রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১

আবদুল্লাহ ইবনু উমর : হাদিস-শাস্ত্রের তারকা-সাহাবি

0

নাম বংশ ও জন্ম
ইতিহাসে তিনি ইবনু উমর নামেই প্রসিদ্ধ। মূল নাম আবদুল্লাহ এবং উপাধী ছিল আবদুর রহমান। পিতা ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব, মাতা যাইনাব। তাঁর জন্মসন সম্বন্ধে মতপার্থক্য পাওয়া যায়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের নবুয়তপ্রাপ্তির প্রথম বছর, কারও মতে দ্বিতীয় বা তৃতীয় বছরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বংশগতভাবে তিনি নবম ঊর্ধ্বপুরুষে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের বংশের সাথে মিলিত হন।

দৈহিক আকৃতি, পোশাক-আশাক ও পেশা
দেখতে তিনি নিজ পিতা উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু’র মতই সুদর্শন ছিলেন। খানিক লম্বা, সুদেহী, বাদামিবর্ণ, মুখ-ভর্তি দাড়ি, ছাঁটা গোঁফ, কাঁধ পর্যন্ত দীর্ঘ ও খাড়া চুল ছিল। চুলে হলুদ রঙ ব্যবহার করতেও দেখা যেত।
পোশাক হিসেবে তাঁর পছন্দ ছিল ঘন কালো পাগড়ি, মোটা পাজামা এবং সাধারণ জুতা। ‘আবদুর রহমান ইবনু উমর’ খোদাই করে লেখা একটি আংটি ছিল তাঁর, এটি সবসময় আঙুলে দেখা যেত। তাঁর সম্বন্ধে উক্তি আছে যে তিনি অনেক সময় দামি পোশাকও পরতেন, যাতে আল্লাহ পাকের নেয়ামত থেকে সুবিধাগ্রহণ অস্বীকার না হয়ে যায়।
তিনি ব্যবসা করতেন। মদিনার বাজারে উটের বেচাকেনা ছিল তাঁর পেশা। এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় ওজিফাও তিনি সকল খেলাফত-কালে পেয়েছেন। উমরের শাসনকালে যখন সকল সাহাবির ভাতা নির্ধারণ হয়, তখন তাঁর ভাতা ছিল আড়াই হাজার দিরহাম, অপরদিকে গোলাম থেকে আজাদ হওয়া সাহাবি যায়েদ ইবনু হারেসার পুত্র উসামার ভাতা ছিল সাড়ে তিন হাজার দিরহাম। নিজ পিতা খলিফা উমরের নিকট তিনি এ বৈষম্যের কারণ জানতে চাইলে উমর বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তোমার পিতা থেকে তাঁর পিতাকে বেশি ভালোবাসতেন এবং তোমার থেকে তাঁকে বেশি ভালবাসতেন।

