বৃহস্পতিবার, ১৩ মে ২০২১

আবদুল্লাহ ইবনু সালাম : ইহুদি পণ্ডিত থেকে রাসুলের সাহাবি

0

হুসাইন ইবনু সালাম। সম্ভ্রান্ত ইহুদি পরিবারে জন্ম। বাবা ছিলেন তাওরাত গ্রন্থের পণ্ডিত এবং সমাজের সম্মানীয় ব্যক্তি। সমাজের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রশংসার পাত্র। বাবার কাছ থেকেই হুসাইন তাওরাতের শিক্ষা পেয়েছেন।
হুসাইনও তাওরাতের বিজ্ঞ পণ্ডিত। ইহুদিদের মাঝে অনন্য চরিত্রের অধিকারী। বাবার মতো সব শ্রেণিপেশার মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধার চোখে দেখে। ধর্মীয় কোনো জিজ্ঞাসা থাকলে তাঁর কাছ থেকে জেনে নেয়। অন্য ধর্মাবলম্বীদের কাছেও তিনি সমান শ্রদ্ধার পাত্র।
খুব সাধারণ জীবন যাপন করতেন তিনি। তাঁর অতি সাধারণ চলাফেরায় ফুটে উঠত ব্যক্তিত্বের ছাপ। বিশাল মরুভূমির মাঝে দানবের মতো দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়ের মতো তিনি ছিলে দৃঢ়চেতা একজন পুরুষ।
দিনের একভাগে তিনি আল্লাহর ইবাদাত করতেন আর মানুষকে পরম মততায় দ্বীনের কথা বোঝাতেন। তাদেরকে আল্লাহর দিকে ডাকতেন।
আরেকভাগে সংসারের কাজ করতেন। খেজুরবাগানে সময় দিতেন। গাছের যত্ন ও পরিচর্যা করতেন। পাকা খেজুর কেটে বাজারজাত করতেন।
দিনের তৃতীয় আরেকভাগে তিনি তাওরাত খুলে বসতেন। গভীর ইলমি নিমগ্নতায় হারিয়ে যেতেন কিতাবের মাঝে। তাওরাতের পাতায় পাতায় খুঁজে ফিরতেন পরম সত্যের সন্ধান। জীবনের সব সমস্যার সমাধান খোদাপ্রদত্ত এই কিতাব থেকে খুঁজে বের করতেন। এর নির্যাস পৌঁছে দিতেন মানুষের কাছে।
তাওরাত গ্রন্থে তিনি একজন নবির আবির্ভাবের কথা জানতে পারেন। যিনি হবেন সর্বশেষ নবি। তাঁর আগমনের পরে আর কোনো নবি আসবেন না। তিনি আসার পরে পূর্ববর্তী সকল ধর্ম ও ধর্মগ্রন্থ রহিত হয়ে যাবে। একমাত্র তাঁর আনীত ধর্ম ও ধর্মগ্রন্থই পৃথিবীর সব মানুষের জন্য প্রযোজ্য হবে।
পূর্বের সকল নবি ও ধর্মগ্রন্থকে তিনি সত্যায়ন করবেন। তাঁর মাধ্যমেই নবুওয়াত ও রিসালাত পূর্ণতা লাভ করবে।
তিনি আরও জানতে পারেন—শেষ নবি মক্কা নগরিতে আগমন করবেন। মক্কার মানুষকে তিনি ইসলামের আহ্বান করবেন। অল্পকিছু মানুষ ছাড়া কেউই তাঁকে গ্রহণ করবে না, বরং শত্রু হয়ে যাবে।
মক্কার কাফের গোষ্ঠি তাঁর ও তাঁর অনুসারীদের প্রতি জুলুম করবে। অত্যাচার করবে।
তাদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে তিনি ইয়াসরিবে হিজরত করবেন। ইয়াসরিবের মানুষ তাঁকে আপন করে নেবে। তাঁর দাওয়াত গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে যাবে।
ইয়াসরিব হবে মদিনা, সোনার মদিনা, মদিনাতুর রাসূল—সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
