শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০

জিন জাতির মধ্যেও কি সাহাবি ছিলেন?

0

অন্যদিনের মতো ওইদিনও তারা মেঘদূত ফেরেশতাদের পারস্পরিক আলাপচারিতা শোনার জন্য আকাশের নীলরঙা দেয়ালে কান পেতে বসেছিল। হঠাৎ দেখতে পেল দূর থেকে ধেয়ে আসছে উল্কাপিণ্ড। সাক্ষাৎ-বিপদ দেখে তারা দ্রুত দৌড়ে পালাল। যেতে যেতে একে অপরকে বলতে লাগল, ‘আগেও তো আমরা আকাশের কোণে বসে ফেরেশতাদের আলাপ শুনতাম। কিন্তু আজ কেন উল্কা নিক্ষেপের প্রদর্শনী হলো এবং প্রবেশপথে নিশ্ছিদ্র প্রহরার ব্যবস্থা করা হলো?’
মনোবাসনা পূরণ না হওয়ায় একবুক ব্যথা নিয়েই তারা গন্তব্যে ফিরে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে যখন তায়েফের সন্নিকটে ‘বাতনে নাখলাহ’ নামক স্থান দিয়ে ডানা মেলে তারা উড়ে যাচ্ছিল, সুমধুর এক আওয়াজ এসে তাদের কানে বাজল। কীসের আওয়াজ এটা—বলল তাদের একজন। অন্যরা বলে উঠল—‘চুপ করো, শুনতে দাও!’
কী হচ্ছে স্বচক্ষে দেখার জন্য তারা পাখা গুটিয়ে নিচে নেমে এল। দেখতে পেল রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পবিত্র কুরআন পাঠ করছেন। কুরআন তেলাওয়াতের মধুমাখা সুরলহরী তাদেরকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। তারা কুরআনের প্রতি ঈমান আনল এবং স্বজাতিকে কুরআনের বিধিমতে সতর্ক করার জন্য ফিরে গেল [১]।
পাঠক হয়তো ভাবছেন, আমি কোনো রূপকথার গল্প বলছি। ছোটবেলায় উঠোনে মাদুর পেতে দাদুর কোলে শুয়ে শুয়ে শোনা আজগুবি কোনো গালগল্প লিখছি। না, আমি কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সাথে জিনদের একটি উপদলের সাক্ষাতের সত্য ঘটনা বর্ণনা করছি।
জিন জাতি হলো আল্লাহ তায়ালার এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। তারা অগ্নিশিখা দ্বারা সৃষ্ট [২]। তারা নিজেদের আকৃতি, রূপ ও বেশ চোখের পলকেই পরিবর্তন করতে পারে। কাল্পনিক পঙ্খিরাজের মতো তাদের দুটি পাখা আছে। তারা যথাখুশি উড়ে বেড়াতে পারে। আমাদের উচ্ছিষ্ট হাড়গোড় খেয়ে তারা বাঁচে। হাদিসে এসেছে—যখন তারা কোনো হাড় কুঁড়িয়ে নেয়, তখন তাতে গোশতের পোশাক পরিয়ে দেয়া হয় [৩]। এজন্যই হাদিস শরিফে হাড্ডি দ্বারা পবিত্রতা অর্জন করাকে নিষেধ করা হয়েছে। জিনদের সন্তান-সন্ততিও হয়। এমনকি তাদের বংশলতিকা মহাকালের বুকে এঁকেবেঁকে হেঁটে যায় বহুদূর। তাদের মাঝেও পুরুষ-নারীর শ্রেণীভেদ আছে। তাদেরকেও হাশরের মাঠে নিজ কর্মের জবাবদিহি করতে হবে এবং এর প্রতিদান বা পরিণতি ভোগ করতে হবে [৪]। এই তো কুরআন-হাদিস সমর্থিত জিনজাতি সম্পর্কে অমূলক ধারণার বিপরীতে সত্যনিষ্ঠ বর্ণনা।
কিন্তু আমার আলোচ্য বিষয় জিনদের জীবনাচার বা সমাজব্যবস্থা নয়। আমি একটি ভিন্ন বিষয়ে আলোকপাত করতে চাই। পাঠক যদি একটু সজাগ দৃষ্টি দেন, তাহলে সহজেই বুঝতে পারবেন উপরযুক্ত ঘটনা থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে কিছু জিনের সাক্ষাৎ ঘটেছিল। কিন্তু এখানে একটা সংশয় রয়ে যায়—আমরা জানি যে, সাহাবিয়্যাত বা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সান্নিধ্যের সুগন্ধি লাভের সোনালি খাতায় স্বর্ণতুলির আঁচড়ে লেখা হয় কেবল তাঁদের নাম, যাঁরা রাসুলের প্রতি বিশ্বাস রেখে তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর সাক্ষাৎপ্রাপ্ত হয়েছেন এবং সেই ঈমান নিয়েই অনন্তের পথে যাত্রা করেছেন [৫]।
এই সংজ্ঞামতে কি সেই জিনেরাও আল্লাহর রাসুলের সাহাবি বা সান্নিধ্যের সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন? আসুন, এই ব্যাপারে কুরআন থেকে নির্যাসিত কিছু দলিলভিত্তিক আলোচনা করা যাক।

