শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০

যায়েদ ইবনু হারেসা : রাসুলের পালকপুত্র

0

উকায মেলা। তায়েফ শহরের এক প্রান্তে বিরাট জায়গা জুড়ে বেশ কিছুদিন ধরে চলছে এ মেলা। আরবের ঐতিহ্যবাহী এবং অতি প্রাচীন মেলা এটি। আরব উপদ্বীপ ছাড়াও সুদূর সিরিয়া থেকে এখানে বিভিন্ন ধরনের পণ্য আসে। আজ মেলার শেষদিন হওয়ায় বাজার বেশ জমজমাট। মানুষের হাঁক-ডাক, কেনা-বেচার গমগম আওয়াজ সেটার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে।
দুপাশে সারে সারে বসানো তাঁবু। মাঝখান দিয়ে মানুষ চলাচলের রাস্তা। পণ্য অনুযায়ী দোকানগুলো ভাগ ভাগ করা। একপাশে গমের দোকান, আরেক পাশে কাপড়ের, আরেক পাশে মসলা ইত্যাদির ইত্যাদি।
গোলাম আর গবাদি পশু—উট, ভেড়া, দুম্বা, বকরির বাজার মাঠের শেষ দিকে। সবসময় এখানে ভিড় একটু বেশিই হয়ে থাকে। নানা জাতির গোলাম-বাঁদির সমাহার। মালিক অনুযায়ী প্রত্যেক দল আলাদা আলাদা পাটিতে বসা।
সাদা, কালো, হাবশি, পারশিক কত রকমের মনুষ্য-পণ্য! প্রতিটা দলের সাথে একজন করে দালাল। তার যাকে ইচ্ছে, দাঁড় করিয়ে দাম হাঁকছে। ক্রেতাদের আকর্ষণের জন্য বেসুরো গলায় মাঝে মাঝে গানও ধরছে। গানে নির্দিষ্ট গোলাম বা বাঁদির বৈশিষ্ট্য তুলে ধরছে, যেন ক্রেতা হাতছাড়া না হয়।
বনু কায়েনার লুটেরা বেপারি বিরস মুখে আকাশের দিকে তাকাল। দুপুরের চেতা সূর্যটা ক্রমশ পশ্চিমে ঢেলে পড়ছে। সেই কাঠফাঠা ঘর্মাক্ত দুপুর থেকে সে দাঁড়িয়ে আছে চারটি গোলাম নিয়ে। কম বয়সী হওয়ায় কেউ তেমন নজর দিচ্ছে না। নজর দিলেও দূর থেকে দেখেই চলে যাচ্ছে। তাছাড়া গোলামগুলো কৃষ্ণাঙ্গ না হওয়ায় আজকের এই ভোগান্তি।
দুদিন আগে বনু মানের দিকে রওনা করা একটি কাফেলা থেকে ওদের লুট করা হয়েছে। বড়দের আনা ঝামেলা বিধায় বেছে বেছে ছোটদের এনেছে ওরা। সাথে উট, অন্যান্য ধন-সম্পদ তো আছেই।
বেপারি আকাশের দিক থেকে চোখ নামিয়ে সবার শেষ মাথায় বসা ছেলেটার দিকে তাকালেন।
আরবীয় গাত্রবর্ণ। চোখদুটি বড় বড়। পেলব শরীর। গায়ে মোটামুটি অভিজাত্য লুকিয়ে আছে। বাকিরা ক্লান্ত হয়ে ঝিমোচ্ছে। শুধু ছেলেটাই একা চুপচাপ বসে আছে। কে জানত যে, স্বাধীন জীবন থেকে তাদের দাস হতে হবে! কে জানত—শৈশবের ওড়াউড়ির দিনে ডানায় শিকল বেঁধে দিবে পাষান লুটেরার দল!
হঠাৎ একজনকে এদিকে আসতে দেখা গেল।
ভাবনায় পড়ে যাওয়া বেপারি সাথে সাথে নিজেকে গুছিয়ে নিলো। কাছে আসতেই লোকটার চেহারাও চিনে ফেলল। তিনি কুরাইশ গোত্রের একজন সম্ভ্রান্ত ও জ্ঞানী ব্যক্তি। বড় ব্যবসায়ী। নাম হাকিম ইবনু হিযাম।
‘এই ছেলেরা, উঠো… উঠো…!’
বেপারি তাড়া দিয়ে সবাইকে বসা থেকে দাঁড় করাল। ভীত হরিণের মতো এদিক-সেদিক তাকাতে লাগল ছেলেগুলো। হাকিম ইবনু হিযাম কাছে এসেই দাম হাঁকলেন। সময় একদমই কম। সন্ধ্যা দুয়ারে করাঘাত করছে। লু হাওয়া কমে এসেছে অনেকটা।
‘আমার আরেকজন গোলাম দরকার। বড়জোড় চারশো দিরহাম দেবো। চলবে…?’
বেপারি যেখানে যেচে দুশো দিরহাম পেলেই খুশি, এখন ক্রেতার দ্বিগুণ দাম হাঁকায় সে খুশিতে আটখানা। কিছুক্ষণ মেকি ধরনের চাপাচাপি করে অবশেষে চারশো দিরহামেই ঠেকল লুটেরা বেপারি।
‘আপনি নিলে আল্লাহ বরকত দেবেন। আমার কাছে থাকা সবচেয়ে ভালো ছেলেটাকে দিলাম। তবে ওর দিকে একটু খেয়াল রাখলেই হবে। দেখতে যেমন ভদ্র, ভেতরে ভেতরে তেমনই দুষ্টু, আর পালাতেও উস্তাদ।’
এ কথা বলে শান্ত দীঘির জলের মতোন টলটলে চোখওয়ালা সেই ছেলেটাকে হাকিম ইবনু হিযামের সামনে এনে দাঁড় করাল বেপারি।
ছেলেটার দিকে তাকিয়ে ইবনু হিযাম ভ্রু কুঁচকে ফেললেন, ভাবি দাসত্বের জীবন নিয়ে তাকে তেমন চিন্তিত দেখাচ্ছে না। কেমন চোখদুটি মেলে তাকিয়ে আছে নতুন মনিবের দিকে।
তিনি দাম চুকিয়ে গোলামকে সাথে নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে এলেন। বাজার ততক্ষণে ভাঙতে শুরু করেছে। শেষ সময়ে পণ্যের নির্ধারিত মূল্য কমিয়ে সজোরে হাঁক দিচ্ছে বিক্রেতারা।
ভিড় ঠেলে মূল রাস্তায় আসতে আসতে সূর্যটা দেয়ালের ওপাশে লুকিয়ে গেল। যেন খুব ধীরে, সন্তর্পণে কেউ একজন কালো চাদরে ঢেকে দিল পৃথিবীকে।
হাকিম ইবনু হিযাম তখনও জানতেন না, গোলামদের যে একটা দল তিনি বাড়িমুখে নিয়ে চলছেন, তার সবার শেষে মাথা নিচু করে হাঁটছে আট বছরের অসাধারণ একটি শিশু। ইতিহাস যাঁকে যায়েদ ইবনু হারেসা নামে প্রসিদ্ধ করে রাখবে পরবর্তী পৃথিবীর কাছে। কালক্রমে এই শিশুটিই হয়ে উঠবে কুরআনে কারিমে নামসহ উল্লেখিত একমাত্র সাহাবি, ইসলামের একদম প্রারম্ভিক সময়ের মুসলমান, নবি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের অতি প্রিয় পালকপুত্র।

