রবিবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২০

আবু বকর আস-সিদ্দিক : সংক্ষিপ্ত জীবনিকা

0

গারে সওর। মক্কা থেকে মদিনার পথে অবস্থিত এই গুহাটিতে আত্মগোপন করে আছেন দুজন মহান ব্যক্তি। তাঁদের অপরাধ তাঁরা মানুষকে আহ্বান করেন সত্যের দিকে। বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তার দিকে। তাই আজ নিজ দেশের, নিজ গোত্রের কাছের লোকেরাই হয়ে দাঁড়িয়েছে ঘোর শত্রু। বাধ্য হয়ে তাঁরা কৌশলে ছেড়ে এসেছেন নিজ গৃহ। কাফেররাও নেমে গেছে পিছু পিছু খুঁজতে। তাই তাঁরা দুজন আশ্রয় নিয়েছেন এই নির্জন পর্বতগুহায়। তবুও কাটে না বিপদ। দূরাচারী কাফেররা চলে আসে গুহার প্রবেশদ্বার পর্যন্ত। গুহায় আশ্রয় নিয়েছেন যে দুজন, তাদের একজন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানব রাসুল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। আরেকজন তাঁর প্রিয় সাথি, সর্বশ্রেষ্ঠ সাহাবি। গুহার প্রবেশদ্বারে কাফেরদের পদশব্দ শুনতে পেয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথি। দুরু দুরু বুকে বলেন, ‘তাঁরা যদি নিচে তাকায় তাহলে আমাদের দেখে ফেলবে।’ রাসুল তখন বললেন, ‘যে দুজন ব্যক্তির তৃতীয় সাথি আল্লাহ তাআলা হন, তাদের ব্যাপারে আপনার কী ধারণা? তাদেরকে কি তিনি শত্রুর হাতে তুলে দিতে পারেন?’ [বুখারি : ৩৬৫৩]
আল্লাহ তাআলাও পবিত্র কুরআনে বর্ণনা করলেন সে কথা,
[إِذْ هُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ لا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا ]
অর্থ : যখন তাঁরা দুজন গুহায় অবস্থান করছিলেন, রাসুল তাঁর সাথিকে বললেন, ভয় পেয়ো না, আল্লাহ আমাদের সাথেই আছেন। [সুরা তওবা : ৪০]
ইসলামি ইতিহাসের স্মরণীয় সেই রাতে রাসুলের সাথি যিনি ছিলেন, তিনি হলেন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুগ্ধ হয়ে যার উপাধি দিয়েছিলেন আস-সিদ্দিক তথা সত্যবাদী। যিনি ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ সাহাবি। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পর মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে প্রিয় মানুষ।

জাহেলি যুগে তাঁর জীবন
তাঁর পুরো নাম আবদুল্লাহ ইবনু উসমান ইবনু আমের ইবনু আমর ইবনু কাব ইবনু সাদ ইবনু তাইম। উপাধি ছিল আতিক। কুনিয়াত তথা উপনাম ছিল আবু বকর। আর সর্বময় সমাদৃত ছিলেন আস-সিদ্দিক তথা সত্যবাদী পরিচয়ে। তাঁর পিতা উসমানকে সবাই ডাকত আবু কুহাফা উপনামে। আবু কুহাফা ছিলেন মক্কার প্রসিদ্ধ বনু তাইম গোত্রের গণ্যমান্য একজন ব্যক্তিত্ব। বনু তাইম ছিল কুরাইশের বারো শাখা-গোত্রের একটি। আবু কুহাফা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন মক্কা বিজয়ের বছর। অতঃপর হিজরি ১৪ সনে প্রায় একশ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তাঁর মাতা উম্মুল খায়ের সালমা বিনতু সাখরও ছিলেন একই গোত্রের। তবে তিনি স্বামীর বহু পূর্বেই ইসলামের আলোয় ধন্য হয়েছিলেন। মক্কার দারুল আরকামে ইসলাম গ্রহণকারীগণের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। তিনি প্রায় ৯০ বছর বয়সে পুত্রকে খিলাফতে অধিষ্ঠিত দেখে ইন্তেকাল করেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মের দু বছর কয়েক মাস পর আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর জন্ম হয়। তিনি ছিলেন উজ্জ্বল গৌরবর্ণ, পাতলা ছিপছিপে দেহ এবং প্রশস্ত ললাট বিশিষ্ট।
