রবিবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২০

উম্মু কুলসুম বিনতু রাসুলিল্লাহ : যুন-নুরাইনের দ্বিতীয় নুর

0

উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু ব্যথিত হৃদয়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের কাছে উপস্থিত হলেন। তাঁর কন্যা হাফসার স্বামী যুদ্ধে শহিদ হয়েছেন। বিধবা কন্যার জন্য তাই দুশ্চিন্তায় ছিলেন তিনি। আবু বকর ও উসমানের কাছে প্রস্তাব করেছিলেন মেয়েকে বিয়ে দেয়ার জন্য। রুকাইয়া রাদিয়াল্লাহু আনহার মৃত্যুর পর তখনও বিয়ে করেননি উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু। তিনি বিষয়টি ভেবে দেখবেন বলে সময় চেয়ে নেন এবং কিছুদিন পর ‘বিয়ের কথা ভাবছেন না’ বলে জানান। অপরদিকে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু কিছু না বলে নীরব রইলেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের দরবারে উপস্থিত হয়ে মনের দুঃখ প্রকাশ করলেন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বললেন—‘হাফসাকে বিয়ে করবে উসমানের চেয়ে উত্তম ব্যক্তি আর উসমান বিয়ে করবে হাফসার চেয়েও ভালো মেয়েকে।’ [আনসাবুল আশরাফ— ১/৪২৩, উসদুল গাবা— ৫/৪২৪]
এর কিছুদিনের মধ্যেই হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহার বিয়ে হয়েছিল রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সাথে। আর উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুও বিয়ে করেছেন হাফসার চেয়ে উত্তম একজনকে, যিনি হয়েছিলেন তাঁর জীবনের দ্বিতীয় নুর এবং যাঁকে পেয়ে তিনি ‘যুন-নুরাইন’ বা ‘দুই জ্যোতির অধিকারী’ উপাধি লাভ করেছিলেন। সেই দ্বিতীয়া নুরটি হচ্ছেন রাসুল-কন্যা উম্মু কুলসুম রাদিয়াল্লাহু আনহা।

রাসুল-কন্যা
উম্মু কুলসুম রাদিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের তৃতীয় কন্যা। মাতা খাদিজা বিনতু খুওয়াইলিদ রাদিয়াল্লাহু আনহা।  রুকাইয়া রাদিয়াল্লাহু আনহার ছোট এবং ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহার বড় ছিলেন উম্মু কুলসুম রাদিয়াল্লাহু আনহা। সে হিসেবে ধারণা করা হয়, তিনি নবুওয়াতের ছয় বছর পূর্বে জন্মগ্রহণ করেছেন। কারণ নবুওয়াতের সাত বছর পূর্বে রুকাইয়া রাদিয়াল্লাহু আনহা আর পাঁচ বছর পূর্বে ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহা জন্মগ্রহণ করেন। [সাহাবিয়াত—১২৯]
বাকি বোনদের মতো উম্মু কুলসুম রাদিয়াল্লাহু আনহার শৈশব সম্পর্কেও খুব বেশি জানা যায় না। আবু লাহাবের পুত্র উতাইবার সাথে বিয়ের সময় থেকে ইতিহাসে বর্ণনা পাওয়া যায়। রুকাইয়া রাদিয়াল্লাহু আনহা এবং উম্মু কুলসুম রাদিয়াল্লাহু আনহার একই সময়ে আবু লাহাবের দুই পুত্রের কাছে বিয়ে হয়েছিল। বিয়ে হলেও দুইবোন রাসুলের ঘরেই ছিলেন। অতঃপর যখন আবু লাহাব আর তার স্ত্রী উম্মু জামিলের ঘৃণ্য আচরণের কারণে সুরা লাহাবে তাদেরকে অভিশাপ দেয়া হয়, তখন তারা দুই পুত্রকে ডেকে তাদের স্ত্রীদেরকে তালাক দেয়ার নির্দেশ দেয়। আর বলে, ‘তোমরা যদি তাঁর মেয়েকে তালাক না দাও তবে তোমাদের সাথে আমাদের মেলামেশা হারাম!’ [তাবাকাত-৮/৩৭]
হতভাগ্য উতবা আর উতাইবা পিতামাতার নির্দেশমতো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের কন্যাদের তালাক দিয়ে দেয়।

