শনিবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২০

উসমান ইবনু আফফান : সংক্ষিপ্ত জীবনিকা

0

বদরযুদ্ধের বিজয়ের সংবাদ যখন মদিনায় পৌঁছে; তখন লোকেরা তাঁর স্ত্রীর দাফন সম্পন্ন করছে। যুদ্ধে বের হবার আগ থেকে রুকাইয়াহ রাদিয়াল্লাহু আনহা অসুস্থ ছিলেন। তাই রাসুল সাল্লালাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম নিজের মেয়ের সেবাযত্নের জন্য রেখে যান জামাতাকে।
ফলে বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলেও তাঁকে বদরি সাহাবাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যুদ্ধ শেষে গনিমতের একটি অংশও দেয়া হয়।
রুকাইয়াহ রাদিয়াল্লাহু আনহার মৃত্যুর পর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের আরেক কন্যা উম্মু কুলসুমকে তাঁর সাথে বিয়ে দেন। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু ছাড়া আর কেউ কোনো নবির দুজন মেয়ে বিয়ে করবার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারেননি। এ জন্য তাঁর উপাধী ছিল যুননুরাইন। নবম হিজরিতে উম্মু কুলসুমও মারা যান। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তখন বলেন, ‘আমার যদি আরও একটি কন্যা থাকতে, আমি উসমানের কাছে বিয়ে দিতাম।’

ইসলামগ্রহণ
ইবনু সাআদসহ একদল ঐতিহাসিক বর্ণনা করেন, সিরিয়া থেকে ফিরছিলেন উসমান। পথে মুয়ান ও যারকারের মধ্যবর্তী স্থানে বিশ্রাম নিচ্ছেন। হঠাৎ তদ্রাচ্ছন্নে শুনলেন, কে যেন ডেকে বলছে—জেগে ওঠো ঘুমন্ত মানুষেরা, আহমদ আত্মপ্রকাশ করেছেন। তিনি মক্কায় ফিরে দেখলেন, শহরে নতুন এক জাগরণ শুরু হয়েছে। একত্ববাদের প্রচার করছেন রাসুল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম।
কারও কারও বর্ণনামতে, উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর খালা ছিলেন একজন কাহিনাহ। খালা তাঁকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে আগেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন।
মক্কায় তখন রাসুলের সহযোগী হয়ে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুও ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছেন। আবু বকরের সাথে উসমানের ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। একদিন আবু বকর উসমানের সামনে ইসলাম পেশ করলেন। উসমান ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হন। আবু বকর তাঁকে রাসুলের দরবারে নিয়ে যান। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বললেন, ‘উসমান, জান্নাতের পথ মেনে নাও। আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে সমস্ত সৃষ্টির জন্য রাসুল হিসেবে প্রেরিত।’ উসমান তখন হাত বাড়িয়ে ইসলাম কবুল করে নেন। ইসলামগ্রহণকারীদের দিক থেকে তিনি ছিলেন চতুর্থ।

যেমন ছিলেন
উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর গঠন ছিলে মাঝারি ধরনের। সাদা ও লালচে বর্ণ মিশ্রিত গায়ের রঙ। চেহারায় বসন্তের দাগ। মেহেদি-রঙের ঘন দাড়ি। প্রশস্ত গ্রীবা। সুঠাম দেহ। স্বর্ণখচিত ঝলমল দাঁত। হলদে কলপের বাবরি চুল।
তিনি ছিলেন কুরাইশ বংশের উমাইয়া গোত্রের লোক। তাঁর পূর্বপুরুষ অনেকেই ছিলেন ব্যবসায়ী ও প্রখ্যাত ধনী। ৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে মক্কায় জন্ম। পিতা আফফান ও মা আরভি বিনতু কারিসা। তাঁর মূল নাম উসমান। উপনাম আবু আমের, আবু আবদিল্লাহ, আবু লায়লা। উপাধী যুননুরাইন।
উসমান ছিলেন কুষ্টিবিদ্যায় পারদর্শী। জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, লজ্জা, আত্মমর্যাদাবোধ ও সৌজন্যবোধে অনন্য গুণাবলির অধিকারী। জাহেলি যুগে বেড়ে উঠেও যুগের কোনো অপকর্ম তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। যৌবনে বংশ পরম্পরায় ব্যবসা শুরু করেন। সততা ও আমানতদারিতা এনে দেয় সফলতার ভাণ্ডার। ধীরে ধীরে মক্কার সমাজে লাভ করেন গনি উপাধী।

