শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০

উসামা ইবনু যায়েদ : রাসুলের প্রিয়ভাজন

0

শুরুকথা :
বারো-তেরো বছরের এক কিশোর ছেলে, যে দ্বিতীয়বারের মতো যুদ্ধের নির্বাচনী সারিতে দাঁড়িয়েছে। তার কয়েকজন সাথি গতযুদ্ধে যেদিন তাকে রেখে চলে যায়, সেদিন সে চোখের অশ্রু ধরে রাখতে পারছিল না। কিন্তু নাছোড়বান্দা, এবার সে যাবেই। এজন্য কৌশল অবলম্বন করতে ভুলল না। নির্বাচনী সারিতে দুই পায়ের পাতায় ভর দিয়ে লম্বা হয়ে দাঁড়াল। এ দৃশ্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দৃষ্টিগোচর হলো। রাসুল তার আগ্রহ দেখে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। সেই কিশোর ছেলে হলেন উসামা ইবনু যায়েদ; যাঁর প্রতি রাসুলের ভালোবাসা দেখে দুনিয়া ঈর্ষান্বিত হতো! যিনি ছিলেন রাসুলের প্রিয়ভাজন যায়েদ ইবনু হারেসা রাদিয়াল্লাহু আনহু’র ছেলে। যাঁকে দুনিয়াবাসী মনে রাখে ইবনু হিব্বুর রাসুল তথা রাসুলের প্রিয়ভাজনের ছেলে বলে। আসুন প্রিয়ভাজন সেই মহান সাহাবির গল্প শোনা যাক—

জীবনের সূর্যোদয়
নবুওয়াতের সপ্তম বছরের কথা। মক্কার কুরাইশ পৌত্তলিকরা ইসলাম প্রচারে একের পর এক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে চলছে। তারা রাসুলকে চতুর্দিক থেকে বয়কট করা শুরু করে। রাসুলের চেহারা মলিন, খুশির আভা নেই। এমন কষ্টের মাঝে একটি খুশির সংবাদ তাঁর চেহারা আলোকিত করে তোলে। প্রিয় উসামার জন্মের সংবাদ রাসুলের মুখে হাসি ফোটায়। উসামার মা উম্মু আয়মান—রাসুল যাঁকে ছোটকাল থেকে মা বলেই চিনে আসছেন; রাসুলের মা আমেনা জীবিত অবস্থায় এবং পরলোকগমন করার পরও যিনি রাসুলকে কোলে পিঠে করে বড় করেছেন; রাসুল যাঁর ব্যাপারে প্রায়ই বলতেন—‘আমার মায়ের পরে তিনিই আমার মা এবং আমার পরিবারের একজন।’ তিনি ছিলেন হাবশি বংশোদ্ভূত। মা আমেনার পরিচারিকা ছিলেন। আমেনা মারা যাওয়ার পর রাসুল তাঁর উত্তরাধিকার হন। রাসুল প্রায়ই উম্মু আয়মান সম্পর্কে বলতেন—যদি কেউ জান্নাতি মহিলা বিবাহ করতে চায়, সে যেন উম্মু আয়মানকে বিবাহ করে। রাসুলের এ কথায় যায়েদ ইবনু হারেসা রাদিয়াল্লাহু আনহু উম্মু আয়মানকে বিবাহ করেন এবং রাসুলের প্রিয় এই দুই সৌভাগ্যবান দম্পতির ঔরসে জন্মগ্রহণ করেন উসামা।

