রবিবার, ৬ ডিসেম্বর ২০২০

খাদিজা বিনতু খুয়াইলিদ : সংক্ষিপ্ত জীবনিকা

0

বাগানে ফুটল গোলাপ

৫৫৫ খ্রিষ্টাব্দ। আমুল ফিলের ১৫ বছর আগের কথা। হলুদ সর্ষের মতো ঝলমলে, সুন্দর, রৌদ্রজ্জল একদিনে—খুয়াইলিদ ইবনু আসাদের স্ত্রী ফাতিমা বিনতু যাইদা এক ফুটফুটে কন্যা সন্তানের জন্ম দিলেন। জাহেলি যুগের কন্যাসন্তান! জীবন্ত পুঁতে ফেলা হয় জন্মের সাথে সাথেই। খুয়াইলিদের কেন যেন তা করতে মন চাইল না। সদ্য প্রস্ফুটিত গোলাপের মতো মুখখানি তাঁর হৃদয়-অলিন্দে মায়ার ঢেউ তুলল। রেশমের মতো তুলতুলে ছোট দেহটিকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিলেন। রঙ্গন ফুলের রাঙা পাপড়ির মতো লাল টুকটুকে ঠোঁট দুটোতে আলতো করে চুমু খেলেন। এ যে রাজকন্যা। তাঁর শরীরের টুকরো। রাজকন্যার নাম রাখলেন খাদিজা। খাদিজা বিনতু খুয়াইলিদ। খাদিজা নামের অর্থ ‘যে আগে জন্মগ্রহণ করেছে।’

নামের সার্থকতা তাঁর জীবনে পুরোপুরি বাস্তবতা লাভ করেছিল। অগ্রগামিতায় সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন আজীবন। খুয়াইলিদ ইবনু আসাদ ছিলেন কুরাইশ গোত্রের মর্যাদাশীলদের একজন। গুরুত্বপূর্ণ সব ব্যাপারে মানুষ কামনা করত তাঁর পরামর্শ। চাইত তিনি যেন মতামত পেশ করেন। তিনি ছিলেন সম্পদশালী ব্যবসায়ী। বদান্যতা, উদারতা, তাঁর অন্যতম গুণ ছিল। অতিথিপরায়ণ, দানশীল ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর দুয়ার ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত। অসহায়ের সাহায্যে তিনি ছিলেন উদারহৃদয়। পিতার এইসব গুণ খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন যেন।

খাদিজা রা.-এর জন্ম হয়েছিল ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জমান এক যুগে। চারিদিকে চারিত্রিক অধঃপতনের নোংরা উৎসব লেগে থাকে হররোজ। নারী মানেই অশুচি, নারী ভোগের পণ্য—সবার এই ধারণা ছিল। খুয়াইলিদের কন্যা খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে আল্লাহ তায়ালা অদৃশ্য হাতে রক্ষা করে রেখেছিলেন যুগের পঙ্কিলতা থেকে। তাঁর চুলের আগা থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত ছিল পবিত্রতার রক্ষাকবচে সংরক্ষিত। তিনি ছিলেন সবার চেয়ে আলাদা। আভিজাত্যে পরিপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, মর্যাদার কথা ছিল লোকের মুখে মুখে। অবক্ষয়ের শেষপ্রান্তে পৌঁছা সমাজের চোখে ঘৃণিত নারীদের মধ্য থেকে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ আলাদা।   তাই লোকে তাঁর নাম দিয়েছিল তাহিরা। যার অর্থ পবিত্র, পরিচ্ছন্ন।

শুধু তিনি নন, তাঁর পুরো পরিবারই ছিল জাহেলি যুগের পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত। তাঁরা ছিলেন ধর্মানুরাগী। কুফর, শিরক, গোত্রপ্রীতি ও অনাচারকে তাঁরা মনেপ্রাণে ঘৃণা করতেন। তাঁর চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবনু নওফাল ছিলেন ইহুদি ও খৃষ্ট ধর্মের জ্ঞানী ব্যক্তি। তাঁর কাছেই খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান লাভ করেছিলেন। জানতে পেরেছিলেন শেষ নবির আগমনী সম্পর্কে। তাঁর প্রতীক্ষায় তিনি ছিলেন প্রতীক্ষিত। তাঁর সম্পর্কে জেনে যেন তাঁকে হারাতেন চোখে চোখে। তাঁর গুণ শুনে হৃদয় উদ্বেলিত হয়ে উঠত। কানে গুঞ্জরিত হতো তাঁর কথা, স্বর। হৃদয় হতো পুলকিত, অভিভূত। দিনে দিনে প্রতীক্ষা বাড়ছিল জলোচ্ছ্বাসের ঢেউয়ের উচ্চতার মতো।

