রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১

উমর ইবনুল খাত্তাব : সংক্ষিপ্ত জীবনিকা

0

বিরল হৃদয়দান :
মাথা নিতে গিয়ে হৃদয় দিয়ে আসার কাহিনি ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল। ঠিক এরকম কাহিনি তৈরি করে ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ইতিহাসকে আলোকিত করে গেছেন। কাহিনিটি এরকম : আবু জাহেল যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হত্যার জন্য একশত উট পুরস্কার ঘোষণা করল, উমর তৎক্ষণাৎ তরবারি হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। এমনিতেই তিনি মুহাম্মাদের প্রতি ঘোর শত্রুতা পোষণ করেন, এখন সঙ্গে যোগ হয়েছে পুরস্কার। এ সুযোগ হাতছাড়া করা যায় না। যেভাবেই হোক আজই মুহাম্মাদকে হত্যা করতে হবে। পথিমধ্যে এক লোকের সাথে সাক্ষাৎ। লোকটি উমরকে তরবারি-হাতে ছুটতে দেখে জিজ্ঞেস করল, ‘কোথায় যাচ্ছ, উমর?’ তিনি বললেন, ‘মুহাম্মাদকে হত্যা করতে।’ লোকটি বলল, ‘আশ্চর্য! আগে ঘরের খবর লও, তোমার বোন তো ইসলামগ্রহণ করেছে।’ এটা শুনে রাগে তিনি ফুঁসতে ফুঁসতে বোনের বাড়িতে গেলেন। গিয়ে বোন ও বোনজামাইকে মারতে শুরু করলেন। মারতে মারতে একসময় কী মনে করে বললেন, ‘তোমরা কী পড়ছিলে, দেখাও তো।’ বোন বললেন, ‘আগে পবিত্র হয়ে এসো।’ তিনি পবিত্র হয়ে এলে বোন তাঁকে কুরআন দিলেন। তিনি সেটা থেকে সুরা তহা পড়লেন। কুরআনের বরকতময় পরশে তাঁর মন পরিবর্তন হয়ে গেল। তিনি বললেন, ‘আমাকে মুহাম্মাদের কাছে নিয়ে চলো।’ তাঁরা তাঁকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে নিয়ে গেলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর কাপড় ধরে বললেন, ‘উমর, এখনো কি তুমি সজাগ হবে না?’ উমর তখনই পড়লেন—আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্নাকা রাসুলুল্লাহ।

পরিচয় ও জন্মগ্রহণ
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন কুরাইশের অভিজাত লোকদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর মাধ্যমে যখন ইসলাম প্রকাশ্যে আসে, তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর উপাধী দেন ফারুক। বদরযুদ্ধের দিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর উপনাম দেন আবু হাফস। তাঁর গোত্রের নাম আদাউয়ি, এটি কুরাইশ বংশের শাখা। জাহেলি যুগে এ গোত্রের দায়িত্ব ছিল যুদ্ধের সময় কুরাইশের পক্ষে দূতের কাজ করা এবং যখন বংশের বড়ত্ব বর্ণনার প্রয়োজন হতো, তখন গৌরবগাথা বয়ান করা। তাঁর পিতার নাম, খাত্তাব ইবনু নুফাইল। মাতা হানতামা বিনতু হাশিম। তাঁর বংশপরম্পরা এরকম : উমর ইবনুল খাত্তাব ইবনি নুফাইল ইবনি আবদুল উজ্জা ইবনি রাবাহ ইবনি আবদুল্লাহ ইবনি কুরত ইবনি রাজাহ ইবনি আদি ইবনি কা’ব। কা’ব থেকে তাঁর বংশ পরম্পরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বংশের সাথে মিলে গেছে।
তাঁর ভাইবোন ছিলেন তিনজন; যায়েদ ইবনুল খাত্তাব, ফাতিমা বিনতু খাত্তাব এবং সাফিয়্যাহ বিনতু খাত্তাব। তাঁরা সকলে ইসলামগ্রহণ করেছেন। ফাতেমা বিনতু খাত্তাবের স্বামী ছিলেন সাঈদ ইবনু যায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহু, আর সাফিয়্যাহ বিনতু খাত্তাবের স্বামী ছিলেন কুদামা ইবনু মাযউন রাদিয়াল্লাহু আনহু।
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু মক্কায় হস্তিবাহিনী আক্রমণের ১৩ বছর পর হিজরতের ৪০ বছর পূর্বে অনুমানিক ৫৮৬ ঈসায়িতে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন।

