শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০

আবু যার গিফারি : দুনিয়াবিমুখতায় প্রসিদ্ধ সাহাবি

0

জুনদুন ইবনু জুনাদাহ, যিনি আবু যার গিফারি নামে পরিচিত। রাসুলের নৈকট্যপ্রাপ্ত দুনিয়াবিরাগী একজন সাহাবি ছিলেন। আরবের গিফার গোত্রের লোক তিনি। আদ্দার উপত্যকার পাশেই ছিল ‘গিফার’ কবিলার বসতি। মক্কার কুরাইশরা এই পথ দিয়ে ব্যবসার জন্য সিরিয়া যাতায়াত করত। যেসব কাফেলা এই পথ দিয়ে যাতায়াত করত, তাদের নিরাপত্তার বিনিময়ে সামান্য যা কিছু উপার্জন হতো তা দিয়েই তারা জীবিকা নির্বাহ করত। এর বাইরে লুটতরাজ, রাহাজানি, ডাকাতি—এগুলো ছিল তাদের প্রধান পেশা।
আবু যার খুব ছোটকাল থেকেই অসীম সাহস, প্রখর মেধা, তীক্ষ্ণ দৃষ্টির জন্য সকলের থেকে আলাদা ছিলেন। জাহেলি যুগের প্রথম দিকে তাঁর পেশা ছিল ডাকাতি-রাহাজানি। গিফার গোত্রে তিনি একজন দুঃসাহসী ডাকাত হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
কিন্তু কিছু দিনের ভেতর তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। পরিবর্তিত জীবনে আসার পর তাঁর কবিলার লোকেরা যে এক-মাবুদের উপাসনার বদলে পাথরের মূর্তির পূজা করত, তাতে তিনি খুব কষ্ট অনুভব করতেন।
তখন সমগ্র আরব জুড়ে মূর্তি পূজা আর কুসংস্কারের সয়লাভ চলছিল, তা তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেন। তিনি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকেন একজন মহামানবের, যিনি এই প্রেতায়িত অন্ধকারে সত্যের আলো জ্বালবেন।
পুরো আরব বিশ্ব যখন জাহেলিয়াতে লিপ্ত তখন তিনি রাহাজানি ছেড়ে দিয়ে এক আল্লাহর ইবাদাতে মশগুল হন। আবু মা’শার বলেন, আবু যার জাহেলি যুগেও মুওয়াহহিদ বা একত্ববাদী ছিলেন। এক আল্লাহ ছাড়া তিনি আর কোনো কিছুরই উপাসনা করতেন না। তাঁর বিশ্বাস বা আল্লাহর ইবাদাত মানুষের কাছে অজানা ছিল না। তাই তো যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম তাঁকে রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে খবর দেয়, সে বলেছিল—‘আবু যার, মক্কায় তোমার মতো এক ব্যক্তি একত্ববাদে বিশ্বাসী।’
তিনি যে কেবল তাওহিদে বিশ্বাসী ছিলেন তা না, তিনি জাহেলি যুগে নামাজও আদায় করতে। একথা তিনি নিজেও বলেছেন—‘আমি রাসুলের সাথে সাক্ষাতের তিন বছর আগ থেকেই নামাজ আদায় করতাম।’ লোকেরা তাঁকে প্রশ্ন করেছিল, ‘কাকে উদ্দেশ্য করে নামাজ পড়তেন?’ তিনি বলেছিলেন, ‘আল্লাহকে উদ্দেশ্য করে।’
তাঁর ইসলাম গ্রহণ করার ঘটনাটা চমৎকার। ইবনু হাজার আসকালানি ‘আল ইসাবা’ গ্রন্থে তা উল্লেখ করেছেন।
ঘটনার সারসংক্ষেপ হলো—আবু যার তখন তাঁর গোত্রের সাথেই বসবাস করছিলেন। একদিন খবর পেলেন, মক্কায় একজন নিজেকে নবি দাবি করছে, এবং তাঁর কাছে আসমান থেকে ওহি আসে।
তিনি তাঁর ভাই আনিসকে খবর করলেন। আনিসকে তিনি বললেন, ‘তুমি মক্কায় যাবে। সেখানে যিনি নিজেকে নবি দাবি করছেন এবং তাঁর উপর আসমান থেকে ওহি আসে বলে প্রচার করছেন, তুমি তাঁর সম্পর্কে ভালো করে খোঁজ-খবর নেবে, তাঁর আচার-ব্যবহার দেখবে এবং তাঁর মুখ থেকে কিছু কথা শুনে আসবে। এরপর ফিরে এসে আমাকে জানাবে।’
