রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১

আয়েশা বিনতু আবি বকর : দিলরুবায়ে রাহমাতুল্লিল আলামিন

0

শুভজন্ম ও বংশীয় কৌলিন্য
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াতপ্রাপ্তির চতুর্থ বছরে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু’র একজন কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করেন। আবু বকরের স্ত্রী উম্মু রুমান বিনতু আমিরের গর্ভে। আবু বকর তাঁর নাম রাখেন আয়েশা। যার অর্থ সুখী জীবনযাপনকারিণী। স্বচ্ছল, সমৃদ্ধশীল। পিতার দিক থেকে তাঁর ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের বংশ ছিল এক বংশ। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার অধিকারী। তাঁর অসাধারণ বিচক্ষণতা, প্রজ্ঞাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি, যৌক্তিক কথাবার্তার দ্বারা—বড় হয়ে তিনি যে অসামান্য, বহুদর্শী, জ্ঞানী হবেন তার পরিচয় পাওয়া যেত সেই পুতুল খেলার বয়স থেকেই। আর বয়সের সাথে সাথে তাঁর এইসব গুণাবলি ফুলের পাপড়ির মতোই ডানা মেলে প্রস্ফুটিত হতে থাকে।

রাসুলের প্রিয়তমা
নবুওয়াতের দশম বছর তখন। সমস্ত মাখলুকাতের সান্ত্বনার আধার যে মহামানব তাঁর মন ভারাক্রান্ত , ব্যাথিত। শোকের আঘাতে জর্জরিত তাঁর কোমলপ্রাণ। রাতে ঘুমাতে গিয়ে বুকটা কেমন হাহাকার করে শূন্যতায়। অলক্ষে দুফোঁটা অশ্রুও গড়িয়ে পড়ে। দুনিয়ার কেউ দেখে না। কেউ জানে না। বুঝে না তাঁর মনের ব্যথা। হৃদয়-অলিন্দে বয়ে যাওয়া শূন্যতার ঝড়। তাঁর মনের ভেতর চলা মরু সাইমুমের কারণ তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী গত হয়েছেন কিছুদিন। আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেছেন তাঁর দুঃসময়ের সাথি। কষ্টের ভাগিদার।
সারাদিন দাওয়াতের কাজে কাটে। দিনশেষে ঘরে ফিরে দেখেন নিষ্ঠুর শূন্যতায় হাহাকার করছে তাঁর ঘর। বুকভরা কষ্ট আর শূন্যতা নিয়ে ক্লান্ত দেহ সঁপে দেন ঘুমের কোলে। চোখের কোণে যেন বেদনার অশ্রু।
ঘুমের ঘোরে স্বপ্নে দেখেন এক ঐশিদূত। তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন ঠোঁটে একটুখানি হাসির ঝিলিক মেখে। হাতে কী যেন একটা! ফেরেশতা দেখালেন রেশমি রুমাল। ‘কী আছে তাতে?’ জিজ্ঞেস করলেন রহমতের নবি। ফেরেশতা মিষ্টি হেসে বললেন আপনিই দেখুন না খুলে। কিছুটা দ্বিধা-সংশয় যেন মনে। ফেরেশতা অভয় দিলেন। মনের দ্বিধা-সংশয় ঝেড়ে খুলে দেখলেন রেশমি রুমাল। কী আছে তাতে? চোখের সামনে ভালো করে মেলে ধরতেই দেখা গেল তাতে এক বালিকার মায়াবী মুখচ্ছবি। বালিকাটি তাঁর খুব চেনা। তার প্রিয় বন্ধু আবু বকরের কন্যা। আয়েশা বিনতু আবি বকর রাদিয়াল্লাহু আনহা।
রাসুল কিছুটা অবাকই হলেন। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন ঐশীদূতের মুখের দিকে। ফেরেশতা হেসে বললেন, ‘এই ভাগ্যবতীই হবেন আপনার স্ত্রী। আপনার হৃদয়েশ্বরী। এ জনমে। পরজনমেও।’
দিনের বেলা সবকিছুই স্বাভাবিক। তবে রাসুলের বারবার মনে পড়ছে রাতে দেখা সেই স্বপ্নের কথা। মনের ভেতর সংশয়। কারও কাছে তা প্রকাশ করলেন না। চেপে রাখলেন মনে। দেখি শেষতক কী হয়!
দ্বিতীয় রাতে আবারও সেই স্বপ্ন। অদৃশ্যালোকের কণ্ঠে যেন ধ্বনিত হলো ‘আপনার জীবনসঙ্গিনী, আপনার অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে তাঁকে। এই ছোট্ট বালিকাই আপনার হৃদয়ের ক্ষতে লাগিয়ে দেবে প্রেমের মলম। খাদিজার শোক ভুলিয়ে দেবে ভালোবাসার শীতল পরশ দিয়ে।’
এবারও রাসুল কারও কাছে কিছু বললেন না। মনের ভেতর লুকিয়ে রাখলেন স্বপ্নের কথা। ভেবে কূল পাচ্ছেন না। এ কি সত্যিই মহান রবের পক্ষ থেকে কোনো অদৃশ্য ইঙ্গিত না কেবলমাত্র স্বপ্নই! কিন্তু তা তো হবার কথা না। ফেরেশতার মাধ্যমে তাঁকে দেখানো হয়েছে। বিষয়টি তাঁকে ভাবাচ্ছে খুব।
তৃতীয় রাতে আবারও ঘুমের ঘোরে সেই ঐশীদূত। সেই আগের কথা। আগের ছবি। রেশমি ঝালরওয়ালা দোপাট্টার ভেতর চঞ্চলা বালিকার মায়াবী মুখচ্ছবি।
আজকের স্বপ্ন দেখার পর রাসুলের মন থেকে কেটে গেল সৃষ্টিগত সব দ্বিধা-সংশয়। মনের গহীনে স্পষ্টভাবে যেন কেউ বলে উঠল, হ্যাঁ! এই মায়াবী, নিষ্পাপ মুখাবয়বের অধিকারিণীই হবে আমার জীবনসঙ্গিনী। আমার দিলরুবা। আর এটা নিশ্চয়ই আল্লাহর ফায়সালা। আমি সাদরে গ্রহণ করে নিলাম মহান রবের এ পয়গাম।
তারপর খাওলা বিনতৃ হাকিমের মধ্যস্থতায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আয়েশা রাদিয়াল্লাহার মা উম্মু রুমানের কাছে তাঁর বিবাহের প্রস্তাব দেন। উম্মু রুমান তখন কেনো মতামত দেননি। তিনি বিষয়টি তাঁর স্বামী আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে জানালেন। শুনে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর চেহারায় দুশ্চিন্তার ছাপ পড়ে গেল। কারণ, এর আগে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে মুতঈম ইবনু আদি’র পুত্র যুবায়ের ইবনু মুতঈমের কাছে বিবাহ দেওয়ার ওয়াদা করেছিলেন। আর তাদের বাগদানও সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল। স্ত্রীর কাছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রস্তাব শুনে বললেন, ‘আমি মুতঈমকে ওয়াদা দিয়েছিলাম ওর ছেলের কাছে আয়েশাকে বিয়ে দেবো বলে। এখন কী করা যায়? আমি তো জীবনে কখনো ওয়াদা ভঙ্গ করিনি। এদিকে আল্লাহর রাসুল প্রস্তাব দিয়েছেন! আমি এ সৌভাগ্য কী করে দূরে ঠেলে দিই!’ তিনি মুতঈম ইবনু আদি’র বাড়ি গেলেন। তাদের মনমানসিকতা জানার জন্য। মুতঈমের কাছে বিয়ের কথাটা পাড়লেন। মুতঈমের স্ত্রী বলে উঠল, ‘আমার পুত্রের জন্য আয়েশাকে বিয়ে করিয়ে আনলে আমার ঘরে ইসলাম প্রবেশ করবে। আমি এই বিয়েতে রাজি নই।’ আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু মুতঈমের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘আমার স্ত্রীর কথাই আমার কথা।’ তাঁর এই কথা শুনে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু স্বস্তি পেলেন। তিনি খাওলা বিনতু হাকিমের মধ্যস্থতায় আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে বিয়ে দিলেন। তখন শাওয়াল মাস। বিয়ের মোহরানা ছিল চারশত দিরহাম।