ইসলামপূর্ব জীবন
ছোটকাল থেকে পিতার তত্ত্বাবধানে পাহাড়ি এলাকায় বড় হন। পিতা তাঁকে উট চরানোর দায়িত্ব দেন। এর পাশাপাশি পড়ালেখা শেখেন হারব ইবনু উমাইয়্যার কাছ থেকে। যুবক হওয়ার পর ব্যবসা শুরু করেন এবং সেটা ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আগ পর্যন্ত চালিয়ে গিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে কুরাইশ গোত্রের অন্যতম ধনাঢ্য ব্যক্তিতে পরিণত হন। সেসময় কুরাইশরা তাঁকে যুদ্ধের সময় দূতালি করার জন্য এবং বংশমর্যাদার প্রতিযোগিতার সময় গৌরবগাথা বর্ণনার জন্য নিয়োগ দেয়। অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তিনি সেই দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়ে সবাইকে খুশি করে দিতেন। ফলে তিনি আদৃত হন কুরাইশের অন্যতম নেতা হিসেবে। সেসময় তিনি অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ ছিলেন, উপাস্য মূর্তিগুলোর প্রতি তাঁর ভক্তি ছিল সীমাহীন। ন্যায়পরায়ণতা, কঠোরতা, বীরত্ব ও শক্তিমত্তায় আরবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। সমরবিদ্যা, অশ্বারোহণ ও কুস্তিখেলায় তাঁর জুড়ি মেলা ভার ছিল। আরবের বড় বড় কুস্তিগিরকে তিনি সহজেই হারিয়ে দিতেন।

ইসলাম হলো শক্তিশালী
একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুআ করলেন—‘হে আল্লাহ, উমর ইবনুল খাত্তাব ও আবু জাহেল; এই দুইজনের মধ্যে যে আপনার কাছে বেশি প্রিয় তাকে দিয়ে ইসলামকে শক্তিশালী করুন।’ দুআ দুজনের জন্য করলেও তাঁর মনের টান ছিল উমরের প্রতি। তাঁর এই দুআর বরকতে নবুওয়তের ষষ্ঠ বছর উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ইসলাম গ্রহণ করেন। কাহিনি উপরে বর্ণিত হয়েছে। তাঁর আগে মুসলিম হয়েছিলেন ৪০ জন পুরুষ ও ১০জন মহিলা। তাঁর ঈমান আনয়ন ইসলামি দাওয়াতের নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। ইসলামগ্রহণের পর তিনি বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আমরা কি সত্যের উপর নই?’ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তর দিলেন, ‘অবশ্যই, সেই সত্ত্বার কসম— যাঁর হাতে আমার প্রাণ! নিঃসন্দেহে তোমরা সত্যের উপরে।’ তিনি বলেন, ‘তাহলে গোপনীয়তা কীসের! সেই সত্ত্বার কসম— যিনি আপনাকে সত্যরূপে পাঠিয়েছেন! অবশ্যই অবশ্যই আপনি বের হবেন।’ তখন পর্যন্ত ইসলাম প্রচার হতো গোপনে। তাঁর এই কথায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিদের নিয়ে বের হয়ে পড়েন। শুরু করেন প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত ও তাবলিগ।

