শনিবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২০

আকিল ইবনু আবি তালিব : রাসুলের চাচাতো ভাই

0

রাসুলের ভালোবাসার মানুষ :
‘হে আবু ইয়াযিদ, আমি তোমাকে দুই কারণে ভালোবাসি। প্রথম কারণ, তুমি আমার আত্মীয়। দ্বিতীয় কারণ, তোমাকে আমার চাচা অধিক ভালোবাসতেন।’ বললেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। কাকে বললেন? কে সে রাসুলের ভালোবাসার মানুষ? তিনি হচ্ছেন আকিল ইবনু আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আপন চাচাতো ভাই। আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু ও জাফর আত-তাইয়ার রাদিয়াল্লাহু আনহু’র আপন বড় ভাই। আবু ইয়াযিদ তাঁর উপনাম। পিতার নাম আবু তালিব, যিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিতা ও দাদার মৃত্যুর পর চাচা হিসেবে তাঁর অভিভাবক হয়েছিলেন এবং পরিপূর্ণ হক আদায় করে অভিবাবকত্ব করেছিলেন, কিন্তু ইসলামগ্রহণ করেননি, ৬১৯ ঈসায়িতে কাফের অবস্থায় মক্কায় ইন্তেকাল করেন। মাতা হলেন ফাতেমা বিনতু আসাদ ইবনি হাশিম, তিনি ১১ নম্বর মুসলিম, মহিলাদের মধ্যে দ্বিতীয়, হিজরতের সময় তিনিও হিজরত করে মদিনায় চলে যান, চতুর্থ হিজরিতে সেখানেই ইন্তেকাল করেন। আকিল রাদিয়াল্লাহু আনহু’র গোত্র হচ্ছে কুরাইশ বংশের অন্যতম গোত্র বনু হাশিম। তাঁর বংশানুক্রম এরকম : আকিল ইবনু আবি তালিব ইবনি আবদুল মুত্তালিব ইবনি হাশিম ইবনি আবদি মানাফ ইবনি কুসাই ইবনি কিলাব। তিনি হিজরতের ৪৪ বছর পূর্বে অনুমানিক ৫৭৮ ঈসায়িতে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন।

ইসলামপূর্ব জীবন
পিতা আবু তালিব তাঁকে অন্য ভাইদের থেকে একটু বেশি ভালোবাসতেন। শিশুকাল থেকে তিনি তাঁকে মমতার আশ্রয়ে বড় করে তুলেন, কখনো তাঁকে কাছছাড়া করেননি। একবার মক্কায় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর চাচা আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু চিন্তা করলেন, আবু তালিবের পারিবারিক বোঝা হালকা করবেন। সে উদ্দেশ্যে তাঁরা তাঁর কাছে গিয়ে পরিকল্পনা জানালেন। উত্তরে তিনি বললেন, ‘আকিলকে আমার কাছে রেখে বাকি দুজনকে তোমরা যা ইচ্ছে করো।’ তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুকে নিলেন এবং আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু নিলেন জা’ফর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে।
বড় হয়ে আকিল রাদিয়াল্লাহু আনহু কুরাইশের বংশ, যুদ্ধবিগ্রহ ও কীর্তিসমূহ সম্পর্কে বড় জ্ঞানী হয়ে যান। মানুষ তাঁর কাছে তাদের বংশ ও আরবের যুদ্ধবিগ্রহ সম্পর্কে জানতে ভিড় করত। আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘কুরাইশের মাঝে চারজন ব্যক্তি ছিলেন, যাঁদের কাছে তারা ঝগড়ার সময় বিচারপ্রার্থী হতো এবং বংশ সম্পর্কে যাঁদের কথার উপর নির্ভর করত। তাঁরা হলেন, আকিল ইবনু আবি তালিব, মাখরামা ইবনু নওফল, আবু জাহম ইবনু হুযাইফা ও হুওয়াইতিব ইবনু আবদিল উযযা।’
বদরযুদ্ধের সময় বনু হাশিমের অন্যান্যদের মতো তাঁকেও মক্কার কাফেররা জোর করে তাদের সঙ্গে নিয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ বিষয়টি জানতেন, তাই তিনি সাহাবিদেরকে বলে দেন, ‘বনু হাশিমকে যুদ্ধে জোর করে নিয়ে আসা হচ্ছে। তাদের সাথে যুদ্ধ করার প্রয়োজন নাই। যুদ্ধের সময় তাদের কেউ তোমাদের কারো মুখোমুখি হলে তাকে হত্যা কোরো না।’ যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তিনি বলেন, ‘তোমরা দেখো তো, বন্দীদের মধ্যে আমার পরিবারের কেউ আছে কি না।’ আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু দেখে এসে বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, সেখানে আমি আব্বাস, নওফল ও আকিলকে দেখলাম।’ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে তাঁদের দেখতে যান। তখন আকিল রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, ‘কুরাইশের কোন নেতা নিহত হয়েছে?’ তিনি বলেন, ‘আবু জেহেল নিহত হয়েছে।’ আকিল রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘তাহলে তো এখন আপনার জন্যে উপত্যকাটা (মক্কা) পরিস্কার হয়ে গেছে।’
এরপর তাদের উপর মুক্তিপণ নির্ধারিত হলে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু ও নওফল রাদিয়াল্লাহু আনহু তা দিয়ে দিলেও আকিল রাদিয়াল্লাহু আনহু’র কাছে কোনো কিছু ছিল না। তখন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর মুক্তিপণ আদায় করেন।