ইসলামগ্রহণ ও পরবর্তী প্রেক্ষাপট
শৈশবেই তিনি ইসলাম কবুল করেন। নবুয়তের তৃতীয় বছর তাঁর বয়স যখন ১০ বছর, নিজ পিতার সাথে ইসলামের ছায়ায় আশ্রয় নেন। এরপর শত্রুদের অত্যাচারে তিনিও নিজ পিতার সাথে মদিনায় হিজরত করেন। ইসলামগ্রহণের সময় তাঁর বয়স সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধও পাওয়া যায়। আসহাবুর রাসুল গ্রন্থে বলা হয়েছে, সাধারণ বুঝ হওয়ার পর থেকেই তিনি পরিবারে ইসলামি আবহ দেখতে পান, অর্থাৎ অবুঝ অবস্থাতেই তিনি পিতার ধর্মের অনুসারী হয়ে যান।
তিনি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের পরে তিন খলিফার নিকট বাইআত গ্রহণ করেন। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু অন্তিম-শয্যাকালে তাঁকে খলিফা হতে বারণ করেন। পরবর্তী খলিফার ব্যাপারে তিনি জিজ্ঞেস করলে খলিফা উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু এ ব্যাপারে প্রথমে কিছু বলতে চাননি কিন্তু তিনি যখন বলেন যে, আপনি এই ব্যাপারে কিছু না বললে পরে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে, তখন তিনি তাঁকে অন্যান্য সম্মানিত সাহাবায়ে কেরামের মতো খলিফা নির্বাচনের দায়িত্ব প্রধান করেন।
তৃতীয় খলিফা উসমান ইবনু আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে বিচারকের দায়িত্ব দেন কিন্তু তিনি ইলমি নিমগ্নতায় ঘাটতি ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের একটি হাদিসের আমল করতে এ দায়িত্ব গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু’র শাহাদাতের পর মারওয়ান ইবনু হাকাম তাঁকে খলিফা হওয়ার পরামর্শ দিলে তিনি বলেন, যদি খুবই নগণ্য সংখ্যক লোকও আমার খেলাফতের বিরোধী হয় তারপরও আমি খেলাফত গ্রহণ করব না।
আলি ইবনু আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু’র খেলাফতের তিনি গুণগ্রাহিতা ও ফজিলতের ব্যাপারে কথা বললেও তাঁর হাতে বাইআত হননি, কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে বাইআত হন, এবং মুয়াবিয়ার পুত্র ইয়াযিদেরও বাইআত গ্রহণ করেন। যখন রাসুল-দৌহিত্র হুসাইন ইবনু আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু কুফার দিকে যাচ্ছিলেন তখন তিনি তাঁকে ইয়াযিদের সাথে যুদ্ধে না জড়ানোর পরামর্শ দেন, কিন্তু হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু এতে অস্বীকৃতি জানান।
কথিত আছে যে আবু মুসা আশআরি রাদিয়াল্লাহু আনহু উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু’র নিকট ইবনু উমরকে খলিফা বানানোর কথা বললে তিনি এ কথা বলে নাকচ করে দেন যে, তার খিলাফাহ পরিচালনার যোগ্যতা নেই।

নববিযুগে ইবনু উমর
বদর ও উহুদ যুদ্ধের সময় তিনি নিতান্তই শৈশব পার করছিলেন, এ জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাঁকে যুদ্ধে অংশগ্রহণ থেকে বারণ করেন। খন্দকের যুদ্ধের সময় তিনি পনের বছর বয়সের কিশোর, তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম প্রথম তাঁকে যুদ্ধে অংশ নেয়ার অনুমতি দেন। এরপর অন্যান্য যুদ্ধগুলোতেও তিনি ধারাবাহিকভাবে অংশগ্রহণ করেন। উল্লেখ আছে যে মুতার যুদ্ধের সময় যখন শত্রুদের জয়ের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছিল, তখন ইবনু উমরসহ আরও কিছু মুজাহিদ যুদ্ধের মাঠ থেকে পলায়ন করেন, কিন্তু পরে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের নিকট যখন তিনি অনুশোচনা প্রকাশ করেন তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামও তাঁকে ক্ষমা করে দেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় সংঘটিত সকল গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ ও ঘটনায় তিনি প্রত্যক্ষ শরিক ছিলেন।