মদিনার পথে
ইসলামগ্রহণের পর তিনি পাহাড়ের মতো অটল হয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পাশে দাঁড়িয়ে যান। জোরেশোরে ইসলামের প্রচার-প্রসার করতে থাকেন। দুর্বল মুসলমানদের জন্য তিনি হয়ে যান আশ্রয়স্থল। বিপদেআপদে সাহায্যের জন্য তাঁরা তাঁর কাছে ছুটে আসেন। যখন বায়আতে আকাবার মাধ্যমে মদিনা নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে যায়, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন সাহাবিদেরকে সেখানে হিজরতের অনুমতি দেন। তখন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু দ্বীনের তরে হিজরতের মনস্থ করেন। তাঁর হিজরতের কাহিনি আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু এভাবে বর্ণনা করেন, ‘আমার জানা মতে সকল মুহাজির গোপনে হিজরত করেছেন কেবল উমর ইবনুল খাত্তাব ছাড়া। যখন তিনি হিজরতের ইচ্ছা করলেন, তখন কোমরে তরবারি ঝুলালেন, কাঁধে ঝুলালেন ধনুক, হাতে নিলেন কয়েকটা তীর এবং বল্লম নিলেন। এরপর কাবায় গেলেন। তখন কুরাইশের একদল সেখানে ছিল। তিনি ধীরেসুস্থে কাবা সাতবার তওয়াফ করলেন। এরপর মাকামে ইবরাহিমে নামাজ পড়লেন। এরপর মানুষের প্রত্যেকটা মজমায় তিনি একবার একবার দাঁড়ালেন এবং বললেন, ‘যে ব্যক্তি তাঁর মাকে সন্তানহারা, সন্তানকে এতীম এবং স্ত্রীকে বিধবা বানাতে চায়, সে যেন এই উপত্যকার পিছনে আমার সাথে দেখা করে।’ আলি বলেন, ‘এই কথা বলে যখন তিনি রওয়ানা করলেন, তখন কেউ তাঁর পিছু নিল না। এই সুযোগে দুর্বল মুসলমানগণ তাঁর পেছন ধরলেন। তিনি তাঁদেরকে নিয়ে মদিনায় চলে গেলেন।’ তাঁদের সংখ্যা ছিল বিশজন।

