শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০

মুয়ায ইবনু জাবাল : ইলম আমল ও জিহাদে অগ্রগামী সাহাবি

0

সাহসী এক যুবক
প্রাচীন জনপদ ইয়াসরিব, যার পরবর্তী নাম মদিনা। এখানকার একদল টগবগে যুবক। মুসআব ইবনু উমায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাতে তাঁরা ইসলাম গ্রহণ করেছেন। একদিন তাঁরা পরিকল্পনা করলেন এলাকায় মূর্তি-উৎখাত অভিযান চালাবেন। পরিকল্পনা মোতাবেক তাঁদের কাজ শুরু হলো। কখনো গোপনে, কখনো প্রকাশ্যে চলল তাঁদের অপারেশন। এ অভিযানে বেশ সফলতা পেলেন তাঁরা। এর ফলশ্রুতিতে নতুন আরও অনেকে ইসলাম গ্রহণ করলেন। তন্মধ্যে অন্যতম হলেন আমর ইবনুল জামুহ রাদিয়াল্লাহু আনহু।
আমর ইবনুল জামুহ ছিলেন মদিনার বনু সালামা গোত্রের অন্যতম সরদার। ‘মানাত’ নামে তাঁর একটি মূল্যবান মূর্তি ছিল। তিনি সেটাকে অত্যন্ত ভক্তি ও সম্মান করতেন। প্রতিদিন সকালে সেটাকে রেশমি কাপড় পরাতেন এবং সুগন্ধি মাখিয়ে দিতেন।
এক রাতে সেই যুবকেরা তাঁদের পরিকল্পনা অনুযায়ী তাঁর মূর্তিকে ময়লার ভাগাড়ে ফেলে দিলেন। সকালে তিনি নির্ধারিত স্থানে সেটাকে না পেয়ে খুঁজতে লাগলেন পাগলপারা হয়ে, একপর্যায়ে সেটাকে আবিস্কার করলেন ময়লার স্তুপের মধ্যে। তাঁর মূল্যবান মূর্তির এ অবস্থা দেখে অত্যন্ত দুঃখ পেলেন তিনি। ভক্তিসহকারে সেটাকে সেখান থেকে তুলে এনে ধুয়েমুছে সুগন্ধি মাখিয়ে দিলেন। মনের ঝাল মেটালেন শত্রুদের উপর বদদুআ করে।
দ্বিতীয় দিনও একই কাণ্ড ঘটল। তৃতীয় দিনও। কিন্তু তৃতীয় দিন তিনি বিরক্ত হয়ে একটা তরবারি মূর্তির গলায় লটকিয়ে দিলেন। এরপর তাকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘হে মানাত! তোমার মাঝে যদি ভালো কিছু থাকে, তবে তুমি নিজেকে রক্ষা কোরো।’ সেদিন রাতেও যুবকেরা মূর্তিটিকে নিয়ে গেলেন। এরপর সেটিকে একটি মৃত কুকুরের সাথে বেঁধে ময়লার গর্তে ফেলে রাখলেন। সকালে আমর ইবনুল জামুহ যখন মূর্তির এ অবস্থা দেখলেন, তখন তিনি রাগে-গোস্বায় একটি কবিতা আবৃত্তি করলেন, যার ভাবার্থ এরকম—
‘কসম খোদার! তুমি হতে যদি প্রভু,
হতো না কূপের মাঝে কুকুরের সাথে তব
জড়াজড়ি কভু।
বন্দনা যাবতীয় আল্লার তরে,
যিনি—
দয়ালু মেহেরবান রিজিক করেন দান
মহাবিচারক সব ধর্মের ঘরে,
তিনিই আমাকে করেছেন হেফাজত,
নিঝুম অন্ধকার কবরে হবার আগে বসত।’
এই ঘটনার পরপরই তিনি মূর্তিপূজা ত্যাগ করে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেন।
সেই সাহসী যুবকদের মাঝে একজন ছিলেন দীর্ঘদেহী এবং অত্যন্ত সুদর্শন। তাঁর ছিল গায়ের রং উজ্জ্বল ফর্সা, চোখ ডাগর-ডাগর আর কাজলকালো, ভ্রুজোড়া সংযুক্ত, চুল কোঁকড়ানো এবং দাঁত ধবধবে সাদা। যে-ই তাঁর দিকে তাকাত, সহজে দৃষ্টি ফেরাতে পারত না। উপরন্তু তাঁর মেধা ছিল প্রখর, বুদ্ধি ছিল তীক্ষ্ণ। ভাষার মাধুর্য ও উচ্চ মন-মানসিকতায় তিনি ছিলেন অন্য যুবকদের থেকে আলাদা। আর তিনি হচ্ছেন আমাদের আজকের আলোচ্য সাহাবি মুয়ায ইবনু জাবাল। রাদিয়াল্লাহু আনহু।

