শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০

আবদুর রাহমান ইবনু আউফ : সম্পদ ও দানশীলতায় অগ্রগামী সাহাবি

0

বদান্যতার পরাকাষ্ঠা :
নবম হিজরি। গ্রীষ্মকাল। তীব্র দাবদাহে বিপর্যস্ত আরবভূমি। ইতিমধ্যে এই মরুদেশের পানির পরিমাণ কমে গেছে ব্যাপকহারে। ফল পাকার মৌসুমও খুব নিকটে। কৃষকেরা অধীর অপেক্ষায় দিন গুণছে। এমন দুর্যোগপূর্ণ সময়ে একদিন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে খবর আসল, রোমানরা মদিনা আক্রমণের ফন্দি আঁটছে। তিনি সাহাবিদেরকে সাথে নিয়ে পরিকল্পনা করলেন, রোমানদেরকে মদিনা থেকে বহুদূর তাবুকে আটকে দেবেন। স্বাভাবিকতই সেটা ব্যয়বহুল, তাই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিদেরকে আল্লাহর রাস্তায় সম্পদ ব্যয় করার তাগিদ দিলেন। নিবেদিতপ্রাণ সাহাবিগণ প্রতিযোগিতা শুরু করলেন—কে কত দিতে পারেন। একেকজন দানের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করলেন। তাঁদের মধ্যে একজন সাহাবি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে আট হাজার দিরহাম নিয়ে আসলেন। তাঁর এই দান দেখে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘আমার মনে হচ্ছে সে গুনাহগার হয়ে যাচ্ছে। কারণ, আপন পরিবারের জন্য সে কিছুই রাখেনি।’ এ কথা শুনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বললেন, ‘তুমি পরিবারে জন্য কি কিছু রেখেছ?’ তিনি বললেন, ‘জি হ্যাঁ, তাদের জন্য এর চেয়ে অধিক ও উত্তম বস্তু রেখে এসেছি।’ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবার জানতে চাইলেন, ‘কত?’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল যত রিযিক, কল্যাণ ও প্রতিদানের ওয়াদা করেছেন, তত।’

কে এই মহৎপ্রাণ?
তিনি হচ্ছেন মুহাজির সাহাবি আবদুর রাহমান ইবনু আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু। সাহাবিদের মাঝে যিনি ছিলেন সবচেয়ে বড় ধনী এবং নেতৃস্থানীয়। আপন নামের কথা বলতে গিয়ে স্বয়ং বলেন, ‘আমার নাম ছিল আবদু আমর। যখন ইসলাম গ্রহণ করলাম, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নাম রাখলেন আবদুর রাহমান।’ তাঁর উপাধি আবু মুহাম্মদ। পিতার নাম আউফ ইবনু আবদি আউফ। মাতা আশ-শাফা বিনতু আউফ। পিতা বনু জাযিমার হাতে গুমায়সা নামক স্থানে নিহত হন। মা ইসলাম গ্রহণ করেন এবং হিজরত করেন।
তিনি কুরাইশ বংশের শাখা যুহরা গোত্রের লোক। এটা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মামাদের গোত্র। তাঁর বংশানুক্রম এরকম : আবদুর রাহমান ইবনু আউফ ইবনি আবদি ইবনিল হারেস ইবনি যুহরা ইবনি কিলাব। কিলাব থেকে তাঁর বংশ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বংশের সাথে মিলে গেছে। তাঁর ভাইবোন ছিলেন চারজন; আবদিল্লাহ ইবনু আউফ, আল-আসওয়াদ ইবনু আউফ, আতিকাহ বিনতু আউফ এবং হালাহ বিনতু আউফ। আবদুল্লাহ ইবনু আউফ ছিলেন কুরাইশদের অন্যতম একজন নেতা। তাঁর ছেলে তালহা ইবনু আবদিল্লাহ ছিলেন প্রসিদ্ধ তাবেঈ এবং মদিনার কাজি। আল-আসওয়াদ ইবনু আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন সাহাবি। মক্কা বিজয়ের পূর্বে তিনি মদিনায় হিজরত করেন। জঙ্গে জামালে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহুর পক্ষে শহিদ হন। তাঁর ছেলে জাবির ইবনুল আসওয়াদকে আবদুল্লাহ ইবনু যুবাইর রাদিয়াল্লাহু আনহু মদিনার গভর্নর নির্ধারণ করেন। আতিকাহ বিনতু আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু সাহাবিয়াহ ছিলেন। তিনি মায়ের সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁকে বিবাহ করেন সাহাবি মাখরামা ইবনু নওফল রাদিয়াল্লাহু আনহু। হালাহ বিনতু আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহাও সাহাবিয়াহ ছিলেন। তাঁকে বিবাহ করেন বিশিষ্ট সাহাবি বিলাল ইবনু রাবাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু।

