শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০

আবদুল্লাহ ইবনু আমের ইবনি কুরাইজ : খুরাসান বিজেতা সাহাবি

0

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের পর কেটে গেছে চারটি বছর। সে বছর মক্কার বনু শামস গোত্রে আমের ইবনু কুরাইজ আল-আবশামির ঘরে জন্ম নিল শুভ্র সুন্দর এক শিশু। তিন বছর পর সপ্তম হিজরিতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় এলেন উমরাতুল কাজার উদ্দেশ্যে। সেদিনের সেই ছোট্ট শিশুর বয়স এখন তিন। গুটিগুটি পায়ে হাঁটতে শিখেছে সবে। তাঁকে নিয়ে আসা হলো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে। রাসুল তাঁকে দেখে বনু শামসকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘এ তো দেখছি আমারই মতো। তোমাদের চেয়ে আমার সাথে এর সাদৃশ্যতা বেশি।’ এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিশুটির মুখে তাহনিক করলেন। ছোট্ট শিশুটি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বরকতময় লালা গিলতে শুরু করল। রাসুল তা দেখে তাঁকে দুআ করলেন। বললেন, ‘আশা করি আল্লাহ তাআলা তাঁকে পানি থেকে বঞ্চিত করবেন না।’ এরপর সেই ছোট্ট শিশুটি যেখানেই গিয়েছে সেখানেই সে পেয়েছে পানির সন্ধান। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুআ কখনো বিফল হতে পারে না। [তাবাকাতু ইবনি সাদ, আল-ইসাবাহ—ইবনু হাজার আসকালানি]
সেদিনের সেই ছোট্ট শিশুটির নাম আবদুল্লাহ ইবনু আমের ইবনি কুরাইজ। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু’র মামাতো ভাই। অল্প কয়েক বছর পরেই সেই ছোট্ট শিশুটিকে দেখা যাবে বসরার গভর্নর পদে। যাঁর হাত ধরে বিজয় হবে সমগ্র খুরাসান (আফগানিস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান)। যাঁর পদতলে লুটাবে পারস্য, সিজিস্তান। তাঁর হাতেই হবে পারস্যের কিসরার মুণ্ডুপাত। আরাফার ময়দানে হাজিদের তেষ্টা মেটাতে তাঁকেই দেখা যাবে প্রথম হাউজ খনন করতে এবং তাতে পানি প্রবাহের ব্যবস্থা নিতে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামই তো তাঁকে দুআ করে বলেছিলেন, ‘সে কখনো পানি থেকে বঞ্চিত হবে না। তাঁর মাধ্যমে লোকেরা পাবে পানির ক্ষেত্র।’
২৯ হিজরি। চলছে উসমান ইবনু আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহু’র খেলাফত। ইসলামি সাম্রাজ্যের সীমানা হয়েছে বিস্তৃত। রোমকদের কাছ থেকে সিরীয় অঞ্চল অধিকৃত হয়েছিল উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালেই। বিস্তৃত হয়েছে সুদূর ইউরোপ এবং আফ্রিকা পর্যন্তও। পারস্যের কিছু অঞ্চলও এসেছে মুসলমানদের করতলে। তবে মধ্য-এশীয় অঞ্চলে তখনো ইসলাম ছড়াতে শুরু করেনি। এমনই সময়ে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনি কুরাইজকে বসরা এবং পারস্যের বিজিত অঞ্চলসমূহের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ করেন। অতঃপর তিনি রওনা হন শামের দিকে। সেখানে অবস্থান করছেন মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু। মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে গেলে তিনি আবদুল্লাহ ইবনু আমের রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে নিজ মেয়ে হিন্দার বিবাহ সম্পন্ন করেন। [সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, তারিখে তবারি]
কাদিসিয়ার যুদ্ধে বিশাল পরাজয়ের পর পারসিকরা আবার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে ইয়াজদগরিদ ইবনু শাহরিয়ার ইবনি কিসরার হাত ধরে। এমনই সময়ে তাদের মাঝে দুঃস্বপ্ন হয়ে আসেন আবদুল্লাহ ইবনু আমের ইবনি কুরাইজ রাদিয়াল্লাহু আনহু। প্রথমেই তিনি জয় করে নেন পারস্যের এস্তেখার শহর। এ শহরে মুসলিম বাহিনী এবং পারসিকদের মধ্যে হয় তুমুল লড়াই। নিহত হন অন্যতম সেনাপতি আবদুল্লাহ ইবনু মামার রাদিয়াল্লাহু আনহু’র মতো সাহাবি। [সিয়ারু আ’লামিন নুবালা]