নববি মাদরাসায়
ইসলামগ্রহণের পর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহচর্যে থেকে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু কতটুকু উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন তা বর্ণনার জন্য শত শত পৃষ্ঠা প্রয়োজন। ইসলামের পূর্বেও তাঁর মাঝে বহু গুণের সমাহার ছিল। নববি মাদরাসায় যোগ দেওয়ার পর তাঁর সেই গুণগুলোতে স্ফুরণ ঘটে। ফলত তাঁর মাঝে আরও অসংখ্য গুণের জন্ম হয়। সেসব গুণ দ্বারা তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু’র পরেই তাঁর জায়গা করে নেন। স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অসংখ্য বর্ণনায় তাঁর উচ্চতার স্বীকৃতি দিয়ে যান। একবার তিনি বলেন, ‘আমার পরে যদি কেউ নবি হতো, তবে সে হতো উমর।’ এর মানে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু নববি মাদরাসা থেকে নবি হওয়ার পূর্ণ যোগ্যতা অর্জন করে নেন। আরেকবার বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা উমরের জিহ্বা ও অন্তরে হককে স্থাপন করে দিয়েছেন।’ অন্য একবার বলেন, ‘তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতদের মাঝে মুহাদ্দাস ছিল। এই উম্মতের মাঝে যদি কেউ থেকে থাকে, তবে সে হল উমর।’ এখানে ‘মুহাদ্দাস’ মানে হলো, যাঁর অন্তরে আল্লাহর পক্ষ থেকে ইলহাম করা হয় এবং তিনি সেটার ভিত্তিতে কথা বলেন। আরেকবার তাঁকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘হে ইবনুল খাত্তাব, সেই সত্তার কসম—যাঁর হাতে আমার প্রাণ! তুমি যে পথে যাও, শয়তান সে পথে যায় না, অন্য পথ দিয়ে যায়।’ কল্পনা করুন, কতটুকু উচ্চে অবস্থান করলে একজন লোক স্বয়ং নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এই স্বীকৃতিগুলো পেতে পারে। তাছাড়া স্বীকৃতি কেবল এগুলো না, বরং তাঁর সম্পর্কে এরকম আরও বহু বর্ণনা আছে।
নববি মাদরাসায় উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু কতটুকু ইলম অর্জন করেছিলেন? আসুন এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে জেনে নিই। তিনি বলেন, ‘একদিন আমি ঘুমন্ত ছিলাম। তখন দেখলাম আমার কাছে একটি দুধভর্তি পাত্র নিয়ে আসা হলো। আমি সেটা থেকে পান করলাম, এত্ত পান করলাম যে, আমি আমার নখগুলোতেও তৃপ্তি অনুভব করলাম। এরপর বাকিটুকু উমর ইবনুল খাত্তাবকে দিয়ে দিলাম।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আপনি এর ব্যাখ্যা কী করেছেন?’ তিনি বলেন, ‘ইলম’। অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেই পাত্র থেকে ইলম পান করেছেন, তিনিও সেই পাত্র থেকে ইলম পান করেছেন। তিনি স্বহস্তে তাঁকে ইলম পান করিয়েছেন। ইলমে দ্বীনের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছার জন্য আর কী লাগে, এটাই তো যথেষ্ট। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘যদি উমরের ইলম এক পাল্লায় রাখা হয় এবং বাকি লোকের ইলম আরেক পাল্লায় রাখা হয়, তবে অবশ্যই উমরের ইলম লোকদের ইলম থেকে ভারি হবে। আমি মনে করি উমরের মৃত্যুর দ্বারা ইলমের দশভাগের নয়ভাগ চলে গেছে।’
তাঁর বহু ফজিলতের মধ্যে অন্যতম একটা হলো, দশের অধিক এমন ঘটনা আছে যেখানে তিনি যে মত দিয়েছেন, সে মতের অনুকূলে আল্লাহ তাআলা কুরআনের আয়াত নাজিল করেছেন। অর্থাৎ তিনি আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা বুঝতেন। এজন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে ‘মুহাদ্দাস’ বলেছেন। সাহাবিগণের মধ্যে এই মর্যাদার অধিকারী আর কেউ ছিলেন না, কেবল তিনিই। তাছাড়া তিনি সেই দশজন সাহাবির অন্তর্ভুক্ত, যাঁদেরকে দুনিয়াতেই জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। তিনি ছিলেন বদরে ও বায়আতে রিযওয়ানে অংশগ্রহণকারী সাহাবিগণের মধ্যে অন্যতম একজন, যাঁদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা সন্তুষ্ট হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে তিনি বহু হাদিস বর্ণনা করেছেন। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং উবাই ইবনু কা’ব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকেও বর্ণনা করেছেন। এ ব্যপারে তিনি অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতেন। তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু, আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু, আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাসহ বহু বড় বড় সাহাবি। তাবেয়িদের মধ্য থেকেও বিরাট এক জামাত তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন। হাদিসের কিতাবাদিতে তাঁর ৫৩৯টি হাদিস পাওয়া যায়। তন্মধ্যে ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম মোট ৮১টি হাদিস তাঁদের কিতাবে এনেছেন।
জিহাদের ময়দানেও তাঁর সমকক্ষ কেউ ছিলেন না। বদর, উহুদ, খন্দকসহ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সকল যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন এবং সেগুলোতে সর্বোচ্চ কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। বদরযুদ্ধে তিনি আপন মামা আস ইবনু হিশামকে হত্যা করেন, রক্তের সম্পর্কের দরুণ তাকে ছাড় দেননি। উহুদের যুদ্ধে যখন মুসলমানরা পাহাড়ে আশ্রয় নেন, তখন তিনি সেখান থেকে আবু সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু আনহুর কথার জবাব দিয়ে তাঁকে ঘাবড়ে দেন। (আবু সুফিয়ান তখন পর্যন্ত ইসলাম কবুল করেননি।)
মক্কাবিজয়ের দিন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাতহা নামক স্থানে এসে তাঁকে কাবাঘরের ছবিসমূহ মিটিয়ে দেওয়ার জন্য পাঠান। মিটিয়ে দেওয়ার পর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে ঢোকেন। হুনাইনের যুদ্ধে যখন মুসলমানরা পিছু হটতে শুরু করেন, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে যেসব সাহাবি ময়দানে অবিচল ছিলেন, তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন তিনি। তাবুকযুদ্ধে যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাস্তায় সদকা করার তাগিদ দেন, তখন তিনি চার হাজার দিরহাম সদকা করেন।
অন্যান্য বিষয়ের মতো ইবাদাতের ক্ষেত্রেও তাঁর অবস্থান ছিল সর্বোচ্চ স্তরে। নামাজের প্রতি এত্ত যত্নবান ছিলেন যে, যেদিন তাঁকে ছুরিকাঘাত করা হয়, সেদিনও ফজরের নামাজ পড়েন এমতাবস্থায় যে, তাঁর আঘাতপ্রাপ্ত স্থান থেকে রক্ত ঝরছিল। শেষরাতের নামাজ তিনি নিজের জন্য ওয়াজিব করে নিয়েছিলেন। তিনি রোজা রাখতেন অধিকহারে। তাঁর ছেলে আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘তিনি ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা ও সফর ছাড়া বাকি সময় ধারাবাহিক রোজা রাখতেন।’ আর তাঁর দানের হাত ছিল অকল্পনীয় প্রশস্ত। উপরে তাবুক যুদ্ধে তাঁর দানের একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। দুনিয়বিমুখতা তাঁর মাঝে এতটাই ছিল যে, খলিফা অবস্থায় একবার তিনি খুতবা দিচ্ছিলেন, তখন তাঁর পরনে বারোটি তালিযুক লুঙ্গি ছিল।