জন্মগ্রহণ ও আকার-অবয়ব
আবদুর রাহমান ইবনু আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু মক্কায় হস্তিবাহিনী আক্রমণের দশ বছর পর হিজরতের ৪৩ বছর পূর্বে ৫৮১ ঈসায়িতে মক্কার তিহামা নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন দীর্ঘদেহী, চেহারা ছিল সুদর্শন, চোখ বড় বড়, দাড়ি পাতলা, তন্মধ্যে কয়েকটা শেষ বয়সে পেঁকেছিল। তাঁর ঘাড় ছিল লম্বা, হাতের তালু বিশাল এবং আঙ্গুল মোটা মোটা। উহুদের যুদ্ধে তিনি সামনের দুটি দাঁত হারান এবং এবং অধিক আঘাতের দরুণ তখন তাঁর এক পা খোঁড়া হয়ে যায়। জাহেলি যুগেও কখনো তিনি মদপান করেননি।

ইসলামের সুশীতল ছায়ায়
আবদুর রাহমান ইবনু আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন প্রথমসারির মুসলিমদের অন্যতম একজন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দারুল আরকামে প্রবেশের পূর্বে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর ইসলামগ্রহণের ঘটনা এরকম : আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন ইসলামগ্রহণ করলেন, তখন একরাতে তিনি তাঁর কাছের বন্ধুদের দাওয়াত করলেন। তাঁরা হলেন, উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু, সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহু, যুবাইর রাদিয়াল্লাহু আনহু, তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহু, উসমান ইবনু মাযউন রাদিয়াল্লাহু আনহু, আবু উবাইদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং আবদুর রাহমান ইবনু আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু। রাতে যখন মক্কার অলিগলি সুনসান হয়ে গেল, তখন তাঁরা আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু’র ঘরে আসলেন। কথাবার্তার ফাঁকে তিনি তাঁদেরকে ইসলামের কথা শুনালেন। বললেন, ‘তোমরা যেসব উপাস্যের ইবাদত কর; লাত, মানাত, উজ্জা ইত্যাদির, সেগুলো মূর্তি বৈ কিছুই নয়। সেগুলো কোনো উপকারও করতে পারে না, ক্ষতিও করতে পারে না। এই মহাবিশ্বে উপাস্য কেবল একজন আছেন। এখানকার সকল সৃষ্টি তাঁর। এখানে তাঁরই আদেশ চলে। তিনি তোমাদের থেকে একজন রাসুল তোমাদের মাঝে প্রেরণ করেছেন। যিনি সুসংবাদ দেন এবং সতর্ক করেন। যিনি দুনিয়ায় নেতৃত্ব ও কল্যাণ লাভের এবং আখেরাতে মুক্তি ও নেআমত হাসিলের পথ দেখান।’ তাঁরা এই কথাগুলো শুনে আশ্চর্য হয়ে গেলেন। বললেন, ‘কে সেই ব্যক্তি—যিনি এক আল্লাহর দাওয়াত দেন এবং আমাদের বাপদাদাদের বিরোধী পথ অনুসরণ করতে বলেন?’ আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘তিনি মুহাম্মদ ইবনু আবদিল্লাহ ইবনি আবদিল মুত্তালিব।’ তাঁরা বললেন, ‘আল্লাহর কসম! তিনি তো আল-আমিন (বিশ্বস্ত)। আমরা তাঁকে কখনো মিথ্যা বলতে শুনিনি। তাঁর কথা মেনেছে কে? আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘তিনজন। তাঁর স্ত্রী খাদিজা, তাঁর অল্পবয়স্ক চাচাতো ভাই আলি এবং আমি।’ এরপর আল্লাহ তাআলা তাঁদের সবার অন্তরে হোদায়তের আলো জ্বেলে দিলেন। সকলে ইসলামের সুশীতল আশ্রয়ে আশ্রিত হলেন।