পরদিন সকাল।
মেলা থেকে আপন ভাতিজা হাকিম ইবনু হিযামের ফেরার সংবাদ শুনে খাদিজা বিনতু খুয়াইলিদ তাঁর বাড়িতে এসেছেন। বিভিন্ন বিষয়ে নানা কথাবার্তার পর হাকিম ইবনু হিযাম বললেন, ‘ফুফু, আমি গতকাল বেশ কিছু দাস ক্রয় করে এনেছি। আপনার যাকে পছন্দ হয় বেছে নিন। হাদিয়া হিসেবে দিলাম।’ এ বলে তিনি গোলামদের থাকার ঘরের দিকে যাত্রা করলেন।
ছেলেগুলো সেই সকালেই জেগে উঠেছে। যে যার কাজে ব্যস্ত তখন। কেউ আস্তাবল ঝাট দিচ্ছে, কেউ মেষগুলোকে মাঠে চরাবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, কেউ উট-ঘোড়াকে দানাপানি খাওয়াচ্ছে।
মনিবের ডাক শুনে সবাই একজায়গাতে জড়ো হলো। অনভ্যস্ত ভঙ্গিতে ঘোড়ার ভুষি মাখাতে ব্যস্ত ছোট্ট যায়েদ এভাবেই মনিবের দিকে দৌড়ে আসলেন।
খাদিজা বিনতু খুয়াইলিদ বেশ সময় নিয়ে যায়েদের দিকে তাকিয়ে রইলেন। চেহারায় তীক্ষ্ণ মেধা ও বুদ্ধির ছাপ স্পষ্ট। সব শেষ তিনি যায়েদকেই বাছাই করলেন। এবং যায়েদকে সঙ্গে নিয়ে নিজ বাড়িতে ফিরে এলেন।