যে ব্যক্তি আল্লাহ ও রাসুলকে ভালোবাসে, সে যেন উসামাকেও ভালোবাসে
মা হাবশি বংশোদ্ভূত হওয়ায় উসামার চেহারা ছিল কুচকুচে কালো। চ্যাপ্টা নাক, তবে চেহারা ছিল মায়াবী। তাতে বীরত্বের ছাপ ছিল। জন্মের পর থেকেই তিনি ইসলামকে আপন করে নিয়েছেন। রাসুলের দৌহিত্র হাসান ছিলেন সুন্দর চেহারার অধিকারী। রাসুল উভয়কে নিজের উরুতে বসাতেন এবং চুমু খেতেন। আর বলতেন—‘হে আল্লাহ আমি তাদেরকে ভালোবাসি, আপনিও তাদেরকে ভালোবাসেন!’ রাসুলের প্রিয়তমা উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন—‘কেউ যেন উসামার সাথে রাগ না করে। কেননা রাসুল প্রায়ই বলতেন—যে ব্যক্তি আল্লাহ ও রাসুলকে ভালোবাসে, সে যেন উসামাকেও ভালোবাসে!’
রাসুলের সাথে উসামার ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল ঈর্ষণীয়। উসামাও রাসুলের ভালোবাসায় তাঁর আংটিতে লিখেছিলেন—হিব্বু রাসুলিল্লাহ তথা রাসুলের প্রিয়ভাজন। এ কারণে মক্কার ছোটবড় সবাই তাদের মুহাব্বতের কথা জানতেন। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু’র খেলাফতকালে আবদুল্লাহ ইবনু উমরের জন্য বায়তুল মাল থেকে তিন হাজার ভাতা নির্ধারণ করেন। আর উসামা ইবনু যায়েদের জন্য সাড়ে তিন হাজার ভাতা নির্ধারণ করা হয়। এতে আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু মনে মনে ভাবলেন যেহেতু উসামাকে বেশি দেয়া হয়েছে, হয়তো ইসলামে তাঁর স্থান পরে হয়ে যাবে! কারণ তিনি রাসুলের আনুগত্য করতেন সবচেয়ে বেশি।
তাই তিনি পিতা উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন, ‘আমি রাসুলের সংশ্রবে বেশি থেকেছি অথচ আমাকে বায়তুল মালের অংশ কম দেয়া হচ্ছে!’ পিতা বললেন, ‘বাছা! তোমার চেয়ে উসামাকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বেশি মুহাব্বাত করতেন, এবং তোমার পিতা থেকে উসামার পিতাকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বেশি ভালোবাসতেন।’ আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, উসামার শিশুকালে একদিন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আমাকে গোসল করাতে বলেন, কিন্তু আমার কোনো সন্তান না থাকাতে আমি জানতাম না কীভাবে গোসল করাতে হয়। অতঃপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আমার কাছ থেকে নিয়ে তাকে গোসল করিয়ে দিলেন। এবং বলতে লাগলেন, ‘ভালোই হলো উসামা মেয়ে না, যদি সে মেয়ে হতো আমি তাকে গয়না পরাতাম!’

আরেকদিনের ঘটনা : মক্কার উঁচু বংশের এক নারীকে চুরির অভিযোগে আটক হয়। তার বংশের লোকেরা শাস্তি কমানোর জন্য বিভিন্ন চেষ্টা করতে থাকে। অবশেষে উসামার দ্বারস্থ হয়। তারা ভাবছিল, যেহেতু উসামাকে রাসুল অনেক মুহাব্বাত করেন, হয়তো তাঁর সুপারিশ তিনি গ্রহণ করবেন। এরপর উসামা তাদের চাপচাপির কারণে রাসুলের কাছে ওই নারীর বিষয়ে সুপারিশ করেন। তাঁর কথা শোনার সাথে সাথে রাসুলের চেহারা রক্তিম বর্ণ হয়ে যায়। তিনি বলেন, ‘তুমি কি আমাকে আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তির ব্যাপারে সুপারিশ করছ? আল্লাহর কসম, আমার মেয়ে ফাতেমাও যদি এমন অপরাধে জড়িত হয়, আমি তার হাত কাটতে দ্বিধা করব না।’ এ কারণে উসামা পরে ক্ষমা প্রার্থনাও করেন।

