শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০

আবু দারদা : দুনিয়াবিরাগী আলেম সাহাবি

0

বাড়ি থেকে বেরিয়ে দোকানের দিকে ছুটছেন উয়াইমির ইবনুল মালিক আল-খাযরাজি। আবু দারদা নামেই যিনি বেশি পরিচিত। সহসা দেখতে পেলেন, মদিনার অলিগলি আজ লোকে লোকারণ্য। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সাহাবিরা বিজয়ী বেশে দলে দলে শহরে প্রবেশ করছেন। তাঁদের সামনে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে শৃঙ্খলিত কুরাইশ-বন্দীদের। বদরের গৌরবময় বিজয়ের আনন্দ আজ তাঁদের চোখেমুখে। মুসলমানদের এই অভাবনীয় বিজয় আর কুরাইশদের লাঞ্চনাকর অবস্থা মোটেও ভালো লাগল না আবু দারদার। তিনি মুসলমানদের থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলেন। অন্যদিনের তুলনায় আজ একটু সকাল করেই বেরিয়েছিলেন তিনি৷ ভোর সকালেই ঘুম থেকে উঠে গেলেন ঘরের সবচেয়ে উন্নত বেদীতে স্থাপিত মূর্তিটির দিকে। পরম ভক্তি সহকারে প্রণাম করলেন। মূর্তির গায়ে জড়িয়ে দিলেন উন্নতমানের রেশমি পোশাক, যা গেল-দিন ইয়ামানের এক ব্যবসায়ী তাঁকে হাদিয়া দিয়েছিলেন।
অতি মূল্যবান সুগন্ধিতে সুবাসিত করলেন মূর্তিটিকে। যে সুবাস এখনো ছড়াচ্ছে তাঁর শরীর থেকে।
আবু দারদা খাযরাজ গোত্রের এক যুবকের দিকে এগিয়ে গেলেন। নিজের অন্তরঙ্গ বন্ধু আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহার খবর জানতে চাইলেন তাঁর কাছ থেকে। খাযরাজি তরুণ জানালেন—‘বদরযুদ্ধে শত্রুদের বিরুদ্ধে চরম নৈপুণ্যতা প্রদর্শন করেছেন তিনি এবং অত্যন্ত বীরত্বের সাথে লড়াই করেছেন। প্রচুর গনিমতের মালসহ নিরাপদেই ফিরে আসছেন৷ আপনি তাঁর ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।’
আবু দারদা চিন্তামুক্ত হলেন। মুসলমানদের বিজয়ে খুশি না হলেও বন্ধুর খবর জেনে তিনি আনন্দিত বোধ করলেন। আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহার সাথে তাঁর বন্ধুত্ব সেই জাহেলি যুগ থেকেই। ইসলামের আবির্ভাব হলে আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা আশ্রয় নেন ইসলামের সুশীতল ছায়ায়। কিন্তু আবু দারদা স্বীয় বাপ-দাদার ধর্মের মায়া ত্যাগ করতে পারলেন। পৌত্তলিকতার ওপর অটল থাকলেন। ফলে দুজনের অবস্থান হয় ভিন্ন মেরুতে। তবে ধর্মের ভিন্নতা তাঁদের সম্পর্কে ফাটল ধরাতে পারেনি। তাঁদের সখ্যতা ও পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববন্ধন অটুট থাকে আগের মতোই।
আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা নিয়মিত খোঁজখবর রাখতেন প্রিয় বন্ধুর। তাঁকে ইসলামের শীতল ছায়ায় নিয়ে আসতে আপ্রাণ চেষ্টা চালাতেন৷ ইসলামের দাওয়াত দিতেন তাঁকে। শিরকের ছায়ায় কাটানো তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের জন্য খুবই ব্যথিত হতেন। আফসোস করতেন। আহ! যদি আবু দারদা বুঝত! ফিরে আসত কল্যাণের পথে…