সাহাবিগণের মূল্যায়ন
আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের কাছে যাঁর অবস্থান উচ্চতার সর্বোচ্চ শিখরে, সাহাবিদের কাছে তাঁর অবস্থান কতটুকু উচ্চে তা বলা বাহুল্য। সাহাবিগণ হচ্ছেন এই উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজন্ম। তাঁদের সাক্ষ্য পৃথিবীতে আল্লাহ তাআলার সাক্ষ্যের মতো। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু’র উচ্চমর্যাদার ব্যাপারে তাঁদের থেকে বেশুমার বর্ণনা পাওয়া যায়। তন্মধ্যে কয়েকটি এখানে উল্লেখ করছি। আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু’র ছেলে মুহাম্মাদ বলেন, একদিন আমি পিতাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরে উত্তম ব্যক্তি কে?’ তিনি বললেন, ‘আবু বকর।’ আমি বললাম, ‘এরপর কে?’ তিনি বললেন, ‘উমর।’ আমার মনে হলো, এরপর তিনি উসমানের কথা বলবেন। আমি বললাম, ‘এরপর কি আপনি?’ তিনি বললেন, ‘আমি তো কেবল সাধারণ এক মুসলিম।’ আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে আমরা লোকদেরকে একজনের উপর আরেকজনকে অগ্রাধিকার দিতাম। অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে প্রথমে রাখতাম আবু বকরকে, এরপর উমর ইবনুল খাত্তাবকে, এরপর উসমান ইবনু আফ্ফানকে। রাদিয়াল্লাহু আনহুম।’ আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘নিঃসন্দেহে উমর ছিলেন ইসলামের মজবুত দূর্গ। এতে মানুষ কেবল ঢুকেছে, বের হয়নি। যখন তিনি মৃত্যুবরণ করলেন, সে দূর্গ দুর্বল হয়ে গেল। ফলত মানুষ ইসলাম থেকে বের হয়ে যেতে লাগল।’ আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘তোমরা বেশি বেশি উমরের কথা স্মরণ করো। কারণ, যখন উমরকে স্মরণ করা হবে, তখন ন্যায়-ইনসাফকে স্মরণ করা হবে। আর যখন ন্যায়-ইনসাফকে স্মরণ করা হবে, তখন আল্লাহকে স্মরণ করা হবে।’