জাহেলি যুগে তিনি দুই বিবাহ করেন। প্রথম স্ত্রী কুতাইলা বিনতু আবদিল উজ্জার ঔরসে জন্ম নেন আবদুল্লাহ এবং আসমা নামক দুই সন্তান। ইসলাম গ্রহণের আগেই আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে তালাক প্রদান করেন। দ্বিতীয় স্ত্রী উম্মু রুমানের ঔরসে জন্ম নেন আবদুর রহমান এবং আয়েশা। উম্মু রুমান ইসলাম গ্রহণ করেন।
ইসলাম গ্রহণের পর আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু আরও দুই বিয়ে করেন। জাফর ইবনু আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদাতের পর তাঁর স্ত্রী আসমা বিনতু উমাইস রাদিয়াল্লাহু আনহুকে তিনি বিয়ে করেন। তাঁর ঔরসে জন্ম নেন মুহাম্মাদ ইবনু আবি বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু। চতুর্থ স্ত্রীর নাম ছিল হাবিবা বিনতু খারিজা বিনতু যায়েদ আল-খাজরাজিয়্যাহ। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর ইন্তেকালের পর তাঁর ঔরসে উম্মে কুলসুম নামের কন্যা সন্তানের জন্ম হয়।
জাহেলি যুগে তিনি ছিলেন কুরাইশের একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব। জ্ঞান, মেধা, অভিজ্ঞতা, বিচক্ষণতা ও সচ্চরিত্রের জন্য তিনি আপামর মক্কাবাসীর শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। মক্কাবাসীর দিয়াত তথা রক্তপণের সমুদয় অর্থ তাঁর কাছে জমা রাখা হতো। আরববাসীর নসব বা বংশপরম্পরা সংক্রান্ত জ্ঞানে তিনি ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ। কাব্যপ্রতিভাও ছিল তাঁর। ছিলেন অত্যন্ত বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জল-ভাষী। বক্তৃতা ও বাগ্মীতায় ছিলেন খোদাপ্রদত্ত যোগ্যতার অধিকারী।
ছিলেন বিশিষ্ট একজন ব্যবসায়ী। ব্যবসার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেশে করতেন সফর। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিখ্যাত শাম সফরে তিনিই ছিলেন সঙ্গী। তাঁর পুঁজি ছিল বেশ ভালো। পাশাপাশি তিনি ছিলেন খুবই উদার। তাই কুরাইশের কাছে তিনি ছিলেন খুবই পছন্দনীয় একজন ব্যক্তি।
সেই জাহেলি যুগ থেকেই তিনি মদের সংস্পর্শে যাননি। ইসলাম আসার পর তো তা নিষিদ্ধই হয়ে যায়। প্রথম প্রথম বৈধতা থাকা সত্ত্বেও তিনি কখনোই মদ পান করেননি। [তারিখুল খোলাফা—সুয়ুতি]
এমনিভাবে তিনি কখনো কোনো মূর্তিকে করেননি সেজদা। সাহাবায়ে কেরামের এক মজলিসে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি কখনো কোনো মূর্তিকে সেজদা করিনি। একদিন আমার পিতা আমাকে হাতে ধরে নিয়ে কিছু মূর্তি দেখিয়ে বললেন, এইগুলো হচ্ছে তোমার প্রভু। এরপর তিনি আমাকে সেখানে রেখে যান। আমি মূর্তির কাছে গিয়ে বলি, আমার খুব ক্ষুধা লেগেছে, আমাকে খাবার দাও। সে আমার কথার কোনো জবাব দিল না। আমি আরও বললাম, আমি উলঙ্গ, আমাকে কাপড় পরিয়ে দাও। তবুও কোনো জবাব এল না। তখন আমি একটি পাথর নিক্ষেপ করলাম। যা গিয়ে পড়ল মূর্তিটির চেহারায়।’ [আবু বকর সিদ্দিক—আলি তানতাভি]
সেই জাহেলি যুগ থেকেই তিনি ছিলেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথি। ইসলাম গ্রহণে অগ্রগামিতা তাঁকে করেছে অন্যদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ। রাসুলের পর তিনিই ছিলেন ইসলাম ধর্ম গ্রহণকারী দ্বিতীয় ব্যক্তি। যদিও সাহাবায়ে কেরামের মাঝে ইসলাম কোনো পার্থক্য করেনি, তবে কেউ কেউ ইসলামে অগ্রগামিতা, খোদাভীরুতা, একনিষ্ঠতা এবং ইসলামের জন্য আত্মত্যাগের উপর ভিত্তি করে শ্রেণীবিন্যাস করেছেন। এসব গুণে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন সর্বাগ্রে।

এলো যখন ইসলামের আলো