***
আবু দারদার বাড়িতে হাজির হলেন আবদুল্লাহ ইবনু রওয়াহা রাদিয়াল্লাহু আনহু। বিশেষ এক উদ্দেশ্যে তাঁর আজকের আগমন। আবু দারদা বেখবর, কী ঘটতে চলেছে তাঁর বাড়িতে৷ তিনি তখনো নিজ দোকানে ব্যবসার তদারকি করছেন৷ মহাজনের আসনে বসে৷
বাড়ির দরজা খোলা পেয়ে ভেতরে ঢুকলেন আবদুল্লাহ ইবনু রওয়াহা রাদিয়াল্লাহু আনহু। আঙিনায় আবু দারদার স্ত্রীকে দেখতে পেলেন। সালাম ও কুশল বিনিময়ের পর বললেন—‘প্রিয়বন্ধু আবু দারদা কোথায়?’
উম্মু দারদা বললেন, ‘তিনি তো দোকানে গিয়েছেন। শীঘ্রই ফিরে আসবেন।’
আমি কি ভেতরে অপেক্ষা করতে পারি তার জন্য?’ জানতে চাইলেন আবদুল্লাহ।
উম্মু দারদা বললেন, ‘অবশ্যই।’
আবদুল্লাহ ইবনু রওয়াহা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বসার ব্যবস্থা করে দিয়ে আবু দারদার স্ত্রী চলে গেলেন ভেতর-ঘরে। ব্যস্ত হয়ে পড়লেন নিজ কাজকর্মে।
ঘরের ভেতর চুপচাপ বসে রয়েছেন আবদুল্লাহ ইবনু রওয়াহা রাদিয়াল্লাহু আনহু। হঠাৎ চুপিসারে এগিয়ে গেলেন আবু দারদার পূজার ঘরে। নিজের কাছে লুকিয়ে রাখা কুঠারটা বের করে ভেঙে ফেললেন মূর্তিটিকে আর বলতে লাগলেন—‘শুনে নাও, আল্লাহর সাথে যার ইবাদাত করা হয় তা বাতিল, তা মিথ্যা।’
কুঠারের আঘাতে মূর্তিটিকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে তিনি গৃহ ত্যাগ করলেন। কুঠারের আওয়াজ শুনে দৌড়ে এলেন উম্মু দারদা। মূর্তির নাজেহাল অবস্থা দেখে তাঁর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। তিনি চিৎকার করে বলতে লাগলেন—‘হে ইবনু রওয়াহা! তুমি আমাকে ধ্বংস করলে… হে ইবনু রওয়াহা! তুমি আমাকে ধ্বংস করলে…’

***
কিছুক্ষণ পর ফিরে এলেন আবু দারদা৷ মূর্তিগৃহের দরজায় দেখতে পেলেন উম্মু দারদা উচ্চস্বরে কাঁদছেন। ভয়ে তাঁর চোখমুখ রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘আপনার অনুপস্থিতে আপনার বন্ধু আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা এসেছিল। সে আপনার মূর্তির সাথে যা ইচ্ছে তাই করেছে।’
রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে ঘরে প্রবেশ করলেন আবু দারদা। মূর্তির বেহাল দশা তাঁকে পাগলপ্রায় করে তুলল। কিন্তু পরক্ষণেই নিভে গেল ক্রোধের অগ্নিশিখা। ঘটে যাওয়া বিষয়টা নিয়ে তিনি ভাবনার জগতে হারিয়ে গেলেন। তিনি ভাবলেন—যদি এ মূর্তির মাঝে কোনো কল্যাণ ও শক্তি থাকতে, তবে তা নিজ থেকেই কষ্ট-বেদনা দূর করত।
এই ভাবনা তাঁর ভেতরটাকে নাড়িয়ে দিল। তিনি ছুটে গেলেন আবদুল্লাহ ইবনু রওয়াহার কাছে। তাঁকে সঙ্গে নিয়ে হাজির হলেন রাসুলের দরবারে। ঈমানের নেয়ামতে ধন্য হলো তাঁর জীবন। শামিল হলেন পূণ্যবানদের কাতারে।