মহিরুহের ছায়ায়
৫৯৫ খ্রিষ্টাব্দ। ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিবাহ সংঘটিত হয় সে বছর। বর—মক্কার প্রভাবশালী নেতা আবদুল মুত্তালিবের দৌহিত্র মুহাম্মদ ইবনু আবদিল্লাহ। আর কনে মক্কার শ্রেষ্ঠ রমণী ধনবতী গুণবতী খাদিজা বিনতু খুয়াইলিদ।
বিয়ের পর খাদিজা প্রিয়তম স্বামীকে উত্তম কিছু হাদিয়া দেয়ার ইচ্ছে করলেন, সেই ইচ্ছে থেকেই গোলাম যায়েদকে তাঁর মালিকানায় দিয়ে দিলেন।
আকর্ষনীয় এক মনিব পেয়ে যেন নতুন জীবন শুরু হলো যায়েদের। অল্প কদিনেই যায়েদ তাঁর ভালোবাসা আর আদর-স্নেহে সিক্ত হয়ে উঠলেন।
আরবের অন্য গোলামরা যেখানে মনিবের হাতে পশুর মতো ব্যবহৃত হতো, সেখানে যায়েদ তাঁর মনিবের ঘরে পুত্রস্নেহে লালিত হতে লাগলেন। শৈশবে হারানো পিতা-মাতার অভাব এক প্রকার ভুলেই বসলেন তিনি।
শিশুরা দ্রুত অতীত ভোলে। যায়েদও তার ব্যাতিক্রম নন। ছোট্ট হৃদয়ের ছোট্ট যায়েদ ক্রমশ অতীত দৃশ্যগুলো থেকে দূরে সরে পড়লেন। মা-বাবার কথা খুব একটা আর মনে পড়ল না তাঁর।

মা-বাবার তড়প
ইয়েমেনের প্রভাবশালী গোত্র বনু কুজাআ। সেখানকার গোত্রপতি হারেসা ইবনু শুরাহবিল। যায়েদের পিতা। মা সুদা বিনতু সালাবাহও ছিলেন আরবের আরেক বিখ্যাত তাঈ গোত্রের কন্যা। ইতিহাস থেকে জানা যায়, বিখ্যাত দানবীর হাতিম তাঈ এই গোত্রেরই ছিলেন।
সন্তান হারানোর বুকফাটা ব্যথা নিয়ে সুদা স্বামীর কবিলায় পৌঁছুলেন। সেখানে গিয়ে সব ঘটনা খুলে বললেন স্বামীর কাছে।
‘যায়েদকে দুর্বৃত্তরা অপহরণ করেছে’—এই সংবাদ হারেসা ইবনু শুরাহবিল জানতে পেরে অনেকটা পাগলের মতো হয়ে গেলেন। পুত্রের সন্ধানে নেমে পড়লেন তিনি। গ্রুপ গ্রুপ করে আশপাশের সব জনপদে অনুসন্ধানী লোকও পাঠিয়ে দিলেন। খোঁজ দিতে পারলে খোঁজদাতাকে বিশেষ পুরস্কার প্রদানেরও ঘোষণাও করলেন।
এভাবে বেকারার হয়ে তিনি সন্তানের খোঁজ চালিয়ে যেতে থাকলেন। আর এদিকে মা সুদা একাকী ঘরে বুকের ধনকে হারিয়ে অশ্রু বিজর্সন দিতে থাকেন। তাঁর রাতের ঘুম হারাম। আদরের ছেলেটি বেঁচে আছে নাকি ডাকাতদের হাতে মারা পড়েছে, এ কথাও তিনি জানেন না।
তখনকার আরবের প্রসিদ্ধ একজন কবিও ছিলেন হারেসা ইবনু শুরাহবিল। ছেলের সন্ধানে যেখানেই যেতেন, মনের সব দুঃখ ঢেলে একটি কবিতা আবৃত্তি করতেন, যার ভাবার্থ এমন—
যায়েদের জন্য আমি কাঁদছি,
জানি না কী হয়েছে তার,
সে কি এখন জীবিত,
নাকি আশা নেই ফেরার।
কসম আল্লাহর,
আমি জানি না,
অথচ জিজ্ঞেস করছি বারবার,
তোমাকে অপহরণ করেছে কারা,
সমতল, নাকি পার্বত্য ভূমির
কোনো লুটেরা সরদার।
খুব ভোরে উদিত সূর্য
মনে করিয়ে দেয় তোমার কথা
আবার যখন অস্ত যায়,
তখনো পাই ঠিক একই ব্যাথা।
আমি দেশ থেকে দেশান্তরে,
ঘুরব তোমার সন্ধানে
উট হাঁকাব অবিরাম,
ফিরব না কভু ক্লান্ত মনে।
আমার জীবন থাকুক,
বা মৃত্যু আসুক,
পথ আমার চলবেই,
প্রতিটি প্রাণীই মরণশীল,
মুত্যু তাকে ধরবেই।