পরবর্তী চার খেলাফত-কাল
কিছু যুদ্ধে অংশগ্রহণ ছাড়া ইবনু উমর সম্বন্ধে তখন পর্যন্ত বিশেষ কোনো রাজনৈতিক কর্মকুশলী ঘটনা বা সুখ্যাতি পাওয়া না যাওয়ায় হুকুমতের দায়িত্ব এবং রাজনীতিতে তাঁকে অযোগ্য বিবেচনা করা হয়। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু’র খেলাফত-কালে তিনি উসামা ইবনু যায়দের সেনাবাহিনীর সদস্য ছিলেন। পিতা উমরের শাসনকালে তিনি নাহাওন্দ-যুদ্ধ ও আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু’র নেতৃত্বে মিশর বিজয়ে অংশ নেন। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর পরবর্তী খলিফা নির্বাচনের লক্ষ্যে একটি শুরা মিটিং আহ্বান করলে সেখানে তাঁকে উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়, কিন্তু উমর তাঁকে পরবর্তী খলিফা হওয়ার অনুমতি দেননি। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু’র শাহাদতের পর লোকেরা তাঁকে খলিফা হতে অনুরোধ জানায় এমনকি না হতে চাইলে হত্যার হুমকিও দেয়া হয়, কিন্তু তিনি সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেন।
ইবনু উমর আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু’র বিরোধিতাও করেননি এবং তাঁর বিরোধীদের পক্ষও নেননি। যখন আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু খেলাফতের মসনদে আসীন হলেন তখন আম্মার ইবনু ইয়াসির রাদিয়াল্লাহু আনহু আলি’র অনুমতি নিয়ে তাঁর সাথে বাইআতের বিষয়ে কথা বলেন এবং আলির গুণাবলি ও দূরদর্শিতা সম্পর্কে বর্ণনা করেন কিন্তু তিনি বাইআত গ্রহণ করেননি।
তিনি সবসময় ইবাদতের চিন্তায় মগ্ন থাকতেন, সামাজিক বিশৃঙ্খলায় মাথা ঘামাতেন না। আলি ও মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু’র মধ্যকার দ্বন্দ্বে তিনি জড়িত না হয়ে বলেছেন, জিহাদ ফরজ আর জিহাদ কাফেরদের বিরুদ্ধে হয়, কাফেররা আমাদেরকে আল্লাহর ইবাদাত করতে দেয়নি, আমরা জিহাদ করেছি। কিন্তু এটা জিহাদ নয়, ভাইয়ে ভাইয়ে লড়াই জিহাদ হতে পারে না, নিছকই গৃহযুদ্ধ। এই মনোভাব থেকে তিনি জামাল ও সিফফিন যুদ্ধে অংশ নেননি এবং তাঁর হাত থেকে জীবনভর কোনো মুসলমানের এক-ফোঁটা রক্তও যাতে না ঝরে, সেই চেষ্টা করে গেছেন।
আলি ও মুয়াবিয়ার মধ্য থেকে কার খেলাফত তিনি মেনেছিলেন, এটা স্পষ্ট নয়৷ ইবনু হাজার বলেন, ইবনু উমর মনে করতেন যখন পর্যন্ত কোনো লোকের ব্যাপারে জনগণের ঐক্যমত না হয়, তাঁর হাতে বাইআত হওয়া উচিত নয়। এই দৃষ্টি থেকে তিনি আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু’র হাতে বাইআত হননি। কিন্তু ‘মুসতাদরাক’ বলছে ভিন্ন কথা, তিনি নাকি আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু’র কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন যে আলি যদি গৃহযুদ্ধে না যান তাহলে তাঁর হাতে বাইআত গ্রহণ করবেন এবং তিনি হয়েছিলেনও।
আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু’র শাহাদাতের পর তিনি বৃহত্তর মুসলিম ঐক্য ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহুর বাইআত গ্রহণ করাকে সমীচীন মনে করেন এবং তাঁর পরিচালিত প্রত্যেকটি অভিযানে শরিক হন, কনস্টান্টিনোপল অভিযানেও তিনি ছিলেন।
কথিত আছে—যখন কোনো লোক বলত, আমি ইবনু উমরের মতো গভীর জ্ঞানসম্পন্ন নই, আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলতেন ইবনু উমর না হকের সাহায্য করেছেন, না বাতিল ধ্বংস করেছেন, বরং সবকিছুতে অধিক মধ্যমপন্থা অবলম্বন করেছেন। তবে উল্লেখ আছে, আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুকে সমর্থন না করায় অন্তিম জীবনে অনেক আফসোসও তিনি করেছেন।

ইয়াযিদের নিকট বাইআত ও হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুকে যুদ্ধে না জড়ানোর আহ্বান
মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহুর মৃত্যুর পর মদিনার হাকিম ওয়ালিদ ইবনু উতবা তাঁকে ইয়াযিদের হাতে বাইআত গ্রহণ করতে আহ্বান করলে তিনি বলেন, আমার অনৈক্য পছন্দ নয়, যদি সবাই তার কাছে বাইআত নেয় তাহলে আমিও বাইআত গ্রহণ করব। ইবনু উতবা তখন চলে যান এই ভেবে যে তিনি বাইআত গ্রহণ না করলেও অসুবিধে নেই কারণ তিনি বিরোধিতাও করেন না।
ইবনু উমর দ্বন্দ্ব পরিত্যাগ করতেন এবং মনে করতেন মুসলিম জালিম শাসকের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ জায়েজ নয়। এ জন্য তিনি রাসুল-দৌহিত্র হুসাইন ইবনু আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুকে কুফায় যেতে বারণ করেন এবং বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম থেকে শুনেছি যে হুসাইনকে শহিদ করা হবে, এ কারণে আমার আপনাকে নিয়ে ভয় হচ্ছে। কিন্তু হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর সফর বাতিল করেননি। সেই সময় ইবনু উমর দ্বন্দ্বের উদ্রেক হতে পারে ভেবে ইয়াযিদের কাছে বাইআত নেয়া ন্যায় মনে করেন এবং বাইআত গ্রহণ করেন। এ সম্বন্ধে তিনি বলেন, যদি তার খিলাফাহ ভালো হয় তাহলে আমরা ঐক্যের প্রশ্নে গ্রহণ করতে রাজি, আর যদি মন্দ হয় তাহলেও ইত্তিফাকের জন্য মেনে নেব।