দ্বীনের তরে হিজরত
যখন আবদুর রাহমান ইবনু আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু ইসলামগ্রহণ করলেন, বাকি মুসলিমদের মতো তাঁর উপরও মক্কার মুশরিকদের জুলুমের খড়গ নেমে আসে। হাটে-মাঠে সব জায়গায় তাঁকে হেয়প্রতিপন্ন করা হতে থাকে। শত অত্যাচারের পরও তিনি পাহাড়ে মতো অটল থেকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গ দিতে থাকেন। একপর্যায়ে কাফেরদের নির্যাতন সীমা অতিক্রম করলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদেরকে হাবশায় হিজরতের অনুমতি দেন। সেই অনুমতির ভিত্তিতে নবুওয়তের পঞ্চম বছরের রজব মাসে তিনি আরো দশজন সাহাবির সাথে উসমান ইবনু মাযউন রাদিয়াল্লাহু আনহু’র নেতৃত্বে হাবশায় চলে যান। সেখানে কিছুদিন থাকার পর ভুল তথ্যের ভিত্তিতে তিনি এবং আরো কয়েকজন সাহাবি মক্কায় ফিরে আসেন। মক্কায় এসে তথ্যের উল্টো দেখে অন্যান্যরা আবার হাবশায় ফিরে গেলেও তিনি গিয়েছিলেন কি না এটা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না।
এরপর যখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিগণকে মদিনায় হিজরতের অনুমতি দিলেন, তখন অন্যান্যদের মতো তিনিও সকল সহায়-সম্পত্তি মক্কায় রেখে সম্পূর্ণ ফকিরবেশে দ্বীনের তরে মদিনায় পাড়ি জমান। হিজরতের পর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সকল মুহাজির ও আনসার সাহাবিগণের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববন্ধন তৈরি করে দেন। সাদ ইবনুর রাবি’ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে তাঁর ভাই বানিয়ে দেন। তিনি সসম্মানে তাঁকে ঘরে এনে বলেন, ‘আনসারদের মাঝে আমি সবচেয়ে সম্পদশালী। আমি আমার সম্পদকে দুভাগ করলাম। তন্মধ্যে যে ভাগ আপনার কাছে ভালো মনে হয়, সে ভাগ নিয়ে নিন। আর আমার স্ত্রী আছে দুজন। তাদের মধ্যে একজনকে পছন্দ করুন, আমি তাকে আপনার জন্য তালাক দিয়ে দেবো।’ এ কথা শুনে আবদুর রাহমান ইবনু আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা আপনার সম্পদ ও পরিবারে বারাকাহ দান করুন। আমি আপনার কাছ থেকে কিছুই চাই না। আপনি কেবল আমাকে বাজারে নিয়ে চলুন।’ তিনি তাঁকে বাজারে নিয়ে গেলেন।
আবদুর রাহমান ইবনু আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু বাজারে ঢুকেন কয়েকটি দিরহাম ছাড়া সম্পূর্ণ নিঃস্ব অবস্থায়। কিন্তু ব্যবসায়ে তাঁর দক্ষতা ও পক্কতা ছিল। প্রথমে টুকটাক জিনিস দিয়ে ব্যাবসা শুরু করেন। ধীরে ধীরে তাঁর ব্যবসা বড় হতে থাকে। কিছুদিনের মধ্যে তিনি একপাল উটের মালিক হয়ে যান। এভাবে একপর্যায়ে তিনি সাহাবিগণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সম্পদশালী ব্যক্তি হয়ে ওঠেন। পরবর্তী সময়ে মক্কায় রেখে আসা ঘরবাড়ি কখনো ফেরত নেননি। সেখানে গেলে ঘরের দিকে ফিরেও তাকাতেন না। লোকেরা এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তর দেন, ‘ওগুলো আমি আল্লাহর জন্য ছেড়ে দিয়েছি।’
ব্যবসা করে মোহর দেওয়ার মতো সামর্থ্য যখন তাঁর হয়ে যায়, তখন তিনি এক নারীকে বিয়ে করে নেন। এরপর একদিন তিনি শরীরে জাফরান লাগানো অবস্থায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে যান। তাঁকে দেখে তিনি বলেন, ‘ব্যাপার কী?’ আবদুর রহমান রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘আমি বিয়ে করেছি।’ তিনি বলেন, ‘মোহর কত দিলে?’ আবদুর রহমান রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘খেজুর বিচির পরিমাণ স্বর্ণ।’ তখন তিনি বলেন, ‘ছাগল দিয়ে হলেও ওয়ালিমা করো।’

