শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০

আবদুল্লাহ ইবনু যুবাইর : জালেমের কাছে অপরাজিত সাহাবি

0

আবদুল্লাহ। ইসলামে দুটি শ্রেষ্ঠ নামের একটি। মহান রবের কাছে অতিপ্রিয় এই নাম। ইসলামের সোনালি সময়ের কয়েকজন খ্যাতনামা সাহাবির নাম আবদুল্লাহ। তাঁদেরই একজনের গল্প বলব আজ।
আজ আমরা এমন একজন আবদুল্লাহ’র গল্প বলব যিনি জন্মের পূর্বেই হিজরতের সম্মান লাভ করেছেন। মায়ের পেটে, মায়ের সাথে সোনার মদিনায় হিজরত করেছেন। মুহাজির হবার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সার্বক্ষণিক সহচর যুবাইর ইবনুল আওয়াম রাদিয়াল্লাহু আনহুর ছেলে তিনি, ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু’র নাতি। আসমা বিনতু আবি বকর রাদিয়াল্লাহু আনহা’র নাড়ি-ছেঁড়া ধন।

জন্ম ও বেড়ে ওঠা
আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহা’র বিবাহ হয় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের ফুফাতো ভাই যুবাইর ইবনুল আওয়াম রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে। তিনি যখন সন্তান-সম্ভবা হন তখন হিজরতের ডাক আসে। মহান এই যাত্রায় অংশ নেন সন্তান-সম্ভবা আসমা। হিজরতের পরে কুবায় থাকাকালীন তিনি জন্ম দেন ইতিহাসের এই বীর-সাহাবি আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে।
জন্মের পরে তাঁকে নবিজির দরবারে নিয়ে যাওয়া হয়। নবিজি আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে নির্দেশ দেন আবদুল্লাহ’র দুই কানে আজান ও ইকামত দিতে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম নিজে খেজুর চিবিয়ে নরম করে শিশু আবদুল্লাহ’র কচি মুখে দেন। নবিজির পবিত্র লালা-মিশ্রিত খেজুর-চূর্ণ হয় তাঁর প্রথম আহার। আহ, কত না সৌভাগ্য তাঁর!
আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু নবিজির বড্ড আদরের ছিলেন। ছেলেবেলা থেকেই তিনি নবিজির সান্যিধ্য লাভ করেছেন। তাঁর খালা উম্মুল মুমিনিন আয়েশা আস-সিদ্দিকাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা’র ঘরে থাকতেন অধিকাংশ সময়। নবিজি পরম স্নেহে হাত বুলিয়ে দিতেন তাঁর শরীরে, মাথায়।
রাসুলের আমল তিনি ছেলেবেলা থেকেই খুব কাছ থেকে দেখেছেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের পবিত্র জবান থেকে শুনেছেন বহু হাদিস।

ইবাদাত
ইবাদাতে তিনি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। গভীর নিমগ্নতার সাথে সালাত আদায় করতেন। সালাতে রবের স্মরণে এমনই মগ্ন হতেন যে, রুকু-সেজদার সময় পাখিরা তাঁর কাঁধে বসে পড়ত। একবার তাঁর বুক ও দাড়ির মাঝখান দিয়ে পথর নিক্ষেপিত হয়, কিন্তু তিনি টেরই পাননি। সালাতের ধ্যান তাঁর বিন্দুমাত্রও ভঙ্গ হয়নি।
তাঁর সাথে আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর মাসআলাগত ইখতিলাফ ছিল তবু তিনি তাঁকে যে শব্দে মূল্যায়ন করেছেন তা অবিস্মরণীয়।
ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু’র কাছে তাঁর ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন—‘আবদুল্লাহ (ইবনু যুবাইর) ছিলেন কারি, সুন্নাহর একনিষ্ঠ অনুসারী। মহান রবের একান্ত অনুগত বান্দা। রবের ভয়ে গ্রীষ্মের প্রচণ্ড খড়ায়ও তিনি রোজা রাখতেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সহচর আবু বকরের কলিজার টুকরো নাতি। আসমা বিনতু আবি বকর যাঁর মা, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের প্রিয়তমা স্ত্রী আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা যাঁর খালা তাঁর ব্যাপারে ওই ব্যাক্তিই অজ্ঞ থাকতে পারে যাকে আল্লাহ অন্ধ বানিয়ে রেখেছেন।’

