শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০

জাবির ইবনু আবদিল্লাহ : হাদিস বর্ণনায় প্রসিদ্ধ সাহাবি

0

জন্ম ও বংশপরিচয় :
নাম জাবির। বংশপরম্পরা—জাবির ইবনু আবদিল্লাহ ইবনি আমর ইবনি হারাম ইবনি সালাবাহ ইবনি হারাম ইবনি কাব ইবনি গানাম ইবনি কাব ইবনি সালিমাহ। উপনাম আবু আবদিল্লাহ, আবু আবদির রাহমান, আবু মুহাম্মদ। আনসারি সাহাবি, মদিনার খাযরাজ গোত্রের লোক। রাদিয়াল্লাহু আনহু। তাঁর উপনাম আবু আবদিল্লাহ নাকি আবু আবদির রহমান এ নিয়ে মতপার্থক্য আছে। আবু মুহাম্মদও তাঁর উপনাম ছিল। তবে প্রথমটি অধিকতর শুদ্ধ বলে ইতিহাসকাররা বলেন।
তিনি হিজরতের ষোলো বছর পূর্বে ইয়াসরিবে (মদিনার পূর্বনাম) জন্মগ্রহণ করেন।
পিতা আবদুল্লাহ ইবনু আমর প্রথম সারির আনসারি সাহাবি, হিজরতের আগে মদিনার যাঁরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন তাঁদের একজন, বায়াতে আকাবায়ে ছানিয়ায় নবিজি যে বারোজন নেতা নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন, এই বারোজনের মধ্যে তিনি অন্যতম, বদরের যুদ্ধের শীর্ষ নেতাদের একজন। উহুদ যুদ্ধে সর্বপ্রথম তিনিই শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর হত্যাকারী সুফিয়ান ইবনু আবদি শামস। তাঁকে এবং তাঁর শ্যালক আমর ইবনু জামুহকে একই কবরে সমাধিস্থ করা হয়। তখন উভয়েরই বয়স ছিল প্রায় একশ বছর।
মায়ের নাম নাসিবা। বংশপরম্পরা—নাসিবা বিনতু উকবাহ ইবনি উদদি ইবনি সিনান ইবনি নাবি ইবনি যায়েদ ইবনি হারাম ইবনি কাব ইবনি গানাম।
হারামে এসে জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহুর পিতামাতা উভয়ের বংশধারা একত্রিত হয়েছে। তাঁর পিতার দশ সন্তানের মাঝে তিনিই একমাত্র ছেলে, বাকি সব মেয়ে।

ইসলামগ্রহণ ও নবিজির সাহচর্য
নবুয়তের তেরোতম বছর তাঁর পিতা হযরত আবদুল্লাহ ইবনু আমর তাঁকে বায়াতে আকাবায়ে ছানিয়ায় সাথে নিয়ে যান। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ছয় বছর। এই সময়েই তিনি ইসলামের ছায়াতলে আসেন। ফলে নবিজির বিশেষ স্নেহে ধন্য হন। নবিজির সাথে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল খুবই ঘনিষ্ঠ। নবিজি তাঁর হালপুরস্তি করতেন, ভালো-মন্দের খবর রাখতেন। এমনকি নবিজির কখনও করজের প্রয়োজন পড়লে, তাঁর কাছ থেকে নিতেন। মাঝেমধ্যে তাঁকে হাদিয়া-তোহফাও দিতেন।
ড. আবদুর রহমান রাফাত পাশা সুন্দর বলেছেন—মুবারকবাদ জাবির ইবনু আবদিল্লাহ আল আনসারিকে; তিনি রাসুলে আযাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে বায়াত গ্রহণ করেছেন, যখন তিনি নিষ্পাপ শিশু, তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছেন, যখন তাঁর আঙুলের নখগুলো কোমল, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে জিহাদ করেছেন, যখন তিনি পূর্ণ যুবক, আর আল্লাহর রাস্তায় তিনি তখনও নিজের পায়ে ধুলো জড়িয়েছেন, যখন তিনি অশীতিপর বৃদ্ধ।

যুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং যুদ্ধে সংঘটিত প্রসিদ্ধ দুটি ঘটনা
বদর এবং উহুদ যুদ্ধ ছাড়া নবিজির সাথে বাকি সব যুদ্ধেই তিনি অংশগ্রহণ করেছেন। তবে কোনো কোনো রেওয়ায়াতে পাওয়া যায় তিনি বদরে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং তৃষ্ণার্ত মুজাহিদদের পানি পান করিয়েছিলেন। এ ক্ষেত্রে জাবিরের কথাই অগ্রগণ্য। উসদুল গাবাহ গ্রন্থে জাবিরের উক্তি নকল করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একুশটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন, এবং আমি তাঁর সাথে উনিশটি, (অন্য মতে সতেরোটি) যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। বদর এবং উহুদে যেতে পারিনি; কারণ আমার পিতা আমাকে যেতে বারণ করেছিলেন। কিন্তু উহুদ যুদ্ধে আমার পিতা শহিদ হওয়ার পর থেকে নবিজির সাথে আর কোনো যুদ্ধে আমি অনুপস্থিত থাকিনি।’
উল্লেখ্য, উহুদ যুদ্ধের সময় তিনি ছোট ছিলেন এবং ঘরে তাঁর ৯ বোন (অন্য মতে ৭ বোন) ছিলেন, তাঁদের তদারকির জন্যই তাঁর পিতা তাঁকে বারণ করেছিলেন।

ঘটনা এক—
খন্দকের যুদ্ধে তাঁর মেহমানদারির ঘটনা সুপ্রসিদ্ধ। তিনি সামান্য খাবারের আয়োজন করে নবিজিকে দাওয়াত করে বলেছিলেন, ‘আমরা একটি বকরির বাচ্চা জবাই করেছি। আর এক ছা’ যব ছিল, আমার স্ত্রী তা পিষেছে। সুতরাং আপনি আরও কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে চলুন।’ কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম পরিখা খননকারী সকল সাহাবিকে ডেকে বললেন, ‘এসো তোমরা, তাড়াতাড়ি চলো, জাবির তোমাদের জন্য খাবার তৈরি করেছে।’ অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বললেন, ‘তুমি বাড়ি ফিরে যাও। আমি না আসা পর্যন্ত গোশতের ডেকচি নামাবে না এবং খামির থেকে রুটিও বানাবে না।’ এরপর তিনি লোকজনসহ উপস্থিত হলেন। তখন তাঁর স্ত্রী খামিরগুলি রাসুলের সম্মুখে দিলে তিনি তাতে লালা মিশিয়ে দিয়ে বরকতের জন্য দুআ করলেন। অতঃপর ডেকচির নিকট অগ্রসর হয়ে তাতেও লালা মিশিয়ে বরকতের জন্য দুআ করলেন। এরপর বললেন, ‘তুমি আরো রুটি প্রস্তুতকারিণীদের ডাকো, যারা তোমার সাথে রুটি বানাবে। আর চুলার উপর থেকে ডেকচি না নামিয়ে তুমি তা থেকে তরকারী নিয়ে পরিবেশন কর।’ জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘সাহাবিদের সংখ্যা ছিল এক হাজার। আমি আল্লাহর কসম করে বলছি, সকলে তৃপ্তি সহকারে খেয়ে চলে যাওয়ার পরও ডেকচি ভর্তি তরকারী ফুটছিল এবং প্রথম অবস্থার ন্যায় আটার খামির হতে রুটি প্রস্তুত হচ্ছিল।’

ঘটনা দুই–
গাযওয়ায়ে যাতুর রুকায় তিনি একটি রুগ্ন উট নিয়ে অংশ নিয়েছিলেন। ফেরার পথে তাঁর রুগ্ন উটটি চলতে চলতে থেমে পড়ছিল। কাফেলার সবাই আগে চলে যাচ্ছিল আর তিনি পেছনে থেকে যাচ্ছিলেন। বারবার তাঁকে পেছনে পড়তে দেখে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বললেন, তুমি কাফেলার সাথে না চলে পেছনে কেন? উত্তরে উটের দুর্বলতার কথা বললে, নবিজি কাছের এক ঝাড় থেকে একটি ঢাল ভেঙে তা দিয়ে মৃদু আঘাত করেন। ছড়ি মারতেই বাহন-উটটি দ্রুত গতিতে চলতে লাগল। জাবির বলেন, এমন দ্রুত চলতে লাগল যে, নবিজির উটের সাথে তাল মিলিয়ে চলছিল। এবং আমি নবিজির সাথে কথা বলতে বলতে যাচ্ছিলাম। কথা বলতে বলতে নবিজি হযরত জাবিরের উটটি কিনতে চাইলেন। তিনি বললেন, আপনার কাছে বেচব কেনো, আমি আপনাকে এটি হাদিয়া করে দেব। নবিজি হাদিয়া নিতে রাজি হলেন না, তিনি বললেন, ‘নাহ, আমি এটা মূল্য দিয়েই কিনব। ’শেষে এক উকিয়াহ -প্রায় আটশ দিরহামের সমপরিমাণ- মূল্যে নবিজি উটটি ক্রয় করেন। কিন্তু পরবর্তীতে নবিজি উটটি হযরত জাবিরকে ফিরিয়ে দেন, সাথে এর মূল্যও দিয়ে দেন।