জন্ম ও পরিচয়
হিজরতের আঠারো বছর পূর্বে ইয়াসরিবে জন্মগ্রহণ করেন।
হিজরতের আঠারো বছর পূর্বে তৎকালীন ইয়াসরিব আর পরবর্তীকালের মদিনাতুর রাসুলে জন্মগ্রহণ করেন। নাম মুয়ায। উপাধী আবু আবদির রহমান। পিতা জাবাল ইবনু আমর। মাতা হিন্দা বিনতু সাহল। মদিনার অন্যতম গোত্র খাযরাযের উদাই বংশের লোক। তাঁর বংশানুক্রম এ-রকম—মুয়ায ইবনু জাবাল ইবনি আমর ইবনি আউস ইবনি আয়েয ইবনি আদি ইবনি কা’ব ইবনি আমর ইবনি উদাই ইবনি সা’দ ইবনি আলি ইবনি আসাদ ইবনি সারিদাহ ইবনি ইয়াযিদ ইবনি জুশাম ইবনিল খাযরায।
বাবা মারা যাওয়ার পর তাঁর মা বনু সালামার এক লোকের কাছে বিবাহ বসেন। মায়ের সাথে তিনিও সেখানে বসবাস শুরু করেন। পরবর্তীকালে সে গোত্রের পরিচয়ে পরিচিত হয়ে যান। বদরি সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনুল জাদ্দ রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর বৈপিত্রেয় ভাই।

ইসলামের ছায়াতলে
নবুওয়তের বারোতম বছরের যিলহজ্জ মাসে প্রথম বায়আতে আকাবাহ অনুষ্ঠিত হয়। এতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে মদিনার বারোজন লোক বায়আত করেন। ফিরে যাওয়ার সময় মদিনায় ইসলাম প্রচারের জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদের সাথে মুসআব ইবনু উমায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহুকে প্রেরণ করেন। তিনি মদিনায় এসে জোরেশোর ইসলাম প্রচার করেন এবং সর্বোচ্চ চেষ্টা চালান। তাঁর দাওয়াতে সাড়া দিয়ে প্রচুর মানুষ ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করে। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন নবীন যুবক মুয়ায ইবনু জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু। তখন তাঁর বয়স ছিল আঠার বছর। পরের বছর তথা নবুওয়াতের তেরোতম বছরের জিলহজ মাসে মদিনা থেকে সত্তরজনেরও অধিক লোকের বড় একটি মুসলিম জামাত মক্কার উদ্দেশে রওয়ানা করে। আগের বছরের ওয়াদা অনুযায়ী মক্কায় পৌঁছে তাঁরা আকাবা নামক স্থানে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে দেখা করেন। সেখানে বায়আতে আকাবায়ে সানিয়াহ অনুষ্ঠিত হয়। এটি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মদিনা হিজরতের ব্যাপারে বড় ভূমিকা রেখেছে। এই মহাসৌভাগ্যের অধিকারী জামাতের সাথে মুয়ায ইবনু জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহুও ছিলেন।