দাম্পত্যজীবন ও হিজরত
বিয়ের পর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তিনবছর মক্কায় অবস্থান করেন। নবুওতের ১৩তম বছরে আল্লাহর পক্ষ থেকে হিজরতের নির্দেশ আসে। সাহাবিরা একে একে হিজরত করতে শুরু করেন। সবশেষে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাঁর পরিবার মক্কায় রেখে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে সাথে নিয়ে মদিনায় হিজরত করেন। মদিনায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের বসবাসের জন্য মসজিদের পাশে হুজরা (ছোটো কুটির) নির্মাণ করা হলো। হুজরা নির্মাণের পর তাদের পরিবারের সদস্যদের মদিনায় নিয়ে আসার জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যায়েদ ইবনু হারেসা, আবু রাফে ও তাদের হিজরতের গাইড আবদুল্লাহ ইবনু উরাইকিতকে মক্কায় পাঠালেন। কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁরা দুই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মদিনায় ফিরে এলেন।
হিজরতের তিনমাস অতিবাহিত হয়েছে। মুহাজিররা মদিনার পরিবেশে অভ্যস্ত না থাকায় অপরিচিত এক অসুখে আক্রান্ত হয়ে পড়লেন। প্রায় সবারই জ্বর উঠল। প্রচণ্ড জ্বর। সবার সাথে সাথে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। জ্বরের প্রকোপে তাঁর মাথার চুল পর্যন্ত উঠে গেল। বেশ কিছুদিন তিনি অসুস্থ থাকার পর সুস্থ হলেন। পরিপূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠলে আবার আগের মতো চঞ্চলতায় মন দেন।
তখন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার বয়স নয় বছর। জিবরাইল আলায়হিস সালাম রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে একদিন বললেন, ‘আয়েশা আপনার স্ত্রী। আপনি তাঁকে ঘরে তুলুন।’ তারপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বিয়ের অনুষ্ঠান উদযাপন করে ঘরে তোলার ইচ্ছা পোষণ করলেন। প্রতিবেশী আনসারি নারীদের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হলো। তাঁরা প্রায় সবাই আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর কুটিরে সমবেত হলেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার তো এ সম্পর্কে কোনো খবরই নাই। তিনি আগের মতই সখীদের সঙ্গে খেলছিলেন। ঘরের বাইরে তাদের সঙ্গে দোলনায় দোল খাচ্ছিলেন। এই সময় তিনি মায়ের ডাক শুনে ঘরে গেলেন। মা তাঁর মুখ-হাত ধুয়ে দিয়ে মাথার চুল পরিপাটি করে দিলেন।
আনসারি নারীরা মুবারকবাদ, আহলান সাহলান বলে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বিয়ের শুভেচ্ছা জানালেন। এই সময় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে তাশরিফ আনলেন। অনুষ্ঠান সম্পন্ন হলো। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে পাঠানো হলো স্বামীর ঘরে।
শুরু হলো আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার দাম্পত্যজীবন।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম এবং আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার মাঝে যে ভালোবাসা ছিল তা নজিরবিহীন। দুনিয়ার বুকে তাঁদের ভালোবাসাই ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ নজির।
মসজিদে নববির উত্তর-পূর্ব দিকের ছো্টি ঘরটি ছিল তাঁদের ভালোবাসার রাজপ্রাসাদ। জীর্ণ কুটিরে অভাব-অনটন লেগেই থাকত। তবু ভালোবাসার কলতানে মুখরিত থাকত ঘরের প্রতিটি কোণ।
ভালোবাসার খুনসুটিতে তাঁরা মেতে থাকতেন এ ঘরেই। একদিন রাসুল তাঁকে বলছেন, ‘আয়েশা! তুমি কখন আমার উপর প্রসন্ন থাকো আর কখন অভিমান করো আমি অনুভব করতে পারি!’
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা পুলকিত মনে নবিজিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কীভাবে হে আল্লাহর রাসুল!’
রাসুল মুচকি হেসে বললেন, তুমি যখন প্রসন্ন থাকো তখন কথা প্রসঙ্গে শপথ করতে হলে বলো—মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের প্রভুর শপথ। আমার নাম উচ্চারণ করে মনে মনে আনন্দিত হও। আর যখন অভিমান করো তখন কথা প্রসঙ্গে শপথ করতে হলে বলো, ইবরাহিম আলায়হিস সালামের প্রভুর শপথ। তুমি আমার নাম উচ্চারণ করো না।’
আয়শা রাদিয়াল্লাহু আনহা মিষ্টি করে হেসে বললেন, ‘আল্লাহর রাসুল, আমি তো মুখেই আপনার নামটা পরিত্যাগ করি। অন্তর তো আপনার প্রতি ভক্তি, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় টইটম্বুর থাকে।’

