রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১

ফাতিমাতুয যাহরা : রাসুলের চাঁদকন্যা

0

কাবাঘরের পুনঃনির্মাণ কাজ চলছিল তখন। কাজ শেষে বিপত্তি বাঁধল ‘হাজরে আসওয়াদ’ প্রতিস্থাপন নিয়ে। কুরাইশ বংশের সকল গোত্র কাবাঘর পুনঃনির্মাণে অংশগ্রহণ করেছে। প্রতিটি গোত্রই চায় ‘হাজরে আসওয়াদ’ প্রতিস্থাপনের সৌভাগ্য অর্জন করতে। কিন্তু একটিমাত্র পাথরকে তো আর এতজন মিলে ধরা যায় না। এ নিয়ে ঝগড়া বেঁধে গেল। একপর্যায়ে তাদের এই সামান্য ঝগড়াটিই যুদ্ধের রূপ নিতে শুরু করল। এমনকি প্রাণ বিলিয়ে দেয়ার কসমও করে বসল প্রত্যেক গোত্র। তখন প্রবীণ কুরাইশ নেতা আবু উমাইয়া ইবনু মুগিরাহ একটি প্রস্তাব দিলেন। সকলে একবাক্যে তাঁর পরামর্শ মেনে নিয়ে সিদ্ধান্ত নিলো, পরদিন ভোরে যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম হারাম শরিফে প্রবেশ করবে তার দেয়া ফয়সালা মেনে নেবে সবাই।
পরদিন ভোরে সবার আগে হারাম শরিফে প্রবেশ করলেন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম। তখনও তিনি নবওয়াতের রৌশনিতে বিভাসিত হননি। তাঁকে বিষয়টি খুলে বলল সবাই। তখন তিনি একটি চাদর বিছিয়ে তাতে পাথরটি রেখে সকল গোত্র থেকে একজনকে চাদরটি ধরার সুযোগ করে দিলেন। এভাবে তারা পাথরটি যথাস্থানে নিয়ে গেলে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম নিজ হাতে সেটি স্থাপন করে দিলেন। কুরাইশ বংশের লোকেরা একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ থেকে বেঁচে গেল।
সেদিন প্রসন্ন-মনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ঘরে ফিরলেন। ঘরে ফিরে পেলেন কনিষ্ঠা কন্যার জন্মসংবাদ। ভীষণ খুশি হয়ে কন্যার নাম রাখলেন ‘ফাতিমা’। আরবি ‘ফতম’ থেকে উৎপন্ন এই শব্দটির অর্থ রক্ষাকারী। আল্লাহ তায়ালা ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহার মাধ্যমেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের বংশধারা অব্যাহত রেখেছেন।

রাসুলের চাঁদকন্যা
নবুওয়তের পাঁচ বছর পূর্বে ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহা মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ও খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার চতুর্থ কন্যা তিনি। কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণকারী ফাতিমার জন্য ধাত্রী নিয়োগের পরিবর্তে নিজে দুধপান করিয়ে লালন-পালন করেন মাতা খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা। মায়ের স্নেহের আঁচলে অন্য শিশুদের তুলনায় ভিন্ন বৈশিষ্ট্য নিয়ে বড় হন রাসুলের এ চাঁদকন্যা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুওয়াত লাভের সময় ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহার বয়স ছিল পাঁচ বছর। মাতা খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা ও বোনদের সাথে তিনি শৈশবেই ইসলামগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই ইসলামের দীক্ষায় বড় হন তিনি। অত্যন্ত আল্লাহভীরু ছিলেন বলে তাঁর উপাধি হয়েছিল রাজিয়া ও মারজিয়া।
অত্যধিক রূপবতী ছিলেন বলে ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহার নামের সাথে যুক্ত হয় ‘যাহরা’, যার অর্থ কুসুমকলি।
শিশুবয়স থেকেই ফাতিমা পিতার কষ্ট বুঝতেন। পিতার জন্য কষ্ট পেতেন। কাফির-মুশরিকদের আচরণে অসন্তুষ্ট হয়ে তাদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করতেন।
পনেরো বছর বয়সে তিনি মায়ের স্নেহের ছায়া হারান। মায়ের ইন্তেকালের পর তাঁকেই সাংসারিক সব কাজকর্ম দেখাশোনা করতে হয়। অতটুকুন বয়সে সব কিছু সামাল দেয়া কষ্টসাধ্য হলেও ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহা পিতার পাশে দাঁড়ান দৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ে। মদিনায় হিজরতের আগ পর্যন্ত তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের ইসলাম প্রচারে সহযোগী হিসেবে অবদান রেখেছেন। এ কারণে তাঁকে ‘উম্মু আবীহা’ (তাঁর পিতামহী) উপাধি দেয়া হয়।