নবিজির সান্নিধ্যে
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় আসার পর থেকে মুয়ায ইবনু জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু সর্বক্ষণ তাঁর সান্নিধ্যে থাকার যথাসাধ্য চেষ্টা করতেন। সফরে থাকুন কিংবা বাড়িতে, জ্ঞানার্জনের পিপাসা মেটানোর তাগিদে তিনি লেগে থাকতেন তাঁর সাথে। এভাবে তিনি তাঁর কাছ থেকে হাসিল করেন কুরআন ও ইসলামি শরিয়াহর বিস্তর ইলম। একসময় তিনি সাহাবিগণের মধ্যে হয়ে যান অন্যতম শ্রেষ্ঠ কারি এবং শ্রেষ্ঠ আলেম। তাঁর যোগ্যতা দেখে স্বয়ং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবাদের উদ্দেশ করে বলেন, ‘তোমরা কুরআন শেখো চারজনের কাছ থেকে; ইবনু মাসউদ, আবু হুজায়ফার আজাদকৃত গোলাম সালিম, উবাই এবং মুয়ায ইবনু জাবাল।’
তিনি আরও বলেন, ‘মুয়ায ইবনু জাবাল আমার উম্মতের মধ্যে হালাল ও হারাম বিষয়ে সবচেয়ে বেশি জ্ঞান রাখে।’
অন্য জায়গায় বলেন, ‘কেয়ামতের দিন যখন আলেমগণ তাদের রবের নিকট উপস্থিত হবে, তখন মুয়ায তাদের সম্মুখে পাথর নিক্ষেপের দূর পর্যন্ত এগিয়ে থাকবে।’
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিঃসন্দেহে তাঁর সাহাবিদের সবচেয়ে বেশি চিনতেন। প্রত্যেককে তিনি স্তর অনুযায়ী ভালোবাসতেন এবং কাছে টানতেন। তাঁর কাছে মুয়ায ইবনু জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহুরও বিশেষ মর্যাদা ছিল। তিনি আপন সততা, একনিষ্ঠতা, মেধা ও যোগ্যতাবলে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্তরে বিশেষ স্থান করে নিয়েছিলেন। একবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর হাত ধরে বললেন, ‘মুয়ায, আল্লাহর শপথ! আমি তোমাকে ভালোবাসি।’ মুয়ায রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘আল্লাহর রাসুল, আমার পিতামাতা আপনার জন্যে কুরবান হোন, আমিও আপনাকে ভালোবাসি।’ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘মুয়ায, আমি তোমাকে ওসিয়ত করছি, প্রত্যেক নামাজের শেষে তুমি এই দুআ পড়তে ভোলো না, اللهم أعني على ذكرك وشكرك وحسن عبادتك।’
কতটা অন্তরঙ্গতা স্নেহাশিষ থাকলে পরে স্বয়ং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর প্রতি ভালোবাসা জানাতে পারেন! নিঃসন্দেহে এটা মুয়ায রাদিয়াল্লাহু আনহুর জন্য বড় গৌরবের বিষয় ছিল।
অন্য একবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ধারাবাহিকভাবে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু, উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু, আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু, উসাইদ ইবনু হুযাইর রাদিয়াল্লাহু আনহু, সাবেত ইবনু কায়েস রাদিয়াল্লাহু আনহু, মুয়ায ইবনু জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং মুয়ায ইবনু আমর ইবনিল জামুহ রাদিয়াল্লাহু আনহু—এঁদের প্রত্যেকের ব্যাপারে প্রশংসা করে বলেন, ‘কতই না উত্তম লোক তারা!’
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে তাঁর বিশেষ স্থান থাকার আরেকটা প্রমাণ হলো, তিনি বলেন, ‘একদিন আমি একটি গাধার উপর আল্লাহর রাসুলের পিছনে বসা ছিলাম। গাধাটিকে ‘উফাইর’ নামে ডাকা হতো।…’ অন্য বর্ণনায় পাওয়া যায় তিনি বলেন, ‘তখন তাঁর ও আমার মধ্যখানে হাওদার কাঠ ছাড়া অন্য কিছু ছিল না।’
এগুলো ছাড়াও আরও অনেক বর্ণনায় তাঁর প্রতি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিশেষ দৃষ্টির প্রমাণ পাওয়া যায়।