সময়কে ধরে রাখা বড্ড কঠিন। স্রোতেলা গাঙের মতো সবকিছু ভাসিয়ে সে সামনের পথ দেখে। কার কী হলো না হলো, এসব দেখার ফুরসত মেলে না তার।
প্রায় একযুগ আগে অপহরণ হয়ে যাওয়া বালক যায়েদের খোঁজে ইয়েমেন থেকে দুটি উট মক্কা অভিমুখে রওনা হয়েছে। একটিতে হারেসা ইবনু শুরাহবিল, আরেকটিতে তাঁর ভাই কাব।
দুদিন আগে মক্কা থেকে হজ করে ফেরা স্বীয় গোত্রের লোকদের থেকে যায়েদের সংবাদ পান হারেসা। তারা নাকি যায়েদকে দেখেছে, এমনকি তাঁর সাথে কথাও বলেছে। এ সংবাদ শোনার পরপরই হারেসার মন উতলা হয়ে উঠেছে ছেলের জন্য।
সারাদিন মরুর সাগর পাড়ি দিয়ে বিকেলের দিকে তাদের মরু-জাহাজ নোঙর করল মক্কায়। লোকদের জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন, যায়েদ নামের একটি ছেলে মুহাম্মাদের বাড়িতে থাকে। খুঁজতে খুঁজতে ভাইকে সাথে নিয়ে সোজা খাদিজার বাড়ির দোরগোড়ায় উপস্থিত হলেন হারেসা। চাওয়া একটাই—অর্থ যতই লাগুক, তিনি আপন সন্তানকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দিতে চান।
কিন্তু যায়েদ কি আসলেই সাধারণ ক্রীতদাসদের মতো? তাঁকে উকায মেলা থেকে কিনে আনা হয়েছিল শুধু কাজ করানোর জন্যই? নাকি মুহাম্মাদ আপন সন্তানের মতো বুকে আগলে রেখেছিলেন তাঁকে? এসবের কিছুই জানতেন না হারেসা।
মনিব মুহাম্মাদ ধৈর্য নিয়ে হারেসা ইবনু শুরাহবিলের সব কথা শুনলেন। তারপর যায়েদকে ডেকে আনা হলো। এতদিন পর পিতা-পুত্রের অশ্রুসিক্ত মিলন অন্যদের চোখও ভিজিয়ে তুলল। পিতা এবং চাচা হিসেবে হারেসা আর কা’বকে শনাক্ত করার পর মুহাম্মাদ কিছুক্ষণ চুপ রইলেন। আপন ছেলের মতো স্নেহ দিয়ে লালন-পালন করা যায়েদকে হারানোর বেদনায় মনিব মুহাম্মাদের হৃদয়ও সিক্ত হয়ে পড়ল।
আরব জুড়ে আল-আমিন খ্যাতি পাওয়া মুনিব মুহাম্মাদ আবেগের বশে অবিচার করতে পারেন না। তিনি নীরবতা ভেঙে বললেন, ‘যায়েদকে অধিকার দেয়া হোক! সে যদি আপনাদের সাথে চলে যেতে সম্মত হয়, তাহলে সে মুক্ত। কোনো অর্থে বা মুক্তিপণের প্রয়োজন নাই। আর যদি সে থাকতে চায়, তাহলে এ ক্ষেত্রে আমার অনুরোধ থাকবে তাঁকে আপনারা রেখে যাবেন।’
চমৎকার ফয়সালা শুনে হারেসার চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল।
চুপচাপ তিনি অপেক্ষা করতে লাগলেন পুত্রের উত্তর শোনার জন্য।
মাথা নিচু করে যায়েদ চুপ। তাঁর এক কথাতেই জীবনের মোড় ঘুরে যাবে। যদি হারেসার আবেদনে তিনি সাড়া দেন তাহলে, বাকি জীবন জন্মদাতা পিতার সাথে থাকতে পারবেন ঠিকই, কিন্তু আদর্শের দীক্ষাগুরুর সার্বক্ষণিক সাহচর্য থেকে বঞ্চিত হতে হবে।
কিছুক্ষণ পর যায়েদ মাথা তুলে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন। স্বাভাবিক কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে মনিব মুহাম্মাদকে বললেন, ‘হে মক্কার শ্রেষ্ঠ মানব! আমি আপনার তুলনায় অন্য কাউকে প্রাধান্য দিত পারি না। এমনকি আমার জন্মদাতা পিতা-মাতাকেও না। আমি আপনার নিকটেই থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম।’
নিশ্চুপ পিতা এবার বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। এ-ই কি সেই যায়েদ, ছোটবেলা যে মায়ের কোল থেকে অপহৃত হয়েছিল? পিতা-মাতার নিশ্চিত আশ্রয় উপেক্ষা করে মনিবের আশ্রয়কেই যে প্রাধান্য দিচ্ছে?
তিনি আর ভাবতে পারলেন না। যায়েদের পিতা এবং চাচা বুকে কষ্ট চেপে মেনে নিলেন যায়েদের এই সিদ্ধান্ত।
এরপরের ঘটনা তো ইতিহাস। মনিব মুহাম্মাদ যায়েদের হাত ধরে কাবা চত্বরে উপস্থিত হলেন সাথে সাথে। সব মানুষের সম্মুখে গম্ভীর কণ্ঠে ঘোষণা করলেন—‘এ হচ্ছে যায়েদ। সে আজ থেকে মুক্ত। এবং আমার পুত্র। সে আমার উত্তরাধিকারী হবে, এবং আমি তাঁর উত্তরাধিকারী হবো।’
এ কথা শুনেই জনসাধারণের মাঝে গুনগুন শুরু হয়ে গেল। কৃতদাসকে কেউ পুত্র হিসেবে ঘোষণা করে! তাও নিজের উত্তরসুরি হিসেবে!
মনঃক্ষুণ্ণ হারেসা আর কা’বের চোখে আলো ঝলক দিয়ে উঠল। হারানো ছেলেকে তাঁর যোগ্য অভিভাবকের কাছে রেখে তাঁরা নিশ্চিন্তে এবং খুশি মনে ইয়েমেনের পথ ধরলেন।
এই ঘটনার পর থেকে কুরআনের আয়াত নাযিল হয়ে পালক পিতার বিধান রহিত হবার আগ পর্যন্ত তাঁকে যায়েদ ইবনু মুহাম্মদ নামেই ডাকা হতো।
স্থিরচিত্তে দাসত্ব বরণ করে নেয়া যায়েদ শুধু মুক্তিই পেলেন না, সাথে সাথে মক্কার শ্রেষ্ঠ পুরুষের ছেলে হিসেবেও স্বীকৃতি পেলেন। মুহাম্মাদ-খাদিজার সংসারেই তিনি থাকতে লাগলেন। মহাকালের দিগন্তে বিস্তৃত সুবিশাল মহিরুহের ছায়ায় লালিত হতে লাগলেন যায়েদ ইবনু হারেসা।

