রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১

সাহাবি আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ : উম্মাহর বিশ্বস্ত ব্যক্তি

0

নিঃশঙ্ক যোদ্ধার মতো এগিয়ে যাচ্ছেন একজন বীর শার্দূল। শিরকের সকল নিশানা নিশ্চিহ্ন করে এ পৃথিবীর বুকে হকের আজান দেয়ার তাঁর তীব্র আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু সাহাবায়ে কেরামের সারিতে তাঁর মতো যোদ্ধার লড়াইটা একটু ভিন্ন। মনে একটু তোলপাড় সৃষ্টি করবার মতোই হয়তো। কারণ, প্রতিপক্ষের সারিতে চিরঘৃণিত মুশরিকদের সাথে রয়েছেন তাঁর মমতাময় পিতাজান আবদুল্লাহ ইবনুল জাররাহ। অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকা পিতার এ অবস্থায় পুত্রের মন হাহাকার করলেও পিতা যেন তাঁর অসাড় চিন্তার তাগিদে পূর্বের মতোই বিদ্বেষপ্রবণ। তাওহিদের মর্মস্পর্শী বক্তব্যে একটিবারের জন্যও গলে না তাঁর মন। ধাবিত হয়ে ছুটে না মহাসত্যের দিকে।
আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ ততক্ষণে রণাঙ্গনের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছেন। তাঁর অসামান্য রণকুশলী বীরত্বে মুশরিকরা তাঁকে এড়িয়ে চললেও কেউ যেন একজন তাঁকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে বারেবারেই সুযোগ খুঁজছে। দীর্ঘসময় তাঁকে এড়িয়ে চলার পর একসময় যখন সুযোগসন্ধানী ব্যক্তিটি আক্রমণের দুঃসাহস করেই ফেলল, উন্মুক্ত তরবারি হাতে কদম বাড়ালেন এবার আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ। ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে হলেও এবার সুরাহা তিনি করবেনই। এক ঝটকায় দ্বিখণ্ডিত করে ফেললেন মাথাটা। ছিট করে ফিনকি দিয়ে উঠলো একদলা রক্ত। উপুড় হয়ে পড়ে রইল তাঁরই সামনে নিথর, স্থবির এবং দুর্ভাগা একটি অপবিত্র দেহ।
কিন্তু পড়ে থাকা এ দেহটি আসলে কার? নিশ্চিত জেগে ওঠা এরকম প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেয়ে বড় প্রসঙ্গ হচ্ছে ‘আল হুব্বু ফিল্লাহ, আল বুগদু লিল্লাহ’র সঠিক প্রয়োগ। আর তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আজ স্থাপিত হয়েছে যেন বদর-প্রান্তরে। আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের জন্য উৎসর্গিত হয়ে তাওহিদের মর্মবাণী প্রচারের প্রচেষ্টায় পিতার ভালোবাসাও হয়ে গেছে এক ঠুনকো বিষয়।
নিজের সর্বত্র উজাড় করে দেয়া এ মহান সাহাবি ৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে কুরাইশ গোত্রের বনু হারিস ইবনে ফিহর গোত্রে আবদুল্লাহ ইবনুল জাররাহর ঘরে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। মাতা উমাইমাহ বিনতে গানাম মুসলমান হলেও পিতার ভাগ্যে জুটেনি তাওহীদের উপর বিশ্বাস স্থাপনের মহাসৌভাগ্য। পূর্বেই আমরা সে পাঠ চুকিয়ে এসেছি। চোখ জুড়িয়ে যাওয়া চেহারার আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী আর লজ্জায় ভীষণ কাতর। কিন্তু চরিত্রের দিক থেকে নানারকম ঐশ্বর্যের ধারক হওয়ায় কঠিন পরিস্থিতিতে তাঁর ভূমিকা ঝাঁপিয়ে পড়া নেকড়ের মতো হলেও কেউ অবাক হতেন না। কারণ সময়ের চাহিদাকে প্রাধান্য দেয়াই তো বুদ্ধিমানের পরিচয়। বিশ্বস্ততার মাপকাঠিতে তাঁর পরিচয় তো দিয়েছেন খোদ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। স্পষ্ট বাক্যে বলেছেন «إن لكل أمّة أميناً، وإن أميننا أيتها الأمة: أبو عبيدة بن الجراح». অর্থাৎ–‘প্রত্যেক জাতির একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি রয়েছে আর এ জাতির বিশ্বস্ত ব্যক্তি হলেন আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ।
সেইসাথে তাঁর চারিত্রিক প্রশংসার কথাও এসেছে আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর বক্তব্যে। তিনি বলেছিলেন—‘কুরাইশের তিন ব্যক্তি চেহারায় ছিলেন সমুজ্জ্বল, চরিত্রে ছিলেন মোহময় আর লজ্জায় ছিলেন দৃঢ়তর। যদি তাঁরা তোমাদের সাথে কথা বলেন, মিথ্যা বলবেন না। আর যদি তোমরা তাঁদের সাথে কথা বলো, তবে তোমাদেরকে মিথ্যাবাদী বলবেন না। তাঁরা হলেন আবু বকর, উসমান ইবনু আফফান এবং আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ রাদিয়াল্লহু আনহুম।’
আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ ইসলামগ্রহণে অগ্রণী ভূমিকায় থাকা ব্যক্তিদের অন্যতম ছিলেন। বলা হয় আবু বকর আস-সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহুর পরদিনই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। দারুল আরকামে একে একে সমবেত সাহাবি চল্লিশজন হবার অনেক আগেই তিনি সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন একজন পুরোদস্তুর মুসলিমের পরিচয়ে। নবুওয়াত-পরবর্তী দাওয়াতের কাজ চুপিসারে চলাকালীন তিনি ছিলেন নকিজির উল্লেখযোগ্য সঙ্গী। সেইসাথে নাজিলের প্রথম প্রহরেই হিফজ করে নিতেন কালামুল্লাহ। মাক্কি জীবনের এ সময়ে পৃথিবীর বুকে চিরসত্য দ্বীনের আবির্ভাব মেনে নিতে না পেরে কুরাইশ কাফেরদের অত্যাচারের যে ইতিহাস রচিত হয়েছিল তখন, ধৈর্যের সবটা দিয়ে আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ নিজের নাম সোনার হরফে লিখে প্রমাণ করেছিলেন—তাওহিদের মর্মবাণী কতটা মজাদার এবং কী অভূতপূর্ব সত্য মিশে আছে এর সাথে, যার সামনে যাবতীয় অত্যাচার আর হিংস্রতা যেন খুবই তুচ্ছ। যেহেতু নিজ গোত্রের একমাত্র মুসলিম হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ হয়েছিল, তাই সবার সাথে সাথে তাঁকেও মাথা পেতে মেনে নিতে হয়েছে অত্যাচারের এই ধৃষ্ঠতা। একসময় নবিজির নির্দেশে অত্যাচারের হাত থেকে সাময়িক রেহাই খুঁজতে হিজরত করেছিলেন সুদূর আবিসিনিয়ায়।