***
পল্লিবাসীর মধ্যে সর্বশেষ ইসলাম গ্রহণ করেন আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু৷ ইসলামগ্রহণের পর আল্লাহ ও রাসুলের প্রতি ছিল তাঁর অগাধ বিশ্বাস। ঈমানের নুর মিশে গিয়েছিল তাঁর রক্তবিন্দুতে। হারিয়ে যাওয়া কল্যাণের ব্যাপারে তিনি খুব অনুতপ্ত হতেন। তাঁর সাথিরা যে এগিয়ে গেছেন বহুদূর। দ্বীনের জ্ঞান অর্জনে তিনি যে তাঁদের তুলনায় বেশ পিছিয়ে। কুরআন মুখস্থ করা, কুরআনের মর্মবাণী উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে তাঁরা এগিয়ে রয়েছেন। তাছাড়া ইবাদত-বন্দেগি ও তাকওয়া-পরহেজগারিতেও তাঁদের সঞ্চয় তাঁর চেয়ে বেশি। ফলে তাঁদের সওয়াবের পাল্লাও বহুগুণ ভারী। সব মিলিয়ে আল্লাহর দরবারে তাঁর চেয়ে তাঁদের মর্যাদা অনেক বেশি। এই আত্মোপলব্ধি আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে খুব ব্যথিত করল। তিনি দৃঢ় সংকল্প করলেন রাত-দিন কঠোর পরিশ্রম করে তিনি সেই শূন্যতা পূরণ করবেন। মেহনত-মুজাহাদার মাধ্যমে তাঁর সাথিদের কাতারে শামিল হবেন৷ বরং তাঁদের চেয়েও এগিয়ে যাবেন বহুদূর।
তাই দুনিয়াত্যাগী হয়ে আল্লাহর ইবাদাতে মগ্ন হয়ে পড়লেন৷ দ্বীনের জ্ঞান অর্জনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন তৃষ্ণার্ত ব্যক্তির মতো। কুরআন মুখস্থ ও এর মর্মার্থ অনুধাবনে আত্মনিয়োগ করলেন। তবে যখন দেখলেন, ব্যবসা তাঁর ইবাদাত-বন্দেগিতে একাগ্রতা বিনষ্ট করছে, প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে জ্ঞান অর্জনে, তখন তিনি নির্দ্বিধায় ব্যবসা ছেড়ে দিলেন।
এ ব্যাপারে কেউ তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘রাসুলের সঙ্গে ইসলামের প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ হওয়ার পূর্বে আমি ছিলাম একজন ব্যবসায়ী। ইসলামগ্রহণের পর আমি ইবাদাত ও ব্যবসা একসঙ্গে দুটোই চালাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি৷ তাই ব্যবসা ছেড়ে ইবাদাতে আত্মনিয়োগ করি।’
তিনি বলেন, ‘সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আবু দারদার প্রাণ! আজ তো আমার মনের আকুতি এমন, যদি মসজিদে নববির দরজায় আমার একটি দোকান হয়, তাতে জামাতের সাথে সকল নামাজ আদায় করার পাশাপাশি প্রতিদিন ৩০০ স্বর্ণমুদ্রা লাভ হয় তবুও একাগ্রতার সাথে জ্ঞানার্জন করা ও অধিক পরিমাণ ইবাদাত করা আমার কাছে এই দোকানের চেয়ে হাজারগুণ বেশি প্রিয়।’