নবিজির সংস্পর্শে
নিঃসন্দেহে সকল সাহাবি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে তারকাতুল্য। কিন্তু কিছু কিছু সাহাবি আত্মত্যাগের নজির স্থাপন করে তাঁর কাছে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেন। তাঁদের মাঝে অন্যতম একজন আবদুর রাহমান ইবনু আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু। তিনি সেই দশজন সাহাবির একজন, যাঁদেরকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়াতেই জান্নাতের সুসংবাদ দেন। এর থেকেই অনুমিত হয়, রাসুল সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সংস্পর্শে থেকে তিনি কতটুকু উচ্চতায় পৌঁছান। তিনি বদরি সাহাবিগণের অন্তর্ভূক্ত ছিলেন—যাঁদের ব্যাপারে বলা হয়েছে, ‘তোমরা যাচ্ছেতাই করো, আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিলাম।’ একবার তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে অভিযোগ করেন। তখন তিনি বলেন, ‘হে খালিদ, তুমি এমন ব্যক্তিকে কষ্ট দিয়ো না, যে বদরি। কারণ, তুমি যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণও আল্লাহর রাস্তায় খরচ করো, তবুও তুমি তাঁর আমলের সমপর্যায়ে পৌঁছাতে পারব না।’ আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু একবার কোনো এক কথার উত্তরে তাঁকে বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, আপনি জমিনবাসীর মাঝেও বিশ্বস্ত, আসমানবাসীর মাঝেও বিশ্বস্ত।’ তাবুক যুদ্ধের সময় একদিন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর পেছনে নামাজ পড়েন। নামাজ শেষে বলেন, ‘কোনো নবিই তাঁর উম্মতের একজন নেককার ব্যক্তির পিছনে নামাজ পড়ার পূর্বে ইন্তেকাল করেননি।’ একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট কোমল কণ্ঠের এক লোক তিলাওয়াত করে। তার তিলাওয়াত শুনে উপস্থিত সবাই কেঁদে দেন। কিন্তু আবদুর রাহমান ইবনু আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু কাঁদেননি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটা দেখে বলেন, ‘যদি আবদুর রাহমান ইবনু আউফের চোখ না কাঁদে, তবে তাঁর অন্তর কেঁদেছে।’ সাঈদ ইবনু যায়েদ বলেন, ‘একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হেরা গুহায় ছিলেন। তাঁর সাথে ছিলেন আবু বকর, উমর, উসমান, আলি, তালহা, যুবায়ের, সাদ ও আবদুর রাহমান ইবনু আউফ। তখন তিনি বললেন, ‘হে হেরা, সুস্থির হও। কারণ, তোমার উপর আছেন নবি অথবা সিদ্দিক অথবা শহিদ।’

জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ
বদর, উহুদ, খন্দক, মক্কা বিজয় ও তাবুকসহ সকল যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করে সেগুলোতে কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। সাঈদ ইবনু যুবাইর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘আবু বকর, উমর, উসমান, আলি, তালহা, যুবাইর, সা’দ, আবদুর রাহমান ইবনু আউফ এবং সাঈদ ইবনু যায়েদ; এঁদের অবস্থান যুদ্ধে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে ছিল এবং নামাজে তাঁর পিছনে।’ উহুদ যুদ্ধে লোকেরা পিছু হটলেও তিনি ময়দানে অবিচল থাকেন। ফলত সামনের দুটি দাঁত হারানোসহ বিশেরও অধিক আঘাতে জর্জরিত হন। কিছু আঘাত এমন ছিল যে, সেখানে হাত ঢুকানো যেত। পায়ে বেশি আঘাত পাওয়ার ফলে এক পা খোঁড়া হয়ে যায়। পঞ্চম হিজরির শাবানে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে ৭০০ সৈন্য দিয়ে দাওমাতুল জান্দাল এলাকায় প্রেরণ করেন। যাবার সময় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে তাঁকে পাগড়ি পরিয়ে দিয়ে বলেন, ‘সে এলাকা বিজয় হলে সেখানকার রাজকন্যাকে বিয়ে কোরো।’ তিনি সেখানে পৌঁছে তিনদিন তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেন। তৃতীয় দিন রাজাসহ বহু লোক ইসলামগ্রহণ করে নেয়। এরপর তিনি রাজকন্যা তুমাযার বিনতু আসবাগকে বিবাহ করেন। এর কিছুদিন পর মদিনায় ফিরে আসেন।
তিনি আল্লাহর রাস্তায় কেবল আপন প্রাণকে নিবেদন করে ক্ষান্ত হননি, বরং সম্পদও দান করেন অকাতরে। তাবুক যুদ্ধের কাহিনি তো উপরে বর্ণিত হয়েছে। আরেকবার তিনি জিহাদ ফী সাবিলিল্লাহর জন্য ৫০০ ঘোড়া সদকা করেন। এছাড়াও অসংখ্যবার মুক্তহস্তে আল্লাহর পথে সম্পদ বিলিয়ে দেন।

