শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০

আব্বাস ইবনু আবদিল মুত্তালিব : প্রিয় নবির প্রিয় চাচা

0

নুতায়লার মেঘশুভ্র কপাল জুড়ে ফুটে উঠেছে চিন্তার রেখা। ছেলেটা যে এভাবে শিশুবয়সেই হারিয়ে যাবে, অমন কথা কখনও তাঁর চিন্তার চৌহদ্দিতেও আসেনি। ভীষণ দুশ্চিন্তার সাগরে সাঁতার কাটছিলেন তিনি, টুপ করে এক মিষ্টি ভাবনা রূপচাঁদার মতো ভেসে উঠল তার করোটিতে—আরে, রাব্বে কাবা তো আছেন! তিনিই সহায়। এই ভেবে তিনি কাবার মালিকের নামে মানত করলেন—যদি ছেলেকে ফিরে পান, কাবাকে জড়াবেন মিহি রেশমি গিলাফে।
একসময় তিনি ছেলেকে ফিরে পান, তখন তিনি তাঁর অঙ্গীকার পূরণ করেন।
শৈশবের হারিয়ে যাওয়া এই ছেলেটিই ছিলেন আব্বাস ইবনু আবদিল মুত্তালিব। তাঁর মা নুতায়লা-ই ইতিহাসে সর্বপ্রথম ব্যক্তি, যিনি কাবার দুধসাদা গায়ে জড়িয়েছিলেন রেশমি কালো গিলাফ [১]।

জন্ম ও বংশপরিচয়
আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু’র উপনাম আবুল ফজল। পিতা আবদুল মুত্তালিব। পিতামহ আবদু মানাফ। জন্ম ৫৬৮ ঈসায়ি সনে। আসহাবে ফিলের ঘটনার বছর তিনেক আগে [২]।
তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সম্মানিত চাচা। রাসুলের দুবছরের বড়। দীর্ঘদেহী ও ধবধবে ফর্সাবরণের ছিলেন। ছিলেন দশ ছেলের জনক। তাঁর কিছু অসাধারণ গুণ তাঁকে করে তুলেছিল অনন্য।
খুব বিচক্ষণ ও গভীর জ্ঞানের আধার ছিলেন। আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা, অভাবীকে সাহায্য করা ছিল তাঁর চিরাচরিত অভ্যাস।

ইসলামপূর্ব জীবন
আব্বাস ইবনু আবদিল মুত্তালিব ছিলেন একজন অভিজাত ব্যক্তিত্ব। আজন্ম আভিজাত্যের সাথেই তাঁর ওঠাবসা। বনেদি কুরাইশ বংশের সন্তান। রক্তে তাঁর মিশে ছিল বদান্যতা, পরোপকার ও মানবসেবা। তাই ইসলাম ও জাহেলি—উভয় যুগেই তিনি ছিলেন সম্মানের দৌড়ে শীর্ষ সীমান্তস্পর্শী।
জাহেলি যুগেই তিনি ছিলেন কুরাইশদের গোত্রপতি। কাবা ঘরের রক্ষণাবেক্ষণ ও হজের মৌসুমে বাইতুল্লাহর মুসাফিরদের পানি পানের ব্যবস্থা করা ছিল তাঁর দায়িত্ব [৩]।
তিনি যখন পূর্বসূরিদের ধর্মের শিকড় আঁকড়ে ছিলেন, তখনও ছিলেন মহানবির পরম হিতৈষী। যার প্রমাণ বহন করে আকাবার ঐতিহাসিক দ্বিতীয় বাইআতের ঘটনা। নবমুসলিমদের উপর কুরাইশ নেতাদের নিগ্রহের জগদ্দল পাথর যখন শক্তভাবে গেড়ে বসেছিল, তখন মদিনার কিছু সম্ভ্রান্ত লোক নবিজিকে হিজরত করার প্রস্তাব দেন। নবিজি তাঁদের সাথে হজের সময় মিনায় পরামর্শ-বৈঠক করেন। তখন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘হে মদিনাবাসী! আমাদের কাছে মুহাম্মদের মর্যাদা কতটুকু, তা তোমরা জানোই! আমরা এতদিন তাঁকে শত্রুদের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করে এসেছি। এখন তিনি তোমাদের কাছে যাবেন। যদি তোমরা তাঁকে রক্ষা করার অঙ্গীকার করতে পারো, তাহলে তাঁর দায়িত্ব গ্রহণ করো! নয়তো তিনি স্বগোত্র ও স্বদেশে ভালোই আছেন।
আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু’র অভিব্যক্তিই বলে দেয়, তিনি রাসুলের কতটা কল্যাণপ্রত্যাশী ছিলেন [৪]।