বিয়ের পিঁড়িতে

ছোট রাজকন্যাটির একসময় বিয়ের বয়স হলো। তার আগেই তাঁর সৌন্দর্য, আভিজাত্যে-ভরা ব্যক্তিত্বের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল পুরো মক্কা জুড়ে। সম্ভ্রান্ত প্রতিটি যুবকের কাছে তিনি হয়ে উঠলেন পরম আরাধ্য। কারণ বংশমর্যাদা ও চারিত্রিক সৌন্দর্যের দিক থেকে তিনি ছিলেন অতুলনীয়। হিরের টুকরো এমন রাজকন্যাকে পেতে কার না সাধ জাগবে!

পিতা খুয়াইলিদ তাঁর অনুপমা কন্যার জন্য ভেবেচিন্তে, দেখেশুনে নির্বাচিত করলেন বনু মাখযুম গোত্রের নীতিবান, ধনী, সফল ব্যবসায়ী আতিক ইবনু আবিদকে। এক শুভদিনে আতিক ইবনু আবিদ ও খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা আবদ্ধ হলেন পরিণয়সূত্রে। সজ্জন আতিক ইবনু আবিদ ছিলেন সকলের ভালোবাসার পাত্র। খাদিজাতুত তাহিরার দিন কাটতে লাগল সুখে শান্তিতে। তাঁদের সুখকে ষোলকলায় পরিপূর্ণ করতে তাঁদের ঘর আলোকিত করে এল এক রাজকন্যা। তাঁরা তার নাম রাখলেন হিন্দ।

কিন্তু হিন্দের জীবনে পিতৃস্নেহের ছায়া বেশিদিন রইল না। কয়েকবছর পরই খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বৈধব্যের যন্ত্রণায় ফেলে মৃত্যুবরণ করলেন আতিক ইবনু আবিদ। সুখের সংসার, বিরাট ব্যবসা, অঢেল সম্পত্তি, প্রিয়তমা খাদিজা আর হৃদয়ের স্পন্দন হিন্দকে রেখে পাড়ি জমালেন পরপারে। খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা হয়ে পড়লেন সঙ্গীহীন, নিঃসঙ্গ।

আতিক ইবনু আবিদ মারা গেছেন বেশিদিন হয়নি। খুয়াইলিদের দরজায় আবারও কড়া নাড়তে লাগলেন বিবাহপ্রার্থী পুরুষেরা। কারণ খাদিজা তো ছিলেন এমন নারী যাঁর মধ্যে পুরুষের আকাঙ্ক্ষিত সব গুণ তো ছিলই, সাথে ছিল আরও বেশি, ভিন্ন কিছু যা তাঁকে করে তুলেছিল আকর্ষণীয়া।

পিতার অনুরোধে খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা আতিক ইবনু আবিদের স্মৃতিকে বুকের অতলে ফেলে রাজি হলেন দ্বিতীয় বিবাহের ব্যাপারে। জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করলেন আবু হালা যুরারা আত-তামিমিকে। আতিকের মতো আবু হালাও ছিলেন সম্পদশালী, মর্যাদাবান, গুণবান আর ধনী ব্যবসায়ী। তাঁর ব্যবসা ছড়ানো ছিল দেশে বিদেশে। সফল ব্যবসায়ী, বীর যোদ্ধা, প্রসিদ্ধ দানবীর হিসেবে সর্বত্র তার সুনাম ছড়ানো ছিল। যোগ্য জীবনসঙ্গী পেয়ে খাদিজার হৃদয় আবার সুখের ঘর বাঁধল। আগের স্বামীর মতো আবু হালার কাছেও সমর্পণ করলেন তাঁর সর্বস্বত্ত্বা, হৃদয়ের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। আবু হালার ঔরসে তাঁর দুজন পুত্রসন্তানের জন্ম হলো। যাদের নাম রাখলেন হিন্দ ও হালা। পুরনো শোক মুছে নতুন ছন্দে সেজে উঠল তাঁর জীবন।