আগেই বলেছি, তিনি ছিলেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিশ্বস্ত বন্ধু। ছিলেন রাসুলের বিশ্বস্ততা এবং সুচরিত্রের জ্বলন্ত সাক্ষীও। তাই রাসুল তাঁকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানাতেই তিনি নির্দ্বিধায় সাড়া প্রদান করেন। ইসলাম গ্রহণের পর থেকেই তিনি ছিলেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সবসময়ের সাথি। সফরে অথবা নিজ শহরে কখনোই হননি তিনি রাসুল থেকে বিচ্ছিন্ন। তবে রাসুল যদি কোনো হজের কাফেলা অথবা যুদ্ধে যাবার নির্দেশ দিতেন, তখন বিচ্ছিন্ন হতেন। তিনি ছিলেন রাসুলের হিজরতের সাথি। রাসুলের সকল যুদ্ধের সাক্ষী ছিলেন তিনি। উহুদ ও হুনাইনের যুদ্ধে যখন অন্যরা ছিল পলায়নপর, তিনি নির্ভয়ে বুক চিতিয়ে রণাঙ্গনে দাঁড়িয়েছিলেন।
ছিলেন একজন তেজস্বী বীর। যুদ্ধের ময়দানে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতিরক্ষায় তিনি যেন সুদৃঢ় এক পর্বত হয়ে দাঁড়াতেন। এজন্যই তিনি হামযা, আলি, যুবাইর, আবু দুজানা রাদিয়াল্লাহু আনহুম প্রমুখ সাহাবিগণের মতো যুদ্ধের কাতারে গিয়ে সরাসরি লড়াই করতেন না। তাই বীরত্বের চর্চায় তাঁর নামকে পিছনে রাখা হয়। অথচ তিনি অসীম সাহসিকতা আর বীরত্বের সাথে রাসুলের প্রাণরক্ষায় নিজেকে করেছিলেন উৎসর্গ। সহ্য করেছেন বহু আঘাত।
ছিলেন একজন উদার এবং দানশীল ব্যক্তি। নিজের অধিকাংশ সম্পদই তিনি ব্যয় করে দিয়েছিলেন আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের রাহে। তাঁর ব্যাপারেই কুরআনে অবতীর্ণ হয়েছে,
[وَسَيُجَنَّبُهَا الْأَتْقَى (17) الَّذِي يُؤْتِي مَالَهُ يَتَزَكَّى]
অর্থ : জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে খোদাভীরু ব্যক্তিকে। যিনি তাঁর সম্পদ থেকে ব্যয় করে নিজেকে করেন পরিশুদ্ধ। [সুরা আল-লাইল : ১৭-১৮]
তাঁর বদান্যতা বিস্মিত করেছে তাবৎ বিশ্বকে। আল্লাহ তাআলার পথে নিজের সবকিছু উজাড় করে দেয়ার মহৎ দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তিনি ইতিহাসের পাতায় ভাস্বর করেছেন নিজের বরকতময় নামটিকে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন নবুওয়াতের প্রকাশ্য ঘোষণা দেন, তখন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর নিকট ছিল চল্লিশ হাজার দিরহাম। ইসলামের জন্য তিনি তাঁর সকল সম্পদ ওয়াকফ করে দেন। কুরাইশদের যেসব দাস-দাসী ইসলাম গ্রহণের কারণে নিগৃহীত ও নির্যাতিত হচ্ছিল, এ অর্থ দ্বারা তিনি সেই সব দাস-দাসীকে ক্রয় করে মুক্ত করে দেন। তেরো বছর পর যখন তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে হিজরত করেন, তখন তাঁর কাছে এই অর্থের মাত্র আড়াই হাজার অবশিষ্ট ছিল। অল্পদিনের মধ্যে তাও ইসলামের জন্য ব্যয় হয়ে যায়। বিলাল, খাব্বাব ইবনলু আরাত, আম্মার ইবনু ইয়াসির, তাঁর মা সুমাইয়া—রাদিয়াল্লাহু আনহুম—প্রমুখ তাঁর অর্থের বিনিময়েই দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। [আসহাবে রাসুলের জীবনকথা—ড. মুহাম্মাদ আবদুল মাবুদ]
মুসনাদে আহমাদে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুথেকে বর্ণিত আছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন বললেন, ‘আবু বকরের সম্পদ আমার যে উপকার করেছে,অন্য কোনো সম্পদ সেই উপকার করতে পারেনি।’এ কথা শুনে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকান্না করে দেন। বলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমি এবং আমার সম্পদ কি আপনি ছাড়া আর কারও জন্য হতে পারে?