শান্তির শামিয়ানায়
উম্মু কুলসুম রাদিয়াল্লাহু আনহা ইসলামের শুরুর দিকেই মাতা খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন। আর মক্কাবাসী অন্য মুসলিম নারীরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের হাতে বাইয়াত গ্রহণ করতে এলে তখন তাঁদের সাথে বাইয়াত গ্রহণ করেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম পরিবার-পরিজনকে আল্লাহর জিম্মায় রেখে মদিনায় হিজরত করেন। মক্কার পরিস্থিতি নাজুক হতে থাকলে পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে উম্মু কুলসুম রাদিয়াল্লাহু আনহাও হিজরত করেন।

উসমান ইবনু আফফানের গৃহে
উহুদের যুদ্ধের সময় উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর স্ত্রী রাসুল-কন্যা রুকাইয়া রাদিয়াল্লাহু আনহার ইন্তেকাল হয়। তারপর থেকেই নিঃসঙ্গতা আর বিষণ্ণতায় দিন কাটতে থাকে উসমানের। তাই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম একদিন প্রশ্ন করলেন তাঁকে—‘তোমাকে এমন বিষণ্ণ দেখাচ্ছে কেন, উসমান?’
উত্তরে তিনি বললেন, ‘আল্লাহর রাসুল, আমার উপর এমন বিপদ এসেছে যা হয়তো কখনো অন্য কারও উপর আসেনি। রাসুলের কন্যার ইন্তেকালে যেন আমার পাঁজর ভেঙে গিয়েছে। আল্লাহর রাসুলের সাথে আমার আত্মীয়তার বন্ধন ছিঁড়ে গিয়েছে, এখন আমি কী করব!’
উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর কথা শেষ করার আগেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বললেন—‘আল্লাহর পক্ষ থেকে জিবরাইল আলায়হিস সালাম সংবাদ নিয়ে এসেছেন, আমি যেন রুকাইয়ার মোহরানায় উম্মু কুলসুমকে তোমার নিকট বিয়ে দিই।’ [উসদুল গাবাহ— ৬১২]
সে অনুযায়ী হিজরি তৃতীয় সনে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে উম্মু কুলসুম রাদিয়াল্লাহু আনহার বিয়ে হয় এবং এর দুই মাস পর উম্মু কুলসুম রাদিয়াল্লাহু আনহাকে তিনি ঘরে তোলেন।

শেষ-জীবন
উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে ছয় বছরের দাম্পত্য জীবনে উম্মু কুলসুম রাদিয়াল্লাহু আনহার কোনো সন্তান জন্মগ্রহণ করেনি। সংসার-জীবনে দুজনই সুখী ছিলেন।
ছয় বছর পর, শাবান মাসে উম্মু কুলসুম রাদিয়াল্লাহু আনহা ইন্তেকাল করেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের নির্দেশে তাঁকে আসমা বিনতু আমিস রাদিয়াল্লাহু আনহা, সাফিয়্যাহ বিনতু আবদিল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহা ও উম্মু আতিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহা মিলে গোসল করান। পিতার পবিত্র চাদর দিয়ে তাঁর কাফন করা হয়।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম নিজে উম্মু কুলসুম রাদিয়াল্লাহু আনহার জানাজা পড়ান। মদিনার জান্নাতুল বাকিতে তাঁকে দাফন করা হয়।
উম্মু কুলসুম রাদিয়াল্লাহু আনহার ইন্তেকালের পর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন— ‘আমার দশটি কন্যা থাকলে একের পর এক উসমানের কাছে বিয়ে দিতাম।’
অন্য বর্ণনায় দশের পরিবর্তে একশোর উল্লেখ পাওয়া যায়।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম নিজের প্রত্যেক কন্যাকে অসম্ভব রকমের ভালোবাসতেন। আনাস ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন—‘যখন উম্মু কুলসুম রাদিয়াল্লাহু আনহাকে কবরে নামানো হলো, তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম কবরের নিকট উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁর চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল।’

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

error: Content is protected !!