বীরত্ব ও সাহসিকতা
আবদুল্লাহ ইবনু আবি সারাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু’র নেতৃত্বে তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। দুই লক্ষ রোমক সৈন্যের বিরাট বাহিনীর বিপরীতে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল মাত্র বিশ হাজার। সেই বিশ হাজারের ক্ষুদ্র বাহিনীতে যোগ দেন অকুতোভয় এই বীর। যুদ্ধের তীব্রতার মধ্যেও বুক টান করে ঢুকে পড়েছেন কাফের বাহিনীর ভেতরে। কাফের সেনাপতি জারজারিরের মস্তক দ্বিখণ্ডিত করে মুসলিমদের বিজয় সুনিশ্চিত করেছেন।
সিরীয় সেনাপতি হুসাইন ইবনু নুমায়ের তাঁকে খলিফা হবার প্রস্তাব দিলে তিনি স্পষ্ট ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেন। ক্ষমতার প্রতি তাঁর বিন্দুপরিমাণ লোভ ছিল না। তিনি আল্লাহর জমিনে আল্লাহর কালেমা বুলন্দ করতে, ইসলামের পতাকা উড্ডীন করতে যুদ্ধ করতেন। আল্লাহর শত্রুকে দুনিয়া থেকে বিতাড়িত করতে শত্রুবাহিনীর উপর বীর-বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়তেন।