যুহদ ও ইবাদাত
তাঁর দুনিয়াবিমুখতা ও তাকওয়ার ব্যাপারে ইতিহাসে ব্যাপক প্রসিদ্ধি রয়েছে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম যেখানে নামাজ পড়তেন ও শয্যাগ্রহণ করতেন বা বসতেন, তিনি সেসব জায়গায় ভ্রমণ করে সেসব স্থানে নামাজ আদায়ের চেষ্টা করতেন। তাঁর দুনিয়াবিমুখতার ব্যাপারে বলা হয়, তিনি কখনও কারও কাছে টাকাপয়সা চাননি। তবে কোনো শাসকের পক্ষ থেকে উপঢৌকন এলে তা প্রত্যাখ্যান করতেন না। জীবনে তিনি অসংখ্যবার হজ করেছেন এবং অধিক দানকারী ছিলেন, দুনিয়াদারিতা ও আর্থিক লালসা তাঁর কাছ থেকে একেবারেই প্রকাশিত হয়নি।
রাতভর তিনি নামাজ ইবাদাত ও জ্ঞানচর্চায় ব্যয় করতেন। প্রতি রাতে কুরআন খতম করতেন। ধনী ও সফল ব্যবসায়ী ছিলেন, কৃষিযোগ্য অনেক সম্পত্তিও ছিল, কিন্তু তিনি নিজে খুব স্বল্পই ভোগ করেছেন। গরিবদের জন্য অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন সকল কিছু। এক হাজারেরও অধিক গোলাম আজাদ করেছেন।
একবার তাঁর এক বন্ধু ইরাক সফর থেকে ফিরে তাঁকে একটি ওষুধ হাদিয়া দিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন এর গুণাগুণ কী, বন্ধু বললেন, এটি হজমশক্তি বৃদ্ধি করে। ইবনু উমর হেসে দিয়ে বললেন, চল্লিশ বছর ধরে আমি পেটপুরে খেতেই চাইনি। এর কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে জানান—প্রাণাধিক প্রিয় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ও অর্ধ জাহানের বাদশাহি থাকা সত্ত্বেও পিতা উমরের উপোস থাকার দৃশ্য তাঁকে ব্যথিত করত তাই তিনি এমন করতেন।