ইলমে দ্বীনের খেদমত
স্বয়ং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে তিনি ফতোয়া দিতেন। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু’র যুগেও এ কাজ করতেন। এর দ্বারাই বুঝা যায়, ইলমের ময়দানেও তিনি অনেক অগ্রগামী ছিলেন। ১৮ হিজরিতে যখন সিরিয়ায় আমওয়াস মহামারি দেখা দেয়, সেসময় আমিরুল মুমিনিন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু সেখানে যাওয়ার জন্য রওয়ানা করেন। পথিমধ্যে জানতে পারেন, সে এলাকায় মহামারি দেখা দিয়েছে। তখন তিনি সে এলাকায় যাবেন কিনা—এ ব্যাপারে সাহাবিগণের কাছে পরামর্শ চান। আবদুর রাহমান ইবনু আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, “যখন তোমরা কোনো শহরে মহামারির কথা শুনতে পাও, তখন সেখানে যেয়ো না। আর যখন তোমাদের অবস্থানস্থলে তা দেখা দিবে, তখন সেখান থেকে পালিয়ে যেয়ো না।”’ উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু এ হাদিস শুনে সে এলাকায় না গিয়ে মদিনায় ফিরে আসেন।
তাঁর বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা অল্প হলেও অনেকের থেকে এগিয়ে ছিলেন। মোট ৬৩টি হাদিস তিনি বর্ণনা করেছেন। বাকি ইবনু মাখলাদ রহ. তাঁর মুসনাদে সেগুলো একত্র করেছেন। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে একযোগে তাঁর দুটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে, এককভাবে সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে পাঁচটি হাদিস। ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বল রহ. তাঁর মুসনাদে ৩১টি হাদিস বর্ণনা করেছেন। সাহাবিদের মধ্যে তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু, আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু, আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু, যুবাইর ইবনু মুতঈম রাদিয়াল্লাহু আনহু, জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু, মিসওয়ার ইবনু মাখরামা রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং আবদুল্লাহ ইবনু আমের রাদিয়াল্লাহু আনহু। আপন ছেলেদের মধ্য থেকে বর্ণনা করেছন ইবরাহিম, হুমাইদ, আবু সালমা, আমর এবং মুসআব। তাবেঈদের থেকে মালিক ইবনু আউস বর্ণনা করেছেন।