আমিরুল মুমিনিন
আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু’র খেলাফতকালে তিনি প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা পালন করেন। হিজরতের তেরোতম বছর যখন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু ইন্তেকাল করেন, তখন ইন্তেকালের পূর্বে পরামর্শপূর্বক তিনি তাঁকে পরবর্তী খলীফা মনোনীত করে যান। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু খলীফা হয়ে শাহাদতবরণের আগ পর্যন্ত একাধারে ১০ বছর অত্যন্ত সফলতার সাথে ইসলামি রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা, বিচক্ষণতা ও ন্যায়পরায়ণতা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। তিনি এত ন্যায়পরায়ণ ছিলেন যে, ন্যায়পরায়ণতা ও উমর সমার্থক শব্দে পরিণত হয়। ক্ষেত্রভেদে প্রজাদের সম্মুখে তিনি বিভিন্নরূপে হাজির হতেন; কখনো দয়ালু পিতার রূপে, কখনো দরদী মায়ের রূপে, কখনো মহৎ ভাইয়ের রূপে এবং কখনো অনুগত ছেলের রূপে। তাঁর খেলাফতকালে ইসলামি রাষ্ট্র বিশাল সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। যার পূর্ব সীমান্ত সিন্ধু ও আমু দরিয়া, পশ্চিম সীমান্ত তিউনিশিয়া ও আফ্রিকার মরুভূমি, উত্তর সীমান্ত আনাতোলিয়ার পর্বতমালা ও আর্মেনীয় এলাকা এবং দক্ষিণ সীমান্ত প্রশান্ত মহাসাগর ও নুবিয়া শহর। ইসলামি ইতিহাসের সবচেয়ে সোনালী যুগ ছিল তাঁর খেলাফতকাল। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু সত্যই বলেছেন, ‘উমরের ইসলামগ্রহণ ছিল বিজয়, হিজরত ছিল সাহায্য এবং রাষ্ট্রপরিচালনা ছিল রহমত।’ হিজরতের ২৩তম বছর তাঁর শাহাদতবরণের মাধ্যমে এই সোনালি যুগের সমাপ্তি ঘটে।

পরিবার-পরিজন
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু জাহেলি যুগে বিয়ে করেন তিনটি। তিন স্ত্রী হলেন, যাইনাব বিনতু মাযউন, কুরাইবা বিনতু আবি উমাইয়া এবং উম্মু কুলসুম বিনতু জারওয়াল। ইসলামগ্রহণের পরে বিয়ে করেন আরও পাঁচটি। তাঁরা হলেন, উম্মু হাকিম বিনতু হারিস, জামিলা বিনতু সাবেত, বিশিষ্ট সাহাবি সাঈদ ইবনু যায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহু’র বোন আতিকা বিনতু যায়েদ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দৌহিত্রী উম্মু কুলসুম বিনতু আলি ইবনি আবি তালিব এবং সুবাইআহ বিনতু হারেস। তাঁর দুজন দাসীর তথ্য পাওয়া যায়। তাঁরা হলেন, লুহাইয়া ও ফুকাইহা।
তাঁর ঔরসে এ সকল স্ত্রী ও দাসীর ঘরে মোট ১৪ জন সন্তানের জন্ম হয়। তন্মধ্যে ছেলে আটজন। তাঁরা হলেন : আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু, আবদুর রাহমান আল-আকবর রাদিয়াল্লাহু আনহু, আবদুর রাহমান আল-আওসাত রাদিয়াল্লাহু আনহু, আবদুর রাহমান আল-আসগর, আসেম রাদিয়াল্লাহু আনহু, উবায়দুল্লাহ, যায়েদ আল-আকবর, যায়েদ আল-আসগর এবং আয়াজ। আর মেয়ে পাঁচজন। তারা হলেন, হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহা, ফাতেমা, রুকাইয়া, যাইনাব ও জামিলা।
এঁদের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন পিতার সর্বাপেক্ষা যোগ্য উত্তরসূরী। তিনি ছিলেন সাহাবিদের মধ্যে বিশিষ্ট মুহাদ্দিস ও ফকিহ। অধিক ফতোয়াদাতা এবং অধিক হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবিদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। মেয়েদের মধ্যে হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন উম্মুল মুমিনীনগণের মধ্যে অন্যতম একজন। হিজরতের তৃতীয় বছর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বিয়ে করেন।