যোগ্য সেনাপতি
বারো-তেরো বছরের কিশোর ছেলে উসামার আগ্রহ দেখে রাসুল তাঁকে সর্বপ্রথম খন্দকের যুদ্ধে শরিক হওয়ার অনুমতি দেন। তিনি অত্যন্ত উৎফুল্ল মনে সেখানে শরিক হয়েছিলেন। কেউ কেউ বলেন, চৌদ্দ বছর বয়সে তাঁকে সর্বপ্রথম ‘হারকা’ নামক অভিযানে প্রেরণ করা হয়। তাঁর অসীম বীরত্ব এবং অনন্য দুরদর্শিতা দেখে অভিযানের নেতৃত্ব দান করা হয়। তিনি নিজেই বলেন, ‘যখন আমরা মুশরিকদের পরাস্ত করলাম, তারা পালাতে শুরু করল। এমন সময় আমি একজনকে ধাওয়া করলাম। যখন সে আমার নাগালে চলে এলো, তখন উঁচু আওয়াজে কালিমা পড়তে শুরু করল। কিন্তু আমি তাকে বর্শা দিয়ে মেরে ফেললাম। যুদ্ধ থেকে ফেরার পর একজন সাহাবি রাসুলকে বিজয়ের সুসংবাদ জানালেন। রাসুল খুবই আনন্দিত হলেন এবং আমাকে ডেকে আনলেন যুদ্ধের কারগুজারি শোনানোর জন্য। আমি তখন ওই মুশরিকের কাহিনি বললাম, যে ভয়ে উঁচু আওয়াজে কালিমা পড়ছিল এবং আমি তাকে মেরে ফেলি। এ কথা শোনার সাথে সাথে রাসুলের চেহারা রক্তিমবর্ণ হয়ে গেল এবং বলতে লাগলেন, তুমি কেন তার কলিজা ফেঁড়ে দেখলে না? সে কি তোমার ভয়ে কালিমা পড়ছিল, না সত্য ধর্ম গ্রহণের জন্য? এ কথা রাসুল বারবার বলছিলেন; আর আমি এতো অনুতপ্ত হচ্ছিলাম যে, মনে মনে ভাবছিলাম,হায়! আমি যদি আজকের পূর্বে ইসলাম গ্রহণ না করতাম!’
হুনাইনের যুদ্ধে যখন মুসলিম বাহিনী পালাতে শুরু করল, তখন উসামা রাদিয়াল্লাহু আনহু মজবুত পাহাড়ের ন্যায় দাঁড়িয়ে গেলেন এবং রাসুলের ঢাল হয়ে যুদ্ধ করলেন। মক্কা বিজয়ের দিনেও তিনি রাসুলের পাশে ছিলেন। রাসুল তাঁকে, বেলালকে এবং কাবার চাবিরক্ষক উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুকে সাথে নিয়ে সেদিন কাবা ঘরে প্রবেশ করেছিলেন।
আঠারো বছর বয়সে উসামা তাঁর পিতা সেনাপতি যায়েদ ইবনু হারেসার সাথে মুতা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। সেই যুদ্ধে তাঁর পিতা যায়েদ এবং মায়ের দিকের ভাই শহিদ হওয়ার পরেও ভেঙে পড়েননি, বরং বীর বিক্রমে সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের পতাকাতলে যুদ্ধ করে বিজয়ী বেশে মদিনায় ফিরে এসেছিলেন।
উসামার বয়স যখন মাত্র বিশ বছর, তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাঁকে আবু বকর ও উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমার মতো বড় বড় সাহাবিরা থাকার পরেও রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সেনাপতি নিযুক্ত করেন। তখন কিছু কিছু সাহাবি এ বিষয়ে আলোচনা-সমালোচনা করতে থাকেন। রাসুল তা শুনে সবাইকে উদ্দেশ্যে করে বললেন, যারা উসামার সেনাপতি হওয়ার বিষয়ে সমালোচনা করে, তারা তো তার পিতার ব্যাপারেও সমালোচনা করছে! যদি তার পিতা সেনাপতির যোগ্য হয়ে থাকে, তাহলে সেও সেনাপতির যোগ্য। আর জেনে রাখো, তার পিতার পরে সকলের চেয়ে সে আমার কাছে প্রিয়। আমি আশা রাখি, সে তোমাদের নেককারদের একজন। তাই তার সাথে উত্তম আচরণ করো!’
উসামার বাহিনী মদিনা থেকে বের হয়ে জুরুফ নামক স্থানে পৌঁছার পর রাসুলের মৃত্যুর সংবাদ চলে আসে। রাসুলের মৃত্যুর পর আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর আদেশে আবার উসামার বাহিনী রওনা হয়। অনেক সাহাবি এতে অসম্মত ছিলেন। কিন্তু আবু বকর বলেন, ‘আমাকে হিংস্র প্রাণী খেয়ে ফেললেও আমি উসামার বাহীনিকে থামাব না।’ অতঃপর উসামা ফিলিস্তিনের ‘বালকা’ এবং কিলায়াতুত দারুম বিজয় করে চিরতরে রোমানদের বীরত্ব ধ্বংস করে মিশর সিরিয়া ও আফ্রিকাসহ আরও অনেক অঞ্চলের বিজয়ের দ্বার উন্মুক্ত করেন এবং বিপুল পরিমাণ গনিমত নিয়ে নিরাপত্তার সহিত ফিরে আসেন। মুসলিম ঐতিহাসিকরা বলেন, উসামার বাহিনী অপেক্ষা অধিকতর নিরাপদ ও গনিমত লাভকারী বাহিনী দেখা যায়নি।