তরবারি হাতে
বদর যুদ্ধ যখন সংঘটিত হয়, তখন মুয়ায ইবনু জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহুর বয়স ২১। তিনি তাতে অংশগ্রহণ করেন এবং সর্বোচ্চ বীরত্ব দেখান। এ ছাড়া উহুদ যুদ্ধ থেকে নিয়ে তাবুক যুদ্ধ পর্যন্ত তিনি সকল যুদ্ধে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে যোগদান করেন। নবিজির ইন্তেকালের পর শাহাদতের কামনায় তিনি খলিফাতুল মুসলিমীন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর অনুমতিক্রমে সিরিয়ায় চলে যান। সেখানে তিনি ইয়ারমুক, আজনাদাইন ও দিমাশক বিজয়সহ সকল যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে যখন খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে যুদ্ধের মূল নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে সর্বাধিনায়ক করেন, তখন মুয়ায রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর ডান হাত হয়ে যান। আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুর ইন্তেকালের পর তাঁকে সিরিয়ার বাহিনীর প্রধান সেনাপতি নিয়োগ দেওয়া হয়।

ইয়ামানের গভর্নর
তাবুক যুদ্ধের পর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ইয়ামান থেকে একদল লোক আসে। তারা ইসলাম গ্রহণ করে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে বায়আত হয়। তখন তিনি ইয়ামানে শাসনকার্য পরিচালনা, ইলমে দ্বীন শিক্ষাদীক্ষা এবং ইসলাম প্রচার-প্রসারের জন্য মুয়ায ইবনু জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু, আবু মুসা আশআরি রাদিয়াল্লাহু আনহু ও মালিক ইবনু উবাদা রাদিয়াল্লাহু আনহুসহ আরও কয়েকজন সাহাবিকে সেখানে প্রেরণ করেন। তাঁদের আমির বানিয়ে দেন মুয়ায ইবনু জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহুকে। যাবার আগে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, ‘সেখানে তুমি কিসের ভিত্তিতে ফায়সালা দেবে?’ তিনি উত্তর দেন, ‘আল্লাহর কিতাবের আলোকে।’ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যদি আল্লাহর কিতাবে না পাও?’ তিনি বলেন, ‘তবে আল্লাহর রাসুলের সুন্নাহ মোতাবেক ফায়সালা করব।’ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যদি সেখানেও না পাও?’ তিনি বলেন, ‘তবে আমি আমার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইজতিহাদ করব। এ ব্যাপারে কোনো অলসতা করব না।’ তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বুকে চাপড় দিয়ে বলেন, ‘সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার—যিনি আল্লাহর রাসুলের প্রতিনিধিকে এমন তাওফিক দিয়েছেন, যার দ্বারা সে আল্লাহর রাসুলকে খুশি করে দিয়েছে।’ এরপর তাঁকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যন্ত মূল্যবান বহু উপদেশ দিয়ে সমৃদ্ধ করেন। তন্মধ্যে দুটি উপদেশ এখানে উল্লেখ করছি :