ইসলামের প্রথম মুহাজির
উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু হলেন ইসলামের প্রথম মুহাজির।
ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর উপর নেমে আসে ভয়ঙ্কর নির্যাতন। চাচা হাকাম তাঁকে অন্ধকার ঘরে বেঁধে রাখত। পালাক্রমে করত অত্যাচার। কুরাইশের যে আত্মীয়রা তাঁকে ভালোবাসতে, তারা বদলে গেল মুহূর্তে। পরিণত হলো শত্রুতে। স্বজনরা বোঝাতে লাগলো—‘দ্যাখো, এখনও সময় আছে, ভুল স্বীকার করে ইসলাম ত্যাগ করো।’ উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু সিদ্ধান্তে অনড় রইলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের ক্রমাগত সংস্পর্শে হয়ে উঠলেন আরও দৃঢ় ঈমানের অধিকারী।
মক্কার কাফেরদের নির্যাতন একসময় অসহনীয় হয়ে ওঠে। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু দেশত্যাগের অনুমতি চান। নবুওতের পঞ্চম বছর মুসলমানদের একটি দল হিজরত করে হাবশায়। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু ও তাঁর স্ত্রী রাসুল-কন্যা রুকাইয়াহ রাদিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন তাঁদের অন্তর্ভুক্ত।
হিজরতের পর অনেকদিন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাঁদের কোনো খোঁজখবর পেলেন না। ফলে ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেলেন। হাবশা থেকে তখন এক কুরাইশ নারী মক্কায় ফিরেছিল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাকে উসমান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। মহিলা জবাব দিলো, আমি রুকাইয়াহকে গাধার উপর সওয়ার ও উসমানকে গাধাটি তাড়িয়ে নিতে দেখেছি। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম দুআ করে বললেন, ‘আল্লাহ উসমানের সাথে আছেন। হযরত লুত আলায়হিস সালামের পর উসমানই প্রথম ব্যক্তি, যে সপরিবারে আল্লাহর রাস্তায় হিজরত করেছে।’
উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু হাবশা থেকে ফিরলেন দুবছর পর। তাঁদের কাছে সংবাদ পৌঁছেছিল, মক্কার মুশরিকরা ইসলাম গ্রহণ করেছে। কিন্তু ফিরে দেখলেন ভিন্ন অবস্থা। মক্কায় অত্যাচার অব্যাহত এবং ধীরে ধীরে আরও কঠোর হয়ে যাওয়ায় দ্বিতীয়বার হিজরত করেন মদিনায়।
বদরযুদ্ধ ছাড়া বাকি সকল যুদ্ধে সরাসরি জানমাল দিয়ে অংশগ্রহণ করেছিলেন তিনি। প্রতিটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে তাঁর দানের অবদান ছিল অনেক। দুহাতে বাড়িয়ে দিয়েছেন সকল প্রয়োজনে।