ধনাঢ্যতা ও বদান্যতা
ইসলামপূর্ব যুগেও আবদুর রাহমান ইবনু আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন সফল ব্যবসায়ী। ইসলামগ্রহণের পর তিনি মদিনায় ফকিরবেশে আসলেও আপন ব্যবসায়িক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে একপর্যায়ে সাহাবিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সম্পদশালী হয়ে যান। আবু উমর বলেন, ‘তিনি ছিলেন ব্যাবসাকপালী ব্যবসায়ী। অঢেল সম্পদ উপার্জন করেছেন। মৃত্যুর সময় রেখে গেছেন একহাজার হাজার উট, তিনহাজার ছাগল এবং একশত ঘোড়া।’ আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘আবদুর রাহমান ইবনু আউফের মৃত্যুর পর আমি দেখেছি তাঁর প্রত্যেক স্ত্রী আপন ভাগে একলাখ মুদ্রা করে পেয়েছেন।’ এই দুই বর্ণনা থেকে তাঁর সম্পদের পরিমাণ কিছুটা হলেও আন্দাজ করা যায়।
তাঁর যেমন অঢেল ধন ছিল, তেমনি মনও ছিল আকাশের মতো। ইসলামগ্রহণের পর তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বরকতময় সান্নিধ্যে থেকে থেকে নিজের ভিতরকে কৃপণতা ও লালসমুক্ত করে নেন। ফলে তিনি দানসদকা করতেন অকাতরে, যার পরিমাণ হত অবিশ্বাস্যরকমের। একবার তিনি আল্লাহর রাস্তায় চারহাজার দিনার সদকা করেন। এটা দেখে মুনাফিকরা বলতে শুরু করে, ‘আবদুর রাহমান তো এসব লোকদেখানোর জন্য করে।’ তখন এই আয়াত নাযিল হয়, ‘সে সমস্ত লোক যারা বিদ্রুপ করে সেসব মুসলমানদের প্রতি যারা মন খুলে দান করে…।’(তাওবা: ৭৯) তিনি এতো অধিক সাহায্য-সহযোগিতা করেন যে, তাঁর ভাতিজা তালহা ইবনু আবদিল্লাহ রহ. বলেন, ‘মদিনাবাসী সকলে আবদুর রাহমান ইবনু আউফের পরিবারভুক্ত। তাদের তিন ভাগের এক ভাগকে তিনি ক্বরয দেন, এক ভাগের ঋণ পরিশোধ করে দেন আর এক ভাগকে দানসদকা করেন।’
উম্মুল মুমিনিনগণের খেদমতে তিনি নিজেকে উৎসর্গ করে দেন। তাঁদের যাবতীয় প্রয়োজন মেটানোর জন্য তিনি সর্বাগ্রে থাকতেন। একবার তিনি একটি বাগান উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু’র কাছে চল্লিশ হাজার স্বর্ণমূদ্রায় বিক্রি করেন। এরপর সব মূদ্রা তাঁর গোত্রের অভাবীদের মাঝে, মুহাজিরদের মাঝে এবং উম্মুল মুমিনীনগণের মাঝে বণ্টন করে দেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহু’র কাছে যখন তাঁর অংশ পৌঁছাল, তখন তিনি জানতে চাইলেন, ‘এগুলো কে পাঠিয়েছে?’ তাঁকে বলা হল, ‘আবদুর রহমান ইবনু আউফ।’ এটা শুনে তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আমার পরে কেবল ধৈর্যশীলরাই তোমাদের (উম্মাহাতুল মুমিনিন) প্রতি খেয়াল রাখবে।” আল্লাহ তাআলা জান্নাতের সালসাবিল ঝর্ণার সুমিষ্ট পানি দ্বারা ইবনু আউফের পিপাসা নিবারণ করুন।’
মৃত্যুর সময় তিনি অসিয়ত করে যান, সকল বদরি সাহাবিকে যেন চারশো স্বর্ণমূদ্রা করে দেওয়া হয়। তখন তাঁদের সংখ্যা ছিল একশজনের মতো। তাঁদের মধ্যে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুও ছিলেন, তিনি তা গ্রহণও করেছিলেন। পুরো জীবনে তিনি বেশুমার দাসদাসি আজাদ করেন। জা’ফর ইবনু বুরক্বান বলেন, আমার কাছে খবর এসেছে, আবদুর রাহমান ইবনু আউফ ত্রিশহাজার দাসদাসী আজাদ করেছেন।
এতো এতো সম্পদের মাঝে থাকার পরও দুনিয়বিমুখতা তাঁর মাঝে প্রবলভাবে ছিল। একদিন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহু মদিনায় হইচই শোনেন। জিজ্ঞেস করেন, ‘কী হয়েছে?’ লোকেরা বলল, ‘সিরিয়া থেকে আবদুর রাহমান ইবনু আউফের কাফেলা এসেছে।’ সে কাফেলায় ৭০০ উট ছিল। তিনি বললেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, আবদুর রাহমান ইবনু আউফ হামাগুড়ি দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ এ কথা যখন আবদুর রাহমান রাদিয়াল্লাহু আনহু শুনতে পান, তিনি বলেন, ‘আমি তো জান্নাতে দাঁড়িয়ে প্রবেশ করতে চাই।’ এরপর তিনি সেই কাফেলার সমস্ত উট এবং সমুদয় মালপত্র মানুষের মাঝে দান করে দেন। অন্য একদিন তিনি ঘরে গিয়ে গোসল করেন। এরপর বের হয়ে মেহমানদের কাছে আসেন। সঙ্গে তাদের জন্য পাত্রে করে কিছু রুটি ও গোশত নিয়ে আসেন। সেগুলো রাখতে গিয়ে তিনি কেঁদে দিলেন। মেহমানরা জানতে চাইলেন, ‘হে আবু মুহাম্মদ, আপনি কাঁদছেন কেনো?’ তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম মৃত্যুবরণ করেছেন, অথচ কখনো তিনি ও তাঁর পরিবার তৃপ্তিভরে যবের রুটি খাননি।’ আরেকদিন তিনি রোজাদার ছিলেন। ইফতারের পর তাঁর কাছে খাবার আসে। তিনি তা দেখে হাত গুটিয়ে নেন এবং বলে উঠেন, ‘মুসআব ইবনু উমায়ের শহীদ হয়েছেন। তিনি আমার থেকে উত্তম ছিলেন। তাঁকে কাফন দেওয়া হয়েছিল এমন একটি কাপড় দিয়ে, যা দ্বারা মাথা ঢাকলে পা খুলে যেত, পা ঢাকলে মাথা খুলে যেত। হামযা শহীদ হয়েছেন। তিনি আমার থেকে উত্তম ছিলেন। তাঁকে কাফন দেওয়ার মতো কিছুই পাওয়া যায়নি। তারপর আমাদেরকে দুনিয়ার প্রাচুর্য দান করা হয়েছে। আমাদের ব্যাপারে ভয় হয়, আমাদের প্রতিদান দুনিয়াতেই দেওয়া হয়ে যায় কি না!’ এরপর তিনি ঝরঝর করে কেঁদে দেন। সেই খাবার আর স্পর্শ করেন নি।