জীবনের কঠিনতম সংকট
পঞ্চম হিজরির শাবান মাস। রাসুল যাবেন বনু মুস্তালিকের যুদ্ধে। লটারি করলেন স্ত্রীদের মধ্যে কে রাসুলের সাথে যাবেন। উঠল আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার নাম। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা তো খুব খুশি! বেড়াতে যাবেন এক জায়গায়, সে হিসেবে বোন আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহার গলার হারটি ধার নেন। হারের আংটাটা ছিল খুব দুর্বল। এতটাই যে যখনতখন খুলে পড়ে যেত। যুদ্ধ শেষ করে রাসুল সবাইকে নিয়ে রওয়ানা দিলেন মদিনার পথে। সফরকালে রাতের বেলায় এক অপরিচিত জায়গায় যাত্রাবিরতি হয়। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা গোপনে দূরের একজায়গায় গেলেন প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে।
ফেরার সময় হঠাৎ গলায় হাত দিয়ে দেখলেন ধার করা হারটি নেই। তিনি প্রচণ্ড ঘাবড়ে গেলেন। প্রথমত, তাঁর বয়স ছিল কম, তাছাড়া হারটি ছিল ধার করা। হতভম্ব হয়ে তিনি হারটি খুঁজতে লাগলেন। বয়স কম হবার কারণে তাঁর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ছিল না। তিনি ভেবেছিলেন যাত্রা আবার শুরু হবার আগেই তিনি হারটি খুঁজে পাবেন আর সময়মতো হাওদাতে পৌঁছে যাবেন। তিনি না কাউকে ঘটনাটি জানালেন, না তাঁর জন্য অপেক্ষা করার নির্দেশ দিলেন।
খুঁজতে খুঁজতে তিনি হারটি পেয়ে গেলেন কিছুক্ষণ পর। কিন্তু ততক্ষণে কাফেলা রওনা হয়ে গেছে।
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা আলাদা হাওদায় সওয়ার হতেন। তাঁর বয়স তখন চৌদ্দ কি পনেরো। শারীরিক দিক থেকে খুবই হালকা ছিলেন। এতটাই হালকা যে হাওদা বহনকারীরা বুঝতেই পারল না যে তিনি হাওদার ভেতর নেই। তারা উটের পিঠে হাওদা উঠিয়ে দিয়ে সফর শুরু করল। এদিকে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা তখন হার পাওয়ার পর কাফেলার কাছে ফিরে এসে দেখেন, কাফেলা এই জায়গায় নেই। পেরেশান হলেন না। তিনি সেখানে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লেন। ভাবলেন, কাফেলার লোকজন যখন বুঝতে পারবে, তখন আবার এখানে ফিরে আসবে।
সে সফরে সাকাহ হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন সাফওয়ান ইবনু মুআত্তাল রাদিয়াল্লাহু আনহু। তাঁর দায়িত্ব ছিল কাফেলার পেছনে পেছনে এসে ফেলে যাওয়া বস্তু কুঁড়িয়ে নেওয়া। তিনি পথ চলতে চলতে এসে একটি অস্পষ্ট অবয়ব দেখতে পেলেন। অস্পষ্ট হলেও তিনি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে চিনতে পারলেন। কারণ, পর্দার বিধান নাজিল হওয়ার আগে তিনি আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে দেখেছিলেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা এখানে শুয়ে আছেন কেন? তিনি তাঁর অস্তিত্ব জানান দেওয়ার জন্য জোরে ইন্নালিল্লাহ পড়লেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা সজাগ হয়ে বসে পড়লেন। সাফওয়ান রাদিয়াল্লাহু আনহু বুঝে নিলেন, যে তিনি কাফেলাকে হারিয়ে ফেলেছেন।
সফওয়ান রাদিয়াল্লাহু আনহা একটি উট এনে তাতে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে আরোহণ করতে বলে দূরে সরে দাঁড়ান। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা উটের পিঠে আরোহণ করলে তিনি উটের লাগাম ধরে সামনে পথ চলতে থাকেন। অনেক চেষ্টা করেও ভোরের আগে তাঁরা কাফেলাকে ধরতে পারলেন না।
সকাল গড়িয়ে সময় যখন দুপুর হয়ে গেল তখন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা ও সাফওয়ান রাদিয়াল্লাহু আনহু কাফেলার কাছে পৌঁছলেন। কাফেলার সবাই তো পেরেশান হয়ে পড়েছিলেন। দুজনকে আসতে দেখে তাঁরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। কিন্তু কাফেলায় থাকা মুনাফিক-নেতা আবদুল্লাহ ইবনু উবাই ব্যাপারটাতে রঙ চড়িয়ে সদলবলে কুৎসা রটনা করল। এবং আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার পবিত্রতম চরিত্রে কালিমা লেপন করতে লাগল।
ঘটনাক্রমে আরও তিনজন সম্মানিত সাহাবি এই কুচক্রে জড়িয়ে পড়েন। হাসসান ইবনু সাবেত রাদিয়াল্লাহু আনহু, হামনা বিনতু জাহাশ রাদিয়াল্লাহু আনহা আর মিসতাহ ইবনু আসাসাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু।
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা মদিনা পৌঁছানোর পর ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাই তিনি ঘটনাটি সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। নবিজি আর আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে কিছুই জানালেন না।