আবু বকর এবং উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুএর মুসাবাকাত ফিল খাইরাত তথা নেককাজের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়ার কথা সকলেরই জানা। সেই উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল আমাদেরকে একবার সদকা করার আদেশ দিলেন। তখন আমার কাছে কিছু সম্পদ ছিল। আমি মনে মনে বললাম, আজ আমি অবশ্যই আবু বকরকে হারিয়ে দেব। অতঃপর আমি আমার সম্পদের অর্ধেক নিয়ে আসলাম। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, পরিবারের জন্য কী রেখে এসেছ? আমি বললাম, এর অনুরূপ রেখে এসেছি। এরপর আবু বকর এলেন তাঁর কাছে যা ছিল সব নিয়ে। রাসুল বললেন, হে আবু বকর, পরিবারের জন্য কী রেখে এসেছ? বললেন, আমি তাদের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে রেখে এসেছি। তখন আমি বলে উঠলাম, আমি কিছুতেই তাঁকে হারাতে পারব না। [আবু দাউদ, তিরমিজি]
তাঁর হাত ধরে ইসলাম গ্রহণ করেছেন অনেক বড় বড় সাহাবি। উসমান ইবনু আফফান, যুবাইর ইবনুল আওয়াম, তালহা ইবনু উবাইদিল্লাহ, আবদুর রহমান ইবনু আওফ, সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস—রাদিয়াল্লাহু আনহুম—প্রমুখ ছিলেন তাঁদের অন্যতম। তাঁরা সকলেই ছিলেন ইসলামের প্রথম দিকের মুসলমান।
বদরের যুদ্ধে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরামর্শ করলেন সাহাবায়ে কেরামের সাথে। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর পরামর্শ মনঃপুত হলো তাঁর। যুদ্ধের দিন তিনি বনে গেলেন রাসুলের প্রতিরক্ষাকারী ঢাল।
তৃতীয় খলিফা আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু নিজের খেলাফতকালে একদিন লোকদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, সবচেয়ে বীরত্বের অধিকারী কে? লোকেরা বলল, আমিরুল মুমিনীন, আপনিই সবচেয়ে বীরত্বের অধিকারী। আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমি যার সাথে সম্মুখ লড়াই করেছি তাকেই ধরাশয়ী করেছি। তবে সবচেয়ে বীরত্বের অধিকারী হলেন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু। বদরের যুদ্ধে আমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য আসন বানিয়ে তাঁর প্রতিরক্ষার জন্য লোক আহ্বান করলাম। যেন কোনো মুশরিক তাঁর কাছ ঘেঁষতে না পারে। তখন সবার আগে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর তরবারি উত্তোলন করে এগিয়ে আসেন। [আল-খোলাফাউর রাশিদুন—মাহমুদ শাকির]
বদরযুদ্ধে বিজয় লাভের পর বন্দীদের ব্যাপারে কী ফায়সালা করা হবে, এ নিয়ে হয় বিস্তর আলোচনা। সাহাবায়ে কেরামের কাছে এ নিয়ে পরামর্শ চাইলে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, হে আল্লাহর রাসুল, তারা সকলেই আমাদের আত্মীয়-স্বজন। তাই আমার পরামর্শ হচ্ছে, আপনি তাদের কাছ থেকে ফিদয়া তথা মুক্তিপণ আদায় করুন। ফলে তাদের কাছ থেকে আমরা যে সম্পদ আদায় করব, তাতে আমাদের শক্তি বৃদ্ধি পাবে। আর আল্লাহ তাআলা চাইলে তারা আমাদের সমর্থকও বনে যেতে পারে।
উমর ইবনুল খাত্তাব, আলি ইবনু আবি তালিব এবং আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা—রাদিয়াল্লাহু আনহুম—প্রমুখ সাহাবি পরামর্শ দেন বন্দীদেরকে হত্যা করে ফেলতে। তবে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর মতটিই রাসুলের পছন্দ হয়। তিনি বন্দীদের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করেন।