কিন্তু অত্যাচারের এই প্রতিশোধ তিনি কিন্তু নিয়েছিলেন ঠিকই। মাদানি জীবনের নানান সময়ে, নানান মাধ্যমে বদলার কথা মনে রেখেছেন খুব। বদর প্রাঙ্গণে তাঁর হাত থেকে রেহাই পায়নি যেমনিভাবে একজন অত্যাচারী মুশরিক, তেমনই রেহাই পায়নি পিতৃপরিচয় লালন করা পিতাও। সবকিছু ছিঁড়েখুঁড়ে নিজেকে উন্মুক্ত করেছিলেন এক মহাবীর হিসেবে। সে থেকে ওফাত পর্যন্ত সবক’টি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে নবিজির একান্ত সহযোগী হিসেবে ছিলেন সবসময়। এ জন্যই কিনা নবিজির দৃষ্টিতে তাঁর মাকাম ছিল একটু ভিন্ন এবং উঁচু। কারণ ছিল কেবল তাঁর মুখের সেই উচ্চারণ—কুল্লুনা ফিদাকা ইয়া রাসুলাল্লাহ।
উহুদের প্রান্তরে যখন এক অনাকাঙ্ক্ষিত অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল, চারিদিকে মুশরিকদের চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছিল—‘মুহাম্মাদ কই, দেখিয়ে দাও তাকে, ধরে দাও তাকে’, তখন নবিজিকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দিয়ে আগলে রাখা দশজনের একজন ছিলেন আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ। নিজ দেহ পেতে দিয়ে প্রতিরোধ করেছিলেন ধারালো বর্শার আঘাত। একটিবারের জন্যও ভাবতে পারেননি তাদের দেহে প্রাণ থাকা সত্ত্বেও আঘাতে জর্জরিত হবে নবিজির পবিত্র শরীর। যুদ্ধশেষে দেখা গেল নবিজির সম্মুখভাগের চারটি দাঁত ভেঙে গেছে। ললাটে বিদ্ধ হয়েছে বর্মের দুটি আংটা। রক্ত বেরোচ্ছে ক্রমাগত। আবু বকর আস-সিদ্দিক আংটা দুটি টেনে তুলতে যেই এগিয়ে এলেন, চিৎকার করলেন আবু উবায়দাহ—‘আল্লাহর কসম হে আবু বকর, এ কাজ আপনি আমার জন্য ছেড়ে দিন।’ আবু বকর তাঁর পথ উন্মুক্ত করে দিয়ে সরে এলেন। তারপর আবু উবায়দাহ দেখে বুঝতে পারলেন হাত দিয়ে টেনে বের করলে নবিজির কষ্ট হবে। নবিজি ব্যথা পাবেন খুব। বাড়িয়ে দিলেন মুখখানা। দাঁত দিয়ে টেনে বের করতে চেষ্টা করলেন। একটি দাঁত দিয়ে সামনের আংটাটি তুলে আনলেন ঠিকই, কিন্তু একটি দাঁতও তাঁর ভেঙে পড়ে গেল সাথে সাথে। সামনের অপর আরেকটি দাঁত দিয়ে অন্য আংটায় কামড়ে ধরলেন, আংটার সাথে দ্বিতীয় দাঁতটিও পড়ে গেল নিচে। দাঁতগুলো খুলে পড়ে গেলেও যেন তাঁর মুখে ফুটে উঠল এক মহাতৃপ্তির হাসি। ফোকলা দাঁতের ফোঁকর দিয়ে মিষ্টি হাসির রেখায় বোঝা যাচ্ছিল আজকের এ দিনে যেন-বা অর্জিত হলো এক সৌভাগ্যের নতিজা।
নবিজি জীবিত থাকা-অবস্থায় প্রায় সবকটি গাযওয়ায় তিনি অংশগ্রহণ করেছেন। সেইসাথে তাঁর নেতৃত্বেও নবিজি ‘সারিয়ায়ে আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ, সারিয়ায়ে যাতুস সালাসিল ও সারিয়ায়ে খাবত-সহ একাধিক সারিয়াহ প্রেরণ করেছিলেন। কেননা সর্বক্ষেত্রে তাঁর বিশ্বস্ততার পরিচয় ছিল সর্বজনবিদিত।