প্রামাণ্য পর্যালোচনা
আলোচিত ঘটনার প্রেক্ষিতে উত্থাপিত সংশয় নিরসনের ক্ষেত্রে সহজ যে সমীকরণ, সেটা হচ্ছে—কুরআন বলে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম সর্বশেষ রাসুল [৬] আর এটা তো জানা কথা যে, যখন কোনো নতুন রাসুল প্রেরিত হন, তখন তাঁর পূর্ববর্তী সব ধর্ম রহিত হয়ে যায় এবং এটাও সর্বজনবিদিত যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের ধর্ম কেয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী থাকবে। কেননা ঈসা আলাইহিস সালাম এসেও তাঁর ধর্মের অনুশাসনই মেনে চলবেন। অর্থাৎ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবির্ভাবের পর থেকে কেয়ামত অবধি মানুষদের মধ্য থেকে তিনিই হলেন একমাত্র রাসুল।
দ্বিতীয়ত, জিনদের মধ্য থেকে নবি-রাসুল আসার ব্যাপারে অনৈক্য থাকলেও, এ ব্যাপারে সবাই একমত যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পর জিনজাতির মধ্য থেকেও আর কোনো রাসুল আগমন করবেন না।
অতএব এই সমীকরণের ফলাফল দাঁড়ায়, জিনদের মধ্যে থেকে নবিজির আগমনপরবর্তী কোনো রাসুল আসবেন না আর মানুষদের মধ্যে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম সর্বশেষ রাসুল। সুতরাং একথা বলাই বাহুল্য যে, নিঃসন্দেহে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম জিনজাতির জন্যও রিসালাহ বা প্রত্যাদেশপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব।
এটা হচ্ছে কুরআনের মাধ্যমে ভিন্ন আঙ্গিকে বিষয়টা প্রমাণ করার চেষ্টা।
এ ছাড়াও কুরআনের অগণিত আয়াত দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম জিনদেরও রাসুল।

যেমন লক্ষ করুন উপরে আলোচিত ঘটনার ক্ষেত্রে কুরআনের উপস্থাপনাভঙ্গি—
قُلْ أُوحِيَ إِلَيَّ أَنَّهُ اسْتَمَعَ نَفَرٌ مِنَ الْجِنِّ فَقالُوا إِنَّا سَمِعْنا قُرْآناً عَجَباً يَهْدِي إِلَى الرُّشْدِ فَآمَنَّا بِهِ وَلَنْ نُشْرِكَ بِرَبِّنا أَحَداً
অর্থ : হে রাসুল, বলে দাও! আমার কাছে ওহি এসেছে যে, জিনদের একটি উপদল মন দিয়ে কুরআন শুনেছে এবং স্বজাতিকে গিয়ে বলেছে, আমরা এক বিস্ময়কর কুরআন শুনেছি, যা সঠিক পথ দেখায়। সুতরাং আমরা এর প্রতি ঈমান এনেছি। আমরা আর কখনও প্রতিপালকের সাথে কাউকে শরিক করব না। [সুরা জিন, আয়াত : ১-২]
এখানে কুরআন সরাসরি উল্লেখ করেছে যে, জিনেরাও কুরআনের প্রতি ঈমান এনেছে। আর কুরআন নাজিল হয়েছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর এবং কুরআনের অসংখ্য আয়াতে রাসুলের অনুসরণ-অনুকরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অতএব প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মানবজাতির পাশাপাশি তাদেরও রাসুল।