উহুদের যুদ্ধেও আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পাশে পর্বতসম অবিচলতা নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
সপ্তম হিজরি বর্ষে রাসুল সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুএর নেতৃত্বে বন ফাযারার উদ্দেশ্যে একটি সারিয়া প্রেরণ করেছিলেন। তাঁরা সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ গণিমত লাভ করে, বন্দীদেরকে সাথে নিয়ে নিরাপদে ফিরে আসেন।
তাবুকের যুদ্ধে যখন মুসলমানরা ভুগছিল খুবই কষ্টে। সে যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর পতাকা ছিল আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাতে।
হুনাইনের যুদ্ধে নিজেদের সংখ্যাধিক্য দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল মুসলিম বাহিনী। কিন্তু উপত্যকা থেকে শত্রুদের গুপ্ত হামলার পর তারা বিক্ষিপ্ত হয়ে পালাতে শুরু করে। কিন্তু আবু বকর, উমর, আলি, আব্বাস, ফজল ইবনু আব্বাস, আবু সুফিয়ান ইবনুল হারিস, রবিয়া ইবনুল হারিস, উসামা ইবনু যায়েদ—রাদিয়াল্লাহু আনহুম—প্রমুখ সাহাবিগণ রাসুলকে ঘিরে অবিচল দাঁড়িয়ে থাকেন। অতঃপর আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর আহ্বানে মুসলমানরা পুনরায় রাসুলের পাশে এসে জড়ো হন।
মক্কা বিজয়ের পর নবম হিজরিতে প্রথম ইসলামি হজ উপলক্ষে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে হজ-কাফেলার আমির নিয়োগ করেন। অন্তিম রোগশয্যায় রাসুলের নির্দেশেই তিনি মসজিদে নববিতে নামাজের ইমামতির দায়িত্ব পালন করেন। মোটকথা, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন তাঁর উজির অথবা প্রধান উপদেষ্টার ভূমিকায়।
যে রাতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাত হলো আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু এসে দাঁড়ালেন মসজিদে নববির দরজায়। উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু তখন লোকদেরকে উদ্দেশ্য করে বলছিলেন, কিছু মুনাফিক বলছে রাসুল মারা গেছেন। আল্লাহর কসম, তিনি মারা যাননি। বরং তিনি তাঁর প্রভুর কাছে ফিরে গিয়েছেন। যেভাবে ফিরে গিয়েছিলেন মুসা ইবনু ইমরান আলাইহিস সালাম। তিনি তাঁর জাতির কাছ থেকে চল্লিশ দিন অনুপস্থিত ছিলেন। অতঃপর তাঁর মৃত্যুর গুজব ছড়ানোর আগেই ফিরে এসেছিলেন। আল্লাহর কসম, অচিরেই রাসুল ফিরে আসবেন। রাসুল মারা গেছেন; একথা যারা বলবে আমি তাদের হাত কেটে ফেলব। তখন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু জনতার সম্মুখে আসেন। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন দয়া করে চুপ করতে। তবুও তিনি নিজের বক্তব্য চালু রাখেন। অতঃপর আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু দীপ্ত কণ্ঠে বলে উঠলেন, যারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইবাদত করেন তাদেরকে বলছি, মুহাম্মাদ মারা গেছেন। আর যারা আল্লাহ তাআলার ইবাদত করেন তাদেরকে বলছি, আল্লাহ তাআলা চিরঞ্জীব, তাঁর কোনো মৃত্যু নেই। এই বলে তিনি তিলাওয়াত করেন—
[وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ أَفَإِنْ مَاتَ أَوْ قُتِلَ انْقَلَبْتُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ وَمَنْ يَنْقَلِبْ عَلَى عَقِبَيْهِ فَلَنْ يَضُرَّ اللَّهَ شَيْئًا وَسَيَجْزِي اللَّهُ الشَّاكِرِينَ]
অর্থ : মুহাম্মাদ কেবলই একজন রাসুল। তাঁর পূর্বেও অনেক রাসুল অতিবাহিত হয়েছেন। যদি তিনি মারা যান অথবা নিহত হন, তবে কি আপনারা পিছনে ফিরে যাবেন? যে পিছনে ফিরে যাবে সে আল্লাহ তাআলার কোনো ক্ষতিই করতে পারবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা কৃতজ্ঞদের সওয়াব প্রদান করবেন। [সুরা আলে ইমরান : ১৪৪]
লোকদের মনে হলো যেন তারা প্রথমবার এই আয়াত শুনতে পাচ্ছে। যেন সৃষ্টির সেরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর এই আয়াত অবতীর্ণই হয়নি এর আগে।

খেলাফত গ্রহণ
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুর পর সাহাবায়ে কেরাম মুসলমান এবং মদিনার দেখভাল করার জন্য একজন খলিফা তথা প্রতিনিধির প্রয়োজনবোধ করেন। তখনো মদিনার আশপাশের অনেক গোত্র ঈমান আনয়ন করেনি। তাই মদিনার নিরাপত্তার জন্য ছিল শংকা। অনেকেই আবার মুখে মুখে ঈমান এনেছে, যাদের অন্তরে এখনো ঈমানের নুর প্রবেশ করেনি। বরং তারা ঈমান এনেছে ভয়ে। আনসার সাহাবিগণ ভাবলেন, যদি মুহাজির সাহাবিরা এখন মক্কায় চলে যান তবে তারা পড়বেন বিপাকে। তাই তারা দাবি করলেন, তাদের মধ্য হতে কোনো খলিফা নির্বাচিত করতে। মুহাজির সাহাবিগণের কাছে এ মত গ্রহণযোগ্য হলো না। তারা বললেন, ইসলামের বীজ বপন করেছি আমরা এবং আমরাই তাতে পানি সিঞ্চন করেছি। ফলে আমরাই অধিক হকদার। পরিস্থিতি ভিন্নদিকে মোড় নিল। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দেহ মুবারকের কাছ থেকে এসে কথা বলেন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু। তাঁর কথা মেনে নেন আনসার সাহাবিগণ। অতঃপর আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকেই ইসলামের প্রথম খলিফা নির্বাচিত করা হয়।
খলিফা নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি সংক্ষিপ্ত একটি ভাষণ প্রদান করেন। ভাষণে তিনি নিজের অক্ষমতা এবং বিনয় প্রকাশ করেন। বলেন, সঠিক কাজে তাঁকে সহায়তা করতে এবং ভুল কাজে তাঁকে সতর্ক করে দিতে। তাঁর সেই ভাষণটি পৃথিবীর সকল রাষ্ট্রনায়কের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।

ইসলামে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর অবদান
ইসলামি দাওয়াহর বিস্তৃতি ও সমর্থন এবং চক্রান্তকারীদের প্রতিরোধে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর ছিল বিরাট অবদান। তাঁর যুদ্ধ ও বিজয়-অভিযানগুলো ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর ইন্তেকালের পূর্বে মুতার যুদ্ধে শহিদ হওয়া সাহাবিগণের রক্তের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য একটি বাহিনী প্রস্তুত করেন। প্রধান নিযুক্ত করা হয় রাসুলের প্রিয় উসামা ইবনু যায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে। তাঁরা সিরিয়ার দিকে রওনা হয়ে যান। কিন্তু এরই মধ্যে রাসুল অসুস্থ হয়ে পড়লে এ অভিযান স্থগিত রাখা হয়। মদিনার উপকণ্ঠে শিবির স্থাপন করে তাঁরা রাসুলের রোগমুক্তির প্রতিক্ষা করতে