আনিস মক্কার দিকে রওয়ানা হলেন। সেখানে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সাক্ষাৎ করলেন এবং তাঁর পবিত্র জবান থেকে মহাগ্রন্থের বাণী শুনে নিজ গোত্রে ফিরে এলেন।
আবু যার আনিস আসার খবর শুনে তাঁর কাছে ছুটে গেলেন। এবং খুবই আগ্রহের সাথে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন—‘মানুষ তাঁর সম্পর্কে কী বলাবলি করে?’
আনিস বললেন, ‘আল্লাহর কসম! তিনি তো মানুষকে কল্যাণের দিকেই ডাকছেন। তবুও কেউ তাঁকে কেউ জাদুকর কেউ গণক কেউ-বা কবি বলে উপহাস করছে।’
আবু যার বললেন, ‘আনিস, তুমি আমার তৃষ্ণা মেটাতে পারোনি। তুমি কি আমার পরিবারের কিছু দিন দেখাশোনা করতে পারবে যাতে আমি মক্কা গিয়ে স্বচক্ষে তাঁকে দেখে আসতে পারি?’
আনিস বললেন, ‘অবশ্যই। তবে আপনি মক্কার লোকদের থেকে নিরাপদে থাকবেন।’
পরদিন আবু যার মক্কার দিকে রওয়ানা হলেন। সাথে কিছু পাথেয় এবং এক মশক পানি নিলেন। তিনি চলতে লাগলেন মক্কার পথে। ভেতরে তাঁর ভয়—না জানি কেউ তাঁর উদ্দেশ্য জেনে যায়!
এভাবে মনের মধ্যে ডর-ভয় নিয়ে তিনি মক্কায় পৌঁছুলেন। সেখানে তিনি কাউকে মুহাম্মাদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেননি। কারণ তাঁর জানা নেই কে মুহাম্মাদের বন্ধু আর কে শত্রু।
দিন অতিবাহিত হয়ে রাত চলে আসলো। এত দূরের সফরের কারণে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। সে জন্য মসজিদে হারামের এক পাশে শুয়ে পড়লেন। এমতাবস্থায় আলি ইবনু আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে দেখলেন। দেখেই বুঝলেন তিনি একজন মুসাফির। আলি বললেন, ‘আপনি আমার বাড়ি চলুন।’ তিনি আলির সাথে তাঁর বাড়িতে গেলেন এবং সেখানেই রাত্রি যাপন করলেন। সকাল হতেই আবার মসজিদে চলে আসলেন। কিন্তু উভয়জনের মধ্যে কেউ কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করলেন না।
এই দিনও চলে গেল, আবু যার নবিজির সাথে সাক্ষাৎ করতে পারেননি। দিনশেষে রাত চলে আসল। আবু যার আবারও মসজিদে হারামের পাশে শুয়ে পড়লেন। সেখানে আলি তাঁকে দেখতে পেয়ে আবারও নিজের বাড়ি নিয়ে আসলেন। দ্বিতীয় দিনও কেউ কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। এভাবে তৃতীয় রাতও চলে আসল। এরপর আলি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার এখানে আসার কারণ কী?’
আবু যার বললেন, ‘আমি বহু দূর থেকে এসেছি, নতুন নবির সাক্ষাতের জন্য এবং তাঁর থেকে ওহি শোনার জন্য।’
আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুর মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের অনেক গুণকীর্তন করলেন। তারপর বললেন, ‘সকালে আমি রাসুলের দরবারে যাই। আপনি আমার পেছন পেছন চলে আসবেন। আমি যদি আশংকাজনক কিছু মনে করি তাহলে প্রস্রাবের ভান করে দাঁড়িয়ে যাব। তারপর যখন আবার চলতে লাগবো তখন আপনিও চলবেন আমার পেছন পেছন।’