নবিজির ওফাতের পর ঐতিহাসিক সাকিফার দিন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলছিলেন—‘হে আবু উবায়দাহ, আপনি আপনার হাত প্রসারিত করুন, আমি আপনার কাছেই বাইআত হব। কারণ আমি তো আপনার ব্যাপারে আল্লাহর রাসুলকে বলতে শুনেছি উম্মতের বিশ্বস্ত ব্যক্তি আপনিই।’ কিন্তু যিনি উম্মতের বিশ্বস্ত ব্যক্তির পরিচয় পেয়েছিলেন, তিনি কি হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন? না। স্পষ্টভাবেই বলেছিলেন, ‘আমার সে দুঃসাহস নেই যে আমি সে ব্যক্তির আগে কদম বাড়াব, যাঁকে আল্লাহর রাসুল ইমাম হবার নির্দেশ দিয়েছেন। আর আমাদেরকে দিয়েছেন তাঁর অনুসরণের নির্দেশ।’ সঙ্গে সঙ্গে তিনি আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাতে বাইআত গ্রহণ করলেন। মাথা পেতে মেনে নিলেন যাবতীয় দিকনির্দেশনা।
আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে এবং পরবর্তী সময়ে ঐতিহাসিক শাম বিজয়ের বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ ছিলেন সামনের সারির ব্যক্তিদের একজন। আবু বকর রাদিয়ল্লাহু আনহু যখন রোমের উদ্দেশ্যে সৈন্যদল প্রেরণের ইচ্ছা করলেন, ডেকে পাঠালেন চারজন ব্যক্তিকে; মুয়ায ইবনু জাবাল, শুরাহবিল ইবনু হাসানাহ, ইয়াযিদ ইবনু আবি সুফিয়ান এবং আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুম। আবু বকর এ চার নেতাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘আমি তোমাদেরকে এ দীর্ঘ সৈন্যদলের দায়িত্ব দিয়ে সুদূর শামের দিকে প্রেরণ করছি। তবে মনে রাখবে, যুদ্ধে সৈন্যদের পরিচালনার ক্ষেত্রে তোমাদের আমির হলেন আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ। তাঁর অনুপস্থিতিতে ইয়াযিদ ইবনু আবি সুফিয়ান। সর্বক্ষেত্রে এমন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব নিয়ে তিনি শামের পরতে পরতে কদম ছুটিয়েছেন দুর্বার গতিতে। পূর্বে ফুরাত নদী পেরিয়ে আরও গহীনে আর উত্তরে পৌঁছে গেলেন এশিয়া মাইনর পর্যন্ত। সর্বত্র শুধু বিজয়ের ধ্বনিই প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।
প্রতিদিন বিশজন, ত্রিশজন করে শামে পৌঁছতে পৌঁছতে একসময় বিরাট এক সৈন্যদলে পরিণত হলো। ভিন্ন ভিন্ন নেতৃত্বে দিগ্বিদিকে ছড়িয়ে পড়লেন তাঁরা। আবু উবায়দাহ তাঁর দলবল নিয়ে ওয়াদিয়ে কুরা, যাতুল মানার, হাজার এবং শামের বিভিন্ন প্রদেশ জয় করে পৌঁছে গেলেন মাআবে। এরকম জাদরেল সেনাপ্রধান দৃষ্টিগোচর হলে সেখানকার অধিবাসীরা বিনা বাক্যব্যয়ে সন্ধির প্রস্তাবনা পেশ করল। শাম বিজয়ের ইতিহাসে এটিই ছিল প্রথম সন্ধির ঘটনা। নিশ্চিতভাবে বলা যায় এর কারণ একমাত্র আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুর ব্যক্তিত্ব এবং কৃতিত্বের বহিঃপ্রকাশ। পরবর্তী গন্তব্যস্থল জাবিয়াকে সামনে রেখে তাঁরা এবার দ্রুত আগে বাড়লেন।
এরইমধ্যে তাঁর সঙ্গী হলেন খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু। বিজয়ের ধারাবাহিকতায় এবার বেশ গতি চলে এলো। হাওরান প্রদেশ বসরা নিয়ন্ত্রণে এনে দামেশকের পথেও ছুটে গেলেন তাঁরা। বলা হয় শাম বিজয়ের ইতিহাসে বসরাই ছিল প্রথম শহর যেটাকে আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহর নেতৃত্বে মুসলমানরা শিরকের বলয় থেকে মুক্ত করে বিজয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সময়টা তখন ১৩ হিজরির রবিউল আউয়াল। আর তাঁর দুই মাস পরেই জুমাদাল উখরায় মৃত্যুবরণ করেন খলিফাতুল মুসলিমিন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু।