তাবুকযুদ্ধের যখন প্রস্তুতি শুরু হলো, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আরবের অন্যান্য গোত্রকেও এ যুদ্ধে শরিক হতে নির্দেশ দিলেন। যুদ্ধে ব্যয়ভারের জন্য সহযোগিতারও আহ্বান জানান। এ যুদ্ধে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু সৈন্যদের যাবতীয় খরচ বহন করেন। সাড়ে নয় শত উট ও পঞ্চাশটি ঘোড়া দিয়েছিলেন ময়দানে ব্যবহার করতে। ইবনু ইসহাক বলেছেন, তাবুকের বাহিনীর পেছনে উসমানের মতো আর কেউ ব্যয় করতে পারেননি।
মুহাজিররা মদিনায় হিজরতের সময় মাত্র একটি কুয়া ছিল। সেটিও এক ইহুদির মালিকানাধীন। মদিনায় এমনিতেই খাবার-পানির সংকট। তারমধ্যে ইহুদি লোকটি কুয়ার পাশে বসে থাকে। মুসলমানদের পানি নিতে বাধা দেয়। মনে মনে হিসেব করে, অধিক পানি তুললে কুয়া শুকিয়ে যাবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম একদিন বললেন, ‘কে আছ এই কুয়াটি তোমাদের মুসলিম ভাইদের জন্য কিনে দিবে, বিনিময়ে আল্লাহ তাকে জান্নাতে একটা ঝর্ণা দান করবেন।’ উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু এগিয়ে এলেন, বিশ হাজার দিরহামের বিনিময়ে কুয়াটি কিনে মুসলমানদের জন্য ওয়াকফ করে দেন।
ষষ্ঠ হিজরিতে উমরার উদ্দেশ্যে বের হয়েও হুদায়বিয়ায় তাঁবু ফেলতে হলো। কাফেররা মুসলমানদের মক্কায় প্রবেশে বাধা দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন, ‘তুমি মক্কায় গিয়ে নেতৃবৃন্দকে বলবে, আমরা উমরা করতে এসেছি। কোনো যুদ্ধবিগ্রহে জড়াতে চাই না।’ উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘মক্কার সাথে আমার সম্পর্ক ভালো নয়। তারচেয়ে আপনি উসমানকে প্রেরণ করুন। এ কাজে তিনি অধিক উপযুক্ত।’ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুকে দূত হিসেবে মক্কায় প্রেরণ করলেন।
মক্কায় পৌঁছে সর্বপ্রথম আবান ইবনু সাঈদের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। আবান তাকে নিরাপত্তা দিয়ে নেতৃবৃন্দের সাথে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেন। উসমান তাদের কাছে রাসুলের সফরের উদ্দেশ্য জানান। তারা উসমানকে বলে, ‘আপনি চাইলে উমরা করতে পারেন।’ তিনি জবাবে বলেন, ‘রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাওয়াফ না করলে আমি করছি না।’
এদিকে মুসলমানদের মাঝে এই গুজব ছড়িয়ে পড়ল, মক্কার কাফেররা উসমানকে শহিদ করে ফেলেছে। রাসুল হুদায়বিয়ায় বাবলা গাছের নিচে বাইয়াত নেয়া শুরু করেন। উসমান-হত্যার প্রতিশোধ না নিয়ে ফেরা হচ্ছে না আর। ইতিহাসে যা বাইয়াতে রিদওয়ান নামে প্রসিদ্ধ। একে একে সবার পক্ষ থেকে বাইয়াত নেয়া হলো। তারপর রাসুল তাঁর ডান হাতকে বাম হাতের উপর রেখে বলেন, ‘হে আল্লাহ, এটি উসমানের বাইয়াত। সে আপনার ও আপনার রাসুলের কাজে মক্কায় গিয়েছে।

