রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১

উম্মুল মুমিনিন যাইনাব বিনতু খুযাইমা : সংক্ষিপ্ত জীবনিকা

0

উহুদযুদ্ধের পর। সত্তরজন মুসলমান যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেছেন। ফলে নারী-শিশুদের কাফেলায় স্বজনহারা অসহায়দের সংখ্যা বেশ বেড়ে গেছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম সাহাবিদেরকে অভিভাবকহীন নারী-শিশুদের পাশে দাঁড়াতে নির্দেশ দিলেন। বিধবা নারীদেরকে বিয়ে করতে এবং এতিম শিশুদের দায়িত্ব নিতে উৎসাহ দিলেন। সাহাবাগণও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ মতো এগিয়ে এলেন।
এদিকে অন্য সাহাবিদের সাথে উহুদযুদ্ধে আবদুল্লাহ ইবনু জাহাশ রাদিয়াল্লাহু আনহুও শহিদ হয়েছেন। তিনি ছিলেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের আপন ফুফাতো ভাই। আবদুল্লাহ ইবনু জাহাশ রাদিয়াল্লাহু আনহু’র ইন্তেকালের কারণে তাঁর স্ত্রী নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। কারণ ইসলামগ্রহণের কারণে তাঁর পরিবার পূর্বেই তাঁর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। তাঁর আর যাওয়ার জায়গা নেই। ভীষণ কষ্টে দিনাতিপাত করছিলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামও তাঁর দুরবস্থার কথা জানতেন। এদিকে তাঁর গোত্র বনু সুলাইম তখনও অমুসলিম ছিল। ইসলামের প্রতি তারা বিদ্বেষ পোষণ করত, বিরোধিতা করত। এই মনোভাব পরিবর্তন করতে তাদের জন্য ইসলামকে জানা জরুরি ছিল। তাদের গোত্রের কোনো নারীকে বিবাহ করার মাধ্যমে তা সহজ হতো। সবদিক বিবেচনা করে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম শহিদ আবদুল্লাহ ইবনু জাহাশ রাদিয়াল্লাহু আনহু’র স্ত্রী যাইনাব বিনতু খুযাইমা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। এভাবে যাইনাব রাদিয়াল্লাহু আনহা উম্মুল মুমিনিনের অবিনশ্বর উপাধি অর্জন করেন।

জন্ম ও পরিচিতি
যাইনাব বিনতু খুযাইমা রাদিয়াল্লাহু আনহা ৫৯৫ খ্রিষ্টাব্দে জন্ম গ্রহণ করেন। নজদ অঞ্চলের বনু সুলাইম গোত্রের কন্যা তিনি। তাঁর পিতা খুযাইমা ইবনুল হারিস এবং মাতা মানদাব বিনতু আউফ। অতি দানশীলতার জন্য ইসলাম গ্রহণের আগে বাল্যকাল থেকেই তিনি ‘উম্মুল মাসাকিন’ খ্যাতিতে পরিচিত ছিলেন। কারণ তাঁর এমন বহু ঘটনা আছে যে—খেতে বসেছেন, ঠিক তখন কেউ এসে খাবার চাইল। তিনি নিজের খাবারটুকুই তাকে দিয়ে দিয়েছেন।
যাইনাব বিনতু খুযাইমা রাদিয়াল্লাহু আনহার প্রথম বিয়ে হয় তুফাইল ইবনুল হারিসের সাথে। প্রথম স্বামীর সাথে তাঁর বনিবনা হয়নি বিধায় তালাক হয়ে গিয়েছিল। অন্য বর্ণনায় আছে প্রথম স্বামী মৃত্যুবরণ করেছিল। তারপর আবদুল্লাহ ইবনু জাহাশ রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে তাঁর দ্বিতীয় বিয়ে হয়। তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের ফুফু উমাইমা বিনতু আবদিল মুত্তালিবের সন্তান ছিলেন। আবার রাসুলের অন্য স্ত্রী উম্মুল মুমিনিন যাইনাব বিনতু জাহাশের ভাই ছিলেন।