আনন্দে হুসাইনের চোখজোড়া চিকচিক করে ওঠে। দুফোটা আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে। তিনি অপেক্ষা করতে থাকেন শেষ নবির আগমনের। প্রার্থনা করেন প্রতিদিন; যেন শেষ নবির সান্নিধ্য গ্রহণ করে ধন্য হতে পারেন।
আল্লাহ তাঁর প্রার্থনা ফেলে দেননি। তাঁর হৃদয়ের আকুতি আসমানের দরজা ডিঙিয়ে রবের দরবারে পৌঁছে যায়। তিনি লোকমুখে শুনতে পান—মক্কায় শেষ নবির আগমন ঘটেছে। তিনি মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছেন। সবাইকে আল্লাহর পথে ফিরে আসার আহ্বান করছেন।
হুসাইন মক্কার নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের খোঁজ-খবর নিতে থাকেন। তারপর তাওরাত খুলে আগত নবির দেয়া তথ্যের সাথে মেলে কিনা যাচাই করেন। সব মিলে যায়। হুসাইনের মনে আনন্দের ঢেউ আছড়ে পড়ে। হৃদয়ের ব্যাকুলতা বেড়ে যায়।
প্রতীক্ষার প্রহর গুণতে গুণতে সময় কাটে তাঁর।
একদিন তিনি খেজুরবাগানে কাজ করছিলেন। গাছে উঠে গাছের পরিচর্যা করছিলেন। এমন সময় শুনতে পেলেন, মানুষ মক্কার নবির আগমনের ঘোষণা দিচ্ছে। চারদিক থেকে মানুষ নবিকে দেখতে ছুটে যাচ্ছে।
হুসাইন প্রতীক্ষিত ব্যক্তির আগমনের কথা শুনে আবেগে চিৎকার করে বলে উঠলেন—আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার…!
তাঁর ফুফু খালেদা বিনতু হারেস গাছের নিচেই বসে ছিলেন। অন্য ধর্মের নবির আগমনে আনন্দের তাকবির ধ্বনি শুনে তিনি রাগান্বিত হলেন। গজগজ করে বলে উঠলেন—‘তোমার ধ্বংস হোক, তুমি (নিজ ধর্মের নবি) মুসা ইবনু ইমরানের আগমনের বার্তা শুনলে এরচেয়ে বেশি আনন্দিত হতে না।’
হুসাইন নরম গলায় ফুফুকে বললেন—‘তুমি রাগছ কেন ফুফু? খোদার কসম, মুসা ইবনু ইমরান এবং তিনি একই ধর্মের দিকে আহ্বান করেন। তাঁরা দুজন দুজনের ভাই। মুসা ইবনু ইমরান যে ধর্ম নিয়ে এসেছিলেন তিনিও তাই নিয়ে এসেছেন। নবি মুহাম্মাদ পূর্ববর্তী সকল নবি ও ধর্মগ্রন্থকে সত্যায়ন করবেন। এবং তাঁর মাধ্যমেই রিসালাত পূর্ণতা পাবে।’
হুসাইনের কথায় বৃদ্ধা ফুফু আশ্বস্ত হলেন। এবার নরম হয়ে বললেন—‘আচ্ছা, আমাদের তাওরাতে যে শেষ নবির কথা আছে ইনি তাহলে সেই নবি?’
‘হ্যাঁ।’ হুসাইনের ছোট্ট জবাব।
রহমতের নবি ইয়াসরিবে আগমন করেছেন। কুবায় অবস্থান করছেন। মানুষের ভিড় জমে আছে তাঁর অবস্থানস্থল ঘিরে। কাছের-দূরের হাজারও মানুষ নবিজির দরজায় ভিড় করছেন।
মুবারক চেহারা দেখলেই যেন প্রাণ জুড়িয়ে যায়।
হুসাইন নবিজির কাছে গেলেন। দূর থেকেই শুনতে পেলেন তিনি মানুষকে দরদমাখা কণ্ঠে নসিহত করছেন—‘হে মানুষ, তোমরা পরস্পরে সালাম বিনিময় কোরো। ক্ষুধার্তকে আহার করাও। মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন তোমরা সালাত পোড়ো। আর নিরপদে জান্নাতে প্রবেশ করো।’