হাদিস বর্ণনার সংখ্যা
যে সকল সাহাবি অধিক হাদিস বর্ণনা করেছেন, তিনি তাঁদের একজন। তাঁর বর্ণিত হাদিসসংখ্যা, পনেরোশো চল্লিশটি। তাঁর থেকে বর্ণিত দুইশরও বেশি হাদিস দুই ইমাম—বুখারি ও মুসলিম—তাঁদের সহিহানে (বুখারি শরিফ, মুসলিম শরিফ; হাদিসের সবথেকে নির্ভরযোগ্য দুই কিতাব) যোগ করেছেন। এর মধ্যে আটান্নটি হাদিস এমন আছে যেগুলো মুত্তাফাক আলাইহি অর্থাৎ বুখারি মুসলিম উভয়েই এগুলো বর্ণনা করেছেন। এগুলো ছাড়া বুখারি স্বতন্ত্রভাবে তাঁর ছাব্বিশটি হাদিস যোগ করেছেন বুখারি শরিফে এবং ইমাম মুসলিম যোগ করেছেন, একশো ছাব্বিশটি। তাছাড়া হজ সম্পর্কিত সর্বাধিক হাদিস বর্ণনাকারী হিসেবেও তিনি স্বীকৃত।

তিনি যাঁদের থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন—মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, উমর আল-ফারুক, আলি ইবনু আবি তালিব, আবু বকর আস-সিদ্দিক, আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ, মুয়ায ইবনু জাবাল, যুবায়ের ইবনুল আওয়াম, খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ, তালহা ইবনু উবায়দিল্লাহ, আবদুল্লাহ ইবনু উনাইস, আম্মার ইবনু ইয়াসির, আবু হুমাইদ আস সাদি, আবু সাইদ খুদরি, আবু কাতাদা আনসারি, আবু হুরায়রা, উম্মু শারিক, উম্মু কুলসুম বিনতু আবি বকর, উম্মু মালিক আল-আনসারিয়াহ এবং উম্মু মুবাশ্বির আল-আনসারিয়াহ প্রমুখ শীর্ষ সাহাবা রাদিয়াল্লাহু আনহুম।
তার থেকে যারা হাদিস বর্ণনা করেছেন, এর তালিকা অনেক লম্বা, এখানে শুধু উল্লেখযোগ্য কয়েকজনের নাম দেয়া হলো—
মুহাম্মদ আল বাকির, আমর ইবনু দিনার, আবু যুবায়ের আল-মাক্কি, আতা ইবনু আবি রুবাহ, মুজাহিদ ইবনু জাবির, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব, সালিম ইবনু আবিল জাদ, হাসান আল বসরি, হাসান ইবনু মুহাম্মাদ ইবনি আল হানিফা, মুহাম্মাদ ইবনু আল মুনকাদির, সাঈদ ইবনু মিনা আল-মাক্কি, আবু সুফিয়ান তালহা ইবনু নাফে, আমির শাবি—প্রমুখ তাবেয়ি।