আবু যারের কাছে রাতটা দীর্ঘ মনে হচ্ছে। প্রিয় মানুষের সাথে সাক্ষাতের আনন্দে বিছানায় নিজেকে স্থির রাখতে পারছেন না। অনেক প্রতীক্ষার পর অবশেষে সকাল হলো। তিনি আলির পেছন পেছন ছুটতে লাগলেন। পথের আশপাশে কোনো খেয়ালই করলেন না।
অতঃপর তাঁরা রাসুলের দরবারে পৌঁছুলেন। আবু যার রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সালাম করলেন—‘আসসালামু আলাইকুম, ইয়া রাসুলাল্লাহ।’
নবিজি সালামের জবাব দিলেন—‘ওয়া আলইকাস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।’
এভাবে আবু যার সর্বপ্রথম ইসলামি কায়দায় সালাম দেওয়ার মহান গৌরব লাভ করেন। এরপর থেকেই মূলত সালামের প্রচলন শুরু হয়।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু যারকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন এবং পবিত্র কালামুল্লাহ থেকে কিছু আয়াত পাঠ করে শোনালেন। আবু যার সাথে সাথেই ইসলাম কবুল করে নিলেন।
ইসলামগ্রহণের পরের কাহিনি আবু যার নিজের জবানেই বয়ান করে গেছেন। তিনি বলেন, ইসলামগ্রহণের পর আমি কিছুদিনের জন্য মক্কায় অবস্থান করতে লাগলাম। সেখানে রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ইসলামের নানা আদব-কায়দা শিক্ষা করলাম এবং কুরআনের কিছু আয়াত শিখলাম। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, ‘তুমি ইসলাম কবুলের কথা মক্কায় কারও কাছে প্রকাশ করবে না।’ তখন আমি বললাম, ‘যাঁর হাতে আমার জীবন তাঁর কসম, আমি যতক্ষণ কুরাইশদের প্রকাশ্যে দ্বীনের দাওয়াত দিচ্ছি না ততক্ষণ মক্কা ছেড়ে যাব না।’ আমার কথায় রাসুল চুপ হয়ে গেলেন। আমি কাবা শরিফে ছুটে গেলাম। দেখলাম সেখানে কুরাইশরা গল্প-গুজবে ব্যস্ত। আমি তখন উচ্চ কণ্ঠে বললাম, ‘হে কুরাইশ গোত্রের লোকেরা, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর রাসুল।’
আমার এই কথা শুনে কুরাইশের লোকেরা বিস্মিত হলো। সবাই একত্রে বলে উঠল, ‘এই ধর্মত্যাগীকে ধরো।’ তারপর সবাই আমার দিকে ছুটে এল এবং আমাকে প্রহার করতে লাগল। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা আমাকে দেখে চিনতে পারেন, তিনি তাদের বলেন, ‘এই তোমরা কী করছ! গিফার গোত্রের লোককে তোমরা মারছ?’ তাঁর এ কথা শুনে তারা আমাকে ছেড়ে দিলো।
আমি রক্তাক্ত শরীর নিয়ে রাসুলের কাছে ফিরে এলাম। আমার এই অবস্থা দেখে তিনি বললেন, ‘আমি মানা করেছিলাম তোমাকে কুরাইশদের কাছে গিয়ে দ্বীনের কথা বলতে।’ আমি বললাম, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার মনের মধ্যে প্রবল ইচ্ছা ছিল যে, আমি দ্বীনের কথা তাদের সামনে পেশ করি। শুধু মনের ইচ্ছার জন্য তাদের কাছে দ্বীনের কথা প্রকাশ করেছি।’ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, ‘তুমি তোমার গোত্রের কাছে ফিরে যাও এবং সেখানে গিয়ে মানুষদেরকে দ্বীনের দাওয়াত দাও। হতে পারে তোমার দ্বারা দ্বীনের অনেক ফায়দা হবে। আর যখন তুমি জানবে আমি প্রকাশ্যে দ্বীনের দাওয়াত দিচ্ছি, তখন আমার কাছে চলে আসবে।’
রাসুলের নির্দেশে আমি আমার গোত্রে ফিরে এলাম। আমার আসার সংবাদ শুনে আমার ভাই আনিস ছুটে এলো সাক্ষাৎ করার জন্য। এসে বলল, ‘কী করেছ সেখানে গিয়ে?’ আমি বললাম, ‘ইসলাম কবুল করেছি।’ আল্লাহ হয়তো দ্বীনের জন্য তার অন্তর খুলে দিয়ে ছিলেন। আমি তাকে দ্বীনের দাওয়াত দেওয়ার সাথে সাথেই সে ইসলাম কবুল করে ফেলে।
অতঃপর আমরা দুইভাই একত্রে আমাদের মায়ের কাছে হাজির হলাম এবং তাঁকে ইসলামের দাওয়াত দিলাম, তিনিও সঙ্গে সঙ্গে ইসলাম কবুল করে ফেলেন।