কিন্তু এই সুখের উপরও পড়ল শোকের কালো ছায়া। দুই পুত্র ও স্ত্রীকে রেখে আবু হালা পাড়ি জমালেন পরপারে। সুখের সংসারে নেমে এল অকস্মাৎ শোকের মিছিল। খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার ভাঙা মন আরও ভাঙল। আবার হয়ে গেলেন নিঃসঙ্গ, একা।

আবু হালার কিছুদিন পর খাদিজার রাদিয়াল্লাহু আনহা একমাত্র অভিভাবক স্নেহশীল পিতা খুয়াইলিদও মৃত্যুবরণ করলেন। জগতে খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার অভিভাবক বলতে কেউ রইল না। তবু আর দশজন নারীর মতো খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা ভেঙে পড়লেন না। শোক কাটিয়ে উঠলেন। পিতা ও স্বামীর রেখে যাওয়া বিপুল সম্পত্তি ও বিরাট ব্যবসা পরিচালনায় মন দিলেন। সাথে চলল সন্তানদের প্রতিপালন ও উত্তম তরবিয়াত প্রদান। প্রতিজ্ঞা করলেন জীবনেও আর বিয়ের পিড়িতে বসবেন না।

স্বপ্নের পথে যাত্রা, স্বপ্নপূরণ

স্বামীর ব্যবসা-বাণিজ্য মক্কার ভেতর নিজে একাই সামলাতে পারতেন তিনি। কিন্তু তাঁর স্বামী তো শহরের বাইরেও বাণিজ্য করতেন। স্বামীর বাণিজ্য আবার শুরু করতে একজন বিশ্বস্ত লোকের প্রয়োজন। যার হাতে তাঁর আগামী সিরিয়াগামী বিরাট বাণিজ্য কাফেলার দায়িত্ব দিতে পারেন নির্ভয়ে। জাহেলি যুগের লোকেরা সাহসী, আত্মমর্যাদাশীল ও অহংকারী ছিল, কিন্তু সৎ ছিল না। বিশ্বাসযোগ্য ছিল না। তাঁর জানামতে তখনকার সমাজে পুরো মক্কায় একজন যুবক ছিলেন সৎ। কুরাইশ নেতা আবু তালিবের এতিম ভাতিজা। যুবকের নাম মুহাম্মদ। সৎ ও বিশ্বাসী হিসেবে তার সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল চারিদিকে। লোকে তাঁর নাম দিয়েছিল আল-আমিন। পুরো মক্কা জুড়ে সে-ই ছিল এই বিরল সম্মানের অধিকারী। খাদিজাতুত তাহিরা তার সম্পর্কে আরও ভালো করে খোঁজ নিয়ে দেখলেন তার হাতে ব্যবসা নয়, পুরো জীবন সঁপে দেওয়া যায়। খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা তাকে সিরিয়াগামী বাণিজ্য কাফেলার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেবার প্রস্তাব দিলেন এবং বললেন তাকে অন্য লোকদের চেয়ে দ্বিগুণ পারিশ্রমিক দেওয়া হবে। সে বছর আরবে দুর্ভিক্ষ চলছিল। চাচার পরিবারে বড় হওয়া মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ভাবলেন, এ বাণিজ্যের মাধ্যমে তাঁর চাচারও অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা আসতে পারে। তাই তিনি প্রস্তাব গ্রহণ করলেন এবং খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার ক্রীতদাস মাইসারাকে নিয়ে সিরিয়ার উদ্দেশ্য যাত্রা করলেন।

মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম যখন ফিরে আসলেন, দেখা গেল ব্যবসায় প্রচুর লাভ হয়েছে। এত লাভ আগে কখনো হয়নি। দাস মাইসারার কাছে জানতে চাইলেন চলার পথে সে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে কেমন পেয়েছে? মাইসারা তো প্রশংসায় পঞ্চমুখ! বিস্ময়কর সব গুণের অধিকারী এ যুবক। তিনি খুবই সৎ,নিষ্ঠাবান। মিথ্যা বলেন না। কারও সাথে ঝগড়া করেন না। প্রতারণা করেন না। রোদের তীব্রতা থেকে বাঁচাতে ফেরেশতারা মেঘমালা হয়ে তাঁর মাথার উপর ছায়া দিয়ে থাকেন—বললেন মাইসারা।