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘সাবধান, বিলাসিতা থেকে বেঁচে থেকো। কারণ, আল্লাহর প্রকৃত বান্দারা বিলাসী হয় না।’ তিনি তাঁর হাত ধরে পথ চলতে চলতে বলেন, ‘মুয়ায, আমি তোমাকে স্নেহশীল ভাইয়ের মতো উপদেশ দিচ্ছি—তুমি আল্লাহকে ভয় কোরো, সত্য কথা বোলো, অঙ্গীকার পূরণ কোরো, আমানত আদায় কোরো, খেয়ানত ছেড়ে দিয়ো, এতিমদের প্রতি দয়া দেখিয়ো, প্রতিবেশীদের অধিকার রক্ষা কোরো, রাগকে দমিয়ে রেখো, মানুষের প্রতি সদয় হয়ো, সালামের প্রসার কোরো, নম্রভাবে কথা বোলো, ঈমানকে আকড়ে ধোরো, কুরআনে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন কোরো, আখেরাতকে ভালোবেসো, শেষ দিবসের হিসাবকে ভয় কোরো, স্বপ্ন দেখা কমিয়ে দিয়ো এবং কাজকর্ম সুন্দরভাবে কোরো। মুয়ায, প্রত্যেক পাথর ও গাছের নিকটে আল্লাহর যিকির কোরো, প্রত্যেক গুনাহের পরপরই তাওবা কোরো; গোপন পাপের জন্য তাওবা গোপনে এবং প্রকাশ্য পাপের জন্য প্রকাশ্যে তাওবা কোরো, অসুস্থকে দেখতে যেয়ো, বিধবা ও দুর্বলদের প্রয়োজনে দ্রুত ছুটে যেয়ো, ফকির-মিসকিনদের সাথে উঠাবসা কোরো, নিজের থেকে মানুষের প্রতি অধিক ইনসাফ কোরো এবং হক কথা বলতে তিরস্কারকারীর তিরস্কারের ভয় কোরো না।’
বিদায়ের সময় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সওয়ারির পাশে হেঁটে হেঁটে নসিহত করতে করতে বহুদূর পর্যন্ত যান। শেষে তাঁকে বলেন, ‘মুয়ায, এ বছরের পর হয়তো আমার সাথে তোমার আর সাক্ষাৎ হবে না। হয়তো তুমি আমার এই মসজিদ এবং আমার কবরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করবে।’ এ কথা শুনে মুয়ায রাদিয়াল্লাহু আনহু কেঁদে ফেলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সান্ত্বনাস্বরূপ তাঁকে আরও কিছু উপদেশ দেন এবং তাঁর জন্য দুআ করেন, ‘আল্লাহ তাআলা তোমাকে হেফাজত করুন সামনে থেকে, পেছন থেকে, ডান থেকে, বাম থেকে, উপর থেকে, নিচ থেকে এবং তোমাকে মানুষজাতি ও জিনজাতির যাবতীয় অনিষ্ট থেকে দূরে রাখুন।’
রাসুলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মুয়ায রাদিয়াল্লাহু আনহু সাথিদের নিয়ে ইয়ামানের পথে যাত্রা করেন। সেখানে গিয়ে তিনি আল-জানাদ শহরে অবস্থান করেন এবং আল-জানাদে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। কিছুদিন পর সে শহরটি ইয়ামানে দ্বীন ও ইলমের কেন্দ্র হয়ে যায়। এর কিছুদিন পর ভণ্ড নবি আসওয়াদ আনাসির আভির্বাব ঘটে। তার ফিতনা ঝড়ের বেগে পুরো ইয়ামানে ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি তখন এতই খারাপ হয় যে, মুয়ায রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন এটা জানতে পারেন, তখন তিনি তাদের কাছে চিঠি পাঠান যেন তারা এ ফিতনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে তা মূলোৎপাটন করে দেন। মুয়ায রাদিয়াল্লাহু আনহু সে চিঠি মুসলমানদের পড়ে শুনিয়ে তাদের মধ্যে জোশ জাগ্রত করেন এবং রুখে দাঁড়ান। এরপর তিনি সে চিঠিটি আসওয়াদের গুরুত্বপূর্ণ সভাসদ ফিরোজ আদ-দাইলামি ও কায়েস ইবনু মাকশুহের কাছে পাঠান। চিঠি পড়ে তারা মুসলমানদের পক্ষে চলে আসেন এবং গোপনে আসওয়াদকে হত্যা করে ফেলেন। এভাবে সেই ফিতনা সমূলে উৎপাটিত হয়ে যায়। এরপর আরও কিছুদিন মুয়ায রাদিয়াল্লাহু আনহু সেখানে অত্যন্ত দৃঢ়তা ও দক্ষতার সাথে শাসনকার্য পরিচালনা করেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পর তিনি নিজেই পদত্যাগ করে সেখান থেকে মদিনায় ফিরে আসেন।