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা অসুস্থ হলে নবিজি তাঁর অনেক খেয়াল রাখতেন। আদর-যত্ন করতেন। কিন্তু এবারের অসুস্থতায় আগের মতো কিছুই করলেন না। ব্যাপারটা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা লক্ষ করলেন। আরও খেয়াল করলেন যে, নবিজি আর আগের মতো তাঁর সাথে প্রাণ খুলে কথা বলছেন না।
পুরো ব্যাপারটায় তিনি খুব কষ্ট পেলেন। তাই নবিজির অনুমতি নিয়ে বাবার বাড়ি চলে গেলেন। তখনও তিনি আসল ঘটনাটি জানতেন না। পরবর্তীতে, একদিন রাতের বেলা প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাইরে বের হলে মিসতাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুর মা তাঁকে পুরো ঘটনাটি জানান। নিজের ছেলেকে মা হয়ে অভিশাপ দেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা তখন সবকিছু জানতে পারলেন। তাঁর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। তিনি রাত-দিন অবিরত কাঁদতে থাকলেন।
এদিকে তাঁর বিরুদ্ধে অপবাদকারীরা আরও জোরে-শোরে কুৎসা রটাতে থাকে। প্রায় ১ মাস হয়ে যায়। কোনো মীমাংসা হয় না। মুনাফিক আর গুটিকয়েক ব্যক্তি ছাড়া সবাই বিশ্বাস করত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা নির্দোষ ছিলেন। তারপরেও নবিজি ঘটনার তদন্ত করলেন। তিনি উসামা রাদিয়াল্লাহু আনহু ও আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে পরামর্শ করলেন। উসামা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আপনার পরিবার সম্পর্কে আমরা ভালো ভিন্ন আর কিছুই জানি না।’ আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু ঘটনার আরও গভীরে তদন্তের জন্য নবিজিকে ঘরের দাসীদের জিজ্ঞেস করতে বললেন। দাসীকে জিজ্ঞেস করা হলে সে বলল, ‘তাঁর মধ্যে আমি দোষের কিছুই দেখি না। কেবল এতটুকুই যে, তিনি আটার খামির করতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন, আর বকরী এসে আটার খামির সাবাড় করে যায়।’
নবিজি ভারাক্রান্ত মন নিয়ে সবার উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। বললেন, ‘হে লোকসকল! মানুষের কী হয়েছে? তাঁরা আমার পরিবার সম্পর্কে আমাকে কষ্ট দিচ্ছে। তাঁরা মিথ্যা বলছে আমার পরিবারের বিরুদ্ধে।’
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম এরপর আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু’র ঘরে যান। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘হে আয়েশা, লোকেরা কী বলাবলি করছে তা তো তোমার জানা হয়ে গেছে। তুমি আল্লাহকে ভয় করো। আর লোকেরা যেসব বলাবলি করছে তাতে লিপ্ত হয়ে থাকলে তুমি আল্লাহর নিকট তওবা করো। আল্লাহ তো বান্দার তওবা কবুল করে থাকেন।’
পরবর্তীতে আয়েশা রাদিয়ল্লাহু আনহা সে কষ্টের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে বলেন, ‘কসম আল্লাহর! তিনি আমাকে লক্ষ্য করে একথাগুলো বলার পর আমার চোখের অশ্রু সম্পূর্ণ শুকিয়ে যায়। তখন আমি বললাম, আমার সম্পর্কে যেসব কথা বলা হচ্ছে সে ব্যাপারে আমি কখনোই তওবা করব না। আমি যদি তা স্বীকার করি তবে আল্লাহ জানেন যে আমি নির্দোষ আর যা ঘটেনি তা স্বীকার করা হয়ে যাবে। আমি ইয়াকুব আলায়হিস সালামের নাম স্মরণ করতে চাইলাম। কিন্তু মনে করতে পারলাম না। তাই আমি বললাম, ইউসুফ আলায়হিস সালামের পিতা যা বলেছিলেন, তেমন কথাই আমি উচ্চারণ করব—‘আমার জন্য সবরে জামিলই (উত্তম) আর তোমরা যা বলছ সে ব্যাপারে আমি আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করছি।’ [সুরা ইউসুফ : ১৮]
নবিজির ওই বৈঠকেই আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহি নাজিল হলো আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা সম্পর্কে—
‘যারা মিথ্যা অপবাদ রটনা করেছে, তারা তোমাদেরই একটি দল। তোমরা একে নিজেদের জন্যে খারাপ মনে করো না; বরং এটা তোমাদের জন্যে মঙ্গলজনক। তাদের প্রত্যেকের জন্যে ততটুকু আছে যতটুকু সে গোনাহ করেছে এবং তাদের মধ্যে যে এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে, তার জন্যে রয়েছে বিরাট শাস্তি।
‘যারা পছন্দ করে যে, ঈমানদারদের মধ্যে ব্যভিচার প্রসার লাভ করুক, তাদের জন্যে ইহকাল ও পরকালে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।’ [সুরা নুর : ১১, ১৯]
রাসুলের ঠোঁটে ফুটে উঠল স্নিগ্ধ হাসির ঝিলিক। তিনি তা সবার সামনে তেলাওয়াত করলেন নতুন নাজিল হওয়া এই আয়াতগুলো।
আয়াত নাজিলের পর উম্মু রুমান অনেক খুশি হন। মেয়েকে বলেন, ‘আয়েশা, আল্লাহর রাসুলের শুকরিয়া আদায় করো।’ আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা তখন বুকভরা অভিমান নিয়ে বললেন, ‘আমি কখনোই তাঁর শুকরিয়া আদায় করব না। বরং যেই আল্লাহ তাআলা আমার পবিত্রতমা হওয়ার সাক্ষ্য দিয়েছেন, আমি কেবল তাঁরই শুকরিয়া আদায় করব।’