আলি ইবনু আবি তালিবের গৃহে
মক্কার কাফির-মুশরিকদের অত্যাচারের কারণে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর কাছ থেকে অনুমতিপ্রাপ্ত হয়ে মদিনায় হিজরত করেন। তার কিছুদিন পরে পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহাও সেখানে হিজরত করেন। হিজরি দ্বিতীয় সনে আলি ইবনু আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু ও ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহার বিয়ে সম্পন্ন হয়। তবে সঠিক সনের ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে।
ইবনু আবদিল বার তাঁর ‘আল-ইসতিআব’ গ্রন্থে এবং ইবনু সাদ তাঁর ‘তাবাকাত’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মদিনায় আসার পাঁচ মাস পরে রজব মাসে আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বিয়ে করেন এবং বদরযুদ্ধ থেকে ফেরার পর নিজ গৃহে নিয়ে যান। ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহার বয়স বিয়ের সময় ছিল আঠারো বছর। সেই হিসেবে তিনি যখন আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুর ঘরে আসেন তখন তাঁর বয়স বিশ বছর ছিল।
আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু নিতান্তই সাধারণ জীবনযাপন করতেন। তাঁর ঘরে কোনো প্রাচুর্যের ছোঁয়া পাননি ফাতিমা। তিনি নিজ হাতে গৃহস্থালি সকল কাজকর্ম করতেন।
আলি ও ফাতিমার পাঁচজন সন্তান জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিন পুত্র হাসান, হুসাইন ও মুহসিন এবং দুই কন্যা উম্মু কুলসুম আর যাইনাব। পুত্র মুহসিন শৈশবেই ইন্তেকাল করেন। হাসান ও হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুমাকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম অসম্ভব স্নেহ করতেন।
আনাস ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বলতেন—‘আমার ছেলে দুটোকে ডাকো।’ তাঁরা নিকটে এলে তিনি তাঁদের দেহের গন্ধ শুঁকতেন এবং জড়িয়ে ধরতেন। [তারাজিমু সায়্যিদাতি বাইত আন-নুবুওয়াহ-৬২৬]

রাসুলের সান্নিধ্যে
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের অন্য সন্তানদের চেয়ে ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহাই পিতাকে বেশি কাছে পেয়েছেন, সেই হিসেবে পিতার স্নেহ-ভালোবাসা এবং সাহচর্যও অন্যদের তুলনায় তিনি বেশি পেয়েছেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম যখন কোনো যুদ্ধ বা সফর থেকে ফিরতেন তখন প্রথমে মসজিদে গিয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করতেন। তারপর ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহার ঘরে গিয়ে তাঁর সাথে সাক্ষাত করে উম্মাহাতুল মুমিনিনের নিকট যেতেন। [উসুদুল গাবাহ-৫/৫৩৫]
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম একবার বলেছেন, ‘ফাতিমা আমার অংশ। যে তাকে কষ্ট দিলো, সে যেন আমাকেই কষ্ট দিলো।’
ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহা ১৮টি হাদিস বর্ণনা করেছেন। তাঁর কাছ থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন—আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা, আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু, হাসান রাদিয়াল্লাহু আনহু, হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু, উম্মু কুলসুম রাদিয়াল্লাহু আনহা, উম্মু সালামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা, উম্মু রাফি রাদিয়াল্লাহু আনহা, আনাস ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু প্রমুখ সাহাবি।
ইমাম ইবনুল জাওযি বলেন, একমাত্র ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহা ছাড়া রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের অন্য কোনো কন্যা কোনো হাদিস বর্ণনা করেছেন বলে আমরা জানি না। [সিয়ারু আলাম আন-নুবালা-২/১১৯; আলাম আন-নিসা-১২৮, টীকা নং-১]