ইসলামগ্রহণ
কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, তিনি বদরযুদ্ধের পূর্বে ইসলামের ছায়াসুনিবিড় শ্যামলীতে ঠাঁই খুঁজে নিয়েছিলেন, কিন্তু মাতৃভূমি ছেড়ে হিজরতের অভিপ্রায় ব্যক্ত করে রাসুলের নিকট চিঠি লিখলে তিনি বলেন, ‘চাচা, আপনার জন্য মক্কায় থেকে যাওয়াই শ্রেয়। আপনিই হবেন সর্বশেষ মুহাজির, যেমন আমি সর্বশেষ নবি [৫]।’
তিনি ছিলেন ইসলামের জন্য নিবেদিতপ্রাণ। জীবন উৎসর্গ করে যাঁরা ইসলামের সুনীল আকাশে সকালের মিষ্টি রোদের কমলা রঙে সৌভাগ্যের চাঁদ এঁকেছেন, তিনি ছিলেন তাঁদের অন্যতম। কেননা, তিনি ইসলামের স্বার্থেই ইসলামগ্রহণের পরও সত্য গোপন করে কাফেরদের মাঝে অবস্থান করেছিলেন দীর্ঘকাল। এই সময়ে তিনি অতি সন্তর্পণে কাফেরদের গতিবিধি ও যুদ্ধপরিস্থিতি আগাম জেনে নিতেন এবং সঙ্গোপনে মহানবির কাছে দূত মারফত সবিস্তারে লিখে পাঠাতেন। শুভ্র কপোতের সোনালি ডানায় চড়ে আসা এসব সবুজসংকেত ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য কতটা উপকার বয়ে এনেছিল, তার সঠিক মূল্যায়নের কোনো ভাষা পৃথিবীর জানা নেই [৬]।
কোনো কোনো ইতিহাসবিদ অবশ্য এ মতও পোষণ করেছেন যে, তিনি খায়বার বিজয়ের পূর্বে ইসলামের স্বর্ণোদ্যানে বিশ্বাসের কিশলয় রোপন করেছিলেন এবং মক্কা বিজয়ের কিছুদিন পূর্বে মদিনায় হিজরত করে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তিনি তায়েফ অবরোধ, তাবুক অভিযান ও হুনাইনযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন [৭]।

মহানবির সান্নিধ্য
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে আপন পিতার মতো শ্রদ্ধা ও সমীহ করতেন। তাই তো তাঁর ব্যাপারে তিনি উচ্চারণ করেন মুক্তাঝরা সেই উক্তি—‘যে আব্বাসকে কষ্ট দেয়, সে আমাকে কষ্ট দেয়। কারণ, চাচা পিতৃতুল্য [৮]।’
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি সালামের ভালোবাসার পুষ্পিত আঙিনায় ছিল তাঁর অবাধ যাতায়াত। তাই নবিজি কখনও তাঁর দুঃখ সহ্য করতে পারতেন না। যখন তিনি বদরযুদ্ধে বন্দী হন, প্রথম রাতে রশির শক্ত বাঁধনে ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠেন। তাঁর গোঙানির শব্দে রাসুলের হৃদয়-সৈকতে বেদনার নীল ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে। দুচোখের পাতায় ঘুম নামে না তাঁর। সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করেন, ‘হে প্রিয় হাবিব! কেন আপনি নির্ঘুম জেগে আছেন?’ তিনি প্রত্যুত্তরে বলেন, ‘আব্বাসের আর্তনাদ আমার ঘুম কেড়ে নিয়েছে [৯]।’