ইলমি মাকাম এবং সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে তাঁর অবস্থানগত মর্যাদা
তিনি ছিলেন মুআল্লিমুস সাহাবা, মুফতিয়ে মাদিনাহ। এবং তাঁর দরসগাহ ছিল মসজিদে নববি। ছিলেন হাফিজুল হাদিস, বড় ইমাম, মুজতাহিদ, ফকিহ। মুসা ইবনু আলি ইবনি মুহাম্মদ আল-আমির তাঁর ফতোয়া সংকলনও করেছেন। সংকলনটির নাম হলো—জাবির ইবনু আবদিল্লাহ এবং তাঁর ফিকহ। শৈশবেই ইসলামের ছায়াতলে আসার সুবাদে নবিজির সুহবতও পেয়েছেন বেশি। যার ফলে বর্ণিত হাদিস পনেরোশও ছাড়িয়ে গিয়েছে, সাহাবায়ে কেরামের মাঝে তাঁকে অধিক হাদিস বর্ণনাকারীদের মধ্যে গণ্য করা হয়।

হাদিস অন্বেষণের প্রতি ঝোঁক এবং হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে সতর্কতা
হাদিস অন্বেষণের প্রতি তাঁর এতোই ঝোঁক ছিল, এর জন্য দীর্ঘ সফর করতেও দ্বিধা করতেন না। তিনি নিজেই বলেন—একবার আমার কাছে সংবাদ এলো, একজন সাহাবি নবিজি থেকে সরাসরি একটি হাদিস শুনেছেন, যা আমি শুনিনি, শুধু এই হাদিসটির জন্য আমি একমাসের দীর্ঘ সফর করে সিরিয়ায় তাঁর কাছে পৌঁছুলাম।
পঞ্চাশ হিজরিতে তিনি মিসর সফর করেন। তখন মিসরের গভর্নর ছিলেন মাসলামাহ ইবনু মুখাল্লাদা আল আনসারি। তিনি জাবিরের গোত্রেরই লোক। এরই প্রেক্ষিতে ইবনু মানদাহ বলেন, জাবির ইবনু আবদিল্লাহ মাসলামাহ ইবনু মুখাল্লাদের সাথে সিরিয়া এবং মিশর সফর করেন। অন্য রেওয়ায়াতে আছে, তিনি আবদুল্লাহ ইবনু উনাইস থেকে কেসাস সম্পর্কিত শুধু একটি হাদিস বর্ণনার জন্য সিরিয়া সফর করেন। বর্ণিত আছে, তিনি যে-সমস্ত হাদিস শুনেছিলেন সেগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য শেষ জীবনে মক্কায় চলে গিয়েছিলেন। আবার মদিনায় ফিরে আসেন। তিনি শুধু নবিজির থেকেই হাদিস বর্ণনা করেননি, বরং অন্যান্য সাহাবা এবং তাবেয়িদের মধ্যে তাঁর শোনা হাদিসটি অন্যকারো জানা থাকলে তাঁর বরাতও ব্যবহার করতেন; হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে এমন সতর্ক ছিলেন তিনি। ফলে তাঁর বর্ণিত হাদিসগুলো উচ্চমানের।

নবিজির ইন্তেকাল-পরবর্তী জীবন
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের ওফাতের পরে তিনি রাজনৈতিক এবং সামরিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে ছিলেন। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে সিরিয়া অভিমুখে যে যুদ্ধ হয়েছিল, যাকে আরবিতে বলা হয়, ‘আল ফাতহুল ইসলামি লিশ-শাম’, এটি ছাড়া আর কোনো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি। সে যুদ্ধে তিনি ছিলেন খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের সেনাবাহিনীতে, যিনি দামেস্ককে অবরোধ করেছিলেন। এবং আল-কালবি দাবি করেন, সিফফিন যুদ্ধে তিনি আলি রাযদিয়াল্লাহু আনহুর পক্ষে ছিলেন।
এরপরে তিনি মসজিদে নববিতে দারস-তাদরিসে মনোনিবেশ করেন। সেখানে তাঁর মজলিসে লোকেরা জড়ো হতো হাদিসে নববি শোনার জন্য এবং তাঁরা দ্বীনি বিষয়ে নানান জিজ্ঞাসা করত।
পঞ্চাশ হিজরিতে মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মিম্বর এবং লাঠি মদিনা থেকে সিরিয়া নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। এক বর্ণনা মতে তখন মিম্বরে কম্পন শুরু হয়ে যায়, সূর্যগ্রহণ শুরু হয়ে যায় এবং আকাশের তারাগুলো স্পষ্ট হতে শুরু করে; মানুষ ভয় পেয়ে যায়; ফলে মুআবিয়া এ কাজ থেকে বিরত থাকেন। অন্য রেওয়ায়াতে এসেছে, আবু হুরায়রা এবং জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহুমা এসে তাঁকে নিষেধ করার দরুণ তিনি আর এ কাজ করেননি।