মর্যাদা ও অবস্থান
ইবনু উমর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের মর্যাদাবান সাহাবি ও তাঁর পুণ্যবতী স্ত্রীর ভাই, অর্ধবিশ্বের শাসক ও ইতিহাসের কিংবদন্তি মহানায়ক উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর পুত্র ছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে তিনি এমনভাবে অনুসরণ করতেন যে, তিনি যে কোনো কাজ করলেও লোকেরা তা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ ভেবে বসত, কখনও ব্যক্তিগত কোনো কাজ করলে তাঁকে বলতে হতো—এটি সুন্নাহ নয় বরং আমি নিজ থেকেই করছি। এই ব্যাপারে তাঁর ছাত্র ও খাদেম নাফে রহমতুল্লাহ আলায়হি বলছেন, পরবর্তী যুগের লোকেরা তাঁকে পেলে নির্ঘাত পাগল ভেবে বসত, কারণ তিনি এমনভাবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে ভালোবাসতেন যে, রাসুল যে পথ দিয়ে হাঁটতেন তিনিও সেই পথ দিয়ে হাঁটতেন, রাসুল যেসব জায়গায় ভ্রমণ করেছেন তিনিও সেসকল জায়গায় ভ্রমণ করতেন, যেখানে ইবাদাত করতেন তিনিও সেখানে ইবাদাত করতেন। সুন্নাতে তাঁর অনুসরণের ব্যাপারে উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলছেন, ইবনু উমরের মতো আর কেউ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে ওভাবে অনুসরণ করেননি।
জীবনের পনেরটি বছর ভ্রমণ ও স-বাসস্থানে অবস্থান—সর্বাবস্থায় ইবনু উমর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সাহচর্য পেয়েছিলেন। পিতা ফারুকে আজম উমরের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে গড়ে উঠেছিলেন, এ ছাড়া তাঁর নিজের অনুসন্ধিৎসা, জ্ঞান ও ভাবনাপ্রবল মন তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যে সীমাহীন উচ্চতায়। কুরআন হাদিস ফিকহ ও ইতিহাসে তিনি ছিলেন অপ্রতিরোধ্য মশাল, জ্ঞানজগতে তাঁকে বলা হতো মাজমাউল বাহরাইন বা দুই সমুদ্রের সঙ্গমস্থল। আল্লাহর কালামের সুক্ষ্ম ও গভীর ঈঙ্গিত জানতে তাঁর ছিল দারুণ আগ্রহ। কুরআনের উপর গবেষণা করে তিনি জীবনের বড় একটি সময় অতিবাহিত করেন, কেবল সুরা বাকারার গবেষণায়ই তিনি জীবনের ১৪টি বছর কাটিয়েছেন। অস্বাভাবিক শ্রম ও মেহনতের মাধ্যমে তিনি কুরআনের তাফসির ও তাবিলে এত বেশি যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন যে, তা ছিল তাবৎ জ্ঞানীদেরও চমকানোর মতো। হাদিসে তাঁর দখল তো ইতিহাসে দ্যোতি ছড়াচ্ছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের কথার প্রতিটি অক্ষর মুখস্থ না থাকলে তিনি বর্ণনা করতেন না, সার্বক্ষণিক রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের কথা ও কাজ নিয়ে গবেষণারত থাকতেন। তিনি প্রথম সারির হাফিজুল হাদিস, তাঁর বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা [উসদুল গাবার উল্লেখ অনুযায়ী] ১৬৩০টি।
ইবনু উমর ভেবেচিন্তে কাজ করতে পছন্দ করতেন, ঝগড়া-ফ্যাসাদে জড়ানো থেকে পরহেজ করতেন যথাসম্ভব। এই কারণে ফাতাওয়া প্রদানেও অতি সতর্কতা অবলম্বন ছিল তাঁর বিশেষ বৈশিষ্ট্য। আহলে সুন্নাতের মাশায়েখগণ তাঁকে সাধারণ ব্যক্তিত্ব ও সরল মানসিকতার অধিকারী মনে করতেন, কারণ তিনি হুকুমতের বিপক্ষে জনগণের অবস্থান বা প্রতিবাদী হওয়াও পছন্দ করতেন না, এমনকি জালেম শাসকের বিপক্ষাবলম্বনও জায়েজ মনে করতেন না। তিনি বলতেন, আমি অনৈক্য বা যুদ্ধ পছন্দ করি না এবং যুদ্ধে যে পক্ষই জিতে আমি তাদের পেছনে নামাজ পড়তে রাজি।