অতঃপর তিনি আরেক সাহাবি আবদুর রহমান ইবনু সামুরা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে পাঠিয়ে দেন সিজিস্তান অভিমুখে (সিজিস্তান হচ্ছে অধুনা বিলুপ্ত ঐতিহাসিক অঞ্চল। এর অধিকাংশ আফগানিস্তানে, কিছু অংশ পাকিস্তান এবং ইরানে।)। তিনি সন্ধিচুক্তির মাধ্যমে সে অঞ্চল বিজিত করে নেন। অতঃপর তিনি জয় করে নেন হেলমান্দের দাওয়ার নামক অঞ্চল। [তবাকাতু ইবনি সাদ]
এবার আবদুল্লাহ ইবনু আমের রাদিয়াল্লাহু আনহু’র মনোযোগ নিবদ্ধ হয় খুরাসানের প্রতি। তাঁকে বলা হয় কিসরার বংশধর ইয়াজদগরিদ এবং তাঁর সৈন্যরা সেখানেই অবস্থান করছে। নাহাওয়ান্দের যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর তারা নিজেদের খাজানা বহন করে নিয়ে গেছে সেখানে। ইবনু আমের রাদিয়াল্লাহু আনহু অনুমতি চেয়ে চিঠি পাঠান উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু’র কাছে। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে অভিযান পরিচালনার অনুমতি প্রদান করেন। অনুমতি পেয়ে তিনি সেনাবাহিনী নিয়ে বেরিয়ে পড়েন এস্তেখারের পথ ধরে। অতঃপর পথিমধ্যে জয় করে নেন নিশাপুর এবং ইস্পাহানের মধ্যবর্তী তাবাস শহর। এবার তাঁর গন্তব্য মারভের উদ্দেশ্যে (মারভ হচ্ছে বর্তমান তুর্কমেনিস্তানের রাজধানী আশখাবাদ। মারভ নামে পূর্বে পাশাপাশি দুটি শহর ছিল।)। এরপর তিনি পরিচালনা করেন আরও কিছু অভিযান। একের পর এক বিজিত হয় বাদগিস, সারাখস, নিশাপুর, তুস এবং আরও কিছু শহর। এভাবে বিজিত হয়ে যায় প্রায় পুরো খুরাসান অঞ্চল। বর্তমান আফগানিস্তানের সিংহভাগ অঞ্চল চলে যায় মুসলিমদের দখলে। এরপর নিশাপুর থেকে তিনি শুকরিয়া জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে হজের উদ্দেশ্যে ইহরাম বেঁধে মক্কা অভিমুখে সফর করেন। হজ শেষে পুনরায় খুরাসানে ফিরে এসে জয় করে নেন কাবুল এবং জাবুলিস্তান। এভাবে খুরাসান তথা আফগানিস্তান, তুর্কমেনিস্তান এবং পারস্য অঞ্চল সম্পূর্ণরূপে মুসলিম বাহিনীর হাতে বিজিত হয়ে যায়। এই বিজয়যাত্রায় সেনাপতি আহনাফ ইবনু কায়েস রাদিয়াল্লাহু আনহু প্রমুখগণের ছিল অগ্রগন্য অবদান। (তবাকাত, ৪/৩১)
আবদুল্লাহ ইবনু আমের রাদিয়াল্লাহু আনহু উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু’র শাহাদাত পর্যন্ত বসরা এবং পারস্যের প্রশাসক পদে বহাল ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন উদার মনের ব্যক্তি। ইসলামি ইতিহাসের বিজেতাগণের মধ্যে তাঁকে অন্যতম হিসেবে গণ্য করা হয়। বিজয়যাত্রার পাশাপাশি শাসিত অঞ্চলের উন্নয়নেও তিনি কোনো কমতি করেননি। বসরার খাল তিনিই খনন করিয়েছিলেন। আরাফার ময়দানে হাজিদের জন্য তিনিই হাউজ খনন করিয়েছিলেন এবং খাল খনন করিয়ে হাউজের সাথে সংযুক্ত করেছিলেন। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু’র মৃত্যুসংবাদ শুনে তিনি মক্কায় চলে আসেন। এখানে এসে তিনি তালহা, যুবায়ের এবং আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে সংযুক্ত হন। তাঁরা তখন শামের উদ্দেশ্যে সফর করছিলেন। তিনি তাঁদেরকে বলেন বসরার উদ্দেশ্যে সফর করতে। সেখানে রয়েছে তাঁর অবদান এবং জনবল। তাঁদের সাথে তিনি জঙ্গে জামালে শরিক হয়েছিলেন। এ যুদ্ধের পর তিনি দামেস্কে চলে যান এবং সেখানেই অবস্থান করেন। মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু’র শাসনকালে পুনরায় বসরার প্রশাসক হিসেবে নিযুক্ত হন। তিন বছর প্রশাসক থাকার পর মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে অব্যহতি দেন। অতঃপর ৫৭ মতান্তরে ৫৮ হিজরিতে তিনি ইন্তেকাল করেন।
তাঁকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ করায় শিয়ারা উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু’র বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ এনেছিল। অথচ প্রকৃতপক্ষেই আবদুল্লাহ ইবনু আমের রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন এ পদের জন্য যোগ্য। একজন প্রশাসক হিসেবে আবদুল্লাহ ইবনু আমের রাদিয়াল্লাহু আনহু’র সামরিক, প্রশাসনিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক অবদান কিছুতেই কম নয়।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

error: Content is protected !!