শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০

আবু হুরায়রা : সর্বাধিক হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবি

0

ইয়েমেন। দাউস গোত্র।
পাহাড়ের পাদদেশে বেশ কয়েকটা পল্লি নিয়ে দাউস গোত্রের বসবাস। বিশাল জায়গা জুড়ে ছিমছাম অনেকগুলো বাড়ি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
গোত্রপ্রধানদের ঘরগুলো সীমানা-প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। ছাদে মাটি ও পাথরের গাঁথুনি। খানিকটা রঙচটা। বসত ঘরগুলোতে আবার সাদা চুনকাম করা।
নিন্মবিত্তদের মাটি-পাথরের দেয়ালের ঘরে খেজুর পাতার ছাউনি। পুরনো দেয়ালের পাথরগুলো যেন হা করে তাকিয়ে আছে।
অধিকাংশের বাড়ির সামনে শুকিয়ে যাওয়া দু-তিনটা করে বাবলা বৃক্ষ দাঁড়িয়ে নিজেদের ক্ষীণ অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে। ফটক দিয়ে ঢুকলে একপাশে চোখে পড়ে পানির কোয়া। অন্যদিকে মেষ আর দুম্বার আস্তাবল। নেতিয়ে পড়া কিছু ঘাস। ব্যবহৃত কৃষিকাজের যন্ত্রপাতি।
এই গোত্রের আশপাশে অন্যকোনো জনবসতি নেই। উপত্যকা থেকে দূরে তাকালে শূন্য মরুভূমি চোখে ভাসে। যেন দূরের পাহাড়গুলি ঢেউ খেলে দিগন্তে মিশে গেছে। উঁচু-নিচু পাহাড়গুলির মাঝ দিয়ে দুর্গম পথ। এবড়ো-থেবড়ো পাথুরে উপত্যকাভূমি।
সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি—সূর্যের সীমাহীন তেজে সারাটা দিন প্রচণ্ড গরম থাকে মরুভুমিতে। অবশ্য রাতে আবার নেমে আসে শীতলতা।
সূর্য এখন ডুবে যাচ্ছে প্রায়।
পড়ন্ত বিকেলে পশ্চিম পাহাড়ের গা ছুঁয়ে দিচ্ছে লাল সূর্যটা। বাগানের খেজুর গাছগুলোর ছায়া ক্রমশ প্রলম্বিত হতে হতে হারিয়ে যাচ্ছে দোয়ালের ওপাশে। খানিকটা শীতল হয়ে এসেছে শরীর ।
সবুজ চারণভূমিতে পশু চরানো এখানকার অধিবাসীদের প্রধান কাজ। নেতা গোছের কেউ কেউ ব্যবসাও করে। সকালে তারা বেরিয়ে যায় উট-ভেড়া-দুম্বা নিয়ে। সারাদিন চরিয়ে বেড়ায় চারণভূমিতে। সন্ধ্যায় পল্লিতে ফিরতে ফিরতে নানা কথা জমায় রাখাল বা দাসেরা।
সারাদিন রোদে পোড়া শরীরকে জাগিয়ে তুলে কেউ আবার শরাবখানাতেও আসর জমায়। মরু বিয়াবানের মতোই রুক্ষ্ম তাদের স্বভাব।