খালিফাতু রাসুলিল্লাহ
২৩ হিজরির জিলহজ মাসের ২৪ তারিখ। খলিফা উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে আবু লুলু ফিরোজ পেছন থেকে খঞ্জর দিয়ে আঘাত করে। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ফজরের নামাজের ইমামতি করছেন তখন। মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। ধরাধরি করে বাড়ি নেয়া হয়। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তখনও অজ্ঞান হননি। জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে তাকে আঘাত করেছে?’ লোকেরা বলল, ‘আবু লুলু ফিরোজ।’ আবু লুলু ছিল মুগিরাহ ইবনু শুবা রাদিয়াল্লাহু আনহুর দাস এবং ধর্মে অগ্নিপূজক। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু কোনো মুসলমানের হাতে আক্রান্ত হননি বলে শুকরিয়া আদায় করলেন।
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর শারীরিক অবস্থা দিনদিন অবনতির দিকে যাচ্ছিল। মৃত্যুশয্যায় দিন পার হচ্ছিল তাঁর। একসময় তাঁর কাছে পরবর্তী খলিফার ব্যাপারে আলোচনা তোলা হলো। তিনি কাউকে সরাসরি খলিফা নিয়োগ করলেন না। বরং ছয় সদস্যের একটি শুরা কমিটি গঠন করলেন। যার সদস্য হলেন, উসমান, আলি, আবদুর রহমান ইবনু আউফ, সাআদ, যুবাইর ইবনুল আওয়াম এবং তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহুম। তাঁরা সবাই ছিলেন বিশিষ্ট সাহাবি ও জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত।
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তিনদিন বিছানায় অসহ্য যন্ত্রণা সয়ে ইন্তেকাল করলেন। রাষ্ট্র-পরিচালনায় প্রয়োজন পড়ে খলিফার। শুরা সদস্যগণ বৈঠকে বসেন। আলোচনা চলতে থাকে। যখন আলোচনায় কোনো সমাধান আসছিল না, আবদুর রহমান ইবনু আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘আমি খেলাফতের দায়িত্ব ত্যাগ করছি। তোমাদের কে আছো, যে তোমাদের মধ্যে উত্তম খলিফা নিয়োগের ক্ষেত্রে নিজের দায়িত্ব আমার উপর অর্পণ করবে?’
উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু সর্বপ্রথম তাঁর ক্ষমতা আবদুর রহমানের হাতে অর্পণ করেন। এরপর একেএকে সবাই তাঁকে অনুসরণ করেন।
হিজরি ২৪ সনের ১ মুহাররাম। ফজরের পর আবদুর রহমান ইবনু আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু মসজিদে নববিতে দাঁড়ানো। আজ তিনি মুসলিমজাহানের তৃতীয় খলিফার নাম প্রকাশ করবেন। এই ঘোষণার জন্য অনেক বিশিষ্ট সাহাবার সাথে আলোচনা-পরামর্শ করে এসেছেন। মসজিদে নববি লোকে লোকারণ্য। ঘোষণাটি শোনার জন্য সবাই অধীর আগ্রহ নিয়ে বসা। আবদুর রহমান রাদিয়াল্লাহু আনহু ভাষণের এক পর্যায়ে উসমান ইবনু আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহুর নাম ঘোষণা করেন। এবং হাত বাড়িয়ে উসমানের কাছে বাইয়াত হন। সাথেসাথে বাইয়াত হন আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুও। ধীরে ধীরে উপস্থিত সকল মানুষ বাইয়াত হন।

