্য একটি টিলার উপর উঠে চ্যালেঞ্জ করলে তিনি মুহূর্তে এগিয়ে যান এবং তাকে জাপটে ধরে টিলার ঢালে গড়িয়ে পড়েন। মহানবি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম এই দৃশ্য দেখে বলেন, যে আগে মাটিতে গড়িয়ে পড়বে সে নিহত হবে। দেখা গেল, মুশরিকটাই প্রথমে মাটিতে পড়ল এবং সাথে সাথেই যুবাইর উঠে দাঁড়িয়ে তরবারির আঘাতে তাকে হত্যা করলেন।
এই যুদ্ধে তিনি উবায়দা ইবনু সাঈদের মুখোমুখি হয়ে দেখতে পান, সে আপাদমস্তক এমনভাবে বর্ম-আবৃত হয়ে আছে যে শুধু চোখ দুটোই দেখা যাচ্ছে। যুবাইর তার চোখ লক্ষ্য করে তির ছুঁড়লে তা এফোঁড়ওফোঁড় হয়ে চোখে বিঁধে যায়। পরবর্তীতে সেই তিরের ফলাটি বের করতে তাকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। এই ঘটনার স্মৃতিস্বরূপ মহানবি তিরটি নিজের জন্যে নিয়ে নেন এবং সারাজীবন তা সংরক্ষণ করেন।
বদরযুদ্ধে যুবাইর ইবনুল আওয়াম এতটা দুঃসাহসী হয়ে লড়াই করেছিলেন যে তিনি মারাত্মক জখম হয়েছিলেন, তাঁর দেহে অনেকগুলো ক্ষত তৈরি হয়েছিল যা স্থায়ীভাবে শরীরে বীরত্বের চিহ্ন হয়ে থেকে গিয়েছিল। এ যুদ্ধে তিনি হলুদ রঙের পাগড়ি পরেছিলেন। মহানবি দেখে বলেছিলেন—‘আজ ফেরেশতারাও এ বেশে এসেছে।’

উহুদের যুদ্ধে
উহুদের প্রান্তরে যুদ্ধ ভীষণ আকার হয়ে উঠেছে। মহানবি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাঁর নিজের তরবারি উন্মুক্ত করে বললেন—‘আজ কে এর হক আদায় করবে?’ সবাই আগ্রহ দেখিয়ে হাত তুললেন। যুবাইরও তিন বার হাত তুললেন। কিন্তু শেষে এই গৌরব সাহাবি আবু দুজানার হাতে গেল। এই যুদ্ধের শেষ-মুহূর্তে নিশ্চিত বিজয় স্পষ্ট হয়ে উঠলেও যখন বিশেষ কাজে নিযুক্ত তিরন্দাজ বাহীনির ভুলে তা ঘুরে গিয়ে বিপর্যয় চলে আসলো, তখন যে চৌদ্দজন সাহাবি মহানবিকে রক্ষা করতে মানবব্যুহ রচনা করেছিলেন, যুবাইর ইবনুল আওয়াম ছিলেন তাঁদের একজন।

খন্দকের যুদ্ধে
এ যুদ্ধে মুসলিম নারীদের প্রতিরক্ষার দায়িত্বে ছিলেন তিনি। এ ছাড়াও, বনু কুরাইজা গোত্র মুসলিমদের সাথে করা মৈত্রী চুক্তি ভঙ্গ করলে মহানবি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম এ সম্পর্কে তথ্য নিতে একজনকে স্পাই হিসেবে তাদের ভেতরে পাঠাতে চাইলেন। তিনি তিনবার জিজ্ঞেস করলেন—তোমাদের মধ্যে এমন কে আছ যে তাদের খবর নিয়ে আসতে পারবে?’ তিনবারই যুবাইর হাত তুললেন। তাঁর উদ্দীপনা দেখে মহানবি বললেন—‘প্রত্যেক নবিরই হাওয়ারি থাকে। আমার হাওয়ারি হচ্ছে যুবাইর।’
খন্দকের পর তিনি বনু কুরাইজার যুদ্ধ ও বাইয়াতে রিদওয়ানেও অংশগ্রহণ করেন।