মুসলিম জীবন
তিনি তাঁর দুই ভাই আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু ও জা’ফর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বড় হলেও তাঁদের অনেক পরে ইসলামগ্রহণ করেন। অষ্টম হিজরির শুরুতে হুদাইবিয়ার সন্ধির পর তিনি মুসলিম হন। এরপর তিনি হিজরত করে মদিনায় চলে আসেন। তখন তাঁর বয়স ছিল ৫২ বছর। মদিনায় আসার পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর জন্য খায়বার থেকে বার্ষিক ১৪০ ওসক খাদ্যশস্যের ব্যবস্থা করে দেন।
তাঁর ইসলামগ্রহণের কয়েকমাস পর রোমানদের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক মুতার যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে তাঁর ভাই জা’ফর রাদিয়াল্লাহু আনহু শাহাদতবরণ করেন। তিনিও এতে অংশগ্রহণ করে বীরত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। যুদ্ধের সময় এক লোককে হত্যা করে তিনি একটি আংটি পান। যুদ্ধ শেষে মদিনায় আসার পর সেটা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেওয়া হলে তিনি সেটা তাঁকে দিয়ে দেন। এ যুদ্ধের পর অসুস্থতাবশত তিনি মক্কাবিজয়সহ পরবর্তী যুদ্ধগুলোতে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। তবে কেউ কেউ বলেন, তিনি সেসব সাহাবির অন্যতম একজন, যাঁরা হুনাইনের যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে ময়দানে অবিচল ছিলেন।
তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে অল্প কয়েকটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন হাসান বসরি, আতা ইবনু রাবাহ, তাঁর ছেলে মুহাম্মদ, তাঁর পৌত্র আবদুল্লাহ এবং মালিক ইবনু আমের-সহ আরও কয়েকজন। তাঁর হাদিসসমূহের মধ্যে একটি হাদিস হচ্ছে এই : আবদুল্লাহ ইবনু মুহাম্মদ ইবনু আকিল বলেন, আকিল ইবনু আবি তালিব বিবাহ করে আমাদের কাছে আসলেন। আমরা তাঁকে বললাম, ‘بالرفاء والبنين’ অর্থাৎ মিল-মহব্বতে থাকুন এবং সন্তানসন্ততি লাভ করুন। তিনি বললেন, থামো! তোমরা এটা বলো না। কারণ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটা বলতে নিষেধ করেছেন এবং বলেছেন, ‘তোমরা বলো, ‘بارك الله لك و بارك عليك وبارك لك فيها’ অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা তোমাকে বরকত দান করুন এবং তোমার স্ত্রীর মাঝে বরকত দান করুন।’
তাঁর খোদাভীরুতা সম্পর্কে অল্প খানিক ধারণা পেতে আসুন আমরা একটা ঘটনা শুনি। একবার তিনি রক্তাক্ত তরবারি নিয়ে তাঁর স্ত্রী ফাতেমা বিনতু উতবার ঘরে ঢুকলেন। তাঁকে দেখে স্ত্রী বললেন, ‘বুঝতে পারছি, আপনি যুদ্ধ করে এসেছেন। আচ্ছা, মুশরিকদের থেকে গনিমত কিছু কি পেয়েছেন?’ তিনি একটি সুঁই বের করে বললেন, ‘এই নাও সুঁই। এটা দিয়ে তুমি তোমার কাপড় সেলাই কোরো।’ এরপর সুঁই তাকে দিয়ে দিলেন। খানিকক্ষণ পর তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এক ঘোষককে ঘোষণা করতে শুনলেন, ‘কারও কাছে যদি গনিমতের মাল কোনো কিছু থেকে থাকে, সে যেন তা ফিরিয়ে দেয়, চাই সেটা সুঁই বা সুঁইয়ের মতো কোনো কিছু হোক।’ তৎক্ষণাৎ তিনি স্ত্রীর কাছে এসে বললেন, ‘তোমার কাছ থেকে সুঁইটি নিয়ে নিতে হচ্ছে।’ এরপর তিনি তাঁর থেকে সেটি নিয়ে গনিমতের মালে রেখে আসলেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পর তিনি বেশ ক’বছর মদিনায় থাকেন। এরপর সেখান থেকে চলে যান বসরায়। সেখানে কিছুদিন থাকার পর আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু’র খেলাফতকালে তাঁর কাছে হাজির হন। এরপর মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু’র শাসনামলে তিনি দামেস্কে তাঁর নিকট গমন করেন। তিনি ছিলেন মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু’র খালু। তাঁর খালা ফাতেমা বিনতু উতবা ইবনি রাবিআকে তিনি বিয়ে করেছিলেন।