দাম্পত্য-জীবন
তিনি তিন হিজরিতে গাযওয়ায়ে যাতুর রুকার পূর্বে, তাঁর ফুফাতো বোন সুহাইম বিনতু মাসউদকে বিয়ে করেন। সুহাইমের আগেও বিয়ে হয়েছিল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তুমি কুমারী বিয়ে করলে না কেন?’ উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আসলে আমার বোনদের অভিভাবকত্ব করার জন্যই সুাহাইমকে বিয়ে করেছি। তাদের মতো কুমারীকে বিয়ে করলে আমার এই উদ্দেশ্য সফল হতো না।’
তাঁর ঔরসে জন্মগ্রহণ করেন পাঁচ ছেলে—আবদুর রহমান, মুহাম্মদ, মাহমুদ, আবদুল্লাহ এবং উকাইল।

ইন্তেকাল
বায়াতে আকাবায়ে ছানিয়ায় যাঁরা অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাদের মধ্যে সবশেষে ইন্তেকাল করেন তিনি। তাঁর ইন্তেকালের সময় নিয়ে মতপার্থক্য আছে। ওয়াকিদি, ইয়াহয়ইয়া ইবনু বাকির এবং আরও একদল ইতিহাসকার বলেন, তিনি ৭৮ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন। আবু নাঈম বলেন, ৭৭ হিজরিতে। ৭৩, ৭৪ হিজরিতে ইন্তেকাল করেছেন বলেও মতামত পাওয়ায় যায়। তবে অগ্রগণ্য মত হলো—৭৮ হিজরি মুতাবিক ৬৯৭ ঈসায়ি সনে মদিনা মুনাওয়ারায় তিনি ইন্তেকাল করেন।
তিনি ৯৪ বছর বেঁচেছিলেন। এবং শেষ জীবনে তিনি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। উসমান ইবনু আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহুর ছেলে উবান তখন মদিনার গভর্নর ছিলেন, তিনি কুবায় তাঁর জানাযার নামাজ পড়ান। বলা হয়, তিনি ওসিয়ত করেছিলেন, হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফ আসসাকাফী যেন তাঁর জানাযা না পড়েন। জান্নাতুল বাকিতে তাঁকে দাফন করা হয়।

[তাঁর মাকবারা সম্বন্ধে বিভিন্ন জায়গায়, বিশেষ করে উইকিপিডিয়ায় বলা হয়েছে, ইরাকের মাদায়িন শহরে। এবং বাদশাহ ফয়সলের আমলে একবার তাঁর কবর ভেঙে গিয়েছিল, বাদশাহ স্বপ্নে দেখে তাঁর কবর স্থানান্থর করেছেন। এরকম একটি ঘটনাও পাওয়া যায়। কিন্তু আমার বর্ণিত কিতাবগুলোতে তিনি কখনও ইরাক গিয়েছিলেন এমন কোনো আলোচনা পাইনি। একটি কিতাবে শুধু লেখা তাঁকে জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হয়েছে। আমি সেটাই যোগ করেছি। এই ব্যাপারে আরও অনুসন্ধান করা যেতে পারে।]

তথ্যসূত্র
সিয়ারু আলামিন নুবালা
উসদুল গাবাহ ফি মারিফাতিস সাহাবাহ
আল ইসাবাহ ফি তাময়ীযিস সাহাবাহ
সুয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবাহ
তারিখে ইবনে আসাকির
আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া
আল ইকমাল ফি আসমা-ইর-রিজাল
মাদারিজুন্নুবুয়াহ
মুজিযাতুর রাসুল

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

দোয়ারাবাজার, সুনামগঞ্জের ছেলে। আলেম পরিবারের সন্তান। কওমি মাদরাসায় অধ্যয়নরত। পড়াশোনার ফাঁকে টুকটাক লেখালেখি করেন। ইসলামের ইতিহাস ও কুরআনের তাফসির বিষয়ে তাঁর আগ্রহ প্রচণ্ড।

error: Content is protected !!