মাইসারার মুখে প্রশংসা আর অলৌকিকতার বর্ণনা শুনে খাদিজার মন যুবক মুহাম্মদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ল। অথচ খাদিজার দ্বিতীয় বৈধব্যের পরও মক্কার কত ধনী ব্যবসায়ী, বীর তাঁর দরজায় কড়া নেড়েছিল বিবাহপ্রার্থী হয়ে। খোদ আবু জেহেলও চেয়েছিল তার জীবনসঙ্গী হতে। সব ধনী নেতার আকাঙ্ক্ষাকে পায়ে দলে খাদিজার মন কেন শহরের এতিম যুবককে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেতে আকৃষ্ট? কী আছে এই যুবকের মাঝে? অলৌকিক কিছু? শহরের লোকেদের মনে এইসব প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে এইসব প্রশ্ন অবান্তর। বাহ্যিক কিছু দেখে যে তিনি আকৃষ্ট হননি! মনের আয়নায় যুবকের অনন্যতার দ্যুতি চমকাচ্ছিল তাঁর। অজানা এক রহস্যের টানে বারবার যুবকের দিকেই ছুটে যাচ্ছে তাঁর মন।

যুবকের কাছে প্রস্তাব দেওয়া হলে তিনি বললেন, আমার এখন বিয়ে করার মতো অর্থসম্পদ কিচ্ছু নেই। খাদিজা রা. নিজে বিয়ের সমস্ত খরচ বহন করবেন বলে জানালেন। চাচার কাছে অনুমতি চাইলেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম। চাচার অনুমতি পেয়ে রাজি হলেন। তারপর কয়েকদিনের ভেতর মক্কার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে দুটি অভিজাত, পবিত্র হৃদয় প্রাণের বন্ধনে আবদ্ধ হলো। বিয়ের পর খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা নিজের সমস্ত সত্তা প্রিয়তম নবিজির জন্য উৎসর্গ করে দিলেন।

প্রিয়তম রাসুলের সান্নিধ্যে

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ও খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার সংসার গড়ে ওঠে খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার বাড়িতে। বাড়িটি তিনি ভাতিজা হাকিম ইবনু হিজামের কাছ থেকে কিনেছিলেন। খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার ক্রীতদাস বালক যায়েদ ইবনু হারিসা, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিতার ক্রীতদাসী উম্মে আয়মান, আবু তালিবের পুত্র আলি ইবনু আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু, খাদিজার আগের সন্তান হিন্দ ও হালাকে নিয়ে তাঁদের যৌথসংসার। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সমস্ত সত্তা ছিল মানবজাতির জন্য শান্তির উৎস। আর খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন জন্মগত দানশীল, দয়ালু। তাঁদের দরজা ছিল সকলের জন্য উন্মুক্ত। তাঁরা ছিলেন নিঃস্ব, অভাবী ও এতিম-বিধবাদের সহায়। সোনায়-সোহাগা জুটি মিলে বাড়িটি হয়ে উঠেছিল শান্তির নীড়। তাঁদের ঘরটিতে সবসময় বইত জান্নাতের হাওয়া। খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার সৌভাগ্যের দিগন্ত আরও প্রসারিত করতে তাঁর কোল জুড়ে আল্লাহ্ সন্তান দান করলেন। পুত্রসন্তান কাসিমের জন্ম হলো। তবে তিনি অল্পবয়েসেই মারা যান। কাসিমের মৃত্যুর পর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের ঔরসে তাঁর আরও চারজন কন্যা ও একজন পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করেন। পুত্র—আবদুল্লাহ, যিনি শৈশবেই মারা যান। কন্যারা হলেন যাইনাব রাদিয়াল্লাহু আনহা, রুকাইয়া রাদিয়াল্লাহু আনহা, উম্মু কুলসুম রাদিয়াল্লাহু আনহা ও ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহা। এঁদের মধ্যে ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহার মাধ্যমেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের বংশধারা অব্যাহত রয়েছে।