তাঁর চেহারা থেকে পবিত্রতা চুয়ে চুয়ে পড়ছে। তাঁর কণ্ঠ থেকে মায়া ঝরে পড়ছে। তাঁর কথা শুনলে হৃদয় শীতল হয়ে যায়। তাওরাতে দেয়া শেষ নবির সব আলামত তাঁর চেহারায় পরিস্ফুটিত।
হুসাইন এগিয়ে গেলেন নবিজির কাছে। নবিজির কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে পাঠ করলেন—আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহ!
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘তোমার নাম কী?’
‘হুসাইন ইবনু সালাম।’
‘আজ থেকে তুমি হুসাইন না, আবদুল্লাহ, আবদুল্লাহ ইবনু সালাম।’
‘জি, আবদুল্লাহ, আজ থেকে আমার নাম আবদুল্লাহ ইবনু সালাম। এই নামই হোক আমার। অন্যকোনো নাম আমি নিজের জন্য কিছুতেই আর পছন্দ করব না।’
নবিজির দরবার থেকে হুসাইন পরিবারের কাছে ফিরে এলেন। পরিবারের সদস্যদের কাছে নবিজির কথা খুলে বললেন। পরিবারের সবাই ইসলামের শীতল ছায়ায় আশ্রয় নিলেন।
তাঁর সেই ফুফু যিনি কিনা খেজুর বাগানে হুসাইনের তাকবির ধ্বনি শুনে বিরক্ত হয়েছিলেন, তিনিও ইসলাম গ্রহণ করলেন।
পরিবারের সবার ইসলাম গ্রহণের কথা তিনি সঙ্গত কারণেই গোপন রাখলেন। কারণ, ইহুদিদের ব্যাপারে তিনি খুব ভালো করেই জানতেন।
ইহুদি জাতি হিসাবে কতটা খারাপ, মিথ্যাবাদী আর ফ্রড এ কথা আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুর চেয়ে কে আর ভালো জানত!
তিনি রাসুলের কাছে গেলেন। প্রস্তাব করলেন, যেন তাঁর ইসলাম গ্রহণের কথা গোপন রেখে ইহুদিদের নেতৃস্থানীয় লোকদের ডেকে ইসলামের দাওয়াত দেয়া হয়।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাঁকে একটি ঘরে লুকিয়ে রাখলেন। ইহুদি-নেতাদের ডেকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। তারা রাসুলের সাথে তর্ক শুরু করে দিল। অন্যায়ভাবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে বিভিন্ন কটু কথা বলতে লাগল।
মায়ার নবি তাদের চুপ করিয়ে বললেন, আচ্ছা, হুসাইন তোমাদের মধ্যে কেমন মানুষ?
তারা সকলে একবাক্যে সাক্ষ্য দিল—হুসাইন সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। তাঁর বাবা ছিলেন সম্মানীয় ও তাওরাতের বিজ্ঞ পণ্ডিত। তিনিও আমাদের কাছে শ্রদ্ধার পাত্র। তাওরাত গ্রন্থের বিজ্ঞ আলেম।
তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বললেন, যদি হুসাইন ইসলাম গ্রহণ করে, আমাকে সর্বশেষ নবি বলে মেনে নেয়, তাহলে কি তোমরা ইসলাম গ্রহণ করবে? তারা বলল, না, হুসাইন এমন করতে পারেন না। তিনি বিজ্ঞ ব্যক্তি, এমন ভুল কোনোদিনই করবেন না। আল্লাহ তাঁকে হেফাজত করুন।
এ কথা শুনে (হুসাইন) আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু আড়াল থেকে বেরিয়ে ইহুদিদের সামনে চলে এলেন। তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমি তোমাদের গোত্রের সম্মানীয় ব্যক্তি হয়ে সাক্ষ্য দিচ্ছি—তিনি সত্য নবি। তোমরা তাঁর কথা মেনে নাও। তাঁর দাওয়াত কবুল করো। ইসলামের শীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করো।