অসাধারণ গুণাবলি
নবিজির সাথে তাঁর দাম্পত্যজীবনের বয়স ছিল মাত্র নয় বছর। এই নয় বছর রাসুলের সান্নিধ্যে থেকে তিনি উচ্চ শিক্ষা ও বুৎপত্তি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কুরআন, হাদিস, তাফসির, ফিকহ ও ফতোয়া তথা ইসলামি শিক্ষার সব বিভাগেই তাঁর অগাধ জ্ঞান ছিল। কারণ তাঁর জানার আগ্রহ ছিল অপরিসীম। কোনো বিষয়ে খটকা লাগলে সাথে সাথে তিনি রাসুলকে প্রশ্ন করে জেনে নিতেন। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে তিনি ফতোয়া প্রদান করতেন। নামকরা সাহাবিগণ যাঁরা দীর্ঘদিন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সান্নিধ্যে থেকে জ্ঞান অর্জন করেছিলেন তাঁরাও ভুল-ভ্রান্তির শিকার হলে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে এসে মূল মাসআলা জানতেন এবং নিজেদের মতামত শুদ্ধ করে নিতেন।
তিনি অনন্য সব গুণ ও মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। তাঁর কারণে মুসলিম উম্মাহর জন্য আল্লাহ সহজ ও সুন্দর এক বিধান প্রণয়ন করেন। অপারগতার সময়ের জন্য তায়াম্মুমের বিধান। তিনি ছিলেন বীরাঙ্গনা। উহুদের যুদ্ধের ভয়াবহতার সময় নির্ভীক চিত্তে ময়দানে ঘুরে ঘুরে তিনি আহত মুজাহিদদের পানি পান করিয়েছেন।