আহলে সুন্নাতের দৃষ্টিভঙ্গি
ইবনু উমরের পিতার সাথে এ ব্যাপারে গভীর সাদৃশ্য ছিল যে, তিনি আহলে সুন্নাতের রাজনৈতিক এবং দ্বীনি চিন্তায় বিশেষ গুরুত্বারোপ করতেন। তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের বিশেষ সাহাবি হওয়া ছাড়াও তাঁর আত্মীয় ও দ্বিতীয় খলিফার পুত্র ছিলেন, এবং আহলে সুন্নাতের উলামায়ে কেরাম তাঁকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম এবং উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর রাবিও মনে করতেন, এইসব কারণে তাঁর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পর তিনি ৬০ বছর পর্যন্ত ফতোয়া প্রদান করেন। ইবনু আসির তাঁর অনেক ফজিলত বর্ণনা করেন এবং আহলে সুন্নাতের বুজুর্গ হিসেবেও উল্লেখ করেন।
বিপরীত মতও পাওয়া যায়। কেউ কেউ বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম থেকে তাঁর খুব কম রেওয়ায়াত পাওয়া গেছে। যেরূপ শাবি বলছেন, আমি এক বছর পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে ছিলাম কিন্তু তাঁর কাছ থেকে একটি হাদিসও শোনিনি। কারণ তিনি প্রয়োজন ছাড়া হাদিস বর্ণনা করতেন না এবং হুবহু স্মরণ না থাকলে বলতেন না, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের উচ্চারিত শব্দেই হাদিস বর্ণনাকে তিনি জরুরি মনে করতেন। কিন্তু আহলে সুন্নাত হজরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর ফজিলত, কুরআনের বিভিন্ন কেরাত, সাদাকাহ এবং অন্যান্য বিষয়ে বিশেষত তাঁর থেকে হাদিস নকল করেন।
হাদিস বর্ণনায় তাঁর অতি সতর্কতার কারণে আহলে সুন্নাতের ওলামাগণ তাঁকে সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য মনে করেন। ইবনু শিহাব যুহরি কোনো বিষয়ে তাঁর হাদিস পেলে আর কোনো হাদিসের প্রয়োজন মনে করতেন না। হাদিসের সনদের ক্ষেত্রে আহলে সুন্নাতের মুহাদ্দিসিনে কেরাম ‘মালিক আন নাফে আন ইবনি উমার’ এই সনদটিকে ‘সিলসিলাহ আয-যাহাব’ বা ‘সোনালি চেইন’ নামে অভিহিত করেন।

ইন্তেকাল
পুত্র সালিম নিজ পিতার কাছ থেকে বর্ণনা করেন, হজযাত্রী হাজ্জাজের এক সহচরের বর্শা ইবনু উমরের পায়ে লাগে এবং এটিই তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়। বিষের ক্রিয়ায় যখন হকের মশাল ইবনু উমর কাতরাচ্ছিলেন তখন হাজ্জাজ তাঁকে দেখতে এসে বলেন, এই অপরাধী কে আমি জানতে পেলে গর্দান উড়িয়ে দিতাম। তখন ইবনু উমর মুখের ওপর বলেন যে তুমিই আমার হত্যাকারী। এ কথায় হাজ্জাজ চুপ হয়ে যান।
উল্লেখ রয়েছে যে, হাজ্জাজ যখন আবদুল্লাহ ইবনু যুবাইরের ওপর আক্রমণ করেন তখন ইবনু উমর প্রতিবাদ করেন। এ ছাড়াও এক মজলিসে হাজ্জাজ আবদুল্লাহ ইবনু যুবাইরকে কুরআনের বিকৃতিকারী বলে অপবাদ দিতে চাইলে ইবনু উমর সাথে সাথে প্রতিবাদ করেন এবং বলেন, কুরআনের বিকৃতির সাহস ইবনু যুবাইরের নেই, হাজ্জাজের তখন ইবনু উমরকে সরাসরি কিছু বলার সাহস ছিল না। হাজ্জাজ এর প্রতিশোধ নিতে চাচ্ছিল কিন্তু খলিফা আবদুল মালিকের কড়া নির্দেশ ছিল যে ইবনু উমরের সাথে বিবাদে না যেতে, তিনি জ্ঞানী ওলি ও নিরপেক্ষ লোক। হাজ্জাজ তখন ভিন্নপথ অবলম্বন করেন এবং এক শামি সৈনিকের মাধ্যমে তাঁর ওপর প্রতিশোধবশত পরোক্ষ আক্রমণ চালান।
৭৪ হিজরিতে ৮৩, কোনো রেওয়াত অনুযায়ী ৮৪ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। ইন্তেকালের সময় ইবনু উমর ওসিয়ত করেন যে তাঁকে হেরেমের বহিরাংশে কবর দেয়ার জন্য, কিন্তু হাজ্জাজ তাঁর ওসিয়ত রাখেননি বরং তাঁকে ফখ নামক এলাকায় মুহাজিরদের সাথে দাফন করা হয়।

তথ্যসূত্র
উসদুল গাবাহ উরদু
সুওয়ার মিন হায়াতিস সাহাবা
আসহাবুর রাসুল
হেকায়াতে সাহাবা
খিলাফাত বনু উমাইয়া
আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া
তারিখ হাবিবে ইলাহ
হুকুকুল মোস্তফা
জীবন সায়াহ্নে মানবতার রূপ
খিলাফাত রাশেদাহ

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

mm
error: Content is protected !!