জ্ঞানের মশাল হাতে
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, স্বয়ং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে মুয়ায ইবনু জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহুর ইলমি যোগ্যতা স্বীকৃত ছিল। ইলম, আমল ও জিহাদের দিক দিয়ে তিনি সাহাবিগণের মধ্যে নেতৃস্থানীয় ছিলেন। তিনি ঐসকল সাহাবির অন্তর্ভূক্ত ছিলেন, যারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে মদিনায় ফতোয়া দিতেন। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর যুগেও তিনি ফতোয়া দিতেন। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে কুরআন একত্র করতেন চারজন, তাঁরা সবাই আনসারি; উবাই ইবনু কাব, মুয়ায ইবনু জাবাল, যায়েদ ইবনু সাবেত এবং আবু যায়েদ।’ বিশিষ্ট তাবেঈ আবু মুসলিম আল-খাওলানি রহ. বলেন, ‘একবার আমি হিমসের মসজিদে প্রবেশ করলাম। তখন সেখানে প্রায় ত্রিশজন ত্রিশোর্ধ বয়সী সাহাবি ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন যুবক—যাঁর চোখ কাজলকালো এবং দাঁত উজ্জ্বল। তিনি নীরব ছিলেন। যখন অন্যদের মাঝে কোনো বিষয়ে মতভিন্নতা দেখা দিত, তখন তাঁরা তাঁর মুখোমুখি হয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করতেন। আমি একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, “ইনি কে?” সে বলল, “মুয়ায ইবনু জাবাল।”
হাদিস বর্ণনায়ও মুয়ায রাদিয়াল্লাহু আনহু অনেক এগিয়ে ছিলেন। তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বহু হাদিস বর্ণনা করেছেন। তাঁর থেকে ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু, ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু, জাবের ইবনু আবদিল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু ও আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহুসহ আরও অনেক সাহাবি বর্ণনা করেছেন। তাবেয়িদের মধ্যে বর্ণনা করেছেন আবু মুসলিম আল-খাওলানি, আবদুর রাহমান ইবনু গানাম, ইবনু আবি লায়লা ও মাসরুক রাহিমাহুমুল্লাহসহ আরও অনেকে।

অন্যান্য সাহাবিদের কাছে তাঁর মর্যাদা
যাঁর অবস্থান রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছেই অনেক উঁচুতে, সাহাবিগণের কাছে তাঁর অবস্থান কতটুকু উঁচুতে থাকবে—তা বলা বাহুল্য। বড় বড় সাহাবির মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম।
আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে যখন তিনি সিরিয়ার উদ্দেশে বের হয়ে যান, তখন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘তাঁর প্রস্থান ফিকহের ক্ষেত্রে মদিনা ও মদিনাবাসীর ক্ষতি করেছে। তারা আর তাঁর কাছ থেকে ফতোয়া নিতে পারবে না। আমি আবু বকরকে বলেছিলাম মানুষের প্রয়োজনে তাঁকে আটকে রাখতে, কিন্তু আলী দ্বিমত জানিয়ে বললেন, যে লোক শাহাদতবরণের ইচ্ছা পোষণ করেছে আমি তাঁকে আটকে রাখব না। তখন আমি বললাম, আল্লাহর কসম! নিঃসন্দেহে লোকটি ঘরে বসে আপন বিছানায় শুয়ে শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করতে পারবে।’
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে একবার এক লোক তার স্ত্রী থেকে দুবছর দূরে থাকে। ফিরে এসে দেখে তার স্ত্রী গর্ভবতী। সে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে অভিযোগ করে। তিনি তার স্ত্রীকে রজম করতে চান। তখন মুয়ায রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে বলেন, ‘এই মহিলার উপর আপনার অভিযোগ থাকলেও তার গর্ভের সন্তানের উপর তো আপনার কোনো অভিযোগ নেই।’ এটা শুনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে ছেড়ে দেন। কিছুদিন পর স্ত্রীলোকটি ওই ব্যক্তির মতো দেখতে একটি ছেলেসন্তান জন্ম দেয়। তাকে দেখে লোকটি বলে, ‘এ আমার ছেলে।’ তখন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘মহিলারা মুয়াযের মতো ব্যক্তি জন্ম দিতে অক্ষম হয়ে গেছে। যদি মুয়ায না থাকত, তবে উমর ধ্বংস হয়ে যেত।’ অন্য একদিন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু লোকদের উদ্দেশে বয়ান করার সময় বলেন, ‘কেউ যদি ফিকহ শিখতে চায়, সে যেন মুয়ায ইবনু জাবালের কাছে যায়।’
ফারওয়াহ আল-আশজায়ী বলেন, একবার ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন,
إن معاذ بن جبل كان أمة قانتًا لله حنيفًا ولَم يك من المشركين (নিঃসন্দেহে মুয়ায ইবনু জাবাল ছিলেন একটি জাতির প্রতীক, আল্লাহর অনুগত, একনিষ্ঠ এবং তিনি শিরককারীদের অন্তর্ভূক্ত ছিলেন না।)
আমি বললাম, আল্লাহ তাআলা তো বলেছেন, إن ابراهيم كان أمة قانتًا لله حنيفًا ولَم يك من المشركين অর্থাৎ–নিঃসন্দেহে ইবরাহিম ছিলেন একটি জাতির প্রতীক, আল্লাহর অনুগত, একনিষ্ঠ এবং তিনি শিরককারীদের অন্তর্ভূক্ত ছিলেন না।
তিনি বললেন, আমি ভুলে যাইনি। তুমি কি জানো ‘الأمة’ এবং ‘القانت’ মানে কি?
আমি বললাম, আল্লাহ ভালো জানেন।
তিনি বললেন, ‘الأمة’ মানে যে কল্যাণের শিক্ষা দেয় এবং ‘القانت’ মানে যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অনুগত। আর মুয়ায ইবনু জাবাল মানুষদেরকে কল্যাণের শিক্ষা দিতেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অনুগত ছিলেন।
জাবির ইবনু আবদিল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘মুয়ায ইবনু জাবাল লোকদের মধ্যে ছিলেন সবচেয়ে সুন্দর চেহারার অধিকারী, সবচেয়ে সুন্দর চরিত্রের অধিকারী এবং সবচেয়ে বেশি প্রশস্ত হাতের অধিকারী।’