সাহাবাদের মাঝে তিনি
সাহাবায়ে কেরামও তাঁকে খুব সম্মানের চোখে দেখতেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁর সাথে পরামর্শ করতেন। তাঁর মতামত গ্রহণ করতেন। এমনকি আবু বকরউমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা যদি কখনও ঘোড়ার পিঠে চড়ে তাঁর সামনে দিয়ে অতিক্রম করতেন, তাহলে তাঁর সম্মানার্থে নিচে নেমে আসতেন [১০]।
সাহাবাদের মাঝে তিনি কতটা সম্মানে ভূষিত ছিলেন, শুধু একটা ঘটনা থেকেই তা অনুমান করা যায়।
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু’র শাসনকাল। আরবের বুকে অগ্নিশ্বাস ছাড়ছে দুর্ভিক্ষ। গ্রীষ্মের খরতাপে পুড়ে জমিন শুষ্ক; রুক্ষ। বৃষ্টি-তৃষ্ণায় বালুকণাও কাতর। পরিস্থিতি ভয়াবহ দেখে ইহুদি ধর্মজ্ঞ কাব আহবার এলেন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু’র কাছে। বললেন, ‘পূর্বযুগে নবিদের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে বৃষ্টি-প্রার্থনা করা হতো।’ উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘আমরা নবিজির চাচার মাধ্যমে বৃষ্টি-প্রার্থনা করব।’ তা-ই হলো। আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু আল্লাহর কাছে বৃষ্টির জন্য আকুতিঝরা প্রার্থনা করলেন। মুনাজাত শেষ না হতেই পর্বতপ্রমাণ ছাইরঙা মেঘ আকাশ ঢেকে নিল। ঝুম ঝুম বৃষ্টিতে মরুবালুর তৃষ্ণাও নিবারণ হলো। অবিরাম বৃষ্টিতে পানি তখন দেয়াল ছুঁইছুঁই। মরুভূমির কোলে প্রাণ ফিরে এল। মরু-উপত্যকায় নেমে এল সজীবতা [১১]।

মৃত্যু
হিজরতের ৩২তম বর্ষের রজব বা রামাদানের ১২ তারিখ শুক্রবার তিনি ইহকাল ত্যাগ করে অনন্তের পথে পাড়ি জমান। তিনি জীবনের উদ্যানে বয়সের ৮৮টি ফুলবসন্ত উপভোগ করেন। তাঁর বয়স-বৃক্ষ ইসলামপূর্ব যুগে ৫৬টি এবং ইসলামপরবর্তী যুগে ৩২টি শাখা-বিশাখা ছড়ায়। জান্নাতুল বাকিতে মাটির কুটিরে তিনি শায়িত হন [১২]।

ইসলামের জন্য তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। ইতিহাসের ধূসর পাতায় স্বর্ণে খোদাই করে লেখা থাকবে তাঁর নাম। আল্লাহ তাআলা তাঁর কবরকে স্বর্গীয় দ্যুতিতে দ্যোতিত করে দিন। আমিন।

টীকা
[১] উসদুল গবাহ ফি মারিফাতিস সাহাবাহ, পৃষ্ঠা—৬৩২, ইবনুল আসির, দারু ইবনি হাযম।
[২] তারিখু দিমাশক, ২৬/২৭৮, ইবনু আসকারি।
[৩] উসদুল গবাহ ফি মারিফাতিস সাহাবাহ, পৃষ্ঠা—৬৩২, ইবনুল আসির, দারু ইবনি হাযম।
[৪] সিরাতে ইবনে হিশাম, ১/৪৪১, আবদুল মালেক বিন হিশাম।
[৫, ৬] উসদুল গবাহ ফি মারিফাতিস সাহাবাহ, পৃষ্ঠা—৬৩২-৩৩, ইবনুল আসির, দারু ইবনি হাযম।
[৭] আল-ইসতিয়াব ফি মা’রিফাতিল আসহাব, পৃষ্ঠা—৮১২
[৮] জামে তিরমিযি, হাদিস নং—৩৭৫৮
[৯] উসদুল গবাহ ফি মারিফাতিস সাহাবাহ, পৃষ্ঠা— ৬৩২, ইবনুল আসির, দারু ইবনি হাযম।
[১০] আল-ইসতিয়াব ফি মারিফাতিল আসহাব, পৃষ্ঠা— ৮১৪
[১১] প্রাগুক্ত
[১২] উসদুল গবাহ ফি মারিফাতিস সাহাবাহ, পৃষ্ঠা— ৬৩৪, ইবনুল আসির, দারু ইবনি হাযম।

শেয়ার করুন
error: Content is protected !!