চারণভূমি থেকে উট, বকরি আর দুম্বার পাল নিয়ে বাড়ি ফিরছে রাখালেরা। পাহাড়ের দক্ষিণ দিক থেকে নেমে আসা ঝর্ণার পানি সওয়ারিদের পরিমাণ মতো পান করিয়ে নিল, নিজেরাও পান করল কতকটা।
অদূরে উত্তর দিকে বিস্তীর্ণ উপত্যকায় ধূসর লতার মতো গজিয়ে ওঠা পাহাড়ি ঘাসের ভূমিতে সারাদিন ছাড়া ছিল এ পশুগুলি।
‘হে বিড়ালের বাপ!’
কিছু ছেলে দুষ্টুমি করে জোরে জোরে ঢাকছে আবদে শামসকে।
বাড়ির গলিতে প্রবেশ করার আগ পর্যন্ত পেছন থেকে আওয়াজটা বার কয়েক এলো।
বারো-তের বছরের আবদে শামস খুব সন্তর্পণে হাঁটছেন। পা ফেলছেন ধীরে ধীরে। আস্তে হাঁটার কারণ অবশ্য নিজ ইচ্ছায় না। কোলের উপর উঁকি-ঝুকি মারা ছোট্ট বিড়ালটা। বরং এখন আরও জোরে হাঁটা দরকার। আজ খেলা থেকে ফিরতে একটু দেরিই হয়ে গেল। বাবলা গাছের ডালে বিচিত্র পাখিরা সন্ধ্যার আগমনী বার্তা দিচ্ছে।
বাড়ির ভেতর প্রবেশ করে হাতে থাকা বিড়াল ছানাটা ছুড়ে মারলেন খড়ের উপর। ছাড়া পেয়ে বার কয়েক মিউ মিউ করে উঠল সে। এরপর দৌড় দিলো বাড়ির ভেতর।
গায়ের মোটা জুব্বাটা খুলে রশিতে ঝুলিয়ে দিলেন আবদে শামস। বাড়ির দাসটা কয়েকদিন যাবৎ অসুস্থ। টুকটাক, হাল্কা-ভারি কাজ সব তাঁকেই করতে হচ্ছে এ কদিন ধরে। আস্তাবলের দিকে যেতে যেতে মনে মনে তিনি বিরক্তিকর কিছু শব্দ আওড়ালেন।
এই বিড়াল ছানার জন্যই সমবয়সী বন্ধুদের মাঝে তাঁর নাম ‘বিড়ালের বাপ’। অনেক ছোট থেকেই বিড়ালের সাথে তাঁর খুব সখ্য। সারাদিন সাথে সাথেই রাখেন একটি বিড়াল। নরম তুলতুলে ছানাটার সাথে খেলতে ভালোই লাগে।
যার কারণে পিতামাতার রাখা ‘আবদে শামস’ নামটা ঢাকা পড়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। সবার কাছে দিনদিন আবু হুরায়রা (বিড়ালের বাপ) নামে পরিচিত হয়ে উঠছেন তিনি।
দিন যায়, মাস আসে। এভাবে বছরের ঘূর্ণায়নে পৃথিবী আপন কক্ষপথে ঘুরতে থাকে নিয়ম মেনে।
আর এদিকে মাটি গজিয়ে ওঠা অশ্বত্থের মতো ক্রমশ বড় হতে থাকেন আবদে শামস।
পৃথিবীর পরবর্তী ইতিহাসে যাঁকে স্মরণ করা হয় মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া এই নামে।
পৃথিবীরর দক্ষিণ মেরু থেকে উত্তর মেরু, যেখানেই হাদিসের দরসগাহ, যেখানেই মুসলিম স্কলার, আর যেখানেই মুহাদ্দিসদের মিলনমেলা, সবখানে যাঁকে প্রতিনিয়ত স্মরণ করা হয়, হচ্ছে নবি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের যোগ্য প্রতিনিধি হিসেবে।
তিনি হলেন আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু। আশ্চর্য রকমের ধী শক্তির অধিকারী ছিলেন। কোনো আলোচনা বা কথাবার্তা শোনার সাথে সাথেই সংরক্ষণ করে নিতেন। শতদিন অতিবাহিত হয়ে গেলও সেই কথায় একটুও হেরফের হতো না। স্মৃতিশক্তির এই অসাধারণ যোগ্যতাই তাঁকে দিয়েছে শ্রেষ্ঠ হাদিস বর্ণনাকারীর মর্যাদা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সাহাবিদের মাঝে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে বেশি হাদিস বর্ণনাকারী।