***
আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু শুধু ব্যবসা ছেড়েছিলেন তাই নয়, দুনিয়ার মোহমায়া আর শোভা-সৌন্দর্যও ত্যাগ করেছিলেন মহান রবের সন্তুষ্টির জন্য। ভোগ-বিলাসহীন অতি সাধারণ জীবনযাপনকেই তিনি বরণ করে নিয়েছিলেন।
একবারের ঘটনা৷ কনকনে শীতের রাত। কিছু লোক মেহমান হলেন তাঁর বাড়িতে। তিনি অতিথিদের আপ্যায়নে গরম খাবার পরিবেশন করলেন৷ তবে শীত নিবারণের জন্য লেপ বা কম্বলজাতীয় কোনো শীতবস্ত্র দিতে পারলেন না৷ মেহমানরা পরস্পর বলাবলি শুরু করলেন—এই শীতের রাতে লেপ-কম্বল ছাড়া রাত কাটাবে কী করে?
নিরুপায় হয়ে তাদের একজন আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু’র ঘরের দরজায় দাঁড়ালেন। দেখলেন, আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু শুয়ে আছেন৷ পাশে তাঁর স্ত্রী। হাড়কাঁপানো শীতেও কোনো লেপ-কম্বল, পাতলা একখানা কাপড় রয়েছে দুজনের গায়ে। লোকটি আশ্চর্য হয়ে আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে প্রশ্ন করলেন, ‘এ কী! আপনারাও দেখছি আমাদের মতোই রাত কাটাচ্ছেন। আপনাদের পোষাক ও সামানপত্র কোথায়?’
আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘এ বাড়ি ছাড়াও আমাদের আরও একটি বাড়ি আছে। এ বাড়িতে যখনই কোনো সামান-পত্র জমা হয়, সঙ্গে সঙ্গেই ঐ বাড়িতে পাঠিয়ে দিই। যদি আমাদের কিছু থাকতই তাহলে আপনাদের অবশ্যই দিতাম। সে বাড়ির পথ বড় দূর্গম। কণ্টকাকীর্ণ। বোঝা নিয়ে সে পথ পাড়ি দেওয়া বড় কঠিন। বোঝাহীন পথিকের জন্য তা তুলনামূলক সহজতর। তাই বোঝাহীন থাকতেই পছন্দ করি। যেন সে পথ পাড়ি দেওয়াটা আমাদের জন্য সহজ হয়। আশা করি বুঝতে পেরেছেন আমার কথাগুলো।’
মেহমান বললেন, ‘জি হ্যাঁ, খুব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছি এবং খুবই মূল্যবান উপদেশ লাভ করেছি। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন৷