খেলাফতকাল
উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু খলিফা নিযুক্ত হবার পর ইসলামি সাম্রাজ্যকে নতুনভাবে গড়ে তোলেন। বিভিন্ন প্রদেশে কুরআন শরিফের অনুলিপি প্রেরণ, সর্বপ্রথম বৃত্তির প্রবর্তন, পশু চরানোর জন্য চারণভূমি, তাকবির ধ্বনি মৃদু, মসজিদে সুগন্ধির ব্যবস্থা, জুমার দিন দুই আজানের নিয়ম, মুয়াজজিনের বেতন নির্ধারণ, সম্পদ থেকে জাকাত বের করার নিয়ম চালু করেন।
খেলাফতকালে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু কাজের সুবিধার্থে বিভিন্ন প্রদেশের গভর্নর রদবদল করেছিলেন। সে সুযোগে কয়েকটি বিদ্রোহও দেখা দিয়েছিল। সেগুলোকে তিনি কঠোরভাবে দমন করেন।

প্রথম মুসলিম নৌবাহিনী
আমিরে মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু তখনও সিরিয়ার গভর্নর। ২৬ হিজরিতে আনাতোলিয়ায় সাথে যুদ্ধ লেগে গেল। আনাতোলিয়ার লোকেরা ইসলাম সম্পর্কে বিদ্রূপ মনোভাব প্রকাশ করত। মুয়াবিয়া আক্রমণ করে আনাতোলিয়ার শহর আমুরিয়া বিজয় করেন। এই জয়ের পর চাইলেন আরও সামনে অগ্রসর হতে। কিন্তু আনাতোলিয়া ছিল পার্বত্য অঞ্চল। মুসলিম বাহিনীর জন্য অনুকূল পরিবেশ। স্থলপথে সৈন্য প্রেরণের বদলে নৌবাহিনী প্রেরণের কথা পরিকল্পনা করেন তিনি। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালেও একবার নৌবাহিনীর আলোচনা তোলা হয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন দিক বিবেচনায় উমর অনুমতি দেননি।
উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু আবার সে প্রস্তাব পেশ করেন এবং এর উপকারী দিক তুলে ধরেন। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু নৌবাহিনী গঠনের অনুমতি প্রদান করেন। দুবছরেরও কম সময়ে মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু শক্তিশালী এক মুসলিম নৌবাহিনী গড়ে তোলেন।
হিজরি ২৮ সন। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর নির্দেশে আমিরে মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু সাইপ্রাসে আক্রমণ করেন। মুয়াবিয়া একটি নৌবহর ও মিশর থেকে আরেকটি নৌবহর নিয়ে সাইপ্রাসে আক্রমণ হয়। সাইপ্রাসের অধিবাসীরা মুসলমানদের নৌপথ আক্রমণে নতুন মনে করেছিল। কিন্তু শেষে তারাই মুসলিমদের হাতে পরাজয় বরণ করে।
যদিও সাইপ্রাসে প্রথম দুটি মুসলিম নৌবহর আক্রমণ করে, কিন্তু সেটা তত ব্যাপক ছিল না। দুটি নৌবহর ছাড়া বাকি সৈন্য প্রেরণ করা হয়েছিল স্থলপথে। ৩১ হিজরিতে প্রথম মুসলিম নৌযান প্রেরণ করা হয়। বাইজেন্টাইনের রাজা কনস্টানটাইন আলেকজান্দ্রিয়া দখলের জন্য মুসলিম ঘাঁটি মিসর অভিমুখে অভিযান চালায়। সিরিয়া থেকে আমিরে মুয়াবিয়া এ আক্রমণ প্রতিহতের জন্য এগোন। মিশর থেকে গভর্নর আবদুল্লাহ ইবনু সারাহও যুদ্ধজাহাজ নিয়ে মধ্য সাগরে শত্রুর মুখামুখি হন। শত্রুরা সিসিলির দিকে পিছু হটতে থাকে। মুসলমানেরা জয় লাভ করেন। যদিও এর জন্য তাদের তুলনামূলক বেশি লড়তে হয়েছিল।
২৬ হিজরিতে মসজিদে নববি পুনঃনির্মাণের কাজে হাত দেন উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু। আশপাশের কিছু ঘরবাড়ি ক্রয় করেন সম্প্রসারণের জন্য। কারুকার্য খচিত পাথর, পাথরের স্তম্ভ, কাষ্ঠ নির্মিত ছাদ তৈরির মাধ্যমে দৈর্ঘ্য ১৬০ গজ ও প্রস্ত করেছিলেন ১৫০ গজ।