থাকেন। কিন্তু এ রোগেই রাসুলের ইন্তেকাল হয়ে যায়। এই সংবাদ পেয়ে আরবের বিভিন্ন প্রান্তে অপশক্তি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। কেউ ইসলাম ত্যাগ করে, কেউ জাকাত দিতে অস্বীকৃতি জানায়, কেউ নবুওয়াত দাবি করে বসে। এমন পরিস্থিতিতে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু সীমাহীন দৃঢ়তা প্রকাশ করে উসামা রাদিয়াল্লাহু আনহুর বাহিনীকে পুনরায় প্রেরণ করেন। অনেকেই এর বিরোধিতা করেন। কিন্তু তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে বাহিনী প্রস্তুত করেছেন তা কিছুতেই থামিয়ে রাখতে পারেন না।
রাসুলের ইন্তেকালের পর থেকে বাড়তে থাকে মুরতাদ তথা ধর্মত্যাগীদের সংখ্যা। তিনি শক্তহাতে সেই সকল মুরতাদকে দমন করেন। রিদ্দার যুদ্ধে মুরতাদদেরকে পরাজিত করে তিনি এই ফিতনা বিপজ্জনক হওয়ার আগেই সমূলে বিনাশ করে দেন। জাকাত দিতে যারা অস্বীকার করেছিল তাদের বিরুদ্ধেও তিনি ঘোষণা করেন কঠিন হুঁশিয়ারি।
তাঁর সময়েই সংঘটিত হয় বিখ্যাত ইয়ারমুকের যুদ্ধ। যে যুদ্ধে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্বাধীন বাহিনী পরাভূত করে রোমান সাম্রাজ্যের শক্তির প্রাসাদ। তাঁর সময় বিজয় হয় হিরাত ইরাক ও শাম তথা বৃহত্তর সিরিয়ার আরও কিছু অঞ্চল।
তাঁর সময়েই সংঘটিত হয় বিখ্যাত ইয়ামামার যুদ্ধ। যে যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী লাভ করে নিরঙ্কুশ বিজয়। মিথ্যা নবি-দাবিদার মুসাইলামাতুল কাজ্জাব এ যুদ্ধেই নিহত হয়। এ যুদ্ধে মুরতাদদের অনেকেই তওবা করে পুনরায় ইসলামে ফিরে আসে। শহিদ হন বহু সংখ্যক হাফিজে কুরআন সাহাবি। এর ফলেই তিনি কুরআন সংকলণের উদ্যোগ নেন। যায়েদ ইবনু সাবেত রাদিয়াল্লাহু আনহুকে নির্দেশ দেন কুরআনকে সংকলিত করতে। যেভাবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর অবতীর্ণ হয়েছে, ঠিক সেই বিন্যাসে। এই প্রথম কুরআন সংকলন শুরু হয়। যা ছিল আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর অন্যতম অবদান। [আবু বকর সিদ্দিক—আলি তানতাভি]

ইন্তেকাল
উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, এক তীব্র শীতের রাতে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু গোসল করেছিলেন। সে রাতে তিনি প্রচণ্ড জ্বরাক্রান্ত হয়ে পড়েন। এর প্রভাবেই অবশেষে তিনি ইন্তেকাল করেন। ১৩ হিজরির ২২শে জমাদিউল উখরা, মঙ্গলবার রাতে তাঁর ইন্তেকাল হয়। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মতোই ঠিক ৬৩ বছর বয়সে। ইন্তেকালের আগে নিজের পক্ষ থেকে নামাজের ইমাম নিযুক্ত করে যান উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুকে। উমরের ইমামতিই আদায় করা হয় তাঁর জানাজার নামাজ। [আত-তারিখুল মুতাবার ফি আনবায়ি মান গাবারা—মুজিরুদ্দিন আল-আলিমী] তাঁর প্রয়াণে শোকে পাথর হয়ে যায় মদিনা-মক্কা এবং সমস্ত ইসলামি সাম্রাজ্য। সাহাবায়ে কেরামের হৃদয়ে নেমে আসে এক অবর্ণনীয় দুঃখ। এক বর্ণিল জীবন শেষে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু পাড়ি জমান মহান প্রভুর সান্নিধ্যের উদ্দেশ্যে। যেখানে তাঁর জন্য আরও অপেক্ষা করছেন প্রিয় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

error: Content is protected !!