খাইবারের যুদ্ধে
খাইবারে যুবাইর ইবনুল আওয়াম ছিলেন ভীষণ সাহসী ও অ্যাগ্রেসিভ রণ-ভাবের যোদ্ধার ভূমিকায়। এই যুদ্ধের এক সময় ইহুদি-নেতা মুরাহিব নিহত হলে তার ভাই ইয়াসির বিশাল হুঙ্কার ছাড়তে ছাড়তে ময়দানে নামে এবং ওয়ান ভার্সেস ওয়ান লড়াইয়ের আহ্বান করে। ইয়াসির ছিল মস্ত বড় দেহের অধিকারী ও শক্তিশালী ভয়ংকর যোদ্ধা। যুবাইর ইবনুল আওয়াম সাথে সাথে ময়দানে নেমে এলে তাঁর মা সাফিয়্যাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা মহানবিকে বললেন—‘আল্লাহর রাসুল, আজ নিশ্চিত আমার আদরের ছেলে নিহত হবে।’ মহানবি বললেন—‘না, যুবাইরই তাকে হত্যা করবে।’ অল্প কিছুক্ষণ পরই দেখা যায় মহানবির কথা সত্য ফলেছে।
খাইবারের পর মক্কা বিজয়ের প্রস্তুতি চলছে। মানবিক দুর্বলতার কারনে প্রখ্যাত সাহাবি হাতিব ইবনু আবি বালতাআ রাদিয়াল্লাহু আনহু এই খবর জানিয়ে মক্কার উদ্দেশ্যে একটা চিঠি লিখেন এবং একটি মহিলাকে দিয়ে গোপনে পাঠিয়ে দেন। এদিকে ভয়ংকর এই ঘটনার কথা আল্লাহ তাআলা ওহির মাধ্যমে মহানবি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে অবগত করলে তিনি প্রেরিত সেই মহিলাকে ফিরিয়ে আনতে একটা দল পাঠান। যুবাইর সেই দলে ছিলেন।
মক্কা বিজয়ের সময় মুসলিম সেনাবাহিনীর সব থেকে ছোট দলটিতে মহানবি ছিলেন—যুবাইর ছিলেন সেই দলের পতাকাবাহক। বিজয়ের পর সবকিছু শান্ত হয়ে আসলে যুবাইর ও মিকদাদ রাদিয়াল্লাহু আনহুমা মহানবির কাছে এলে তিনি নিজ হাতে তাঁদের চেহারার ধুলি মুছে দেন।
হুনাইনের যুদ্ধে তিনি কাফেরদের একটি গোপন ঘাঁটির নিকট পৌছে গেলে অতর্কিত আক্রমণের শিকার হন। কিন্তু এতটা ক্ষিপ্রতা ও কৌশলের লড়াই করেন যে পুরো ঘাঁটিটাই শূন্য করে ফেলেন।
তাবুক ও তায়েফের যুদ্ধেও তিনি লড়াই করেন। আর দশম হিজরিতে বিদায় হজের সময় তিনি মহানবি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সাথে ছিলেন।

ইয়ারমুকের যুদ্ধে
সিরিয়ায় বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অবসান ও মুসলিম শাসনের পত্তন এই যুদ্ধে বিজয়ের মাধ্যমে। সামরিক ইতিহাসে তাই এই যুদ্ধ অন্যতম ফলাফল নির্ধারণকারী যুদ্ধ বলে গণ্য হয়ে থাকে। তাছাড়া মহানবি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পর এটাই মুসলমানদের প্রথম বৃহৎ বিজয়। এর মাধ্যমেই প্রাচীন খ্রিষ্টান লেভ্যান্টে মুসলিম আধিপত্য ও বিস্তার শুরু হয়। এই যুদ্ধে হজরত যুবাইর ডেসপারেটলি লড়েছিলেন। তিনি একটি ছোট বাহিনী নিয়ে রোমানদের বাহিনীর একটি বিশাল অংশের ভেতর ঢুকে পড়েন যাতে শত্রুবাহিনীর শৃঙ্খলা নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু রোমান সৈন্যদের প্রচণ্ড প্রতিরোধের মুখে মুসলিম সৈন্যদের ক্ষুদ্র এই দলটা বেশিদূর এগোতে পারে না। যুবাইরের আক্রমণ ও গতি এতো ক্ষিপ্র ছিল যে তিনি বাহিনীর শেষপ্রান্তে পৌছে যান এবং পেছন থেকে আক্রমণ করতে করতে ফিরে আসেন। এতে বিশাল বাহিনীর এই অংশটা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। কিন্তু ফেরার সময় তিনি একা হয়ে পড়ায় প্রচণ্ড লড়াইয়ের মুখে পড়েন। মারাত্মক জখম হন। বদরের পর এই যুদ্ধেই তাঁর শরীরে সবচেয়ে বেশি ক্ষত সৃষ্টি হয়।