সাহাবাদের মূল্যায়ন
তিনি ছিলেন অন্যতম নেতৃস্থানীয় সাহাবি। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর ব্যাপারে বলতেন, ‘আবদুর রাহমান মুসলমানদের অন্যতম একজন নেতা।’ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পর ধারাবাহিক আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু নিজের খেলাফতকালে তাঁকে সম্মানের যাথোপযুক্ত স্তরে অধিষ্ঠিত করেন। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বহু বিষয়ে তাঁর পরামর্শ দ্বারা উপকৃত হয়েছেন। তন্মধ্যে আমওয়াস মহামারীর কথা উপরে বর্ণিত হয়েছে, এছাড়াও এরকম বহু কাহিনি আছে। তিনি আপন খেলাফতকালের প্রথম বছর তাঁকে হজ্জের আমীর বানিয়ে প্রেরণ করেন। শেষ বছরও তাঁকে নিয়ে হজ্জ করেন। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুও তাঁর খেলাফতকালের প্রথম বছর তাঁকে হজ্জের আমীর বানান। যখন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ছুরিকাঘাতে মারাত্মক আহত হয়ে মৃত্যুর নিকটবর্তী হন, তখন তিনি পরবর্তী খলীফা নির্ধারণের জন্য ছয়জনের মজলিসে শুরা গঠন করেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আবদুর রাহমান ইবনু আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু। খলীফা নির্ধারণের সময় তিনি নিজের অধিকার ত্যাগ করে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু’র হাতে বায়আত করে নেন। একবার উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর ভাগ্নে মিসওয়ার ইবনু মাখরামা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন, ‘প্রথম ও শেষ হিজরতের কেউ যদি মনে করে, সে তোমার মামা থেকে উত্তম, তবে সে মিথ্যাবাদী।’ অন্য একবার তাঁর নাক দিয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। তখন হুমরানকে ডেকে বলেন, তুমি আমার পরে খেলাফতের দায়িত্ব আবদুর রাহমানের জন্য লিখে রাখ। তিনি তা লিখে আবদুর রাহমান রাদিয়াল্লাহু আনহু’র কাছে যান। গিয়ে তাঁকে এই খবর দেন। তিনি এটা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কবর ও মিম্বর মাঝখানে গিয়ে দুআ করেন, ‘হে আল্লাহ, যদি উসমান কেবল আমার ব্যাপারে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, তাহলে আমাকে মৃত্যু দান করুন।’ এর ছয়মাস পরেই তিনি ইন্তেকাল করেন।

