শনিবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২০

যাইনাব বিনতু রাসুলিল্লাহ : রাসুলের প্রথম কন্যা

0

অবশেষে স্বামীর বিরহে আকুল রমণীর প্রতীক্ষা শেষ হলো। সেই যে পৌত্তলিক স্বামীর ঘর ছেড়ে মদিনায় এলেন, তারপর আর একটিবার স্বামী আবুল আস এসে দেখে যাননি তাঁকে। কতগুলো দিন গুজরে গেল তাঁর প্রতীক্ষায়!
কিছুদিন আগে কুরাইশদের একটি কাফেলা মুসলমানদের হস্তগত হয়েছে। আবুল আস সেই কাফেলার প্রধান ছিলেন। কাফেলার পরিণতি দেখে তিনি রাতের আঁধারে লুকিয়ে মদিনায় স্ত্রীর কাছে হাজির হয়েছেন। স্ত্রী তাঁকে সকল মুসলমানের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা দিলে বাকিরাও তাঁকে নিরাপত্তা দেন। আবুল আসের অবস্থানের সম্মানজনক ব্যবস্থা করতে বললেও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম সেদিন স্ত্রীকে তাঁর স্বামীর কাছে ফেরার অনুমতি দেননি। বলেছেন, ‘জেনে রেখো, যতক্ষণ সে মুশরিক থাকবে; তুমি তার জন্য হালাল নও।’ [আনসাবুল আশরাফ—১/৩৭৭, ৩৯৯]
আজ তিনি ফিরে এসেছেন। আনন্দে ঝলমল করছে যাইনাবের এতদিনের বিরহিত ঘর-দোর। তাঁর স্বামী যে মক্কা থেকে ফিরে এসে ইসলাম কবুলের ঘোষণা দিয়েছেন! রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামও কন্যা যাইনাবকে ফিরিয়ে দিলেন নওমুসলিম জামাতা আবুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে। অবশেষে স্বামীর বিরহে আকুল যাইনাবের প্রতীক্ষা শেষ হলো। [ইবনু হিশাম, আবু দাউদ]

রাসুল-কন্যা
যাইনাব রাদিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের প্রথম কন্যা। তাঁর মাতা উম্মুল মুমিনিন খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা সর্বপ্রথম ইসলাম কবুলকারী। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের নবুওয়ত লাভের দশবছর পূর্বে মক্কায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের বয়স তখন ত্রিশ।

শান্তির শামিয়ানায়
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের নবুওয়ত লাভের পূর্বেই যাইনাব রাদিয়াল্লাহু আনহার বিয়ে হয়। স্বামী আবুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন তাঁর খালাতো ভাই। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম নবুওয়তপ্রাপ্ত হলে প্রথম পর্যায়েই যাইনাব রাদিয়াল্লাহু আনহা ইসলাম কবুল করেন। কিন্তু আবুল আস পূর্বপুরুষদের ধর্ম ত্যাগ করতে রাজি হননি। তাই বলে মুসলিম যাইনাব রাদিয়াল্লাহু আনহাকে ভালোবাসতেও কখনো কার্পণ্য করেননি। ইসলাম গ্রহণের কারণে কখনো বিরূপ প্রতিক্রিয়াও দেখাননি। পরিবারের লোকেরা বারবার তাঁকে কুরাইশ-সুন্দরীর প্রলোভন দেখিয়ে যাইনাব রাদিয়াল্লাহু আনহাকে তালাক দিতে প্ররোচনা দিয়েছে, কিন্তু আবুল আস স্পষ্ট বলেছেন, যাইনাবের পরিবর্তে সকল নারী দিলেও তিনি তা পছন্দ করবেন না। [তাবারি—৩/১৩৬, ইবনু হিশাম; আস সিরাহ—১/৬৫২]

হিজরতের সময় যাইনাব রাদিয়াল্লাহু আনহা মক্কাতেই রয়ে যান। বদরের যুদ্ধে আবুল আসকে যোগ দিতে হয় কুরাইশ বাহিনীর সাথে। মুসলামানগণ বিজয় লাভ করলে যুদ্ধবন্দীদেরকে মদিনায় নিয়ে যাওয়া হয়। যুদ্ধবন্দীদের মধ্যে আবুল আসও ছিলেন। মক্কা থেকে যাইনাব রাদিয়াল্লাহু আনহা তাঁর মায়ের দেয়া একটি হার স্বামীর মুক্তিপণ হিসেবে পাঠান। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম হারটি দেখার পর কষ্ট সংবরণ কর‍তে পারেন না। সাহাবিদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে হারটি ফেরত পাঠান। জামাতা আবুল আসের মুক্তিপণ নির্ধারণ করেন যাইনাব রাদিয়াল্লাহু আনহাকে মদিনায় পৌঁছে দেয়ার অঙ্গীকারকে। আবুল আস তাঁর অঙ্গীকার পূর্ণ করেন। যাইনাব রাদিয়াল্লাহু আনহা আগমন করেন মদিনায়, শান্তির আবাসে।

বিরহি-দিন শেষে
সপ্তম হিজরি। ওয়াদা অনুযায়ী স্ত্রী যাইনাবকে মদিনায় পাঠিয়ে দেয়ার পর কেটে গেল পাঁচটি বছর। কাঁধে চেপে থাকা অন্যের আমানতগুলো ঠিকঠাক বুঝিয়ে দিয়ে ইসলাম কবুল করে আবুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু চলে এলেন মদিনায়। পুত্র আলি আর কন্যা উমামাকে নিয়ে স্ত্রীর সাথে নতুন করে সাজালেন তাঁদের ছোট্ট সংসার। কিন্তু ততদিনে ঘনিয়ে আসে যাইনাব রাদিয়াল্লাহু আনহার জাগতিক জীবনের শেষ সময়।
যাইনাব রাদিয়াল্লাহু আনহা যখন মক্কা থেকে মদিনায় পিতার কাছে যাচ্ছিলেন, পথিমধ্যে তাঁর উপর হামলা চালানো হয়। তিনি উটের পিঠ থেকে নিচে পড়ে গিয়ে আঘাত পান এবং তাঁর গর্ভপাত হয়। রক্তক্ষরণও হয় প্রচুর। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এই আঘাতের যন্ত্রণা ভোগ করেন। অতঃপর অষ্টম হিজরিতে তাঁর ইন্তেকাল হয়। [আল-ইসতিয়াব]
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাঁর জানাজা পড়ান। আবুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহুকে সঙ্গে নিয়ে যাইনাব রাদিয়াল্লাহু আনহার নিথর দেহ কবরে নামান। অতঃপর তাঁর জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম দুআ করেন, ‘হে আল্লাহ, তুমি যাইনাবের মুশকিল আসান করো। কষ্ট দূর করো। তার কবরের সংকীর্ণতা প্রশস্ত করো।’ [তবাকাত-৮/২২]

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

error: Content is protected !!