মিশর অভিযানে
মুসলমানরা আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্বে মিশর আক্রমণ করেন। ফারমাতে দীর্ঘ এক মাসের লড়াইয়ের পর তাঁরা বিজয় লাভ করেন এবং মূল মিশরের দিকে অগ্রসর হন। সেখানকার রোমক শাসক মুকাওকিস পালিয়ে গিয়ে ফুসতাত কেল্লায় আশ্রয় নেয়। মুসলমানরা অনেকদিন পর্যন্ত কেল্লা অবরোধ করে রেখে চেষ্টা করেও কেল্লায় প্রবেশ করতে না পারায় খলিফা উমর আল-ফারুক যুবাইর ও মিকদাদ রাদিয়াল্লাহু আনহুমার নেতৃত্বে দশহাজার সৈন্য পাঠান। সাতমাস পর্যন্ত অবরোধ করে বসে থাকেন তাঁরা। যুবাইর সাহস করে কেল্লার দেয়ালে সিঁড়ি লাগিয়ে উঠে পড়েন এবং টপকে কেল্লার ভেতর প্রবেশ করে লড়াই করতে করতে কেল্লার ফটক খুলে দেন। মুসলমানরা কেল্লায় প্রবেশ করেন। মুকাওকিস নিরাপত্তা প্রার্থনা করলে মঞ্জুর করা হয়।

খেলাফতে রাশেদায় ভূমিকা
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর অ্যাসাসিনেশনের ঘটনায় মৃত্যুর পূর্বে তিনি ছয় সদস্যের একটি বোর্ড গঠন করে তাদের উপর পরবর্তী খলিফা নির্বাচন ও নিয়োগের দায়িত্ব দিয়ে যান। যুবাইর রাদিয়াল্লাহু আনহু সেই বোর্ডের সদস্য ছিলেন।
তৃতীয় খলিফা উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে তিনি রাষ্ট্রীয় সব দায়-দায়িত্ব থেকে অবসর যাপন করছিলেন। পঁয়ত্রিশ হিজরিতে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু বিদ্রোহীদের দ্বারা অবরুদ্ধ হলে তিনি নিজ পুত্র আব্দুল্লাহকে নিয়োগ করেন খলিফার নিরাপত্তায়। উসমান শহিদ হলে তিনি রাতের আঁধারে তাঁর দাফন-কাফন সম্পন্ন করেন।

রাজনৈতিক ভুল-বিবাদ
চতুর্থ আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে তিনি এবং তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহু মক্কায় গিয়ে উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে সাক্ষাত করেন এবং মুসলিম জাতি ও খেলাফতের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। সেখান থেকে তিনি বসরায় যাবার সিদ্ধান্ত নিলে অনেক মানুষজন তাঁর সাথে যোগ দেয়। আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু তাদেরকে বাধা দেবার জন্যে সেনাবাহিনী নিয়ে রওনা করলে যিকার নামক স্থানে দুই দল মুখোমুখি হয়। ইতিহাসে একে উটের যুদ্ধ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইসলামের ইতিহাসে এই যুদ্ধ একটি দুঃখ বৈ কিছু না। আপন জাতি ও ভ্রাতৃত্বের ভেতর এই যুদ্ধের ইতিহাস একটি দুঃখপাঠ হয়ে আছে। কিন্তু এই লড়াই আদৌ লজ্জার লড়াই ছিল না। ক্ষমতা বা অন্য কোনো স্বার্থগত ব্যাপার ছিল না এর পেছনে। মূলত সত্য ও ন্যায় বিধানের উদ্যোগই উভয় দলকে যুদ্ধে লিপ্ত করেছিল। আর আলটিমেটলি তাদের উদ্দেশ্য ছিল একটা সুন্দর সমাধানে আসা। তবুও এটি দুঃখই। একটি ক্ষত। সারাজীবনের সমস্ত যুদ্ধের ক্ষত সেরে উঠলেও, যুবাইর এই ক্ষত থেকে বাঁচতে পারেননি।
আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু একটি ঘোড়ায় চড়ে একাকী ময়দানে এসে ডেকে বললেন—‘হে আবু আবদিল্লাহ, তুমি কি সেদিনের কথা মনে করতে পার—আমরা হাত ধরাধরি করে রাসুলের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি তোমাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন—“তুমি কি আলিকে ভালোবাসো?” তুমি বলেছিলে— “হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসুল।” মনে করে দেখো, তখন তিনি বলেছিলেন—“একদিন তুমি অন্যায়ভাবে তাঁর সাথে লড়বে।”’
যুবাইর সেইকথা স্বরণ করে চমকে গেলেন। বললেন—‘হ্যাঁ, আমার স্বরণ হচ্ছে।’