পরিবার-পরিজন
তিনি চারটা বিবাহ করেছিলেন। স্ত্রীগণ হলেন : উম্মু সাঈদ রাবেতা বিনতু আমর, উম্মুল বানিন বিনতু সুগার, ফাতেমা বিনতু উতবা এবং আরেকজন, যার নাম পাওয়া যায় না। এ ছাড়া তাঁর দাসী অনেক ছিল, যাদের গর্ভে তাঁর সন্তান হয়েছে।
তাঁর ঔরসে এসকল স্ত্রী ও দাসীর ঘরে মোট ২৩ জন সন্তান জন্ম নেন। তন্মধ্যে স্ত্রীগণের ঘরে জন্ম হয় চারজনের। তাঁরা হলেন : ইয়াযিদ, সাঈদ, জা’ফর আল-আকবর ও আবু সাঈদ আল-আহওয়াল। বাকি ১৯ জনের জন্ম হয় দাসীদের ঘরে। তাঁরা হলেন : মুসলিম, আবদুল্লাহ আল-আকবর, আবদুর রাহমান, আবদুল্লাহ আল-আসগর, আলি আল-আকবর, জা’ফর আল-আসগর, হামযাহ, উসমান, মুহাম্মাদ, ঈসা, আলি, উম্মু হানি, যাইনাব, ফাতিমা, যাইনাব আস-সুগরা, উম্মু লুকমান, আসমা, উম্মুল কাসেম ও উম্মুন নুমান।
এসকল সন্তানের মধ্যে মুসলিম ইবনু আকিল হচ্ছেন সেই ব্যক্তি, যাঁকে হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু কুফা শহরে তাঁর পক্ষ থেকে বায়আত নেওয়ার জন্য পাঠিয়েছিলেন। তখন কুফার গভর্নর উবায়দুল্লাহ ইবনু যিয়াদ তাঁকে গ্রেফতার করে শহিদ করে ফেলে।

ইন্তেকাল
আকিল রাদিয়াল্লাহু আনহু ৬০ হিজরিতে ইয়াযিদ ইবনু মুয়াবিয়ার শাসনামলে হাররার ঘটনার পূর্বে দুনিয়া ছেড়ে পরজগতে পাড়ি জমান। কেউ কেউ বলেন, মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু’র শাসনামলের শেষদিকে তাঁর মৃত্যু হয়। মদিনার জন্নাতুল বাকিতে তাঁকে দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ৯৪ বছর।

তথ্যসূত্র
মুসনাদু ইমাম আহমদ— হাদিস নং : ১৭৪০
তাবাকাত ইবনু সা’দ— ৪/৩৮
আল ইসাবাহ— ৪/৪৩৮
সিয়ারু আ’লামিন নুবালা— ১/২১৮
উসুদুল গাবাহ— ৮৫৯
আল ইসতিআব— ৫৮৫
মু’জামুস সাহাবা— ৪/৩৯৮

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

error: Content is protected !!