উদ্ভাসিত হেরার আলো, হিরন্মৃত জীবনের অধিকারী
যায়েদ যখন নিজের পরিবার ছেড়ে মুহাম্মাদকে বেছে নেন, তখনও তিনি জানতেন না যে কাকে বেছে নিচ্ছেন। এমন একজন মানুষের ছায়ায় তিনি আশ্রিত হয়েছেন, অচিরেই যাঁর আলো দ্বারা পৃথিবীর উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু জ্বলে উঠবে। হাজার বছর পূর্বে যে প্রতিশ্রুত রাসুলের আগমনের কথা তাওরাত-ইঞ্জিলে উল্লেখ আছে, এই মুহাম্মাদই হবেন সেই রাসুল।
ওই ঘটনার কয়েকবছর পর মুহাম্মাদ ওহি প্রাপ্ত হন। সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম। একটি মাত্র শব্দ ‘ইকরা’ দ্বারা আগামী পৃথিবীর গতিপথ বদলে যাওয়া শুরু হয়ে গেল তখন থেকে। মানুষের বিশ্বাস, ধর্ম, ভালোবাসা, জীবনাচার—সবকিছুতেই পরিবর্তনের হাওয়া লাগল। এই ‘ইকরা’ শব্দের মাধ্যমে পৃথিবীতে গজিয়ে উঠল নতুন আরেক পৃথিবী, নতুন এক সভ্যতা, নতুন একদল সভ্য মানব-মানবী।
পৃথিবীর সেই সভ্য মানুষদের কাতারে (পুরুষদের দিক দিয়ে) সর্বপ্রথম প্রবেশ করলেন যায়েদ ইবনু হারেসা। রাদিয়াল্লাহু আনহু।
পরবর্তী সময়ে সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে নানা কারণে তাঁর মর্যাদা অনেক উপরের দিকে উন্নীত হয়েছিল। এর মধ্য থেকে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কারণ ছিল পবিত্র কুরআনে উল্লিখিত একমাত্র সাহাবি হিসেবে। প্রেক্ষাপটটিও ছিল বেশ জটিল।
যাইনাব বিনতু জাহাশ রাদিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন নবিজির আপন ফুফাতো বোন। আর যায়েদ তো ছিলেন নবিজির অত্যধিক ভালোবাসার পাত্র। তাই আপন ফুফাতো বোনের সাথেই তিনি যায়েদের বিবাহ ঠিক করলেন। কিন্তু গোলামির লকব যেহেতু যায়েদের উপর পড়ে গিয়েছিল, সে জন্য যাইনাব বিনতু জাহাশ রাদিয়াল্লাহু আনহা এতে আগ্রহী ছিলেন না। আবার রাসুলের সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে বিয়েতে অমতও করলেন না। কিন্তু মনের অনিচ্ছা আর অনাগ্রহের কারণে বিয়ের পর যায়েদের সংসারে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারলেন না। মনোমিলন্য লেগেই থাকত দুজনের মধ্যে। যায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহু অনেক চেষ্টা করলেন, কিন্তু বিয়েটা শেষ পর্যন্ত টিকল না। রাসুলের পরামর্শেই তিনি যাইনাবকে তালাক দিলেন। এবং এ প্রেক্ষিতেই কুরআনের আয়াত নাজিল হয়েছিল।
ঘটনার কিছুদিন পর যায়েদ ইবনু হারেসা রাদিয়াল্লাহু আনহু উম্মু আইমান রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বিয়ে করেন। তাও একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। কারণ, উম্মু আইমানের তখন বয়স ছিল পঞ্চাশের কাছাকাছি। তাছাড়া তেমন সুন্দরী বা আকর্ষণীয়াও ছিলেন না তিনি।
এক দুপুরে দারুল আরকামে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম সকল সাহাবির সামনে ঘোষণা করলেন—‘তোমাদের মধ্যে যদি কেউ বেহেশতি রমণীকে বিয়ে করতে চায়, সে যেন উম্মু আইমানকে বিয়ে করে।’
এ ঘোষণা শোনার সাথে সাথে যায়েদ ইবনু হারেসা দাঁড়িয়ে বললেন—‘আল্লাহর রাসুল! আমি উম্মু আইমানকে বিয়ে করতে চাই। তিনি রূপবতী অনেক রমণী থেকে উত্তম।’
উম্মু আইমান ও যায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর বিয়ে হয়ে গেল। কিছুদিন পর তাঁদের ঘর আলোকিত করে জন্ম নিলেন এক পুত্রসন্তান। নাম উসামা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম সীমাহীন ভালোবাসতেন উসামাকে। কোলে নিয়ে ঘুরতেন, নিজ হাতে খাইয়ে দিতেন, একসাথে খেলতেন। সাহাবিরা তাঁকে বলতেন—রাসুলের ভালোবাসায় সিক্ত এক শিশু।
যায়েদ ইবনু হারেসা রাদিয়াল্লাহু আনহু যেভাবে আপন পরিবার ছেড়ে নবিজিকে বেছে নিয়েছিলেন, ঠিক তেমনি নবিজিও যায়েদকে আপন পরিবারের সাথে মিলিয়ে নিয়েছিলেন। যায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহু কোথাও গেলে তাঁর ফেরার অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকতেন নবিজি। ফিরে এলে খুব খুশি হতেন। এবং এমনভাবে সম্ভাষণ জানাতেন, যা অন্য কারও ভাগ্যে জুটত না।
ছোট্ট একটা ঘটনা বর্ণনা করেছেন উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা। তিনি বলেন, ‘আমরা তখন মদিনায়। রাসুল আমার ঘরে অবস্থান করছেন। এমন এক দিনে যায়েদ ইবনু হারেসা মদিনায় ফিরলেন। ধুলিমলিন জামা-কাপড়। সারাদিনের মরু সফরে ক্লান্ত-বিধ্বস্ত চেহারা। নিজ পরিচয় দিয়ে দরজায় টোকা দিতেই, নবিজি সাথে সাথে বিছানা থেকে উঠে বসলেন। কাপড়ের স্বল্পতায় নবিজির নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত কোনোরকম ঢাকা ছিল। কাপড় টানতে টানতে তিনি দরজার দিকে ছুটলেন। দরজা খুলেই যায়েদকে জড়িয়ে ধরলেন। চোখে-মুখে চুমু খেতে শুরু করলেন। আল্লাহর কসম! এর পরে বা পূর্বে আমি কখনো এভাবে স্বল্প বসনে আল্লাহর রাসুলকে কোনো কাজ করতে দেখিনি।’
তাছাড়া ছোটবেলা থেকেই যায়েদ গোপন বিষয় রক্ষায় রাসুলের অত্যধিক বিশ্বস্তভাজন ছিলেন। কোনো যুদ্ধের ডংকা বাজলে তাঁকে সেনাপ্রধান বানানোর প্রবল আগ্রহ প্রকাশ করতেন আল্লাহর রাসুল। এমনকি মদিনার বাইরে কোথাও গেলে নিজের স্থলাভিষিক্ত করে যেতেন যায়েদ ইবনু হারেসাকে।