সেই দিন থেকে আবু যার আর তাঁর পরিবার দ্বীনের দাওয়াত দিতে শুরু করেন। তাঁরা কখনো মনোবল হারাননি। গোত্রের লোকদের ইসলামের পথে আনার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেন। তাঁদের এই চেষ্টার ফলে গিফার গোত্রের বহু লোক ইসলাম কবুল করে। এবং তাদের মধ্যে নামাজের জামাত কায়েম হয়। তবে গোত্রের কিছু লোক জানায়—রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় আসার আগ পর্যন্ত তারা ইসলাম কবুল করব না। পরবর্তীতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদিনায় আসেন তখন তারাও ইসলাম কবুল করে নেয়।
গিফার গোত্রের ব্যাপারে রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন ‘গিফার গোত্র, আল্লাহ তাদের ক্ষমা করেছেন এবং আসলাম গোত্র, আল্লাহ তাদের শান্তি ও নিরাপত্তা দিয়েছেন।’
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন প্রকাশ্যে দ্বীনের দাওয়াত দিতে লাগলেন তখন আবু যার মক্কায় চলে আসেন। এবং বদর, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধ শেষ হবার পর তিনি মদিনায় হিজরত করেন। সেখানে নবিজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমত করতে থাকেন। মদিনায় থাকাকালে সব সময় তিনি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের খেদমত করতেন। তিনি নিজেও এ কথা বলেছেন—‘আমি সবসময় রাসুলের খেদমতে থাকতাম আর অবসরে মসজিদে এসে বিশ্রাম নিতাম।’
রাসুলের সাথে তাঁর যুদ্ধে অংশগ্রহণের কোনো তথ্য জানা যায় না। তবে ইবনু হাজার আসকালানি তাঁর ‘আল-ইসাবা’ গ্রন্থে আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদের সূত্রে বর্ণনা করেন—রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন তাবুক যুদ্ধের জন্য রওয়ানা হন তখন অনেক লোক নানা অজুহাত দেখিয়ে যুদ্ধে না যাওয়ার ইচ্ছ প্রকাশ করে। কাউকে দেখা না গেলে সাহাবিরা বলতেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ অমুক আসেনি।’ উত্তরে তিনি বলতেন, ‘তার উদ্দেশ্য মহৎ হলে সে আসবে, অন্যথায় সে তোমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।’ এদিকে আবু যার রাদিয়াল্লাহু আনহুর উট ছিল দুর্বল, তাই তিনি মাল-সামানা নিজের কাঁধে তুলে হেঁটে হেঁটে আসছিলেন। সেজন্য কাফেলার সাথে মিলিত হতে বেশ দেরি হচ্ছিল।
আবু যারের আসতে দেরি হচ্ছে দেখে সাহাবিরা বলতে লাগলেন—‘তিনিও আসলেন না!’ এক সাহাবি দূর থেকে এক লোককে আসতে দেখে বললেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ, কে আসছে, দেখুন!’
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘আবু যারই হবে।’
সবই তখন আগন্তুক সেই লোকটির প্রতি গভীর দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। দেখলেন, আবু যারই আসছেন। তখন বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! হ্যাঁ, আবু যারই।’
রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বললেন, ‘সে একা চলে, একাই মরবে, এবং কিয়ামতের দিন একাই উঠবে। আল্লাহ আবু যারের ওপর রহম করুন।’ [তারিখুল ইসলাম, আল্লামা জাহাবি, ৩য় খণ্ড]
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের এই ভবিষ্যদ্বাণী আবু যারের পরবর্তী জীবনে অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে।
আবু যার ছিলেন দুনিয়াবিমুখ, সহজ-সরল এবং নির্জনতা-প্রিয় মানুষ। এজন্য রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে ‘মসিহুল ইসলাম’ লকব দেন। রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাতের পর তিনি একেবারই দুনিয়ার সাথে সম্পর্কহীন হয়ে যান। প্রিয়নবির চলে যাওয়াতে তাঁর অন্তরে যে বিরহের আগুন জ্বলেছিল তা আর কখনো নেভেনি। উপরন্তু প্রথম খলিফা আবু বকর আস-সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহুর ইন্তেকালে তাঁর বিরহের জ্বালা আরও বেড়ে যায়। তাই তিনি মদিনার সুরভিত উদ্যান ছেড়ে সিরিয়ায় হিজরত করেন।