ব্যক্তিগত জীবন
অন্যান্য সাহাবির মতো মুয়ায রাদিয়াল্লাহু আনহুর অন্তরেও দুনিয়ার জন্য কোনো জায়গা ছিল না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বরকতময় সোহবতে ক্বলবকে দুনিয়ামুক্ত করে দিয়েছিলেন। ফলত তাঁর মাঝে ছিটেফোঁটাও কৃপণতা বা লালসা ছিল না। তিনি অত্যন্ত দানশীল ছিলেন, অকাতরে দান করতেন, নিজের কাছে কোনো সম্পদ জমা রাখতেন না। একবার উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে ও আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে পরীক্ষা করতে চাইলেন। স্বর্ণমুদ্রা দ্বারা দুটি থলে ভরে এক গোলামের মাধ্যমে উভয়টি তাদের কাছে পাঠালেন। বলে দিলেন, তারা এগুলো দিয়ে কী করে আড়াল থেকে দেখে এসো। তাঁরা উভয়ে থলে হাতে পেয়েই সব স্বর্ণমূদ্রা অভাবীদের মাঝে বণ্টন করে দিলেন।
আল্লাহর ইবাদতের প্রতিও তাঁর স্পৃহা ছিল প্রচণ্ড রকমের। তাঁর বসতি মদিনার এক পার্শ্বে ছিল। তিনি সেখানকার ইমাম ছিলেন। এরপরও প্রায়সময় ইমামতি করে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে মসজিদে নববীতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিছনে নামাজ পড়তে আসতেন। তিনি রাতকে তিন ভাগ করে নিয়েছিলেন; একভাগে ঘুমাতেন, একভাগে কুরআন তিলাওয়াত করতেন আর একভাগে নামাজ পড়তেন। এছাড়া যিকির-আযকার, তাসবিহ-তাহলিল ও মুনাজাতে তো সর্বক্ষণ নিমগ্ন থাকতেন।
তাঁর স্ত্রী ছিলেন দুজন। সন্তান ছিলেন তিনজন; আবদুর রাহমান রাদিয়াল্লাহু আনহু—তিনি সাহাবি ছিলেন, উম্মু আবদিল্লাহ—তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট বায়আত হয়েছিলেন, আরেকজন ছেলে, তাঁর নাম ও পরিচয় পাওয়া যায় না। ছেলেদুজন পিতার সাথে আমওয়াস মহামারিতে শাহাদতবরণ করেন।