তেমনি সুরা আহকফে উক্ত ঘটনা বর্ণনার একপর্যায়ে কুরআনের ভাষ্য—
وَمَنْ لَا يُجِبْ دَاعِيَ اللَّهِ فَلَيْسَ بِمُعْجِزٍ فِي الْأَرْضِ وَلَيْسَ لَهُ مِنْ دُونِهِ أَوْلِيَاءُ أُولَئِكَ فِي ضَلَالٍ مُبِينٍ
অর্থ : আর যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিবে না, সে পৃথিবীতে আল্লাহকে অক্ষম করতে পারবে না এবং আল্লাহ ছাড়া কোনো অভিভাবকও পাবে না। এমন লোকেরাই নিশ্চিত পথভ্রষ্ট। [সুরা আহকফ, আয়াত : ৩২]
অর্থাৎ জিনেরা যদি আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া না দেয়, তাহলে তারা পথভ্রষ্ট আর আয়াতের পরম্পরা ও ঘটনার বিবরণে খুব সহজেই বুঝে আসে, এখানে আহ্বানকারী বলতে একমাত্র মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম উদ্দেশ্য। সুতরাং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম যে জিনদেরও রাসুল এ আয়াত তার উজ্জ্বল প্রমাণ।

অন্য আয়াত দেখুন, এখানে কুরআন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের বৈশিষ্ট্য বয়ান করতে গিয়ে বলেছে—
لِيَكُونَ لِلْعالَمِينَ نَذِيرا
অর্থ : যেন তিনি বিশ্ববাসীর জন্য সর্তককারী হন। [সুরা ফুরকান, আয়াত : ১]

তেমনি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে—
وأرسلت إلى الخلق كافّة
অর্থ : আমি পুরো সৃষ্টিজগতের জন্য প্রেরিত হয়েছি। [সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ৫২৩]
এটা তো স্বতঃসিদ্ধ কথা যে, সৃষ্টিকুলের মধ্যে পরকালীন পুরস্কার বা শাস্তি শুধু জিন ও মানবজাতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তাই সতর্ক করা কেবল এ দুজাতির ক্ষেত্রেই মানানসই। অতএব, এ আয়াত ও হাদিস দ্বারা সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়—মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম এই দুজাতির জন্যই সর্তককারী হিসেবে প্রেরিত।

এ ছাড়াও উম্মতের উলামায়ে কেরাম এ ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, জিনেরাও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের উম্মত। [৭]

উপরিউক্ত পর্যালোচনার ভিত্তিতে কুরআন-হাদিস, ইজমায়ে উম্মত ও যুক্তির আলোকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম জিনজাতির জন্যও রাসূল এবং জিনেরাও তাঁর উম্মত—এ কথা অকাট্যভাবে প্রতীয়মান হয়। তাহলে জিনদের কেউ যদি ঈমানের সাথে নবিজির সাক্ষাৎ লাভে ধন্য হন, তবে তাঁর সাহাবি হতে বাধা কোথায়?
অতএব ইবনু হাযম যাহেরি রহ.-এর সাথে সুর মিলিয়ে বলাই যায় যে, আল্লাহ তায়ালা জিনদের ওই উপদলের ঘটনার মাধ্যমে আমাদেরকে এ কথার জানান দিয়েছেন যে, জিনদের মাঝেও কেউ কেউ প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সাহাবি ছিলেন। [৮]

তথ্যসূত্র ও টীকা
[১] সুরা আহকফ, আয়াত : ২৯। সুরা জিন, আয়াত : ১-২ ও ৯। মুসতাদরাক আল-হাকেম, হাদিস নং : ৩৭০১। হাকেম রহ.-এর মতে এ হাদিসের সনদ সহিহ এবং হাফেজ যাহাবি রহ.-ও এ কথার সমর্থন করেন।
[২] সুরা আর-রহমান, আয়াত : ১৫
[৩] সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ৪৫০
[৪] সুরা হুদ, আয়াত : ১১৯
[৫] নুযহাতুন নযর ফি তাওযিহি নুখবাতিল ফিকার, পৃষ্ঠা : ১৫৮, ইবনু হাজার আসকালানি রহ., মাকতাবাতুল বুশরা।
[৬] সুরা আহযাব, আয়াত : ৪০
[৭] আল-ইসাবাহ ফি তাময়িযিস সাহাবাহ, ১/১১, ইবনু হাজার আসকালানি, দারুল কুতুবুল ইলমিয়্যাহ। ফতওয়ায়ে সুবকি, ২/৫৯৪।
[৮] আল-ইসাবাহ ফি তাময়িযিস সাহাবাহ, ১/১৪, ইবনু হাজার আসকালানি, দারুল কুতুবুল ইলমিয়্যাহ।

শেয়ার করুন
error: Content is protected !!