আবু বকরের মৃত্যুর পর যখন খেলাফতের দায়িত্বপ্রাপ্ত হলেন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু, শামে প্রেরিত সেন্যদলের সম্পূর্ণ দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে পত্রপ্রেরণ করলেন আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে। খালিদ ইবনুল ওয়ালিদও তখন উপস্থিত। পরিপূর্ণ সমর্থন দিয়ে বললেন, আমি আল্লাহর রাসুলকে বলতে শুনেছি উম্মাহর বিশ্বস্ত ব্যক্তিটি হলেন আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ। তাই দায়িত্বের উপযুক্ত তিনিই। কিন্তু সর্বোৎকৃষ্ট আত্মার অধিকারী আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ অকপটে প্রত্যাখ্যান করে বললেন, আমিও তো নবিজিকে বলতে শুনেছি খালিদ হলো আল্লাহর তরবারি। কত মহান তাঁর মাকাম, কত উত্তম তাঁর ব্যক্তিত্ব। তিনিই হবেন সেনাপ্রধান। তিনিই হবেন সকলের তত্ত্বাবধায়ক।
তারপর একে একে তৈরি হয়েছে বিস্তৃত ইতিহাস। ইয়ারমুকের যুদ্ধ, শাম বিজয়ের পূর্ণতা, শামের প্রদেশে প্রদেশে গভর্নর নিযুক্তি-সহ দীর্ঘ ফিরিস্তি। সবশেষে বিজয়ের মুখ দেখেছে প্রাণের বাইতুল মাকদিস। রোম-পারস্যের সবকিছু করতলগত হলেও বাকি রয়ে গিয়েছিল এই মসজিদের শহর। আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু কিছুটা প্রতিরোধ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন বটে, কিন্তু যখন ময়দানে আবির্ভূত হলেন আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু, সেই শামের মতোই সন্ধির প্রস্তাবনা পেশ করল আহলে কুদস। অনেকটা বাধ্যই হলো যেন। বিজয়ের মহাসংবাদ পত্রস্থ করে তড়িৎ পাঠিয়ে দিলেন খলিফার দরবারে। ১৬ হিজরির রবিউল আউয়াল মাসের এক ঝলমলে রঙিন সকালে বাইতুল মাকদিস প্রাঙ্গণে উপস্থিত হলেন খলিফাতুল মুসলিমিন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু। বিজয় বিজয় রবে প্রতিধ্বনিত হলো তাকবির, বাইতুল মাকদিস চত্বরে।
এভাবেই পরবর্তী দুটি বছর কেটে যাবার পর সহসা শামে দেখা দিল এক ভয়াবহ মহামারি। আমওয়াস নামক এই মহামারি বাইতুল মাকদিসের নিকটবর্তী অঞ্চল থেকে একে একে ছড়িয়ে পড়ল শামের সর্বত্র। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু দূত মারফত নির্দেশনা পাঠালেন যে আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ যেন চলে আসেন মদিনায়। আবু উবায়দাহ সহজেই আঁচ করতে পারলেন তিনি কেন এ সময়ে শাম ছেড়ে চলে আসতে বলছেন। মনে মনে বললেন—খলিফা কি এমন ব্যক্তিকে বাঁচাতে উদ্যত হয়েছেন যে নিজেকেই বাঁচাতে চায় না?’