***
সপ্তম হিজরি। মুহাররাম মাস।
মদিনা মুনাওয়ারাহ।
দাউস গোত্রের একটি প্রতিনিধিদলের সাথে নবিজির সাক্ষাতে এসেছেন যুবক আবু হুরায়রা। তিনি স্বীয় গোত্রপ্রধান প্রখ্যাত সাহাবি তুফায়েল ইবনু আমর আদ-দাওসি রাদিয়াল্লাহু আনহুর দাওয়াতে সম্প্রতি ইসলামগ্রহণ করেছেন।
কুশল বিনিময় পর্বে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার নাম কী?’
‘আবদে শামস।’ উত্তর দিলেন আবু হুরায়রা। আবদে শামস মানে হচ্ছে সূর্যের দাস।
নবিজি কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তারপর বললেন, ‘নাহ, আজ থেকে তোমার নাম হবে আবদুর রহমান।’ আবদুর রহমানের মানে হচ্ছে দয়াময় প্রভুর বান্দা।
আবু হুরায়রা যেন এমন কিছুর জন্যই প্রস্তুত ছিলেন। আনন্দচিত্তে তিনি বললেন, ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ, আপনার জন্য আমার পিতা-মাতা কুরবান হোন। আপনার কথামতই আজ থেকে আমার নাম আবদুর রহমান।’
সেই দিন থেকেই তিনি নিবচ্ছিন্নভাবে রাসুলের সাহচর্য অবলম্বন করেন। নবিজির মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এ সুহবত ত্যাগ করেননি।
দিন রাত চব্বিশ ঘণ্টাই মসজিদে নববিতে পড়ে থাকতেন।
নবিজির জীবদ্দশায় তিনি দাম্পত্য জীবনেও প্রবেশ করেননি। আসহাবে সুফফার পবিত্র জামাতের সাথে মিলে গিয়েছিলেন। তিন বছরের বেশি সময় ধরে তিনি এ আসহাবে সুফফার একনিষ্ঠ ছাত্র হিসেবে জীবন কাটিয়েছেন। এ সময়টাতে বিপদ- মুসিবত, শত পেরেশানি, ক্ষুধা-পিপাসা, অন্ন-বস্ত্রে স্বল্পতা—কিছুই তাঁকে টলাতে পারেনি। দাঁতে দাঁত চেপে ধৈর্য ধারণ করে থেকেছেন। আর গ্রহণ করেছেন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের মুখনিঃসৃত অমীয় বাণী।
পরে আস্তে আস্তে এই দারিদ্র্য অবস্থার অবসান ঘটে। চতুর্দিক হতে মুসলমানদের হাতে ধন-সম্পদ আসতে শুরু করলে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু অর্থ-সম্পদের অধিকারী হলেন। সেই সঙ্গে পেলেন স্ত্রী-পরিজন ও সন্তান-সন্ততিও। কিন্তু এসব কিছুই তাঁর স্বাভাবিক জীবনে প্রভাব ফেলতে পারেনি।
যখন জীবনে কিছু স্থিরতা আসল, তখন তিনি অতীতের স্মৃতিচারণ করতেন এভাবে—‘আমি ইয়াতিম অবস্থায় বড় হয়েছি। খালি হাতে হিজরত করেছি। পেটে-ভাতে বসরা শহরে গাযওয়ান গোত্রের মজদুরি করেছি। তারা কোথাও তাঁবু ফেললে তাদের কাজগুলো করে দিতাম। উটে আরহণ করলে আমি লাগাম টানতাম। অবশেষ আল্লাহ আমাকে সচ্ছলতা দিয়েছেন। যে বসরায় আমি একদিন মজদুরি করেছিলাম, সেখানকার শাসক বানিয়ে দিয়েছেন।’
রাসুলের ইন্তেকালের পর তিনি যখন ব্যাপকভাবে হাদিস বর্ণনা করতে লাগলেন, অনেকের ভেতরই এ বিষয়ে কৌতূহল জাগে। একদিন তাঁকে ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলো, তিনি উত্তর দিলেন এভাবে—তোমরা আশ্চর্য হয়ে বলতে থাকো যে, আবু হুরায়রা বেশি হাদিস বর্ণনা করে। আমার মতো হিজরত করে আসা লোকদের আরও কেউই তো এতো পরিমাণ হাদিস বর্ণনা করতে পারছেন না। শুনে রাখো, আমার ব্যাপারে আল্লাহ সাক্ষী। মুহাজির সাহাবিরা তাঁদের ক্ষেত-খামার দেখাশোনায় সময় ব্যয় করতেন বেশি। আর এদিকে আমি ছিলাম এক মিসকিন ব্যক্তি। নিজের পেট ভরানো ছাড়া আমার আর কোনো কাজ ছিল না। এজন্য নবিজির সাহচর্যে থাকার সৌভাগ্য আমার বেশি হয়েছে। অন্যরা যখন কাজের জন্য উপস্থিত থাকতে পারতেন না, আমি তখন উপস্থিত থাকতাম। অন্যরা নবিজির কথা ভুলে গেলেও আমি স্মরণ রাখতাম।’
একদিন নবিজি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে এমন আছে যে, সর্বদা আমি বসার জন্য স্বীয় চাদর বিছিয়ে দেবে এবং মজলিস শেষে তা আবার উঠিয়ে নেবে? যে একাজের দায়িত্ব নেবে—সে আমার মুখ থেকে শোনা কোনো কথা ভুলবে না।’
আবু হুরায়রা বলেন, ‘নবিজির এ আহ্বান শুনে আমি উঠে গিয়ে নিজ চাদর বিছিয়ে দিলাম। অনেক কথাবার্তার পর মজলিস শেষ হলো। আমি আবার চাদর গুটিয়ে নিলাম। আল্লাহর কসম, তারপর থেকে আমি নবিজির কাছ থেকে শুনেছি এমন কোনো কথা ভুলিনি।’