বিরহের অকূল পাথারে
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার বয়স তখন আঠারো বছর। হিজরি ১১ সন। সফর মাস। নবিজির শরীর খুব খারাপ। প্রচণ্ড মাথাব্যথায় নবিজি কাতর। অসুস্থতায় নবিজি দুর্বল হয়ে পড়লেন। এই অসুস্থতা তাঁকে নিয়ে গেল মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে। এই অবস্থায়ও রাসুল স্ত্রীদের মধ্যে পালাবণ্টনের সমতা রক্ষা করতে চাইলেন। কিন্তু মায়মুনা রাদিয়াল্লাহু আনহার পালার দিন রাসুল পুরোপুরি শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন। বারবার বলতে লাগলেন, ‘আগামীকাল আমি কার ঘরে থাকব? আগামীকাল আমি কার ঘরে থাকব?’ সবাই বুঝলেন, রাসুল আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার ঘরে থাকতে চাইছেন। সবার সম্মতিতে নবিজিকে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার ঘরে আনা হলো। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত রাসুল তাঁর ঘরেই ছিলেন। নবিজির ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত তিনি রাসুলের সান্নিধ্যে ছিলেন। জীবনের শেষ মুহূর্তে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা রাসুলকে মিসওয়াক চিবিয়ে নরম করে দিয়েছেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা রাসুলের সুস্থতার জন্য দুআ করছেন। রাসুলের হাত তাঁর হাতের মধ্যে ছিল। নবিজি হঠাৎ তাঁর হাত সরিয়ে নিলেন এবং বললেন, ‘হে আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন। আমাকে সর্বশ্রেষ্ঠ বন্ধুর সাথে মিলিত করুন।’ তখনই তিনি বুঝে গেলেন নবিজি আমাদের থেকে বিদায় নিচ্ছেন। তিনি ভেঙে পড়লেন। নবিজির দিকে ঝুঁকে বললেন, ‘হে রাসুল, আপনার খুব কষ্ট হচ্ছে?’ নবিজি বললেন, ‘যত কষ্ট তত সওয়াব।’ তখন পর্যন্ত তিনি নবিজিকে ধরে রাখতে পেরেছিলেন। হঠাৎই খুব ভারি অনুভব হলো। চোখের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, চোখদুটো বন্ধ হয়ে গেছে। আস্তে করে কোলের উপর নবিজির মাথা রাখলেন। চোখের সামনে প্রিয়তমের বিদায় তাঁকে স্তব্ধ করে দিলো। অশ্রুঢল সামলাতে ব্যর্থ হয়ে নবিজির শয্যাপাশে বোবা কান্নায় আছড়ে পড়লেন। যে বয়সে আমাদের মেয়েরা বিয়ের পিঁড়িতে বসে সে বয়েসে তিনি বিধবা হয়ে গেলেন! কী যে যন্ত্রণার অনুভূতি! ভাষায় প্রকাশের সাধ্য কোথায়!