শাহাদাতের অমীয় সুধা পান
অষ্টম হিজরির জুমাদাল উলা। প্রচণ্ড শীত পড়েছে। বাগানে খেজুরের কাঁদিগুলোতে রঙ চরেছে সবে মাত্র। পাহাড় থেকে ভেসে আসা ঠান্ডা বাতাস যেন চামড়া ভেদ করে মজ্জায় ঢুকে যাচ্ছে। অন্যদিনের তুলনায় আজ মদিনার আকাশ-বাতাস ভারি নিশ্চুপ। পরিবেশ গুমোট বেঁধে আছে। অনাহুত এক দুঃসংবাদে সবাই যেন শোকে মূহ্যমান।
কাহিনির খোলাসা হলো—ইসলামের শান্তিবাণী ততদিনে মক্কা ছাড়িয়ে আশপাশের এলাকাগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছিল। নবিজি নানা অঞ্চলের গোত্রপ্রধান ও শাসকদের কাছে পত্র ও দূত-মাধ্যমে পৌঁছুচ্ছিলেন ইসলামের দাওয়াত। এর ধারাবাহিকতায় হারিস ইবনু উমাইরকে পাঠালেন সিরিয়ায়। শাসক শুরাহবিলের কাছে পত্র দিয়ে। সিরিয়া ছিল তখন রোম সাম্রাজ্যের অঙ্গরাজ্য। সম্রাট হিরাক্লিয়াস ছিল রোম সাম্রাজ্যের সম্রাট।
গোড়া খ্রিষ্টান শুরাহবিল ইসলামের আভির্বাবের কথা শুনেছিল আরও আগেই। তখন থেকেই ভেতরে ভেতরে সে ক্রোধ পুষছিল ইসলামের বিরুদ্ধে। হারিস রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর দরবারে পৌঁছে যখন বললেন, ‘আমি মদিনা থেকে রাসুল মুহাম্মাদের বার্তা নিয়ে এসেছি…’ কথার মাঝখানেই চিৎকার করে উঠল শুরাহবিল। এতবড় স্পর্ধা! সরাসরি রোম সম্রাটের কাছে সামান্য এক সরদারের চিঠি! রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠল দাম্ভিক শাসক। যেকোনো সভ্যতায় দূত হত্যা ছিল জঘন্যতম অপরাধ। কিন্তু জঘন্যতার কোনো তোয়াক্কা না করে দুধের স্বাদ ঘুলে মিটালো সে। নবিজির দূদ হারিস রাদিয়াল্লাহু আনহুকে হত্যা করল।
এ মর্মান্তিক সংবাদ মদিনায় পৌছুতেই রাসুল নির্বাক হয়ে গেলেন। আগেই বলেছি, দূত হত্যা সব সমাজেই ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। প্রাচীনকাল থেকেই এই রীতি প্রচলিত। আর দূত হত্যা করা মানে, বিরুদ্ধ শত্রুর প্রতি যুদ্ধ ঘোষণা। নবিজি বাকরুদ্ধ হলেও বিচলিত হলেন না। আল্লাহর উপর ভরসা করে পরাশক্তি রোম সম্রাটের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করলেন।
তিন হাজার সদস্যের একটি বাহিনী প্রস্তুত হয়ে গেল। নবিজি সকল সাহাবির মাঝে এসে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে গম্ভীর কণ্ঠে ঘোষনা করলেন—‘আমি এ যুদ্ধের সেনাপতি নিযুক্ত করলাম যায়েদ ইবনু হারেসাকে। যদি যায়েদ শহিদ হয়ে যায়, তাহলে সেনাপতি হবে জাফর ইবনু আবি তালিব। যদি সেও শহিদ হয়ে যায়, তাহলে সেনাপতি হবে আবদুল্লাহ ইবনু রওয়াহা। আর যদি সেও শহিদ হয়ে যায়, তাহলে তোমরা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে যাকে উপযুক্ত মনে করো, সেনাপতি বানিয়ে নিয়ো।’
বাহিনী রওনা হয়ে গেল। নানা জনপদ পাড়ি দিয়ে সিরিয়ার বালকা শহরের উপকণ্ঠে এসে উপনীত হলো। বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে প্রায় দুই মনজিল দূরে অবস্থিত ‘মুতা’ নামক স্থানে তাঁবু ফেলার নির্দেশ দিলেন সেনাপতি যায়েদ ইবনু হারেসা।