জ্ঞান অর্জনের প্রতি খুব বেশি পরিমাণের অগাধ ভালোবাসা ছিল তাঁর। ইতিহাস গ্রন্থে এ নিয়ে চমকপ্রদ একটি ঘটনা আছে।

একদিন বিকেল।
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু কী এক কাজে মদিনার বাজারে গেলেন। তখন বাজার বেশ জমে উঠেছে। কেনা-বেচার হাকডাক সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষ খুব মনোযোগ নিয়ে পণ্য কেনাবেচা করছে। লেনদেনে মানুষকে এত ব্যস্ত দেখে তিনি বিস্মিত হলেন।
এক জায়গায় থমকে দাঁড়িয়ে জোরে ঘোষণা করলেন, ‘হে মদিনাবাসী, তোমরা বিরাট জিনিস থেকে বঞ্চিত হচ্ছ।’
তাঁর এই ঘোষণা শুনে জনগণ থমকে দাঁড়াল। বিস্ময়ঘোর থেকে বেরিয়ে এসে একজন বলল, ‘আবু হুরায়রা, আপনি আমাদের বঞ্চিত হওয়ার কী দেখলেন?’
‘নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম এই মুহূর্তে মিরাস বণ্টন করছেন, আর তোমরা বাজারে ঘোরাফেরা করছ!’
‘কোথায়?’ জনতা চিৎকার করে বলল।
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু কিছুটা দম নিয়ে বললেন, ‘মসজিদ নববিতে।’
এ কথা শুনেই মানুষ মসজিদের দিকে দৌড় দিল হুড়মুড় করে।
কাহিনির পরবর্তী অংশ দেখার জন্য তিনি বাজারেই দাঁড়িয়ে রইলেন। কিছুক্ষণ পর লোকেরা বিরস মুখে ফিরতে লাগল। একজন মুখ কালো করে তাঁকে জিজ্ঞেস করল, ‘আবু হুরায়রা, আমরা তো মসজিদে নববিতে গেলাম। কই? কোনো মিরাস তো বণ্টিত হতে দেখলাম না!’
‘মসজিদে তোমরা কাউকে দেখোনি?’ আবু হুরায়রা বললেন।
‘হ্যাঁ দেখেছি, কিছু লোক নামাজ পড়ছে। কেউ কুরআন তেলাওয়াত করছে। আবার কাউকে দেখলাম হালাল-হারাম বিষয়ে পরস্পর আলোচনা করছে।’
আবু হুরায়রা খুব কষ্ট পেলেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘তোমরা ধ্বংস হও। এটাই তো রাসুলের মিরাস।’

***
মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামল।
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু মদিনার গভর্নর তখন।
এক সকালে কিছু লাকড়ির বোঝা কাঁধে নিয়ে তিনি বাড়ি ফিরছিলেন। পথিমধ্যে সামনে পড়লেন সালাবা ইবনু মালিক। সালাবা যেভাবে পথ চলছিলেন, বাকি পথদিয়ে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুর জন্য বোঝা নিয়ে সামনে যাওয়া কষ্টকর ছিল। তাই তিনি সালাম দিয়ে বললেন, ‘সালাবা, আমিরের জন্য পথটা একটু ছেড়ে দাও।’
‘আল্লাহ আপনার ওপর রহম করুন। এত প্রশস্ত পথ দিয়েও আপনি যেতে পারছেন না!’ প্রতিউত্তরে বললেন সালাবা।
‘তোমাদের আমিরের জন্য না, তাঁর পিঠের বোঝার জন্য পথটা প্রশস্ত করে দাও।’
তখন পেছন ফিরেই সালাবা চমকে উঠলেন। আমিরের এই সাদেগি আর সরলতা তাঁকে বিস্মিত করল।