জীবন থেকে জান্নাতে
তারপর বাকিজীবন কাটিয়ে দিলেন ইসলামের সেবায়। রাসুলের ইন্তেকালের বছর দুয়েকের মাথায় তাঁর পিতা আবু বকর আস-সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু মারা গেলেন। ধৈর্যের পাহাড় হয়ে এ শোকও সামলে নিলেন।
আমিরে মুয়াবিয়ার শাসনামল পরিসমাপ্তির দুইবছর বাকি আছে আর। ৫৮ হিজরির রামাদান মাসে পৃথিবী আলোকিত করা মরুর উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো এই মহিয়সী নারী পাড়ি জমান পরপারে। প্রিয়তমের সাথে পুনরায় মিলিত হতে। মাওলার ডাকে সাড়া দিতে।
রাতের বেলা জান্নাতুল বাকিতে তাঁকে দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৬৬ বছর। তাঁর মৃত্যু সংবাদ শুনে উম্মুল মুমিনিন উম্মু সালামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, ‘আল্লাহর কসম, সকল মানুষের চাইতে সে আল্লাহর রাসুলের কাছে বেশি প্রিয় ছিল।’

তথ্যসূত্র
১. বুখারি
২. তিরমিযি
৩. সিয়ারু আলাম আন নুবালা
৪. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া
৫. আর রাহিকুল মাখতুম
৬. সিরাতে মুস্তফা
৭. তাবাকাতে ইবনে সাদ
৮. মুসলিম শরিফ
৯. আবু দাউদ
১০. যারকানি

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

হবিগঞ্জ, সিলেট

error: Content is protected !!