ফিরতি পত্রে তিনি লিখে দিলেন মনের কথাটা।–‘হে আমিরুল মুমিনিন, আমার নিকট আপনার কী প্রয়োজন আমি সেটা সঠিকভবেই ধরতে পেরেছি। কিন্তু আমি মুজাহিদবাহিনীর সাথে আছি, আর আমৃত্যু তাদের সাথেই থাকব। মরণব্যাধি আমওয়াসে আক্রান্ত হওয়া থেকে নিজের জীবন বাঁচাবার বিশেষ কোনো আগ্রহ আমার নেই। আল্লাহ আমার ও তাদের মাঝে ফায়সালা করার আগে আমি বিচ্ছিন্ন হতে চাই না। সুতরাং আমার উত্তরপত্র আপনার কাছে পৌঁছালে আমাকে ক্ষমা করবেন এবং প্রতিজ্ঞা থেকে মুক্তি দেবেন। আমৃত্যু শামে থেকে যাবার অনুমতি আমাকে দেয়ার অনুমতি চেয়ে শেষ করছি।
পত্র হাতে পেয়ে উমর চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন। কান্নার প্রবলতা দেখে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ ভরা উদ্বেগে জানতে চাইলেন— ‘হে আমিরুল মুমিনিন, আবু উবায়দাহ কি আর নেই? তিনি কি আমওয়াসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন?’ উমর উত্তরে বললেন—‘মারা যাননি ঠিক, কিন্তু তাঁর মৃত্যু সন্নিকটে।’
উমরের ধারণা কদিনের মধ্যেই বাস্তবে পরিণত হলো। মহামারি আমওয়াসে মৃত্যুবরণ করা ৩০ হাজার ব্যক্তির লাশের সারিতে দেখা গেল আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুকেও। প্রাণঘাতী এ মহামারি তাঁর সাথে কেড়ে নিলো মুয়ায ইবনু জাবাল, ইয়াযিদ ইবনু আবি সুফিয়ান, শুরাহবিল ইবনু হাসানা ও আবু জানদাল ইবনু সাহিলের মতো বড় বড় সাহাবিদের প্রাণ। মৃত্যু যখন দুয়ারে, আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ ওসিয়ত করলেন সবাইকে। ভাঙা ভাঙা সুরে বললেন—‘তোমরা সালাত আদায় কোরো, রোজা রেখো, দান-সদকায় অভ্যস্ত হয়ো এবং হজ পালন কোরো। একে অপরকে কল্যাণের আদেশ কোরো। শাসকের কল্যাণ কামনা কোরো। স্বার্থের তালাশে তাদের কাছে যেয়ো না। আর দুনিয়া যেন তোমাদেরকে চরম ঔদাসীন্যের দিকে ঠেলে না দেয়। কারণ, কোনো মানুষকে যদি হাজার বছরের আয়ু প্রদান করা হয় তবে মনে রাখবে, আজ আমি যে বাস্তবতার মুখোমুখি, তাঁকেও সেই বাস্তবতার সম্মুখীন হতে হবে।
ওসিয়ত শেষে নিচু স্বরে সালাম দিয়ে মুয়ায ইবনু জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহুর দিকে ফিরে তাকালেন। বললেন, ‘হে মুয়ায, সবার হয়ে ইমামতির দায়িত্ব আজ তোমার। এগিয়ে যাও। তার কিছু সময়ের মধ্যেই উড়ে গেল নবিজির স্বীকৃত উম্মাহর বিশ্বস্ত ব্যক্তি আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুর পাখিসদৃশ আত্মাটা। মুহূর্তেই নীরব হয়ে এলো চারিপাশ। ভারি কণ্ঠে শোনা গেল মুয়ায ইবনু জাবালের কথা—হে লোকেরা, আজ তোমরা এমন এক ব্যক্তিকে হারিয়েছ, আমি জানি না তারচেয়ে পবিত্র হৃদয়ের অধিকারী কোনো মানুষকে আমি দেখেছি কিনা।
১৬ হিজরির এই আধো আলোয় মাখা সন্ধ্যায় চলে গেলেন আমিনুল উম্মাহ আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু। আশারায়ে মুবাশশারা—জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ সাহাবির দলভুক্ত এ মহান সাহাবিকে বর্তমান জর্ডানের মৃত সাগরের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলেই দাফন করা হয়েছিল।

সুয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবাহ অবলম্বনে রচিত

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

error: Content is protected !!