ইন্তেকাল
হিজরি ৩২ সন। আবু যার গিফারি রাদিয়াল্লাহু আনহু মুমূর্ষু অবস্থায় এক নির্জন মরুভূমিতে শুয়ে আছেন। সাথে তাঁর স্ত্রী। এই মরুভূমি ছিল অপরিচিত। কেউ এই মরুভূমি দিয়ে চলাচল করত না। কোনো বাণিজ্য কাফেলাও এই পথ দিয়ে যেত না। আবু যারের এই অবস্থা দেখে স্ত্রী পেরেশান হয়ে পড়লেন। সাহায্যের আশায় পথপানে চেয়ে রইলেন। মৃত্যুপথযাত্রী আবু যার স্ত্রীর এ অবস্থা দেখে বললেন, ‘তুমি আমার দাফন-কাফন নিয়ে পেরেশান হয়ো না। আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এক মজলিসে বলতে শুনেছি—“তোমাদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তির মৃত্যু হবে নির্জন মরুভূমিতে। এবং তাঁর দাফন-কাফন করার জন্য মুমিনদের একটা দল সেখানে হাজির হবে।” আমি নিশ্চিত সেই লোক আমিই। কারণ সেই মজলিসে যত লোক ছিল আমি ছাড়া সবাই ইতিমধ্যে মৃত্যু বরণ করেছে।’
এর কিছুক্ষণের ভেতর আবু যার ইন্তেকাল করেন। তাঁর স্ত্রী এদিক-সেদিক ছুটতে লাগলেন। সাহায্যের আশায় পথপানে চেয়ে রইলেন। কাউকে না আসতে দেখে অস্থির হয়ে পড়লেন। হঠাৎ দেখলেন একটা কাফেলা এই পথ দিয়ে আসছে।
কাফেলাটি কাছে এসে আবু যার রাদিয়াল্লাহু আনহুকে দেখে তাঁর স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করল, ‘ইনি কে?’ স্ত্রী উত্তর দিলেন, ‘ইনি হচ্ছেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবি আবু যার।’
কাফেলার লোকেরা খুশি হয়ে বললেন, ‘আমাদের জান কুরবান হোক!’
তাঁরা দ্রুত আবু যার রাদিয়াল্লাহু আনহুর দাফন-কাফনের ইনতেজাম করেন। বিশিষ্ট সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ ছিলেন সেই কাফেলায়। তিনি তাঁর জানাজার নামাজ পড়ান।
রাদিয়াল্লাহু আনহু ওয়া আনহুম।

আসহাবে রাসুলের জীবনকথা অবলম্বনে রচিত

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

mm

গ্রামের বাড়ি মৌলভীচক, পতনঊষার, রাজনগর, মৌলভীবাজার। বসবাস শ্রীমঙ্গল শহরে। কওমি মাদরাসায় অধ্যয়নরত। পড়াশোনার ফাঁকে টুকটাক লেখালেখি ও ‘ভাঁজপত্র’ নামে একটি ম্যাগাজিন সম্পাদনা করেন।

error: Content is protected !!