পরদিন সকাল।
পাহাড়ের কোলে সবুজ উপত্যকার প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করার মতো। সূর্যটা ততক্ষণে উপরে উঠতে শুরু করেছে। শারীরিক অবসাদ কাটিয়ে বেশ ফুরফুরে হয়ে উঠেছে সবাই। মুজাহিদ-তাঁবুগুলোদে তাড়া দিচ্ছেন একজন নকিব। নিজ নিজ কাজ থেকে ফারেগ হয়ে সবাই যুদ্ধ সরঞ্জাম গুছিয়ে নিচ্ছে।
পৃথিবীর ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় যুদ্ধ সংঘটিত হতে যাচ্ছে এখন এই মূতার প্রান্তরে। একদিকে সময়ের পরাশক্তি রোম সাম্রাজ্যের দেড় লক্ষ যোদ্ধা। নানা ধরনের যুদ্ধাস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তারা প্রস্তুত। নিশানা ভেদী তিরন্দায আর তরবারি চালনায় দক্ষ সৈন্যের সমাহারে তারা স্বগর্বে দণ্ডয়মান। অপরদিকে বাহ্যত শক্তিহীন এক দুর্বল বাহিনী, তাঁদের সৈন্যসংখ্যা মাত্র তিন হাজার। যুদ্ধাস্ত্র নিতান্তই সামান্য। বাহ্যিক শক্তি-সামর্থে আকাশ-পাতাল তফাত দুই দলের মাঝে।