***
দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু’র তাঁর শামনামলে আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে সিরিয়ার গভর্নর হওয়ার প্রস্তাব দেন। কিন্তু তিনি বিনয়ের সাথে খলিফার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। খলিফা পিড়াপিড়ি করতে থাকলে তিনি বলেন, ‘যদি আপনি সন্তুষ্ট থাকেন যে, আমি তাদের ইমামতি করব এবং তাদেরকে কুরআন-হাদিস ও রাসুলের সুন্নাহ শিক্ষা দেবো তবে আমি যেতে রাজি আছি।’
খলিফা সম্মতি দিলে তিনি সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। দামেস্ক পৌঁছুলে তিনি দেখলেন, সেখানকার লোকেরা ধন-সম্পদ আর ঐশ্বর্যের মায়াজালে আবদ্ধ। আরাম-আয়েশ আর ভোগ-বিলাসে মত্ত। তাদের ঈমানের এই অধঃপতন প্রত্যক্ষ করে তিনি সকলকে মসজিদে জড়ো হতে বলেন। সমবেত জনতাকে লক্ষ করে দরদভরা কন্ঠে হৃদয়-নিংড়ানো ভাষায় বললেন—
‘হে প্রিয় দামেস্কবাসী, ইসলামের কারণে আমরা একে অন্যের দ্বীনি ভাই। প্রতিবেশী বন্ধু। দুশমনের মুকাবেলায় একে অপরের সাহায্যকারী।
‘আমার বন্ধুরা, আমি আপনাদের একজন হিতাকাঙ্ক্ষী ও উপদেশদাতা। খলিফার নির্দেশেই আমার এখানে আগমন৷ আমি আপনাদের কাছে কোনো পারিশ্রমিক চাই না। আশা করি আমাকে আপনাদের হিতাকাঙ্ক্ষী ভাবতে ও আমার উপদেশ মেনে চলতে আপনাদের কোনো আপত্তি থাকবে না৷
‘আমি খুবই আশ্চর্য হচ্ছি যে, আপনাদের মধ্যকার আলেমগণ ইন্তেকাল করছেন। সমাজ আলেমশূন্য হয়ে পড়ছে। অথচ আপনাদের মধ্যে দ্বীনের জ্ঞান শেখার কোনো গরজ নেই। আপনারা উলামাবিমুখ হয়ে পড়ছেন।
‘এটা কেমন কথা, যেই নেয়ামত দেওয়ার দায়িত্ব আল্লাহ পাক নিজে নিয়েছেন, তা হাসিল করার জন্য আপনারা সর্বশক্তি ব্যয় করছেন। হণ্যে হয়ে ঘুরছেন রিজিকের পিছনে। অথচ যা হাসিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (ঈমান, আমল ও উন্নত চরিত্র) তা সম্পর্কে আপনারা বিলকুল বেখবর।
‘কেন এত অঢেল সম্পদ সঞ্চয় করছেন যা কখনোই শেষ করে যেতে পারবেন না!
‘কেন সুরম্য প্রাসাদ আর অট্টালিকা বানাচ্ছেন যাতে চিরকাল থাকতে পারবেন না!
‘কেন এত স্বপ্ন দেখছেন যেই স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে!
‘আপনাদের পূর্বেও বহু জাতি এ পৃথিবীতে এসেছিল। তারাও পুঞ্জিভূত করেছিল অঢেল সম্পদ, বানিয়েছিল বড় বড় অট্টালিকা৷ যা আজ ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে।
‘পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী জাতি ছিল আদ সম্প্রদায়। কোথায় তাদের সেই জনবল, ধন-সম্পদ আর শ্রেষ্ঠত্বের গর্ব! সব আজ ধ্বংসস্তুপে পরিণত। কেউ কি দুই দিরহামেও তা ক্রয় করতে রাজি হবে?’

উপস্থিত জনতা তাঁর হৃদয়গ্রাহী বক্তব্যে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ল। অঝোরে কাঁদতে লাগলে সবাই। যে কান্নার আওয়াজ মসজিদ ছাড়িয়ে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে তুলল।

***
সেদিন থেকে আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু দামেস্কের অলিগলিতে ঘুরে বেড়াতেন। মানুষের সমাবেশস্থলে যেতেন। হাটে-বাজারে ঘুরতেন। কেউ প্রশ্ন করলে তার উত্তর দিতেন। অজ্ঞ ব্যক্তিকে দ্বীনের জ্ঞান শিক্ষা দিতেন। গাফেলকে সতর্ক করতেন। প্রতিটি সুযোগকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করতেন। যেন একটা মুহূর্তও বেকার না যায়।
একদিনের ঘটনা। একদল যুবক আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু’র কাছে এসে বলল, ‘হে রাসুলের সাহাবি, আমাদের কিছু নসিহত করুন।’
তিনি বললেন, ‘বেটা! তোমাদের সুখের দিনগুলোতে আল্লাহকে স্মরণ করো। তাহলে তোমাদের দুঃখের দিনগুলোতে তিনি তোমাদের স্মরণ করবেন।
‘বৎস! তোমরা আলেম হও। অথবা তালিবুল ইলম (জ্ঞান অন্বেষণকারী) হও। কিংবা আলেমদের সান্নিধ্যে গমন করো। তাঁদের কথা মন দিয়ে শোনো। চতুর্থজন (অজ্ঞ ও মূর্খ) হয়ো না, হলে বরবাদ হয়ে যাবে।
‘বেটা! মসজিদকে নিজের ঘরে বানাবে৷ কেননা আল্লাহর নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “প্রত্যেক খোদাভীরু ও মুত্তাকি ব্যক্তির ঘর হলো মসজিদসমূহ।”’