শাহাদাতের শরাবান তহুরা
অতঃপর ইয়াযিদের মৃত্যুর পর যখন তার অল্পবয়সী পুত্র মুআবিয়া ইবনু ইয়াযিদ সিংহাসনে বসে, সিরীয় বাহিনী হিজাজের ভূমি থেকে চলে যায়। আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু তখন হিজাজ, দক্ষিণ আরব, খুরাসান, ইরাক ও মিশরসহ সিরিয়ার বেশ কিছু অংশের খলিফার স্বীকৃতি লাভ করেন। ওদিকে দামেস্কে ইয়াযিদপুত্র দ্বিতীয় মুআবিয়ার মৃত্যু হয়। সিংহাসনে বসে আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ান।
বাদশাহ আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ান আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু’র বিরুদ্ধে সৈন্য প্রেরণ করেন। উমাইয়ার কুখ্যাত সেনাপতি হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফ দীর্ঘ ছয় মাস খলিফা আবদুল্লাহ ইবনু যুবাইর রাদিয়াল্লাহু আনহু’র রাজধানী মক্কা নগরী অবরুদ্ধ করে রাখে। গোলা-বারুদ নিক্ষেপ করতে থাকে। এর ভেতরেই আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু সালাতে নিমগ্ন হয়ে যেতেন গভীর মনোনিবেশে। চারপাশের হৈচৈ-হট্টগোল তাঁর সালাতে বিঘ্ন ঘটাতে পারত না। হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফের সৈন্যরা মক্কা নগরী দখল করে নেয়। অত্যাচার-নিপীড়ন চালাতে থাকে।
পুরো মক্কায় দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষুধার্ত অসহায় মানুষের কান্নায় মক্কার আকাশ ভারি হয়ে ওঠে। ঘোর অন্ধকার নেমে আসে পবিত্র নগরী মক্কার প্রতিবেশে।
এমন পরিস্থিতিতে আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর মায়ের কাছে পরামর্শ চান। ‘মা, মক্কার তো এই দূরবস্থা। আমার সাথিরা সব একে একে শহিদ হয়ে যাচ্ছে, অল্পকজন আছে আমার সাথে। ওদিকে শত্রুরা আমার কোনো দাবি মানছে না। এখন আমি কী করব?’
অগ্নিগর্ভা মা দীপ্ত কণ্ঠে বললেন, ‘বেটা, তুমি যদি সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকো তাহলে তোমার সঙ্গীরা যা করেছে তুমিও তাই করো। তাদের মতো সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য লড়তে লড়তে শহিদ হয়ে যাও। আর যদি তুমি সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত না থাকো তাহলে তুমি বিরাট ভুল করেছ। শোনো বেটা, সত্য উপেক্ষা করে বেঁচে থাকার চেয়ে সত্য প্রতিষ্ঠায় প্রাণোৎসর্গ করা হাজার গুণে শ্রেষ্ঠ। তুমি বিজয়ী হলে তোমার বিজয়ে আমি আনন্দিত হব। খোদার শোকর করব। আর তুমি শাহাদাত বরণ করলে আমি সবর করব। যাও, আত্মোৎসর্গ করো, ফলাফল আল্লাহর হাতে।’
মায়ের এমন পরামর্শে তিনি যেন আরও শক্তিশালী ও সাহসী হয়ে উঠলেন। বললেন, ‘মা, আমার জন্য মহান রবের দরবারে দুআ করুন। আপনার সন্তান ভুল পথে নেই।’
এরপর তিনি হাজ্জাজ বাহিনীর সাথে মরণপণ যুদ্ধ করতে করতে শাহাদাতের শারাবান তহুরা পান করেন। নির্দয় সেনাপতি হাজ্জাজ তাঁর দেহ থেকে মাথা আলাদা করে আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ানের কাছে পাঠিয়ে দেয়। আর তাঁর দেহ শহরের বাইরে শূলিবিদ্ধ করে রাখে।
যে দেহে রাসুলের স্নেহের হাত পড়েছে, শত আদরের চিহ্ন লেগে আছে, সে দেহের অধিকারীকে ওরা নিষ্ঠুরভাবে শহিদ করেছে। আবু বকর আস-সিদ্দিকের হাজারও আদর ও চুমুর স্মৃতি লেগে আছে যাঁর সারা শরীরে, তাঁর শরীরকে ওরা অপমানিত করেছে। শূলিবিদ্ধ করে রেখেছে। কতটা নির্মম আর পাষাণ হৃদয় হলে মানুষ এমন করতে পারে।
হায় আবদুল মালিক, হায় হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফ!
ইতিহাস তাদের বর্বরাতার কথা, নির্মমতার কথা ভুলে যায়নি। আজও মানুষ তাদের ধিক্কার জানায়। অভিশাপ দেয় এই ঘৃণ্য আচরণের কারণে।
শহরের বাইরে তার লাশ শূলিবিদ্ধ হয়ে ঝুলে আছে। বয়সের ভারে ন্যূব্জ মায়ের কানে খবর পৌঁছুতেই ছুটে যান ছেলের লাশ দেখতে। বটবৃক্ষের মতো দৃঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন ছেলের মস্তকহীন দেহ। আহ, মায়ের মনে তখন কী ঝড় বয়ে যাচ্ছিল। পুত্রশোক কি তাঁকে স্পর্শ করেনি? করেছে। কিন্তু আল্লাহর রাস্তায় শহিদ সন্তানের দেহ দেখে সান্ত্বনা লাভ করেছেন। ধৈর্য ধারণ করেছেন। খোদার শোকর আদায় করেছেন।

হাজ্জাজ ছুটে এলো বৃদ্ধা আসমা বিনতে আবু বকরের কাছে। ‘মা, আবদুল মালিক ইবনু মারওয়ান আপনার সাথে সুন্দর আচরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। আপনার কি কিছু প্রয়োজন? আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।’
শোকাহত মায়ের বুক জ্বলে উঠল। তিনি জবাবে বললেন, ‘আমি তোমার মা নই, আমি তো ওই শূলিবিদ্ধ শহিদ সন্তানের জননী। তোমার কাছে চাইবার কিছু নাই আমার।’

রচনাটি রিজালুন হাওলার রাসুল অবলম্বনে লিখিত

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

রাজবাড়ি, ফরিদপুরের ছেলে। তরুণ লেখক। কওমি মাদরাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেছেন। ইসলামের ইতিহাস বিষয়ে তাঁর আগ্রহ প্রচুর।

error: Content is protected !!