হঠাৎ বেজে উঠল যুদ্ধের ঘণ্টা।
প্রচণ্ড শক্তিশালী রোমান বাহিনী বীব্র বেগে ঝাপিয়ে পড়ছে মুজাহিদদের উপর। সংখ্যায় স্বল্প হলেও বীর বিক্রমে প্রতিহত করে চলছে মুজাহিদরা। মানুষের আর্তচিৎকার, তরবারির ঝনঝনানি, আহতদের গলাফাটা আর্তনাদ, ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি মুহূর্তেই পরিবেশকে ভয়ংকর করে তুলেছে।
এদিকে সেনাপতি যায়েদ ইবনু হারেসা রাদিয়াল্লাহু আনহুর তরবারির সামনে কেউই টিকতে পারছে না। তিনি এক হাতে কালেমার পতাকা ধরে আরেক হাতে তরবারি চালাচ্ছেন। যেদিকেই অগ্রসর হচ্ছেন, শত্রুদের ব্যূহ ভেদ করে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছেন। যেন শাহাদাতের প্রবল আকাঙ্ক্ষা তাঁকে উতলা করে তুলেছে।
যুদ্ধ করতে করতে এক সময় ক্লান্ত হয়ে এলো তাঁর শরীর। বাহুটা একটু শিথিল করতেই দূর থেকে একটি তির শাঁ করে এসে হাতে বিঁধে গেল। তিনি ব্যথায় কঁকিয়ে উঠলেন। তখনও ব্যথার তীব্রতায় সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেননি। অমনি শত্রুপক্ষের একটি তরবারি এসে পড়ল তাঁর কাঁধে। তৎক্ষণাৎ তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ চাপা গোঙানি দিয়ে নিস্তেজ হয়ে এলো তাঁর দেহ। অস্ফুট স্বরে কালিমা উচ্চারণ করে তিনি এই পৃথিবীকে বিদায় জানালেন। শামিল হলেন শহিদের মিছিলে।

মূতার যুদ্ধের ফলাফল ছিল কল্প কাহিনীর মতো। নিযুক্ত তিনজন সেনাপতিই পরপর শাহাদাত বরণ করেন। পরিশেষে খালেদ ইবনুল ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু যুদ্ধের হাল ধরে তিন লাখ সৈন্যকেই পিছু হটাতে বাধ্য করেন। আর এর মধ্য দিয়ে বিজয় মুসলমানদের পদচুম্বন করে।

মুতার প্রান্তরে তিন সেনাপতির শাহাদাত যেন রাসুলের পূর্বের সব দুঃখকে ছাড়িয়ে গেল। তিনি খুবই মর্মাহত হলেন। প্রত্যেকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের পরিবারকে সান্ত্বনা প্রদান করলেন।
সবার শেষে যখন যায়েদ ইবনু হারেসা রাদিয়াল্লাহু আনহুর বাড়িতে পৌঁছুলেন, তখন যায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর ছোট মেয়ে চোখ-মুখ ফোলা অবস্থায় রাসুলকে এসে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করলেন। রাসুলও নিজেকে তখন আর ধরে রাখতে পারলেন না। অবুঝ শিশুদের মতো শব্দ করে কেঁদে ফেললেন। রাসুলের কান্নার এমন ধরন দেখে উপস্থিত সাহাবিরা হতবাক হয়ে গেলেন। প্রিয় রাসুলকে এভাবে কাঁদতে আর তাঁরা দেখেননি ইতোপূর্বে।
এক পর্যায়ে সাদ ইবনু উবাদা রাদিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞেসই করে ফেললেন, ‘আল্লাহর রাসুল, এটা কী?’
রাসুল চোখ মুছতে মুছতে জবাব দিলেন, ‘প্রিয়জনের বিরহে প্রিয়জনের কান্না।’

রচনাটি রিজালুন হাওলার রাসুল এবং সুয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবাহ অবলম্বনে লিখিত

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

error: Content is protected !!