অগাধ জ্ঞান, সীমাহীন উদারতা ছাড়াও তাঁর ছিল প্রবল আল্লাহভীতির গুণ। সারাদিন রোজা রাখতেন এবং রাতের অধিকাংশ সময় ইবাদতে মশগুল থাকতেন।

একদিনের ঘটনা।
তাঁর মেয়ে এসে অভিযোগ করে বললেন, ‘বাবা, আমার অন্য বান্ধবীরা আমাকে লজ্জা দেয়। তারা বলে, তোমার পিতা মদিনার শাসক হওয়া সত্ত্বেও তোমাকে সোনার গহনা পরতে দেয় না।’
মেয়ের এ কথার উত্তরে তিনি বললেন, ‘বেটি, তোমার সাথিদের বলে দাও, আমার আব্বা জাহান্নামের লেলিহান শিখাকে ভয় করেন। মেয়েকে গহনা না দেয়ার কারণ, সম্পদের প্রতি লোভ বা কৃপণতা নয়।’

পরীক্ষা করার জন্য খলিফা মারওয়ান একরাতে একশ দিনারের একটি থলে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু’র কাছে পাঠালেন। কিন্তু পরদিন সকালেই আবার স্বীয় লোকমারফত সংবাদ পাঠালেন যে, ‘আমার চাকর ভুল করে আপনাকে টাকাগুলো দিয়ে ফেলেছে। আমি মূলত অন্য আরেকজনকে দিতে চাচ্ছিলাম।’
এ কথা শুনে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু খুব লজ্জিত ও বিস্মিত হলেন। মাথা নিচু করে লজ্জিত স্বরে বললেন, ‘কাল রাতেই তো আমি সবগুলো দিরহাম গরিব-মিসকিনদের বণ্টন করে দিয়েছি। এখন আমার কাছে একটি টাকাও নাই। আচ্ছা ভাই, আপনার মনিবকে গিয়ে বোলো, আগামীকাল সরকারি কোষাগার থেকে মাসিক ভাতা তুলেই আমি এই পাওনা পরিশোধ করে দেবো ইনশাআল্লাহ।’

দুনিয়াবিমুখ এই রাবি সাহাবির এরকম আরও অনেক আশ্চর্য কাহিনি ইতিহাসে সোনার হরফে লিখিত আছে।

***
৫৯ হিজরি।
জীবনের ৭৮টা বসন্ত একে একে পার করে এসেছেন আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু। এখন তিনি অন্তিম শয্যায় শায়িত। কিছুক্ষণ পরপর ব্যাকুল হয়ে কাঁদছেন। খলিফা মারওয়ান এসেছেন দেখা করার জন্য। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু’র এই অবস্থা দেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কাঁদছেন কেন?’
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘আমি এই দুনিয়ার জন্য কাঁদছি না। আমি কাঁদছি দীর্ঘ ভ্রমণের স্বল্প পাথেয়ের জন্য। পৃথিবীর যে রাস্তাটি জান্নাত বা জাহান্নামে গিয়ে শেষ হয়েছে, আমি তার দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত। অথচ জানি না কোন রাস্তা দিয়ে আমি প্রবেশ করব।’
এ কথা শুনে খলিফা মারওয়ান বললেন, ‘আল্লাহ আপনাকে শিফা দান করুন।’
এ কথার উত্তরে তিনি দুআ করলেন, ‘হে আল্লাহ, আমি আপনার দিদার ভালোবাসি। আমাকে আপনার দিদার দ্রুত নসিব করুন।’
খলিফা মারওয়ান সাক্ষাৎ শেষ করে সবে বাইরে এসেছেন, আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু পৃথিবী ত্যাগ করে তখন তাঁর রবের দিদাদের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন।
জান্নাতুল বাঁকিতে তাঁকে চিরতরে সমাহিত করা হয়। তাঁর জানাজা ও দাফন সম্পন্ন করে যখন লোকেরা ফিরছিল, তখন তাঁদের মুখে ওই হাদিসগুলো উচ্চারিত হচ্ছিল যেগুলো তিনি নবিজি থেকে বর্ণনা করতেন।

রচনাটি রিজালুন হাওলার রাসুল ও সুওয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবা অবলম্বনে লিখিত

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

error: Content is protected !!