ভালোবাসা, শান্তি ও প্রেরণার আধার

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বয়স যখন চল্লিশের কাছাকাছি তখন থেকেই নবুওয়াতের বিভিন্ন নিদর্শন প্রকাশ পেতে থাকে। প্রায়ই ইঙ্গিতবহ স্বপ্ন বা নির্দশন রাসুলের কাছে পরিলক্ষিত হতো। সেগুলো তাঁকে বিচলিত করে তুললে তিনি খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে জানাতেন। খাদিজা তাঁকে সান্ত্বনা দিতেন। রাসুল নির্জনবাসের জন্য মক্কা থেকে তিন মাইল দূরের জাবালে নুর পাহাড়ের হেরা গুহায় চলে যেতেন। খাদিজা সেখানে রাসুলের জন্য খাবার নিয়ে যেতেন। কখনো রাসুলের বিরহ ব্যথায় কাতর হয়ে পড়লে এমনিতেই তাঁকে গিয়ে দেখে আসতেন।

সতেরোই রমজান। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন। এমন সময় জিবরাইল আলায়হিস সালাম আগমন করে বললেন, ‘পড়ুন।’ রাসুল বললেন, ‘আমি পড়তে জানি না।’ জিবরাইল আলায়হিস সালাম তাঁকে বুকের সাথে জোরে চাপ দিয়ে বললেন, ‘পড়ুন।’ এভাবে কয়েকবার করার পর কুরআন মাজিদের পাঁচটি আয়াত পড়ে শোনালেন। এটি ছিল ওহি নাজিল ও নবুওয়াত প্রাপ্তির প্রথম দিন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ভয় পেয়ে গেলেন। কারণ, তাঁর সাথে পূর্বে আর এমনটি ঘটেনি। বিহ্বল চিত্তে ঘরে ফিরে খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বললেন, ‘আমাকে কম্বলাবৃত করো। আমাকে কম্বল দ্বারা ঢেকে দাও। আমার ভীষণ ভয় করছে,আমি বিপদের আশঙ্কা করছি।’ তারপর সব ঘটনা প্রিয়তমাকে খুলে বললেন। খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা এসব সম্পর্কে পূর্ব থেকেই কিছুটা অবহিত ছিলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, এটি নবুওয়াত প্রাপ্তির লক্ষণ। তিনি রাসুলকে দৃঢ়ভাবে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ‘কখনো না! আল্লাহর কসম তিনি কখনো আপনাকে অপদস্থ করবেন না। আপনি তো আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখেন। অন্যের ভার বহন করেন। অসহায়দের সহায়তা করেন। অতিথিদের সমাদর করেন।’

খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা এভাবেই আমৃত্যু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের প্রেরণা, সান্ত্বনা, ও শান্তির উৎস হয়ে ছিলেন।

বিচক্ষণতায় অনন্যা

বিচক্ষণতায় তিনি ছিলেন অনন্যা। পুনরায় ওহি নাজিল ও জিবরাইল আলায়হিস সালামের আগমন অব্যাহত রয়েছে শুনে, তিনি রাসুলকে বললেন—আবার যখন তিনি আসবেন আমাকে বলবেন। এরপর জিবরাইল আলায়হিস সালাম আসার পর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে ডেকে বললেন—‘খাদিজা, এই যে এখানে জিবরাইল বসে আছেন।’ খাদিজা রাসুলকে অনুরোধ করলেন যেন তিনি তাঁর ডান উরুতে এসে বসেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বসলে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কি তাঁকে দেখতে পাচ্ছেন?’ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘হ্যাঁ।’ এবার বাম উরুতে বসতে বললেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বসলে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এবার দেখতে পাচ্ছেন?’ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘হ্যাঁ।’ এবার তিনি তাঁর ওড়না খুলে নিলেন এবং রাসুলকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এবার দেখতে পাচ্ছেন?’

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘না, এবার আর দেখতে পাচ্ছি না।’ খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলে উঠলেন, ‘সুসংবাদ! নিশ্চয়ই তিনি ফেরেশতা। কোনো শয়তান নয়। না হলে তিনি লজ্জা পেয়ে এভাবে চলে যেতেন না।’

জীবনের শ্রেষ্ঠ গৌরব অর্জন

খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াতপ্রাপ্তির সাথে সাথে তাঁর সততার প্রতি সাক্ষ্য দিলেন ও ঈমান আনয়ন করলেন। অর্জন করলেন ওহি অবতীর্ণ হবার পর ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম মুসলমান হওয়ার গৌরব।