শাহাদাত
আবদুল্লাহ ইবনু সাবা নামক এক ইহুদি ছদ্মবেশে মুসলমানদের দলে ভিড়ে তখন। ইসলামি খিলাফত ধ্বংসের জন্য যার অপকৌশল অব্যাহত ছিল সবসময়।
উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রদেশের গভর্নর পরিবর্তন করলে, জনগণের ভেতর এর অসন্তোষ প্রকাশ পায়। সাবা এ সুযোগ কাজে লাগায়। সে নতুন গভর্নরদের বিরুদ্ধে কুৎসা গেয়ে বেড়ায়। সাধারণ লোকজনকে ক্ষিপ্ত করে তোলে। সাথেসাথে খলিফা সম্পর্কেও নানা অপবাদ রটিয়ে বিভিন্ন প্রদেশ ঘোরে। জনসাধারণের বিদ্রোহী মনোভাব সৃষ্টির চেষ্টা করে। এ অপরাধে সাবাকে অনেক গভর্নর গ্রেপ্তার করেন। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন এবং প্রদেশ থেকে বহিষ্কারও করেন। কিন্তু তার তৎপরতায় সবখানে কিছু অনুসারী গড়ে ওঠে। যারা তার পক্ষে কাজ করত।
আবদুল্লাহ ইবনু সাবা কয়েকবার তার দলবল নিয়ে মদিনা এসে গোলযোগের চেষ্টা করে। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু সবসময় সেটাকে মীমাংসা করে দেন। কিন্তু কঠোর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। মূলত উসমান চাননি, নিজের হাত দ্বারা বড় কোনো ফিতনা ও রক্তপাতের সূচনা হোক।
একবার সাবাপন্থীরা সুযোগ বুঝে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর বাসভবন ঘেরাও করে বসে। খাদ্যপানীয় বন্ধ করে দেয়। বন্ধ করে দেয় বাইরের সাথে যোগাযোগ। উসমান অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন।
অবরোধকালে একদিন মুগিরাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে এসে বললেন, ‘আমিরুল মুমিনিন, আপনি আমাদের নেতা। কিন্তু আজ বড় কঠিন সময়ের সম্মুখীন। এ থেকে রক্ষার জন্য আমি আপনার নিকট তিনটি প্রস্তাব পেশ করছি। তার থেকে যেকোনো একটি গ্রহণ করুন। এক. অবরোধকারীদের সাথে যুদ্ধ করুন। এখনো এমন অনেক জীবন উৎসর্গকারী আছে, যারা আপনার পক্ষে লড়তে দ্বিধা করবে না। দুই. নতুবা আপনি দেয়াল ভেঙে দরজা করে মক্কায় চলে যান। সেখানে হেরেম আছে। হেরেমের সম্মানে কেউ আপনার সঙ্গে যুদ্ধ করবে না। তিন. আপনি সিরিয়া চলে যান। সেখানকার মানুষ বিশ্বাসঘাতক নয়। এবং সেখানে মুয়াবিয়াও রয়েছেন।’
উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু উত্তর দেন, আমি বাইরে বের হয়ে যুদ্ধে জড়াতে চাই না। কারণ, এ উম্মতের মধ্যে হত্যাকাণ্ড শুরু হবে। আমি চাই না তার সূচনাকারী আমিই হই। আমি মক্কাও যেতে চাই না। তারা হেরেমে খুনখারাবি থেকে বিরত থাকবে, এমন কোনো আশা নেই। আর আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের ভবিষদ্বাণী অনুসারে সে ব্যক্তি হতে চাই না, যে মক্কা মুক্কাররামার অমর্যাদার কারণ হবে।’ সিরিয়ায় হিজরত সম্পর্কে বললেন, ‘রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের প্রতিবেশীদের থেকে দূরে থাকা আমরা জন্য অসহনীয় ব্যাপার।’ মুগিরাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু খলিফার জবাব শুনে আর কিছু বলেননি।
উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর ঘরের দরজায় পাহারারত হাসান ও হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুমাসহ কিছু যুবক। অনেক চেষ্টা করেও অবরোধকারীরা মূল দরজা দিয়ে ঢুকতে পারেনি। শেষে পেছনের দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকে যায়। তখন উসমান নামাজে দাঁড়িয়ে যান। নামাজ শেষে কুরআন তেলাওয়াত শুরু করেন। এ অবস্থায় তাঁকে শহিদ করা হয়।
উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু জীবনের শেষদিন রোজা ছিলেন। দিনটি ছিল হিজরি ৩৫ সনের জিলহজ মাসের শুক্রবার।
তিনি সেদিন সাথিদের ডেকে বলেছিলেন, ‘আজই আমার জীবনের শেষদিন।’ সাথিরা বললেন, ‘শত্রুদের জন্য আল্লাহ যথেষ্ট।’ খলিফা বললেন, ‘আজ রাতে আমি স্বপ্নে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে দেখলাম। সঙ্গে আবু বকর ও উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন, “উসমান, আজ আমার এখানে ইফতার কোরো।’”
উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু সাথিদের আরও বললেন, ‘তাঁরা আমাকে কেন হত্যা করতে চায়? আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম থেকে শুনেছি তিন কারণ ছাড়া কোনো মুসলমানকে হত্যা বৈধ নয়। এক. ইসলাম ধর্ম পরিবর্তন করে মুরতাদ হওয়া। দুই. পবিত্র হবার পর জিনা করা। তিন. কোনো মুসলমানকে অকারণে হত্যা করা। আল্লাহর শপথ! আমি হেদায়াত লাভের পর ধর্ম পরিবর্তনের কল্পনাও করিনি। জাহেলি যুগেও আমি জিনা করিনি। আর কাউকে তো অকারণে হত্যা করিনি। তবে কেন তারা আমাকে হত্যা করতে চায়?’
২০ জিলহজ। পশ্চিমে ডুবন্ত সূর্যের রঙ মেখে আকাশটা দাঁড়িয়ে আছে। সতেরো জন লোক মরুভূমির ক্লান্ত বালির উপর হেঁটে যাচ্ছেন। মন সবার শোকার্ত। চোখ থেকে বেয়ে পড়ছে অশ্রু। কারও কারও কাঁধে মুসলিমজাহানের তৃতীয় খলিফা। তাঁরা এগিয়ে যাচ্ছেন কবরস্তানের দিকে।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

error: Content is protected !!