শাহাদতবরণ
আবদুল্লাহ ইবনু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, একবার নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উমরকে সাদা জামা পরনে দেখে বললেন, ‘তোমার জামা কি নতুন, না ধুয়েছ?’ উমর বললেন, ‘ধুয়েছি।’ তখন তিনি বললেন, ‘তুমি নতুন জামা পরিধান করো, সুখেস্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করো এবং শহিদ হয়ে মৃত্যুবরণ করো। আল্লাহ তাআলা তোমাকে দুনিয়া ও আখেরাতে চক্ষুশীতলকারী দান করুন।’ উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু সত্যসত্যই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কামনা অনুযায়ী শাহাদতবরণ করেন। ঘটনাটি হলো, আবু লুলু নামক এক মূর্তিপূজক দাস কোনো এক বিষয়ে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর চাহিদার বিপরীত রায় দেওয়ায় সে তাঁর উপর রাগান্বিত হয়। এবং প্রতিশোধ নেওয়ার পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনা মুতাবেক সে ২৩ হিজরির ২৬ জিলহ শেষরাতে মসজিদে নববির এক কোণে দুমাথা বিশিষ্ট একটি খঞ্জর নিয়ে লুকিয়ে থাকে। ফজরের সময় উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন অভ্যাসমতো লোকদেরকে নামাজের জন্য ডাকতে বের হলেন, তখন সে সুযোগমতো তাঁর উপর আক্রমণ করে এবং পরপর তিনবার আঘাত করে। তন্মধ্যে একটি আঘাত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু’র তলপেটে পড়ে, যেটা ছিল অত্যন্ত মারাত্মক, এটাই তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দাসটি তাঁকে আঘাত করার পর আশপাশের আরও এগারোজনকে আঘাত করে নিজে আত্মহত্যা করে। এই আঘাতের তিনদিন পর উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু শাহাদতবরণ করেন।
মৃত্যুর আগে ছেলে আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহু’র কাছে পাঠান রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু’র পাশে তাঁর দাফনের অনুমতি নেওয়ার জন্য। তিনি অনুমতি দিলে মৃত্যুর পর তাঁকে সেখানে তাঁর সাথিদ্বয়ের পাশে কবর দেওয়া হয়। তাঁর জানাজার নামাজ পড়ান সুহাইব আর-রুমি রাদিয়াল্লাহু আনহু। শাহাদতকালে তাঁর বয়স ছিল আপন সাথিদ্বয়ের বয়সের মতো—৬৩ বছর।

সূত্র
সহিহ বুখারি— হাদিস নং: ৮২, ৩৪৬৯, ৩৬৫৫, ৩৬৭১
সুনানে তিরমিযি— হাদিস নং: ৩৬৮১, ৩৬৮২, ৩৬৮৬
সুনানে ইবনু মাজাহ— হাদিস নং: ৩৫৫৮
সুনানে বায়হাকি— ৪/৩০১
তাবাকাত ইবেনে সা’দ— ৩/২৪৫
হিলয়াতুল আওলিয়া— ১/৩৮
আল ইসাবাহ— ৪/৪৮৪
সিফাতুস সাফওয়াত— ১০৩
উসদুল গাবাহ— ৮৯৭
আল ইসতিআব— ৪৭৩
উমর ইবনুল খাত্তাব— আ’লামুল মুসলিমিন- ৯৭

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

error: Content is protected !!