ইহুদি নেতাদের চেহারার রঙ বদলে গেল। তারা ক্ষেপে গেল যেন। আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে গালাগাল করতে শুরু করল। তারা বলল, তুমি নিচু জাতের লোক। তুমি মূর্খ। তোমার বাবাও ছিল একজন খারাপ মানুষ, মূর্খ মানুষ। কী করে তুমি আপন ধর্ম বিসর্জন দিয়ে দিলে, ছি!
ইহুদিরা উঠে চলে গেল। আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘আল্লাহর রাসুল, আপনি কষ্ট পাবেন না। তারা এমনই। তারা মিথ্যাবাদী ও বিশ্বাসঘাতক। এমন কোনো পাপ নেই যে তারা করতে পারে না।
আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বেশি বেশি সময় রাসুলের কাছে থাকতেন। রাসুলের মুখ-নিসৃত কোনো বাণী তিনি হারাতে চাইতেন না। রাসুলের বাণী শুনে শুনে মুখস্ত করতেন।
কুরআনের প্রতি ছিল তাঁর সীমাহীন ভালোবাসা। কুরআন তিলাওয়াতে জিহ্বা ভিজিয়ে রাখতেন সবসময়। জান্নাত লাভের আশায় পুরো জীবনটাকে তিনি উৎসর্গ করেছিলেন।
নবিজির সাথে ছায়ার মত লেগে থাকতেন। প্রাণের চেয়ে অধিক ভালোবাসতেন নবিজিকে। নবিজির আদেশের সামনে নিজের সবটুকু দিতে প্রস্তুত থাকতেন সর্বদা।
এত চেষ্টা মেহনত আর ত্যাগ বিফল হলো না। একদিন তিনি সুসংবাদ লাভ করলেন। যে সুসংবাদ একজন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। এমন সুসংবাদ অল্প কয়েকজন সাহাবিই পেয়েছেন।
বর্ণনাকারী বলেন, আমি মদিনার মসজিদে নববিতে এক ইলমি মজলিসে বসা ছিলাম। মজলিসে একজন বৃদ্ধ লোক ছিলেন। লোকেরা তাঁকে ঘিরে বসে ছিল। তন্ময় হয়ে তার কথা শুনছিল। তাঁর উপস্থিতি সবার কাছে খুবই আদরনীয় মনে হচ্ছিল। চমৎকার ভাষা ও ভঙ্গিতে তিনি হাদিস বর্ণনা করছিলেন।
তিনি যখন মজলিস থেকে উঠে গেলেন, তখন মানুষেরা বলাবলি করতে লাগল—তোমরা যদি জান্নাতি ব্যক্তি দেখতে চাও তাহলে এই ব্যাক্তিকে দেখে নাও।
দুনিয়াতেই জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত এই মহান মানুষটিই হলেন আবদুল্লাহ ইবনু সালাম। ইহুদি পণ্ডিত থেকে যিনি রাসুলের স্নেহছায়া পেয়ে হয়ে উঠেছিলেন ইসলামের অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী, মদিনাতুর রাসুলের সম্মানীয় ব্যক্তিত্ব। রাদিয়াল্লাহু আনহু।

রচনাটি সুয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবা অবলম্বনে লিখিত

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

রাজবাড়ি, ফরিদপুরের ছেলে। তরুণ লেখক। কওমি মাদরাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেছেন। ইসলামের ইতিহাস বিষয়ে তাঁর আগ্রহ প্রচুর।

error: Content is protected !!