মৃত্যু
আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু আর কিছু না বলে তাবুতে ফিরে গেলেন। যুবাইর বুঝতে পারলেন যে তারা আসলে যে সত্যের জন্যে লড়াইয়ে নেমেছেন, তাইই সত্য নয়। তিনি লড়াই ছেড়ে একাকী বসরার দিকে রওনা করলেন। তাঁকে যেতে দেখে আহনাফ ইবনু কায়েস বলল, যেন কেউ একজন গিয়ে জেনে আসে তিনি কেন চলে যাচ্ছেন। আমর ইবনু জারমুয নামে একজন ঘোড়া ছুটিয়ে এসে যুবাইরের সাথে যোগ দিলো এবং জিজ্ঞেস করল—
‘আবু আবদিল্লাহ, জাতিকে আপনি কী অবস্থায় রেখে যাচ্ছেন?’
‘তারা সবাই একে অপরের গলা কাটছে।’ যুবাইর বললেন।
‘এখন কোথায় যাচ্ছেন?’
‘আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি তাই এসব ঝগড়া-বিবাদ থেকে দূরে থাকতে অন্য কোথাও যেতে চাই।’
‘চলুন, আমাকেও এদিকে কিছুদূর যেতে হবে।’ প্রতারক জারমুয বলল।
কিছুদূর যাবার পর যুবাইর যোহরের সালাতের জন্যে থামলেন। জারমুয বলল যে সেও একসাথে সালাত আদায় করবে। যুবাইর যখন সিজদায় গেলেন, জারমুয তরবারির আঘাতে তাঁর শির বিচ্ছিন্ন করে ফেলল।

তিনি ছিলেন একজন সাহসী ও ত্যাগী যোদ্ধা-সাহাবি, যিনি সারাজীবন ইসলামের জন্যে লড়াই করে গেছেন। তাঁর জীবনকাল জানতে গেলে বেশিরভাগ শুধু যুদ্ধের ইতিহাস চলে আসে। আর তিনি ছিলেন আশারায়ে মুবাশশারারও একজন। ব্যক্তি জীবনে তিনি সাহস, দানশীলতা ও আমানতদারিতার জন্যে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তিনি ইয়ারমুকের যুদ্ধে নিজের দশ বছরের ছেলেকে সাথে নিয়ে যান যেন সে যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে অভ্যস্ত হয় ও সাহসী হয়ে ওঠে।
একবার মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞেস করলেন—‘তালহা ও যুবাইর সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী?’
আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু উত্তর দিলেন—‘আল্লাহ তাঁদের দুজনের উপর রহমত বর্ষণ করুন। আল্লাহর কসম, তাঁরা দুজনেই ছিলেন সংযমী, পূণ্যবান, সৎকর্মশীল, আত্মসমর্পণকারী, পবিত্রতা অর্জনকারী ও শাহাদাতবরণকারী।’
জারমুয যখন যুবাইরের তরবারি, বর্ম ইত্যাদি নিয়ে আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে হাজির হয়ে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি চাইল, তখন তিনি বললেন—‘ইবনু সাফিয়ার খুনিকে জাহান্নামের সুসংবাদ দাও।’
তিনি যুবাইরের তরবারি নিয়ে চুমু খেলেন এবং সেটির দিকে তাকিয়ে থেকে কাঁদতে কাঁদতে বললেন—‘তিনি অসংখ্যাবার আল্লাহর রাসুলের সামনে থেকে মুসিবতের মেঘমালা অপসারণ করেছেন।’
তারপর মহান এ সাহাবিকে বিদায় জানাতে বলেন—
‘শান্তি বর্ষিত হোক—যুবাইরের উপর, তাঁর জীবনের পর তাঁর মৃত্যুতেও।
শান্তি বর্ষিত হোক— রাসুলের সার্বক্ষণিক সহচরের উপর।’

রচনাটি রিজালুন হাওলার রাসুল অবলম্বনে লিখিত

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

error: Content is protected !!