শ্রেষ্ঠত্বের আসনে
ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাঁর সময়কার শ্রেষ্ঠ নারী বলেছেন। তাঁকে জান্নাতের নারীদের সরদার বলেছেন। একবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মাটিতে চারটি রেখা টেনে প্রশ্ন করলেন, ‘তোমরা কি জানো, এগুলো কী?’
জবাব এলো, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন।’
তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘ফাতিমা বিনতু মুহাম্মাদ, খাদিজা বিনতু খুওয়াইলিদ, মারিয়াম বিনতু ইমরান এবং আসিয়া বিনতু মুহাযিম (ফেরাউনের স্ত্রী); জান্নাতি নারীদের মধ্যে তাঁদের মর্যাদা অধিক।’

অনন্তকালের পথে
পিতার অসুস্থতা দেখে ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহা অস্থিরতায় দিন গুজরান করছিলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তখন তাঁকে বলেছিলেন, ‘আহলে বাইতের মধ্যে তুমিই আমার সাথে সর্বপ্রথম মিলিত হবে।’ [বুখারি—২/৬৩৮]
পিতাকে এত ভালোবাসতেন তিনি, তাঁর সাথে শীঘ্রই মিলিত হওয়ার সংবাদ পাওয়ার আনন্দে হেসে ফেলেছিলেন সেই অস্থিরতার মাঝেও।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের ছয় মাস পরে হিজরি এগারো সনের তেসরা রামাদান ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহাও ইন্তেকাল করেন।
তাঁর ইন্তেকালের ব্যাপারে উম্মুল মুমিনিন উম্মু সালামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, ফাতিমার ইন্তেকালের সময় আলি ঘরে ছিলেন না। সেদিন ফাতেমা আমাকে ডেকে পাঠান এবং বলেন, তাঁর গোসলের জন্য পানির ব্যবস্থা করতে এবং পরিধানের জন্য নতুন পরিচ্ছন্ন কাপড় বের করতে। আমি পানির ব্যবস্থা করে নতুন কাপড় বের করে দিলাম। তিনি সুন্দর করে গোসল করে নতুন কাপড় পরলেন। তারপর বললেন, ‘আমার বিছানা করে দিন, বিশ্রাম করব।’ আমি বিছানা করে দিলাম। তিনি কেবলামুখি হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লেন। তারপর আমাকে বললেন, ‘আমার বিদায়ের সময় ঘনিয়ে এসেছে। আমি গোসল করেছি। দ্বিতীয়বার গোসল দেয়ার প্রয়োজন নেই। আমার পরিধেয় বস্ত্রও খোলার প্রয়োজন নেই।’ এরপরই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। অতঃপর আলি ঘরে আসার পর আমি তাঁকে সব কথা বললাম। তিনি ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহার সেই গোসলকেই যথেষ্ট মনে করলেন এবং সেই অবস্থায়ই দাফন কার্য সমাধা করে নেন। [আলাম আন-নিসা -৪/১৩১]
আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু মতান্তরে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর জানাযা পড়ান।
ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহার অসিয়ত মতো তাঁকে রাতের বেলায়ই দাফন করা হয়। তাই তাঁর জানাযায় খুব বেশি মানুষ অংশগ্রহণ করার সুযোগ পায়নি। ইসলামের ইতিহাসে তিনিই প্রথম নারী যাঁকে পর্দায় ঢাকা অবস্থায় জানাযা ও দাফন করা হয়েছে।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

error: Content is protected !!