***
আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু দামেষ্কে অবস্থানকালে কন্যা দারদার জন্য দামেস্কের শাসক মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু নিজ পুত্র ইয়াযিদের বিবাহের প্রস্তাব পাঠালেন। তিনি ভাবলেন, আবু দারদা আনন্দচিত্তেই তাঁর প্রস্তাব গ্রহণ করবেন। কিন্তু আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু তা প্রত্যাখান করলেন। অতি সাধারণ পরিবারের একজন দ্বীনদার, চরিত্রবান ছেলের সাথে নিজ কন্যার বিবাহ দিয়ে দিলেন।
লোকমুখে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়লে কৌতূহলবশত একজন প্রশ্ন করে বসল, ‘আপনি এমনটি কেন করলেন?’
তিনি জবাব দিলেন, ‘আমার মেয়ের দ্বীন ও দুনিয়ার কল্যাণের কথা ভেবেই এমনটি করেছি।’
লোকটি হতবাক হয়ে জানতে চাইল, ‘গভর্নরের ছেলের সাথে বিবাহে কি কল্যাণ ছিল না?’
তিনি সোজাসাপ্টা উত্তর দিলেন, ‘আমি আমার মেয়েকে অর্থ-কড়ি আর দুনিয়ার চাকচিক্যের পরিবর্তে মুক্ত জীবনযাপনের শিক্ষায় গড়ে তুলেছি। সেই সুরম্য অট্টালিকা, অসংখ্যা দাস-দাসী আর বিলাসিতার পৃথিবীতে তার দ্বীনদারির কী অবস্থা হবে?’

***
একদা খলিফাতুল মুসলিমিন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু গোপনে সিরিয়া সফরে বের হলেন। আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু’র খোঁজ নেওয়ার উদ্দেশ্যে রাতের বেলায় চুপিসারে হাজির হলেন তাঁর বাড়িতে। দরজার কড়ায় হাত দিয়ে বুঝতে পারলেন দরজা আটকানো হয়নি। ভেতরে গাঢ় অন্ধকার। কোথাও আলোর ব্যবস্থা নেই। কোনো আগন্তুকের উপস্থিতি টের পেয়ে এগিয়ে এলেন আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু। খলিফাকে চিনতে পেরে স্বাগত জানালেন।
একত্রে বসে গল্প করছেন আল্লাহর নবির প্রিয় দুই সাহাবি। ঘরের চতুর্দিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। তেলের অভাবে আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু’র ঘরে বাতি জ্বালানো হয়নি। ফলে একে অপরের চেহারাও দেখতে পাচ্ছিলেন না। হঠাৎ উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু’র মনে কৌতূহল জাগল। আবু দারদার বালিশ কেমন তা বুঝতে নেড়েচেড়ে দেখলেন, তাঁর কোনো বালিশই নেই। ঘোড়ার পিঠে ব্যবহৃত মোটা কাপড়কেই তিনি রাতের বেলা বালিশ হিসেবে ব্যবহার করছেন। বিছানায় হাত দিয়ে দেখলেন গুড়িগুড়ি পাথর আর বালির তোষকই তিনি বিছানা হিসেবে ব্যবহার করছেন। লেপ-তোষক বলতে পাতলা একখানি চাদর। যা এই কনকনে শীতে একেবারেই অনুপোযোগী।
তিনি হতবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আবু দারদা, আমি কি আপনার প্রয়োজনীয় ভাতার ব্যবস্থা করিনি? এবং তা সময়মতো আপনার কাছে পাঠাইনি? তারপরও কেন এই করুণ অবস্থা? আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন।’
আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘খলিফাতুল মুসলিমিন, আপনার কি স্মরণে নেই আল্লাহর রাসুল কী বলেছিলেন? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “দুনিয়ায় তোমাদের ধন-সম্পদ যেন একজন মুসাফিরের সামানার চেয়ে বেশি না হয়।”’
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘হ্যাঁ, তিনি বলেছিলেন।’
আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘তাহলে আমরা কী করছি?’
এ কথা শুনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু অঝোরে কাঁদতে থাকলেন। আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহুও কাঁদতে থাকলেন। এভাবে কান্নারত অবস্থায়ই রাত শেষ হয়ে গেল।