পরিবার-পরিজন
আবদুর রাহমান ইবনু আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু’র মোট পনেরজন স্ত্রী ও উম্মু ওয়ালাদের (উম্মু ওয়ালাদ হচ্ছে ওইসব দাসী যাদের ঘরে মনিবের সন্তান জন্মায়) কথা জানা যায়। এছাড়াও তাঁর আরও উম্মে ওয়ালাদ ছিল, যাদের কথা জানা যায় না। পনেরজন হলেন, উম্মু কুলসুম বিনতু উতবা, উম্মু কুলসুম বিনতু উকবা, সাহলা বিনতু আসেম, উম্মু হাকীম বিনতু কারিয, বিনতু শাইবা ইবনু রাবীআ, বাহরিয়া বিনতু হানী, সাহলা বিনতু সুহাইল, বিনতু আবিল হাইসার, তুমাযার বিনতু আসবাগ, আসমা বিনতু সালামা, উম্মু হুরাইস, মাজদু বিনতু ইয়াযিদ, গাযাল বিনতু কিসরা, যায়নাব বিনতু সাবাহ এবং বাদিয়া বিনতু গায়লান।
এ সকল স্ত্রী ও উম্মু ওয়ালাদের ঘরে তাঁর মোট আটাশজন সন্তানের তথ্য পাওয়া যায়। তন্মধ্যে ছেলে বিশজন, মেয়ে আটজন। ছেলেরা হলো: সালিম আল-আকবর, মুহাম্মদ, ইব্রাহিম, হুমাইদ, ইসমাঈল, মাআন, উমর, যায়েদ, উরওয়া আল-আকবর, সালিম আল-আসগর, আবু বকর, আবদুল্লাহ, আবু সালামা, আবদুর রাহমান, মুসআব, সুহাইল, উসমান, উরওয়া আল-আসগর, ইয়াহইয়া এবং বেলাল। মেয়েরা: উম্মুল কাসিম, হুমাইদা, আমাতুর রাহমান, আমাতুর রাহমান আস-সুগরা, আমিনা, মারইয়াম, উম্মু ইয়াহইয়া এবং জুওয়াইরিয়্যা
তাঁর সন্তানদের মধ্যে ইবরাহিম, হুমাইদ, আবু সালামা ও মুসআব প্রসিদ্ধ তাবেঈ এবং হাদিস বর্ণনাকারী ছিলেন। তাদের মধ্যে হুমাইদ ও আবু সালামা ছিলেন বিশিষ্ট ফকীহ। ৪৮ হিজরিতে মদিনার গভর্নর সাঈদ ইবনু আস রাদিয়াল্লাহু আনহু আবু সালামাকে কাজি হিশেবে নিয়োগ দেন।

ইন্তেকাল
৩২ হিজরিতে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু’র খেলাফতকালে এই কৃতজ্ঞ সম্পদশালী মহান সাহাবি ইন্তেকাল করেন। তাঁর বয়স তখন ৭২ বছর। আমিরুল মুমিনিন উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর জানাজার নামাজ পড়ান। তাঁকে দাফন করা হয় জান্নাতুল বাকী’তে। সাঈদ ইবনুল ওয়াক্কাস লাশের খাটিয়া বহনের সময় বলেন, ‘হায়, পাহাড়প্রতিম ব্যক্তি!’ মৃত্যুর দিন আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘আপনি যান, হে ইবনু আউফ। আপনি তো নির্মলতা পেয়ে গেছেন এবং কদর্যতা থেকে এগিয়ে গেছেন।’

সূত্র
সহিহ বুখারি— হাদিস নং ৫৩৯৮
সহিহ মুসলিম— হাদিস নং: ৪৬৭৭
সুনানে তিরমিযি— হাদিস নং: ৩৭৪৮, ৩৭৫০
সুনানু আবি দাউদ— হাদিস নং: ৪০৯৩
হিলয়াতুল আওলিয়া— ১/৯৮
সিয়ারু আ’লামিন নুবালা— ১/৬৮
তাবাকাত ইবনু সা’দ— ৩/১১৫
আল ইসাবাহ— ৪/২৯০
আল ইসতিআব— ৪৪২
আসাদুল গাবাহ— ৭৭৯
সিফাতুস সাফওয়াত— ১২৮
তারিখুল ইসলাম— ৩/৩৯০
হায়াতুস সাহাবা— ১/৮৭, ২৬৩, ২/১৪২

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

error: Content is protected !!