তিনি প্রিয় রাসুলের জন্য তাঁর আগমনের পূর্ব থেকেই প্রতীক্ষায় ছিলেন। রাসুলের জন্য উৎসর্গ করেছেন নিজের সত্তা ও সম্পদ। নবুওয়াতপ্রাপ্তির পর কঠিন মুহূর্তে রাসুলকে দিয়েছেন সান্ত্বনা ও প্রেরণা। রাসুলের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, ও মমতায় তাঁর অন্তর ছিল পরিপূর্ণ। তিনি ছাড়া এ সৌভাগ্যের অধিকারী আর কে হতে পারেন? তাঁর সমস্ত কিছুর পুরস্কার স্বরূপ ইসলামের বাগানের প্রথম ফুল হবার সৌভাগ্য আল্লাহ তাঁকে দান করেছিলেন।

জিবরাইল আলায়হিস সালাম রাসুলকে শিখালেন কীভাবে ওজু করতে হয়। নামাজ পড়তে হয়। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে শিখিয়ে দিলেন। খাদিজাই রাসুলের পেছনে সর্বপ্রথম নামাজ পড়েন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া শুরু করলে খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা দ্বীনের সর্বপ্রকার সহযোগিতায় হাত বাড়িয়ে দিলেন।

বিরহের সমুদ্দুরে

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম যখন প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার করতে লাগলেন, কাফের-মুশরিকরা তার বিরুদ্ধাচরণে নেমে পড়ল সর্বশক্তি দিয়ে। অত্যাচার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছল মুসলমানদের শিআবে আবি তালিবে অবরুদ্ধ করার পর। তিনবছর স্থায়ী হয়েছিল অবরোধ। এই তিন বছরে ক্ষুধা, পিপাসা, রোগ-ব্যাধি, যন্ত্রণা ছিল মুসলমানদের নিত্যসঙ্গী। খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার জীবনের পড়ন্ত বেলা তখন। এ সময়েও তিনি রাসুলের পাশেই ছিলেন। হাসিমুখে পাড়ি দিয়েছেন দুঃসময়। আল্লাহর ইচ্ছায় অবরোধ শেষ হয় অবশেষে। কিন্তু অসুস্থ হয়ে পড়লেন খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা। অসুস্থতা তাঁকে নিয়ে গেল মৃত্যুশয্যায়। আলোকিত, ঈর্ষণীয় এক জীবনপ্রদীপ নিভু নিভু। প্রিয়তমার অন্তিমমুহূর্তে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম উপস্থিত ছিলেন। ২২শে নভেম্বর ৬১৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রিয়তমের উপস্থিতিতেই ঠোঁটে স্নিগ্ধ হাসির ঝিলিক মেখে সাড়া দেন মাওলার ডাকে। চাচা আবু তালিবের মৃত্যুর পর রাসুলকে আরও নিঃসঙ্গ করে দিয়ে তিনি রওয়ানা হন আখেরাতের সফরে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম নিজ হাতে তাঁকে কবর দেন, কবরের মাটি সমান করে দেন।

রাসুলের চোখের আড়াল হলেও মনের আড়াল হননি খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা। আজীবন তাঁকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মনে রেখেছেন। প্রিয়তমার স্মৃতি আমৃত্যু জাগরুক ছিলে তাঁর হৃদয়-অলিন্দে। সবসময় স্মরণ করতেন তাঁকে। বকরি জবাই করলে তার কিছু অংশ খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার বান্ধবীদের কাছে পাঠাতেন। হালা বিনতে খুয়াইলিদের কণ্ঠ শুনে খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে মনে পড়ত তাঁর। খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা সম্পর্কে সুসংবাদ দিয়েছেন বেহেশতের সুরম্য প্রাসাদের রানি হবার। অভিহিত করেছেন পৃথিবীর অল্পসংখ্যক শ্রেষ্ঠ নারীর একজন বলে। দুনিয়ার সকল মুসলমানের অন্তরেও খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার জীবনস্মৃতি অনুসরণীয় হয়ে আছে। পৃথিবীর ইতিহাস তাঁকে গেঁথে রেখেছে অনন্যা, অদ্বিতীয়া অবিস্মরণীয়া এক নারী হিসেবে।

তথ্যসূত্র
১. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া
২. আর রাহিকুল মাখতুম
৩. সিরাতে মুস্তফা
৪. তাবাকাতু ইবনি সাদ
৫. সহিহ বুখারি
৬. মুসলিম শরিফ
৭. আবু দাউদ
৮. যারকানি

শেয়ার করুন

লেখক পরিচিতি

হবিগঞ্জ, সিলেট

error: Content is protected !!