পরকালের সফর
উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে ১৮ হিজরিতে সিরিয়ায় আমওয়াস মহামারী দেখা দেয়। এতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে প্রায় ত্রিশ হাজার মানুষ। তাদের মাঝে অনেক সাহাবিও ছিলেন। এই মহামারীর সময় মুয়ায রাদিয়াল্লাহু আনহু সেখানে মুসলিম বাহিনীর সাথে ছিলেন। যখন মহামারী তীব্র আকার ধারণ করে, তখন প্রধান সেনাপতি আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বাহিনীর সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘হে লোকসকল, এই মহামারী আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত এবং তোমাদের নবীর দুআ। আর আবু উবায়দা আল্লাহর কাছে চাচ্ছে, তিনি যেন তার জন্য এটার একটা অংশ রাখেন।’ এর কিছুদিন পরেই তিনি এতে আক্রান্ত হয়ে শাহাদতবরণ করেন। তাঁর পরে প্রধান সেনাপতি হন মুয়ায ইবনু জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু। তিনিও লোকদের সম্মুখে একই কথা বলেন এবং দুআ করেন, আল্লাহ যেন মুআজের পরিবারের জন্য এই রহমতের একটা অংশ রাখেন। কদিন পরেই তাঁর ছেলেদুজন আক্রান্ত হয়ে শাহাদতবরণ করেন। এরপর তাঁর স্ত্রীদুজন শাহাদতবরণ করেন। এরপর তিনি আক্রান্ত হন। প্রথমে তাঁর বুড়োআঙ্গুলে ফোঁড়া দেখা দেয়। তিনি তাতে চুমু খেয়ে বলে উঠেন, ‘হে আল্লাহ, এটা তো ছোট, তুমি এতে বরকত দান করো। তুমি তো ছোটর মাঝে বরকত দান করে থাকো।’ এরপর সেটা বাড়তে থাকে। মৃত্যুর আগে তিনি শেষ পরিণামের ভয়ে কাঁদতে শুরু করেন। তাঁকে বলা হয়, আপনি আল্লাহর রাসুলের সাহাবি হয়েও কাঁদছেন কেন? তিনি উত্তর দেন, ‘আমি মৃত্যুর কষ্টে কিংবা দুনিয়াত্যাগের জন্য কাঁদছি না, আমি কাঁদছি দুটি পাকড়াও (অর্থাৎ জান্নাত ও জাহান্নাম)-এর জন্য, জানি না আমি কোন পাকড়াওয়ে পড়ব।’ এরপর তিনি আল্লাহর রহমতের আশায় আশান্বিত হয়ে ওঠেন। বলতে থাকেন, ‘সুস্বাগতম হে মৃত্যু, সুস্বাগতম। অনেকদিন পর মেহমান এসেছে। অধীর অপেক্ষার পর প্রিয় বন্ধু এসেছে।’ তারপর তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘হে আল্লাহ, তুমি তো জানতে আমি দুনিয়াকে ভালোবাসিনি। আমি এখানে দীর্ঘসময় থাকতে চাইনি শুধু বৃক্ষরোপণ এবং খাল খননের জন্য। বরং থাকতে চেয়েছি দুপুরের পিপাসা, অবিরাম মুজাহাদা, উলামাদের ভিড়ে যিকিরের হালকায় হাঁটু গেড়ে বসা—এসবের জন্য। তুমি তো এসব জানতে। হে আল্লাহ, তুমি আমাকে সেরকম সুন্দরভাবে গ্রহণ করো, যেভাবে মুমিন আত্মা তোমার কাছে গৃহীত হয়।’ এর কিছুক্ষণ পর তিনি শাহাদতবরণ করেন। বর্তমান জর্ডানের আশ-শুনাতুশ শামালিয়্যাহ শহরে পাশাপাশি তাঁর ও তাঁর ছেলেদের কবর অবস্থিত। শাহাদাতকালে তাঁর বয়স ছিল ৩৮ বছর।

সূত্র
সহিহ বুখারি— হাদিস নম্বর : ২৭২৮, ৩৫৯৫, ৬১৬২
সুনানে তিরমিজি— হাদিস নম্বর : ৩৭৯১, ৩৭৯৪, ৩৭৯৫
সহিহ ইবনু হিব্বান—হাদিস নম্বর : ২০২০
তাবাকাতু ইবনি সাদ—৩/৫৩৯
আল ইসাবাহ—৬/১০৭
হিলয়াতুল আওলিয়া—১/২২৮
সিফাতুস সফওয়াত—১৭৮
সিয়ারু আ’লামিন নুবালা—১/৪৪৩
তারিখুল ইসলাম—৩/১৭৫
উসদুল গাবাহ—১১৩৯
হায়াতুস সাহাবা—২/১৪৩
মুয়ায ইবনু জাবাল—আ’লামুল মুসলিমন সি. ২৫

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

error: Content is protected !!