জীবনের সূর্যাস্ত
উসামা ইবনু যায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহু জীবনের শেষ দিকে দামেস্কের পশ্চিমে ‘মিযযাতে’ বসবাস করতে শুরু করেন। অতঃপর যখন আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু’র শাহাদাতের পর হাসান ও মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে পৃথক হয়ে গেলেন, তখন তিনি পুনরায় মদিনায় ফিরে আসেন এবং বড় বড় সাহাবির সাথে তিনিও মুআবিয়ার হাতে বায়আত গ্রহণ করেন। তবে অনেক ঐতিহাসিকের মতে–আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু’র বিরোধের সময় প্রসিদ্ধ সাহাবিদের মধ্যে সাআদ, ইবনু উমর, মুহাম্মদ ইবনু মাসলামা এবং উসামা ইবনু যায়েদ সেই ফেতনা থেকে বেঁচে ছিলেন।
উসামা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘একদিন আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু আমাকে বললেন আমরা তো তোমাকে আমাদের মধ্যেই গণ্য করি, তাহলে তুমি কেন আমাদের সাথে আসো না? আমি বললাম, আলি, আপনি যদি সিংহের এক চোয়ালে ধরেন আমি দ্বিতীয় চোয়ালে ধরতে রাজি আছি। মরলে এক সাথে, বাঁচলেও এক সাথে। কিন্তু আপনি যে বিষয়ের ওপর রয়েছেন, আল্লাহর কসম, আমি কখনো তাতে প্রবেশ করব না।’

৫৪ হিজরিতে, কারো মতে ৬১ হিজরিতে, তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। মুআবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু’র খেলাফতকালে মদিনার উপকন্ঠে জুরুফ নামক স্থানে তিনি মৃত্যুবরণ করেন এবং জান্নাতুল বাকিতে সমাহিত হন।

স্মর্তব্য
১. উসামা ইবনু যায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে প্রায় ত্রিশজন সাহাবি হাদিস বর্ণনা করেছেন।
২. তাঁর বর্ণিত হাদিস ১১৮টি। বুখারি ও মুসলিমে ৫০টি। বুখারিতে আলাদাভাবে ১টি এবং মুসলিমে আলাদাভাবে বর্ণিত হাদিস ২টি।

তথ্যসূত্র
১. সিয়ারু আলামিন নুবালা পৃষ্ঠা—১০৫১
২. তাহজিবুত তাহজিব, ১/১০৬
৩. সুয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবা পৃষ্ঠা—২২২
৪. আসহাবে রাসুলের জীবনকথা ১/১৭৪

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

error: Content is protected !!