***
জীবনের অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত দামেস্কবাসীর প্রতি আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর নসিহতের ধারা অব্যাহত রাখেন। তাদের কুরআন ও সুন্নাহর জ্ঞান দান করেন।
মৃত্যুশয্যায় তাঁর সাথিরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি কীসের ভয় করছেন?’
তিনি বললেন, ‘আমি আমার গুনাহ সমূহের ভয় করছি।’
তাঁরা জানতে চাইলেন, ‘আপনি কীসের আশা করছেন?’
তিনি জবাব দিলেন, ‘আমি আমার রবের ক্ষমার আশা করছি।’
অতঃপর তিনি লোকদের কালিমার তালকিন করার নির্দেশ দিলেন এবং কালিমা পাঠ করতে করতেই দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন।

তৃতীয় খলিফা উসমান ইবনু আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহু’র শাসনামলে হিজরি ৩২ সনে তিনি ইন্তেকাল করেন। দামেস্কের বাবুস সগিরের কাছে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

***
আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু’র ইন্তেকালের পর বিখ্যাত তাবেয়ি আউফ ইবনুল মালেক আল-আশজায়ি রহ. স্বপ্নে দেখলেন, একটি বিশাল বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ। তাতে রয়েছে সুবিশাল একটি গম্বুজ। এর চারপাশে অনিন্দ্য সুন্দর সারিবদ্ধ বকরির পাল। যা আগে কখনো দেখেননি। আউফ ইবনুল মালিক আল-আশজায়ি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এই নয়নাভিরাম সুন্দর সম্পদের মালিক কে?’
তাঁকে জানানো হলো, এর মালিক আবদুর রাহমান ইবনু আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু।
কথাবার্তা শেষ হলে সেই চামড়ার গম্বুজ থেকে আবদুর রহমান ইবনু আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘হে ইবনুল মালেক! আল্লাহ আমাকে এইসব সম্পদ দান করেছেন কুরআনের বিনিময়ে। তুমি যদি এই পথ ধরে যাও তবে এমন কিছু দেখবে, যা কোনো চোখ আগে কখনো দেখেনি৷ এমন কিছু শুনবে, যা কোনো কান কোনোদিন শুনেনি। এমন কিছু ভাববে, যা কোনো হৃদয় কখনো ভাবেনি।
তিনি জানতে চাইলেন, ‘ওইসব সম্পদ কার?’
আবদুর রাহমান ইবনু আউফ বললেন, ‘আল্লাহ তাআলা আবু দারদা’র জন্য তা প্রস্তুত করেছেন। কেননা তিনি দুহাত দ্বারা দুনিয়াকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

তথ্যসূত্র
১. সুয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবা—৩/৯৫-১০০
২. আল ইসাবাহ—৩/৪৫
৩. উসদুল গাবাহ—৪/১৫৯
৪. হিলইয়াতুল আউলিয়া—১/৩০৮
৫. আল-কাওয়াকিবুদ দুররিয়্যাহ—১/৪৫
৬. হুসনুস সাহাব—২১৮
৭. সিফাতুস সাহাবাহ—১/২৫৭
৮. তবাকাতে ইবনে সাআদ ২/৩৯৩
৯. উসদুল গাবাহ ৫/১৮৬

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

error: Content is protected !!