ইসলামের শামিয়ানায়
বিয়ের সুবাদে যাইনাব রাদিয়াল্লাহু আনহা জন্মস্থান নজদ অঞ্চল থেকে মক্কায় আসেন। স্বামী আবদুল্লাহ ইবনু জাহাশ রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং স্বামীর পরিবারের অন্যদের সাথে তিনিও ইসলামগ্রহণ করেন। তাঁর ইসলাম গ্রহণের কথা পিতৃ বংশের লোকেরা জানতে পেরে তাঁর কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। অতঃপর যখন হিজরতের নির্দেশ আসে তখন যাইনাব রাদিয়াল্লাহু আনহা স্বামীর পরিবারের সাথে আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মদিনায় হিজরত করার পর আবিসিনিয়ায় হিজরতকারী অন্য সবার সাথে আবদুল্লাহ ইবনু জাহাশ রাদিয়াল্লাহু আনহু ও তাঁর পরিবারও মদিনায় হিজরত করেন। তিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এরপর উহুদ যুদ্ধে বীরবিক্রমে লড়াই করতে করতে শাহাদাত বরণ করেন। কাফেররা তাঁর দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেটে লাশ বিকৃত করে ফেলেছিল। [আসহাবে রাসুলের জীবনকথা]

রাসুল-গৃহে
স্বামীর মৃত্যুর পর ‘উম্মুল মাসাকিন’ উপাধিপ্রাপ্ত যাইনাব তখন নিদারুণ দারিদ্র্যে নিপতিত। আত্মীয়-স্বজনও কেউ পাশে ছিল না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তখন তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। তিনি খুশিমনে প্রস্তাব গ্রহণ করেন। এরপর চারশ দিরহাম মোহর ধার্য্য করে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বিয়ে করেন।
অন্য বর্ণনায় পাওয়া যায়, যাইনাব বিনতু খুযাইমা রাদিয়াল্লাহু আনহা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের কাছে বিনা মোহরে বিয়ের প্রস্তাব দেন।
হিজরি তৃতীয় সনের জিলকদ বা জিলহজ মাসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সাথে যাইনাব বিনতু খুযাইমা রাদিয়াল্লাহু আনহার বিয়ে সম্পন্ন হয়। যাইনাব রাদিয়াল্লাহু আনহার বয়স তখন ত্রিশ বছর আর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের পঞ্চান্ন।
তিনি রাসুলের প্রথম স্ত্রী যিনি কুরাইশ গোত্রের নন, অন্য গোত্রের।
হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বিয়ে করার পর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম যাইনাব বিনতু খুযাইমা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বিয়ে করেন।
রাসুলের সাথে বিয়ের পর যাইনাব বিনতু খুযাইমা রাদিয়াল্লাহু আনহা মাত্র দুই কি তিনমাস জীবিত ছিলেন। এই সংক্ষিপ্ত সময়ের কোনো ঘটনা বা বর্ণনা ইতিহাসে পাওয়া যায় না।
কেউ কেউ বলেছেন, উম্মুল মুমিনিনগণের প্রশ্নের জবাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের বাণী—‘তোমাদের মধ্যে যার হাত দীর্ঘ সেই খুব তাড়াতাড়ি আমার মৃত্যুর পর আমার সাথে মিলিত হবে’ দ্বারা যাই়নাব বিনতু খুযাই়মার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। ‘দীর্ঘ হাত’ কথাটি রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। যার অর্থ দানশীলতা। যেহেতু যাইনাব বিনতু খুযাইমা খুব বেশি দান-খায়রাত করতেন, তাই ‘লম্বা হাত’ বলে তাঁকে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু এ তথ্য সঠিক নয়। মূলত এ হাদিস দ্বারা যাইনাব বিনতু জাহাশ রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বুঝানো হয়েছে। কারণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পর উম্মুল মুমিনিনগণের মধ্যে যাইনাব বিনতু জাহাশ রাদিয়াল্লাহু আনহা সর্বপ্রথম ইন্তেকাল করেছেন। আর মুহাদ্দিসগণ তো এ ব্যাপারে একমত যে, যাইনাব বিনতু খুযাইমা রাদিয়াল্লাহু আনহা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় ইন্তেকাল করেছেন। [আসহাবে রাসুলের জীবনকথা]

নশ্বর জীবন
হিজরি তৃতীয় সনের শেষে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সাথে বিয়ে হয় যাইনাব বিনতু খুযাইমা রাদিয়াল্লাহু আনহার। এর তার দুই বা তিন মাস পরে হিজরি চতুর্থ সনে তিনি ইন্তিকাল করেন। তখন তাঁর বয়স ত্রিশ বছর। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের আর কোনো স্ত্রী এত কম বয়সে ইন্তেকাল করেননি।
তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের একমাত্র স্ত্রী যাঁর জানাজার ইমাম রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম নিজে ছিলেন। কারণ খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা যখন ইন্তেকাল করেন তখন জানাজার বিধান ছিল না।

উম্মুল মুমিনিন যাইনাব বিনতু খুযাইমা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হয়।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

error: Content is protected !!